ভাবসম্প্রসারণ: সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই |

সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই উক্তিটি মধ্যযুগ আমলের। মধ্যযুগের কবি বড়ু চণ্ডীদাস উচ্চারণ করেছিলেন বাঙালি জাতির এমনকি মানব-ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবিক বাণী-

‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’

সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই ভাবসম্প্রসারণ

মূলভাব: মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। মানুষের নেই কোনাে জাতিভেদ এবং মানুষের কোনাে জাতিভেদ থাকতে পারে না। সে যে দেশেরই হােক না কেন, যে রঙেরই হােক না কেন তার একটিই পরিচয়— সে মানুষ।

সম্প্রসারিত ভাব: মানুষকে তার সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ বলে ঘােষণা দিয়েছেন। তিনি তাঁর সৃষ্টিতে রাখেননি কোনাে ভেদাভেদ, রাখেননি কোনাে বৈষম্যের পার্থক্যরেখা। কিন্তু শ্রেষ্ঠ জীব মানুষই সৃষ্টি করেছে নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ, ঘৃণ্য জাতিভেদ, বিভিন্ন বৈষম্য। সেই আদিমকাল থেকেই এই মানুষে মানুষে সংঘাত, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। যার ফলে সৃষ্টি হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন জাতি, ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রের। কিন্তু মানুষ তার বুদ্ধি ও মেধা দিয়ে এসব ভেদাভেদ মুছে ফেলে দিয়ে বার বার নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছে। সৃষ্টিকর্তা মানুষের ভেতর দিয়েছেন অসীম শক্তি, সাহস ও মেধা। এই মেধা দিয়েই মানুষ ক্রমে প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছে। সে তার জ্ঞানবুদ্ধি দিয়ে উদ্ভাবন করেছে নানা ধরনের প্রয়ােজনীয় সামগ্রী। অণু থেকে অট্টালিকা, সাগর থেকে মহাসাগর পর্যন্ত জয় করে ফেলেছে। শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন ইত্যাদি সৃষ্টি করেছে সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার জন্যে। সেই আদিকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত মানুষ তার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছে। কিন্তু যে মানুষ তার এই জ্ঞানে, বুদ্ধিতে আর মেধার দাম্ভিকতায় ভাগ্যহত অসহায় মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করে তার ওপর সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ নেমে আসে। বস্তুত দুঃখী, অবহেলিত নিপীড়িত মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালনের মধ্যেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও কৃতিত্ব নিহিত। সবার উপরে মানুষ সত্য’– তাই এই পৃথিবীতে তার দায়িত্বও সবচেয়ে বেশি। মানুষ তার নিরলস শ্রম-সাধনায় মানবকল্যাণে নিজের জীবন উৎসর্গ করার মাধ্যমেই নিজের শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় রেখে যায়। পৃথিবীতে ভিন্ন ভিন্ন জাতি ও ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্র থাকা সত্ত্বেও ক্রমেই এসব সীমা, পার্থক্য মুছে ফেলে মানুষ তার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ করেছে। স্রষ্টা মানুষকে আত্মশক্তিতে বলীয়ান করে সৃষ্টি করেছে। আর সেই শক্তি দিয়েই সে নানাভাবে বিশ্বকে জয় করে তুলেছে।

প্রকৃতপক্ষে ব্যথিত, পীড়িত আর দুঃখী মানুষের প্রতি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের মধ্যেই প্রমাণিত হয় তার শ্রেষ্ঠত্ব ও কৃতিত্ব । আর এভাবেই মানুষ তার কৃতিত্ব রেখে যায়। তাই তাে বলা হয় সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই। আর বাঙালি জাতি এই মহান সত্যের ধারক, বাহক ও প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় নিবেদিত।

একই ভাবসম্প্রসারণের ভিন্ন প্রতিলিপন

মূলভাব : এ পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার মধ্যে মানুষের স্থান সবার ঊর্ধ্বে।

সম্প্রসারিত ভাব : মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। দেহ-মনে-প্রাণে মানুষ অপূর্ব। বাইবেলে উল্লেখ আছে, ‘God made man after his own image.’ পরম করুণাময় আল্লাহ মানুষকে অন্তৰ্শক্তিতে বলীয়ান করে তার মধ্যে মেধা ও বুদ্ধির সমন্বয় ঘটিয়ে অন্যান্য জীব থেকে শ্রেষ্ঠ করেছেন। মানুষ অদম্য অপরিসীম ইচ্ছাশক্তির অধিকারী। মানুষ বুদ্ধিবলে জল-স্থল- অন্তরীক্ষে স্বীয় বিজয় পতাকা উড্ডীন করেছে। মানুষের শক্তি, জ্ঞান ও কর্মের সীমানা অফুরান। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে স্বার্থান্বেষী ও ক্ষমতাদর্পী কিছু মানুষ হীন উদ্দেশ্যে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ সৃষ্টি করতে প্রয়াসী। তারা ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়গত পার্থক্য উসকে দিয়ে জাতিগত বিভেদ ও শ্রেণিগত বৈষম্য সৃষ্টি করে। ফলে সমাজে ও দেশে দেখা দেয় সংঘাত, সংঘর্ষ ও হানাহানি। তবে শক্তির দম্ভে মানুষ যদি তার স্বীয় কর্তব্য ভুলে দরিদ্র ভাগ্যাহত মানুষকে তুচ্ছ জ্ঞান করে, তাহলে সে দাম্ভিক এবং অপরিণামদর্শীর ওপর স্রষ্টার অভিশাপ নেমে আসবে। মানুষই মানুষের সুখ-দুঃখের সাথি! মানুষের চোখের পানি মুছে দিতে মানুষই পালন করবে অগ্রণী ভূমিকা। প্রত্যেক মানুষে স্রষ্টা বিরাজমান। শক্তি-সামর্থ্যে, বিদ্যা-বুদ্ধিতে সকল মানুষ সমান না হলেও মানুষের সাথে ব্যবহারের সময় স্মরণ রাখতে হবে মানুষে মানুষে কোনাে ভেদাভেদ নেই। মানুষ সৃষ্টির সেরা-
‘আশরাফুল মাখলুকাত। তাই সৃষ্টির যে দিকেই তাকাই না কেন, মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কিছুই দেখি না।

মন্তব্য : মানুষের আসল পরিচয় তার মনুষ্যত্বে। মানুষের সবচেয়ে বড় ধর্ম মানব ধর্ম। দেশে দেশে কালে কালে মহামানবরা এ মানবতারই জয়গানে মুখর ছিলেন। তারা প্রমাণ করেছেন, সব কিছুর উর্ধ্বে মানুষ, মানুষের জন্য মানুষ।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *