চাকরির আবেদন,মানপত্র, আবেদন পত্র,আমন্ত্রণপত্র, সংবাদপত্রে প্রকাশ ও ব্যক্তিগত পত্র লেখার নিয়ম

পত্র বা চিঠি

যােগাযােগ ব্যবস্থার এই উৎকর্ষের যুগেও নানা প্রয়ােজনে আমাদের চিঠি লিখতে হয়। কোনাে কারণে বাবা-মার কাছ থেকে দূরে অবস্থান করতে হলে সেসময় তাঁদের চিঠি লিখলে তারা আনন্দিত হন। বন্ধুবান্ধবের কাছেও অনেক সময় চিঠি লিখতে হয়। কখনাে কখনাে প্রধান শিক্ষকের কাছে আবেদন লেখার প্রয়ােজন পড়ে। নিজেরা কোনাে অনুষ্ঠান করলে আমন্ত্রণপত্র রচনার কাজও বর্তায় নিজেদের ওপর। তাছাড়া এলাকার কোনাে সমস্যা সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সংবাদপত্রে অনেক সময় চিঠি লেখারও প্রয়ােজন পড়ে। তাই বিভিন্ন ধরনের চিঠি লিখতে জানা ভাষা শেখার একটি ব্যবহারিক দিক হিসেবে পরিগণিত হয় ।

পত্র বা চিঠির ধরন

চিঠি নানারকমের হতে পারে। যেমন: ব্যক্তিগত চিঠি, দরখাস্ত বা আবেদনপত্র, সংবাদপত্রে প্রকাশের জন্যে পত্র, নিমন্ত্রণপত্র, ব্যবসায়িক পত্র, অভিনন্দনপত্র ইত্যাদি। এক এক ধরনের চিঠি লেখার সময়ে এক এক ধরনের নিয়ম বা ছক মেনে চলতে হয়।

১. ব্যক্তিগত চিঠি লেখার নিয়ম

বাবা-মা, ভাইবােন, আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধুবান্ধবের কাছে যেসব চিঠি লেখা হয় সেগুলাে হচ্ছে ব্যক্তিগত চিঠি। এসব চিঠিতে থাকে পড়াশােনার বা বেড়ানাের কথা, থাকে উৎসব-অনুষ্ঠান পালনের কথা । এ ধরনের চিঠিতে বিশেষ অভিজ্ঞতা কিংবা বিশেষ সমস্যার কথাও লেখা চলে এ ধরনের চিঠি এমনভাবে লিখতে হয় যেন পড়তে ভালাে লাগে, বহুদিন মনে থাকার মতাে নয়। অবান্তর বা অপ্রাসঙ্গিক কথা কিংবা দুর্বোধ্য শব্দের আড়ম্বর ঘটলে এ ধরনের চিঠি কৃত্রিম হয়ে পড়ে।

ব্যক্তিগত চিঠির গঠন কাঠামাে বা আঙ্গিক: পুরাে চিঠির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোন অংশে কী লেখা হয় এবং কোন রীতিতে লেখা হয় তার একটা নির্দিষ্ট ছক আছে। সেই ছককে বলা হয় গঠন কাঠামাে বা আঙ্গিক। গঠন কাঠামাের দিক থেকে ব্যক্তিগত চিঠির দুটো অংশ থাকে

ক. ভেতরের অংশ;
খ. বাইরের অংশ।

ক.চিঠির ভেতরের অংশঃ

চিঠির ভেতরের অংশ পাঁচটি ভাগে বিভক্ত। এখানে তা ব্যাখ্যাসহ উল্লেখ করা হলাে। (নমুনা হিসেবে নিচে দেওয়া চিঠিটি দেখে নাও।)

১. ঠিকানা:চিঠির বামদিকে ওপরের কোনায় যেখান থেকে চিঠি লেখা হচ্ছে সেখানকার ঠিকানা লিখতে হবে।
২. তারিখ: ঠিকানার ঠিক নিচে যে তারিখে চিঠি লেখা হচ্ছে সেই তারিখ দিতে হবে।
.সম্ভাষণ: চিঠির বামদিকে যাকে চিঠি লেখা হচ্ছে তাকে উপযুক্ত সম্ভাষণ করতে হবে। গুরুজন কিংবা সমবয়সি বন্ধুবান্ধবকে সম্বােধন করার ভাষা আলাদা। যেমন:

ক. গুরুজন আত্মীয় হলে: শ্রদ্ধেয় আব্বা, পরম পূজনীয় বাবা, শ্রদ্ধাভাজনীয়াসু মা ইত্যাদি।
খ. গুরুজন আত্মীয় না হলে: মান্যবরেষু, শ্রদ্ধাম্পদেষু, শ্রদ্ধেয়, শ্রদ্ধাভাজনেষু [মেয়েদের বেলায় মাননীয়াসু,শ্রদ্ধাম্পদাসু, শ্রদ্ধেয়া, শ্রদ্ধাভাজনীয়াসু] ইত্যাদি।
গ. সমবয়সি বন্ধুদের বেলায়: প্রিয় আনিস, প্রীতিভাজন সবুজ, প্রীতিভাজনেষু, বন্ধুবরেষু [মেয়েদের বেলায় প্রিয় নীলিমা, প্রীতিভাজনীয়াসু] ইত্যাদি। এক্ষেত্রে কেবল নাম লিখেও সম্বােধন করা চলে। যেমন: রাজু, তাের পাঠানাে চিঠি ও বই গতকালের ডাকে পেয়েছি।
ঘ. সম্পর্কে বা বয়সে ছােটদের সম্বােধনে: স্নেহের শামীম, স্নেহভাজন গৌতম, স্নেহাস্পদেষু, কল্যাণীয়। [মেয়েদের বেলায়: স্নেহের নীলা, স্নেহভাজনীয়াসু, কল্যাণীয়াসু] ইত্যাদি।

৪. মূল পত্রাংশ: এরপর এক বা একাধিক অনুচ্ছেদে চিঠির মূলবক্তব্য গুছিয়ে লিখতে হয়। বক্তব্যের প্রথমে বা শেষে কুশল সংক্রান্ত প্রশ্ন (কেমন আছ?) বা প্রত্যাশা [আশা করি, তােমরা সবাই ভালাে আছ)] থাকতে পারে।
৫. বিদায় সম্ভাষণ ও নাম স্বাক্ষরঃ বক্তব্য শেষ হলে চিঠির শেষ দিকে সমাপ্তিসূচক পদ সালামান্তে, প্রণামান্তে, শুভেচ্ছাত্তে ইত্যাদি লেখা হয়। তারপর সম্পর্ক অনুসারে বিনীত, স্নেহধন্য, প্রতিধন্য, প্রীতিমুগ্ধ, (মেয়েদের বেলায় বিনীতা স্নেহধন্যা, প্রীতিধন্যা, প্রীতিমুগ্ধা), তােমারই, তােরই, আপনারই, শুভাকাঙ্ক্ষী বা শুভার্থী লিখে তার নিচে নিজের নাম লেখা হয়। আগে এক্ষেত্রে ইতি লেখা হতাে। এখন অনেকেই লেখেন না।

লক্ষণীয়:

১.আগে চিঠির ওপরে ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় নিজের ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী মঙ্গল শব্দ (এলাহি ভরসা, খােদা ভরসা, আল্লাহ মহান, পরম করুণাময় ল্লাহর নামে, ওঁ, শ্রীদুর্গা সহায় ইত্যাদি) লেখা হতাে। আধুনিক রীতি অনুযায়ী আজকাল চিঠিতে এগুলাে খুব কমই লেখা হয় ।

২.আধুনিক রীতিতে এবং কম্পিউটারে অক্ষরবিন্যাসের ক্ষেত্রে চিঠিপত্রে বাম-ঘেঁষা পক্তিবিন্যাসের (Left Alignment) রীতি অনুসরণ করা হয়। তবে এক্ষেত্রে ব্যক্তিগতপত্রে পত্রলেখকের কিছুটা স্বাধীনতা রয়েছে। পত্ৰলেখক ইচ্ছা করলে হাতে লেখা পত্রে উক্ত রীতি অনুসরণ নাও করতে পারেন ।

খ.চিঠির বাইরের অংশঃ

চিঠির বাইরে খামের বা পােস্টকার্ডের ডানদিকে প্রাপকের (যিনি পাবেন তার) নাম ও ঠিকানা লিখতে হয়। আর বামদিকে লিখতে হয় প্রেরকের (যিনি চিঠি পাঠাচ্ছেন তাঁর) নাম। বাংলাদেশে বা পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষায়ই ঠিকানা লেখা চলে । তবে সাধারণভাবে বিদেশে চিঠি লিখলে ঠিকানা ইংরেজিতে লেখা উচিত।

২. আবেদনপত্র লেখার নিয়ম

কোনাে প্রতিষ্ঠানের কাছে বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে কোনাে কিছু চেয়ে যে পত্র রচনা করা হয় তাকে আবেদনপত্র বা দরখাস্ত বলে। যেমন: স্কুলের প্রধান শিক্ষকের নিকট ছুটি চেয়ে একটি চিঠি লেখা হলে তা হবে আবেদনপত্র। আবেদনপত্রের নির্দিষ্ট কাঠামাে এবং বেশ কিছু নিয়ম রয়েছে। এগুলাে এখানে উল্লেখ করা হলাে—

. তারিখ: ওপরে বামদিকে চিঠির তারিখ দিতে হবে। তারিখ ব্রিটিশ নিয়মে একেবারে নিচে আবেদনকারীর ঠিকানার নিচেও দেওয়া চলে।
২. উদ্দিষ্ট ব্যক্তির পদবি ও ঠিকানা: পত্রের শুরুতে বামদিকে পত্র-প্রাপকের প্রাতিষ্ঠানিক ঠিকানা ও পদ উল্লেখ করতে হয়।
৩. বিষয়: পত্রে পত্র-প্রাপকের ঠিকানার নিচে সামান্য ফাঁক রেখে ‘বিষয়’ কথাটি লিখে তার পাশে পত্রের মূলবক্তব্য সংক্ষেপে উল্লেখ করতে হয় ।
৪. সম্ভাষণ: বিষয়ের নিচে থাকে সম্ভাষণ অংশ। সম্ভাষণের ক্ষেত্রে জনাব, মান্যবরেষু, মহামান্যবরেষু, মহােদয়, মহাশয় ইত্যাদি সম্ভাষণের যেকোনাে একটি প্রয়ােজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে ।
৫. বক্তব্য: পত্রের মূলবক্তব্য থাকে মূল পত্রাংশে। সাধারণত দুটি অনুচ্ছেদে এই বক্তব্য উপস্থাপিত হয়। প্রথম অনুচ্ছেদে বক্তব্য বিষয় বা সমস্যার প্রকৃতি তুলে ধরা হয়। দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে যে জন্যে পত্র লেখা হচ্ছে সে বিষয়ে আবেদন করা হয়ে থাকে।

৩. চাকরির আবেদনপত্র লেখার নিয়মে

চাকরি পাবার জন্যে যে আবেদনপত্র রচনা করা হয় তাকে চাকরির আবেদনপত্র বা দরখাস্ত বলে । আবেদনপত্র সুলিখিত না হলে কিংবা অসম্পূর্ণ হলে তা চাকরি পাওয়ার পক্ষে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে সুন্দর, নির্ভুল, সুলিখিত দরখাস্ত চাকরিদাতার নজর কাড়ে। চাকরির আবেদনপত্রে প্রয়ােজনীয় সকল তথ্য থাকা দরকার । চাকরির দরখাস্ত লেখার সময় নিম্নের দিকগুলাে একান্ত বিবেচ্যঃ

১. প্রাপকের নাম-ঠিকানা: প্রাপকের নাম-ঠিকানা অংশে চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা লিখতে হয়।
২. বিষয়: প্রাপকের নামের পর বিষয় হিসেবে যে পদে আবেদন করা হচ্ছে তা উল্লেখ করতে হয়।
৩. সম্বােধন: আনুষ্ঠানিক সম্বােধন হবে ‘জনাব’ অথবা মহােদয়’ শব্দটি।
৪. আবেদনের সূত্র: পত্রিকা মারফত নিয়ােগ দানের খবর জানা গেলে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তারিখসহ সংশ্লিষ্ট পত্রিকার সূত্র উল্লেখ করতে হয়।
৫. আবশ্যিক তথ্য: আবেদনপত্রে আবেদনকারীর পূর্ণ নাম, পিতা-মাতার নাম, স্থায়ী ঠিকানা, বর্তমান ঠিকানা, জন্ম তারিখ, নাগরিকত্ব, শিক্ষাগত যােগ্যতা ইত্যাদি সম্পর্কে যথাযথ তথ্য লিপিবদ্ধ করতে হয়।
৬. অতিরিক্ত তথ্য: অতিরিক্ত কোনাে প্রশিক্ষণ কিংবা অতিরিক্ত যােগ্যতা বা অভিজ্ঞতা থাকলে আবেদনপত্রে তা উল্লেখ করা প্রয়ােজন।
৭. সংযুক্তি: দরখাস্তের শেষে আবেদনপত্রে বর্ণিত তথ্যের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিভিন্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সনদপত্র, প্রাপ্ত নম্বর, প্রশংসাপত্র এবং নাগরিকত্ব, যােগ্যতা, অভিজ্ঞতা ইত্যাদি সংক্রান্ত প্রত্যয়নপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি সংযুক্ত করে দিতে হয়।

৪. আমন্ত্রণপত্র লেখার নিয়ম

আমন্ত্রণপত্র সামাজিক অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে রচিত হয়; তা ছাপিয়ে অনেক লােককে বিলি করতে হয়। জন্মদিন, বিয়ে, ভােজসভা ইত্যাদি উপলক্ষ্যে এ ধরনের আনুষ্ঠানিকপত্র ব্যবহৃত হয়। এছাড়া দিবস পালন, ক্রীড়া প্রতিযােগিতা, জন্মজয়ন্তী, মৃত্যুবার্ষিকী, পুনর্মিলন, সংবর্ধনা, শােকসভা ইত্যাদি উপলক্ষ্যেও আমন্ত্রণপত্রের প্রয়ােজন হয়।

আমন্ত্রণপত্রের বিভিন্ন অংশ

আমন্ত্রণপত্র অন্যান্য পত্র থেকে একটু আলাদা ধরনের। এ ধরনের পত্রে নিচের অংশগুলাে থাকে।

১. পত্ৰশীর্ষ: জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্যে আমন্ত্রণ প্রযােজ্য বলে সাধারণত এ ধরনের পত্রের শীর্ষে ধর্মীয় মঙ্গলসূচক কথা ব্যবহৃত হয় না। তবে বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রের পত্ৰশীর্ষে কেউ কেউ মুসলমান রীতিতে ‘পরম করুণাময়ের নামে এবং হিন্দু রীতিতে শ্রী শ্রী প্রজাপতয়ে নমঃ’ লিখে থাকেন। পত্ৰশীর্ষে অনুষ্ঠানের শিরােনামও থাকতে পারে। যেমন: ‘স্বাধীনতা উৎসব ও লােকমেলা ২০২০’।

২. সম্ভাষণ: আমন্ত্রণপত্রের প্রাপককে সম্বােধন করার জন্যে বিশেষ কিছু শব্দ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এদের মধ্যে সুধী’ শব্দটি অধুনা বহুল প্রচলিত। এছাড়া সৌম্য, সবিনয় নিবেদন, জনাব, মহাশয়, মহােদয়, মহাত্মন, মান্যবর, সুহৃদ, সুজন ইত্যাদি সম্ভাষণও ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

৩. মূল অংশ: আমন্ত্রণের উপলক্ষ্য জানিয়ে তাতে যােগ দেওয়ার অনুরােধ করা হয়। অনুষ্ঠানের উপলক্ষ্য, তারিখ, সময় ও স্থানের উল্লেখ থাকতে হয়। এ ধরনের পত্রের ভাষা সহজ, সরল, সাবলীল ও স্পষ্ট হওয়া উচিত। বক্তব্যের মধ্যে বিনম্র ভাবও থাকা চাই।

৪. ইতি বা সমাপ্তি: এ ধরনের পত্রে এক সময় ‘পত্র দ্বারা নিমন্ত্রণের ত্রুটি মার্জনীয়’, ‘নিবেদন ইতি’ ইত্যাদি লেখার চল ছিল । আধুনিক রীতিতে এগুলাে লেখা হয় না।

৫. নাম-স্বাক্ষরে সৌজন্য: চিঠির বিষয় অনুসারে এ ধরনের পত্রে বিনীত’, ‘বিনয়াবনত’, শ্রদ্ধাবনত’, ‘ভবদীয়’ ইত্যাদি বাম দিকে লিখে তার নিচে আমন্ত্রণকারীর নাম লিখতে হয়।

৬. ঠিকানা ও তারিখ: আমন্ত্রণপত্রের বামদিকে তারিখ এবং বামদিকে আমন্ত্রণকারীর নামের নিচে ঠিকানা লেখাই প্রচলিত নিয়ম ।

৭. অনুষ্ঠানসূচি: কোনাে কোনাে অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে আলাদাভাবে তারিখ ও স্থানসহ অনুষ্ঠানসূচি দেওয়ার প্রয়ােজন পড়ে। এর ফলে আমন্ত্রিত ব্যক্তি অনুষ্ঠানের প্রকৃতি, ব্যাপ্তিকাল ইত্যাদি সম্পর্কে আগেভাগেই ধারণা করে নিতে পারেন।

৫. সংবাদপত্রে প্রকাশের জন্য চিঠি বা পত্র লেখার নিয়ম

জনগণের অভাব-অভিযােগ, স্থানীয় কোনাে সমস্যা কিংবা জনগুরুত্বসম্পন্ন কোনাে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন-নিবেদন করে ব্যর্থ হলে ভুক্তভােগীরা অনেক সময় পত্র-পত্রিকার শরণাপন্ন হন। জনগণ যেন তাদের অভাব-অভিযােগ ইত্যাদির প্রতিকার প্রার্থনা করতে পারে কিংবা কোনাে বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্যে উর্ধ্বতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে সেজন্যে সংবাদপত্রে চিঠিপত্রের বিশেষ কলাম থাকে।

সংবাদপত্রে প্রকাশের জন্যে চিঠি আসলে দুটো চিঠি:

  • ক. পত্রিকায় প্রকাশিতব্য চিঠি
  • খ. সম্পাদককে লেখা অনুরােধপত্র।

ক. পত্রিকায় প্রকাশিতব্য চিঠি:

পত্রিকায় প্রকাশিতব্য চিঠিটিই মূল চিঠি। সেটি তথ্যসমৃদ্ধ, যুক্তিযুক্ত ও বাস্তবভিত্তিক হওয়া উচিত যাতে কর্তৃপক্ষ বিষয়টির গুরুত্ব অনুভব করে পদক্ষেপ গ্রহণে অগ্রসর হয়। চিঠিটি বড় হবে কী ছােট হবে তা সমস্যা ও বিষয়বস্তুর ওপরই প্রধানত নির্ভর করে। তবে চিঠি যথাসম্ভব বিষয়ানুগ, বাহুল্যবর্জিত, সংক্ষিপ্ত হলেই ভালাে হয় । বক্তব্য বিষয় যত প্রাঞ্জল ও হৃদয়গ্রাহী হয় ততই ভালাে। এ ধরনের চিঠিতে ভাবাবেগ প্রকাশের সুযােগ থাকে না। বক্তব্যে ধারাবাহিকতা রক্ষা ও ভাষার প্রয়ােগে শুদ্ধতার দিকে বিশেষ মনােযােগী হতে হয়। প্রকাশিতব্য চিঠিতে মূল বিষয় অনুযায়ী উপযুক্ত শিরােনাম দিতে হয়। চিঠির শেষে প্রেরকের নাম ও ঠিকানার উল্লেখ করতে হয়। পত্রপ্রেরক কোনাে সংগঠন, প্রতিষ্ঠান বা এলাকাবাসীর পক্ষে চিঠি লিখলে তার নাম উল্লেখ করা উচিত।

খ. সম্পাদককে লেখা অনুরােধপত্র:

পত্রলেখক যে সংবাদপত্রে চিঠিটি প্রকাশ করতে চান সেই পত্রিকার সম্পাদককে অনুরােধ জানিয়ে একটি চিঠি লিখতে হয়। এ চিঠিটি যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত হওয়াই ভালাে। সম্পাদককে সম্বােধন ছাড়াও যথাস্থানে তারিখ এবং নিচে প্রেরকের নাম, ঠিকানা ও স্বাক্ষর দিতে হয়। অনুরােধপত্রের সঙ্গে প্রকাশিতব্য চিঠি ডাকযােগে বা হাতে হাতে পত্রিকার ঠিকানায় সম্পাদকের কাছে পাঠাতে হয়।

৬. মানপত্র লেখার নিয়ম

আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে বরণ করা, বিদায় জানানাে কিংবা সংবর্ধনা বা সম্মাননা প্রদানের জন্যে যে অভিনন্দনপত্র বা সংবর্ধনাপত্র রচনা করা হয় তাকে মানপত্র বলা হয়। মানপত্র সুন্দরভাবে লিখে, অলংকৃত করে, ছাপিয়ে এবং বাঁধাই করে সংবধেয় ব্যক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদানের জন্যে তৈরি করা হয়।

সংবর্ধনাসূচক মানপত্রে সংবধেয় ব্যক্তিকে স্বাগত জানানাে হয়, বিশিষ্ট ব্যক্তির কর্মকৃতি ও গুণাবলি ইত্যাদি উল্লেখ করা হয়। গুণী ব্যক্তির মহৎ ভূমিকা ও অবদানের স্বীকৃতি এবং তাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানােই মূলত এ ধরনের মানপত্র রচনার লক্ষ্য। নবীনবরণ উপলক্ষ্যে প্রদত্ত মানপত্রও এ ধরনের মানপত্র। বিদায় সংবর্ধনাসূচক মানপত্রের বিষয় মূলত বিদায়ী ব্যক্তির কর্ম ও অবদানের স্বীকৃতি প্রদান । মানপত্রে সেগুলাের উল্লেখ সৌজন্যের পরিচায়ক। বিদায় অনুষ্ঠানে প্রিয় ব্যক্তিত্বের বিদায়জনিত বিচ্ছেদ-বেদনার একটা সুর থাকে। মানপত্রে বিদায়ের আন্তরিক সুরটুকুর প্রতিফলন থাকা উচিত।

মানপত্রের বিভিন্ন অংশ

মানপত্র রচনার ক্ষেত্রে বিশেষ কাঠামাে ও বিশেষ রীতি অনুসরণ করতে হয়। মানপত্রের বিভিন্ন অংশ এরকম:

১. শিরােনাম
২. মূল অংশ
৩. নাম-স্বাক্ষর ও তারিখ

. শিরােনাম: যে উপলক্ষ্যে এবং যাকে (বা যাদেরকে) মানপত্র দেওয়া হয় তা উল্লেখ করে তারপর মানপত্রের প্রকৃতি অনুযায়ী ‘উষ্ণ অভিনন্দন’, ‘প্রাণঢালা শুভেচ্ছা’, ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’, ‘শ্রদ্ধার্ঘ্য ইত্যাদি লিখতে হয়।

২. মূল অংশ: মানপত্রের মূল অংশ কয়েকটি অনুচ্ছেদে বিভক্ত থাকে। একেকটি অনুচ্ছেদ একেকটি ভাবের বাহন হয় । প্রত্যেক অনুচ্ছেদের শুরুতে সংবধেয় ব্যক্তির গুণ প্রকাশক সম্বােধন বা সম্ভাষণ থাকে। তবে এটা গুণাবলির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হওয়া চাই। যেমন: সংবধেয় শিক্ষকের বেলায় সম্ভাষণ: ‘হে বরেণ্য শিক্ষক এবং বিদায়ী শিক্ষকের বেলায় ‘হে বিদায়ী শিক্ষাগুরু’। মূল অংশের সমাপ্তি পর্বে সম্বােধন না করে কর্মজীবনের সাফল্য ও মঙ্গল কামনা করা হয়ে থাকে।

৩. নাম-স্বাক্ষর ও তারিখ: মানপত্রে প্রদানকারী ব্যক্তির নাম স্বাক্ষরিত হয় না। যারা যে সংগঠনের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেয় মূল পত্রাংশের শেষে তাদের সমষ্টিগত প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় দিতে হয়। তবে নাম-স্বাক্ষরের আগে বিনীত’, ‘গুণমুগ্ধ’,‘বিনয়াবনত’, শ্রদ্ধাবনত’ ইত্যাদি বিশেষণ ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয়। নাম-স্বাক্ষর অংশ ডানদিকে থাকে। আর বামদিকে তারিখ দিতে হয়।

৭. ব্যবসায়িক পত্র লেখার নিয়ম

বিষয় ও বক্তব্যের দিক থেকে ব্যবসায়িক পত্র অন্যান্য পত্র থেকে একেবারেই আলাদা। তাই এ ধরনের পত্রের কাঠামাে, রচনারীতি ও ভাষা আলাদা হয়ে থাকে। এ ধরনের পত্র রচনার সময় নিচের বৈশিষ্ট্যগুলাে সম্পর্কে সচেতন থাকা দরকার।

১. কেবল প্রয়ােজনীয় বক্তব্য সংক্ষেপে প্রকাশ করতে হয়।
২. ভাষা সরল, স্বচ্ছ ও স্পষ্ট হতে হয়।
৩. বক্তব্য গােছালাে ও ধারাবাহিক হওয়া উচিত।
৪. এ ধরনের পত্রের বিশেষ লক্ষ্য থাকে সৌজন্য প্রকাশের মাধ্যমে ব্যবসায়িক সম্পর্ক আন্তরিক করা।
৫. পত্রের ধরন অনুযায়ী নির্দিষ্ট আঙ্গিক যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হয়।
৬.পরস্পরের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থা গড়ে তােলা এবং তা অব্যাহতভাবে রক্ষা করার জন্য এ ধরনের পত্রে আন্তরিক ও অকপটভাবে বক্তব্য প্রকাশ করতে হয়।
৭. পরিচ্ছন্নতা ব্যবসায়িক পত্রের বিশেষ ও আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। এ ধরনের পত্রে উপযুক্ত মার্জিন রাখতে হয়।

ব্যবসায়িক পত্রের কাঠামাে

ব্যবসায়িক পত্রের কাঠামাে এরকম:

১. শিরােনামপত্র (Letter head): পত্রের সবচেয়ে ওপরে প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানা, টেলিগ্রাম, টেলিফোন, ই-মেইল ঠিকানা ইত্যাদি থাকে। ছাপানাে প্যাড হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়। শিরােনাম অংশে তারিখ, স্মারক নম্বর (সূত্র, পত্র সংখ্যা) ইত্যাদিও থাকে।

২. পত্র-প্রাপকের ঠিকানা: ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, প্রতিষ্ঠানের নাম- ম-ঠিকানা এর অন্তর্গত। পত্রের বামদিকে এ ঠিকানা লিখতে হয়।
৩. বিষয়: এ অংশে বিষয় লিখে সংক্ষেপে পত্রের মূল বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা দিতে হয় ।
৪. সম্ভাষণ: সম্ভাষণে জনাব, মহােদয় বা সবিনয় ব্যবহার করুন বা সবিনয় নিবেদন লিখুন।
৫. পত্রের মূল অংশ: এ অংশে মূল বিষয়বস্তু বা বক্তব্য সংক্ষেপে উপস্থাপন করতে হয় ।
৬. বিদায় সম্ভাষণ: এ অংশে প্রথমে ধন্যবাদ, শুভেচ্ছা বা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হয়ে থাকে। এরপর বিদায় সম্ভাষণ হিসেবে বিনীত, নিবেদক, আপনার বিশ্বস্ত, ভবদীয় ইত্যাদি সৌজন্যবাচক শব্দ ব্যবহার করা শিষ্টাচারের পরিচায়ক।
৭. নাম-স্বাক্ষর: বিদায় সম্ভাষণের নিচে নাম-স্বাক্ষর করতে হয়। স্বাক্ষরের নিচে বন্ধনীর মধ্যে পুরাে নাম এবং তার নিচে পদমর্যাদা উল্লেখ করা হয়। প্রয়ােজনে প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানাও উল্লেখ করা যেতে পারে।
৮. সংযুক্তি: এ অংশে ফরমাশকৃত দ্রব্যের তালিকা, ব্যবসায়-বাণিজ্য সংক্রান্ত আনুষঙ্গিক কাগজপত্রের অনুলিপি বা ফটোকপি থাকে।
৯. বহিঠিকানা: খামের ওপরে প্রাপক ও প্রেরকের ঠিকানা লিখতে হয়।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *