বাদল দিনে রচনা (600 words) | JSC,SSC |

বাদল দিনে রচনার সংকেত(Hints)

  • ভূমিকা
  • বাদল দিনের রূপ
  • বাদল দিনে ব্যক্তিগত অনভূতি
  • বাদল দিনে গ্রাম ও নগর
  • উপসংহার

বাদল দিনে রচনা

ভূমিকা:

শ্রাবণের একটি বর্ষণমুখর দিন। বর্ষার সমস্ত আনন্দ যেন সেদিন দল বেঁধে ছুটে আসছিল আমার উঠোনে। চারদিকে আবছা অন্ধকার । ঘনকালাে মেঘে ছেয়ে আছে আকাশ। অবিরল বৃষ্টিধারা পড়তে শুরু করল। জানালা খুললেই স্পষ্ট শুনতে পাওয়া যায় পত্রপল্লবের মর্মর ধ্বনি। আজকের বাদলের স্বর আর বাতাসের স্বর দুই মিলে যেন এক স্বরে নাচিয়ে তুলছে গােটা প্রকৃতিকে। কবি জ্ঞানদাস এমন অবস্থা বিবেচনা করেই হয়তাে লিখেছিলেন

‘বাদলের ধারা ঝরে ঝরােঝরাে,
আউশের ক্ষেত জলে ভরাে-ভরাে
কালিমাখা মেঘে ওপারে আঁধার ঘনিয়েছে দেখ চহি রে।

বাদল দিনের রূপ:

বর্ষার আকাশ মেঘমুক্ত নয় । কালো মেঘের দল আকাশ তলে রচনা করে নতুন পরিবেশ। এক স্থান হতে অন্য স্থানে কুণ্ডলী পাকিয়ে গুর গুরু শব্দে ঘুরে বেড়ায় তারা। মেঘের দুত ছুটাছুটির ফলে তাদের সংঘর্ষও হয়ে ওঠে অনিবার্যভাবে। মেঘের যাত্রাপথের এ অনিবার্য সংঘর্ষ ধরাতলে বৃষ্টির আগমন ঘটায়। অকাশে বিদ্যুৎ চমকায় আর বর্ষণ হতে থাকে জলের অবিরাম ধারা । আর তখনি আমাদের মাঝে এসে উপস্থিত হয় বাদল দিন। এ দিনে পাখির স্বাধীন ওড়াউড়ি থাকে না, থাকে না মানুষের ঘরের বাইরে ছুটে চলার স্বাভাবিক চিত্র । বাদল বর্ষণে কবিগুরু প্রভাবিত হয়েছিলেন নানাভাবে । তাঁর কবিতায় তাই বাদল দিন ধরা পড়েছে এভাবে-

সকাল থেকেই বৃষ্টির পালা শুরু
আকাশ-হারনাে আঁধার-জড়ানাে দিন ।
আজকেই যেন শ্রবণ করেছে পণ
শােধ করে দেবে বৈশাখী সব ঋণ।

বাদল দিনে ব্যক্তিগত অনুভূতি:

হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে
ময়ূরের মতাে নাচে রে।”

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের এ কাব্যভাষা আজ বুঝি আমার মনের কথা। বাদল দিনে মনে আজ ঢেউ উঠেছে নানা রঙের সকাল থেকেই সূর্যের সাক্ষাৎ পাইনি আজ । আকাশ ঘােলাটে পাংশু হয়ে আছে। ঘন মেঘের গর্জন আর বৃষ্টির শব্দে মনে দোলা দিয়ে যায় এক অজানা আনন্দ। বায়ু বেগে গাছের লতায় পাতায় মিতালি শুরু হয়েছে আজ। অদূরে নিম গাছটার সরু ডালে ভেজা দুটি ঘুঘু পাখি ডানা ঝাপটাবার চেষ্টা করেও ক্ষান্ত হয়ে আছে। উঠোনের ওপর দিয়ে ছাতা মাথায় দিয়ে দুজন গৃহিণী চাপকল থেকে পানি আনতে যেতে বৃষ্টির পানিতে তাদের প্রাকৃতিক ম্লান হয়ে যায় যেন। বর্ষার ঘােলা পানিতে ভরে আছে ছােট ডােবাগুলাে। মেঘের দল আজ বাঁধনহারা। জল পড়ছে আর উঠছে। তাদের ডাকে যেন নৃত্যগুণ বর্তমান। চারপাশের শ্যামল বৃক্ষলতা যেন নির্বাক। বাদলের জলে ভিজতে ভিজতে তাদের শুধুই দাঁড়িয়ে থাকা। মনে পড়ে কবি বন্দে আলী মিয়ার কবিতার দু চরণ—

‘দেয়া ঝর ঝর সারাদিন ধরি মেঘলা আকাশ হতে
গাছগুলাে ভেজে চুপ চাপ দাঁড়াইয়া কোনমতে ।

গৃহকোণে বসে আজ কত কথাই না মনে পড়ে। টুকরাে টুকরাে কত স্মৃতি এসে নিজের অতীতকে সামনে নিয়ে আসছে। দরজায় হেলান দিয়ে বসে ভাজা কাঁঠাল বিচি চিবুতে চিবুতে মনে পড়ে মেঘদূতের কল্পকাহিনি আর রবীন্দ্রনাথের বর্ষবরণ কবিতা। চোখে ভেসে আসে মেঘের যাত্রাপথ, কল্পনায় কখনাে কালিদাস কখনাে রবীন্দ্রনাথ হয়ে নিজেই রচনা করে চলি। বাদলের রূপ । মনের ভাবালুতা আজ ধরে রাখা দায় । বাদলের রূপমাধুরী হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়। বর্ষণমুখর এ মায়াবী আকাশ। দু নয়নে যেন অঞ্জন বুলিয়ে দেয়। এমন দিনে ভালাে লাগে সব কিছু পৃথিবী, প্রকৃতি আর প্রকৃতির সকল উপকরণ। ভালাে লাগে প্রিয়জনকেও কল্পনা করতে। মানবমনের এ ভাব-বিহ্বলতাই ধরা পড়ে রবীন্দ্র ভাষ্যে-

এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘনঘাের বরিষায়।’

বাদল দিনে গ্রাম ও নগর:

বাদল দিনে গ্রাম ও নগরে বিপরীত চিত্র পরিলক্ষিত হয়। গ্রামের কৃষান-কৃষানির বাইরে কোনাে কাজ থাকে না বলে তারা গৃহে বসেই দিনযাপন করে। মােড়লের দহলিজে বসে কৃষকদের গল্পের মহড়া চলে । চলে হুকার গড় গড় তামাক সেবন। কৃষানিরা নকশিকাঁথার বুকে সুইয়ের ফোড়ে এঁকে যায় লােককাহিনিচিত্র । কেউবা পটের শিকা বনায় গলায় গুণ গুণ গান ধরে। অন্যদিকে, গ্রাম্যবধূ হয়তাে খিচুড়ি রান্নায় মেতে ওঠে রান্নাঘরে । শহর বা নগরের বাদল দিনে আবার ব্যতিক্রম লক্ষ করা যায়। বাদলের আনন্দ উপভােগ নগরে অনুপস্থিত বললে অত্যুক্তি হয় না। শ্রমিকের দল মাথায় বর্ষণ নিয়েই ছুটে চলছে কাজের সন্ধানে। শিল্প-কারখানার শ্রমিকরা বাদলের বর্ষণকে থােড়াই কেয়ার করে । গলির মুখের কাদা, পথের জল কোনাে কিছুই তাদের পথ রােধ করতে পারে না। বিত্তবান বিলাসীরা নিজের গাড়িটিতে চুপটি করে বসে পাড়ি দিতে চায় রাজপথ । কিন্তু রাজপথে তখন হাঁটুজল। জলের প্রহার তাকে গৃহে প্রত্যাবর্তন করায়। তাই নগর জীবনে। বাদলের আনন্দ নয়, বরং বিড়ম্বনাই প্রধান। মােটকথা বর্ষার বাদল দিন সব মিলিয়ে আনন্দ-বেদনায় বৈচিত্র্যময়। বাংলাদেশের প্রকৃতিতে তাই বাদলের আবেদন ফুরাবার নয়।

উপসংহার:

বাদল দিনের স্মৃতি বিস্মৃত হবার নয়। অনেক কবিতা, অনেক গান আর অসংখ্য স্মৃতিচারণের দিন বাদল দিন। শ্রাবণের বাদল দিন ফিরে ফিরে আসুক হাজার স্মৃতির মহড়া নিয়ে ।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *