শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলো

জীবজগতের মধ্যে সৃষ্টিকর্তা মানুষকে বোধগম্য কথা বলা, চিন্তা করা ও ভালো মন্দের যাচাই করার ক্ষমতা দিয়েছেন । পৃথিবীর পরিবেশ ও জলবায়ু সর্বদা মানুষের সুন্দর ও শান্তিতে বসবাসের জন্য উপযোগী ছিল না । মানুষ চিস্তা ভাবনা করেই এই পৃথিবীকে মানব বসতির জন্য উপযোগী করেছে । আমাদের এখন কাজ হচ্ছে এই পৃথিবীকে আরও সুন্দরভাবে বসবাসের উপযোগী অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলা । আজকের শিশুরা আগামী দিনের বিশ্বকে নেতৃত্ব দিবে । এজন্য তাদের বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য দক্ষ ও যোগ্য হিসাবে গড়ে ওঠার জন্য শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে । এখন শিক্ষা প্রত্যয়টির অর্থ ও লক্ষ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছুটা ধারণা নিই ।

শিক্ষার উৎপত্তি

শিক্ষা শব্দটি সংস্কৃত ‘শিক’ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ শাসন করা, নিয়ন্ত্রণ করা, নির্দেশ করা বা পরামর্শ দেওয়া ।

শিক্ষা শব্দের সমার্থক শব্দ বিদ্যা যা সংস্কৃত “বিদ’ ধাতু থেকে উৎপন্ন ৷ “বিদ” অর্থ জানা বা জ্ঞান আহরণ করা ।

শিক্ষা শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ Education তবে Education শব্দটি মূলত ইংরেজি নয় এটি ল্যাটিন ভাষা থেকে ইংরেজিতে এসেছে । তবে এটি নিয়ে যে মতভেদ রয়েছে তা হলো

এক পক্ষের মতে, Education শব্দটি ল্যাটিন ভাষার Educare থেকে এসেছে যার অর্থ নিষ্কাশন করা বা কোন বস্তুকে ভিতর থেকে বাহিরে নিয়ে আসা।
অন্য পক্ষের মতে, Education শব্দটি ল্যাটিন ভাষার Educare যার অর্থ লাভ করা, প্রতিকার করা, পরিচর্যা করা ।
তৃতীয় পক্ষের মতে, ল্যাটিন Education অর্থ শিক্ষা দান বা শিক্ষণ ।

উপযুক্ত ল্যাটিন শব্দের পর্যালোচনা করে আমরা যে বিষয়গুলো পাচ্ছি তা হলো

১) শিক্ষা অর্থ সঠিক যত্নের মাধ্যমে ছাত্র ছাত্রীদের জীবন পথে চলার জন্য উপযুক্ত কৌশল শিখিয়ে দেওয়া ।

২) শিক্ষা বলতে জীবনকে গড়ে তুলতে মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তির বিকাশ সাধন ।

৩) শিক্ষা হচ্ছে সুনির্ধারিত পন্থা অবলম্বন করে ছাত্রদের জ্ঞান অর্জনের সহায়তা করা ।

শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য :

যখন কোন কাজ করা হয় তখন ঐ কাজ করার পেছনে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে । সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমরা কর্মপন্থা ঠিক করি।

তাহলে আমরা শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলো জানার চেষ্টা করিঃ

১. এটি যেকোন দেশের জাতীয় উন্নয়নের পূর্বশর্ত ।

২. দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য দরকার ।

৩. নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন যোগ্য নাগরিক হিসাবে গড়ে তোলার জন্য ।

৪. রাষ্ট্র ও প্রশাসন চালানোর জন্য দক্ষ জনবল তৈরি করার জন্য ।

৫. প্রত্যেক শাসক শ্রেণী তাদের আদর্শ ও দর্শন অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করতে চান । এজন্য শাসক শ্রেণী জনগণের শিক্ষার ব্যবস্থা করেন তার আদর্শ বোঝার জন্য কীভাবে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চান ।

৬. দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতা রক্ষার প্রতি শিক্ষার্থী সচেতন করা ।

৭. একটা জাতির নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারা বিকশিত করে তা এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা ।

শিক্ষার্থীদের নিম্ন লিখিত বিষয়ের প্রতি আরও মনোযোগী হতে হবেঃ

১. শিক্ষার্থীদের ভাল মন্দের পার্থক্য করতে শিখতে হবে। নৈতিক সততার গুণটি আত্মস্থ করতে হবে । নৈতিক সাহস আত্মস্থ করে সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করা ।

২. নিজেকে যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার নিজের শক্তি সম্পর্কে জানা । কাজের প্রতি সন্দেহ ও হীনম্মন্যতাবোধ না করে বিশ্বাস স্থাপন করা এবং পরিবর্তনের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়ানো ।

৩. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে।

৪. বিশ্বায়নের যুগে প্রত্যেক জাতি নিজেদের প্রয়োজনের তাগিদে অন্যান্য জাতির কাছাকাছি চলে আসছে । এজন্য আমাদের নিজেদের ও অন্যান্য জাতির সাথে মিলেমিশে থাকার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে ।

৫. দলবদ্ধভাবে কাজ করতে শেখা ও অন্যের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর অভ্যাস আত্মস্থ করতে হবে । নিজেদের সৃষ্টিশীল ও উদ্যোক্তা হিসাবে গড়ে তোলা ।

৬. শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রধান কাজ হল জ্ঞান আহরণ করা, আর এই কাজটি করতে গিয়ে যেকোনো বিষয়ের প্রতি কৌতুহল সৃষ্টি করা । এ ক্ষেত্রে সৃজনশীল ও অনুসন্ধিৎসু মন তৈরি করতে হবে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে সমালোচনামূলক ভাবে চিন্তা করা ও মূল্যায়ন করা শিখতে হবে ।

৭. মানুষ সামাজিক জীব। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সাথে আমাদের বসবাস করতে হয় । নিজেদের প্রয়োজনে অন্যের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের কৌশল রপ্ত করতে হবে ।

৮. মানুষ যে জিনিসের সাথে যত বেশি সময় দেয় তার প্রতি সে তত আকৃষ্ট হয় ৷ এজন্য আমরা যে দেশে বসবাস করি সে দেশ সম্পর্কে জানতে হবে, নিজ দেশকে ভালোবাসতে হবে এবং নিজের দেশ বাংলাদেশকে নিয়ে গর্ব করতে হবে । এ সমস্ত ধ্যান ধারণা নিজের মধ্যে আত্মস্থ করার জন্য শিক্ষার্থীদের বইয়ের সাহাষ্য নিতে হবে । তাদের দক্ষ ও যোগ্য হিসাবে গড়ে তোলার জন্য পথপ্রদর্শক হিসাবে কাজ করবে বই। বইতে সফল মানুষের চিন্তাধারা, বীরত্ব গাথা এবং মানুষের নানাবিধ কর্মকাণ্ড লিপিবদ্ধ থাকে । মানুষ একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর পৃথিবী ত্যাগ করে। তবে তাদের চিন্তাধারা ও অভিজ্ঞতা বাঁচিয়ে রাখে এই বই । এ জন্য শিক্ষার্থীরা যত বেশি চিন্তাশীল মহামানবের বই পড়বে তত বেশি তারা নিজেকে দক্ষ ও যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে । মানব জীবনে বইয়ের গুরুত্ব অত্যধিক | বই একাকিত্বের সঙ্গী, অন্ধকারে পথ প্রদর্শক ৷ এই বই হাসতে শিখাবে, কাঁদতে শিখাবে আবার চিন্তা করতে শিখাবে । শিক্ষার্থীরা বইকে তাদের পরম বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে এবং তাদের বাসার একটি বুক সেলফে তাদের এই পরম বন্ধুকে স্থান দিবে । মনে রাখতে হবে নিজের ভূল ভাঙে বই পড়ে নিজের উদ্ভট ভাবনা সম্পূর্ণ উদ্ভট নয় – এই অভয়ও পাই বইয়ে । মানুষের ভাবনার জগৎ বহুমাত্রিক ।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *