গ্রামের হাট রচনা (850 words) | JSC, SSC |

গ্রামের হাট রচনার সংকেত

  • ভূমিকা
  • হাটের বর্ণনা
  • গ্রামগুলাের স্বয়ংসম্পূর্ণতা সৃষ্টিতে হাটের ভূমিকা
  • হাটের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক অবদান
  • ভাবের আদান-প্রদানে হাটের ভূমিকা
  • যােগাযােগের মাধ্যম হিসেবে হাট
  • উপসংহার

গ্রামের হাট রচনা

ভূমিকা:

গ্রামজীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হলাে ‘হাট’। বাংলাদেশের গ্রামজীবন এবং হাটব্যবস্থা ওতপ্রােতভাবে জড়িত। গ্রামীণ মানুষ তাদের উৎপাদিত পণ্যসম্ভার ক্রয়-বিক্রয়ের জন্যে সপ্তাহে যেকোনাে এক বা দুই দিন একটা নির্দিষ্ট জায়গায় মিলিত হয়। ক্রয়-বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে কোনাে নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট জায়গায় সমবেত হওয়ার নামই হাট। বাঙালি সংস্কৃতির বিচিত্র বহিঃপ্রকাশ ঘটে হাটে । গ্রামের বিপুল মানুষের বিচিত্র অভিব্যক্তির প্রকাশের মাধ্যম এ হাট’ ।

হাটের বর্ণনা:

গ্রামের সাধারণ মানুষের প্রয়ােজনীয় জিনিসপত্রের পসরা নিয়েই হাট বসে। খুব বেশি দামি জিনিস সেখানে বিক্রি হয় না। সাধারণত কৃষিজীবী, মৎস্যজীবী এবং ক্ষুদ্র কুটিরশিল্পীদের সাধারণ পণ্যসামগ্রী নিয়েই হাট বসে। সেসব পণ্য গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন প্রয়ােজন মেটাতে সক্ষম। হাটের দিন আশপাশের গ্রাম থেকে মানুষ নিজ নিজ পণ্য নিয়ে সমবেত হয়। সাধারণত দুপুরের একটু আগে থেকেই বিক্রেতাদের আগমন শুরু হয়, বিকেলের দিকে হাট জমজমাট হয়ে ওঠে এবং সন্ধ্যার সময় হাট ভেঙে যায়। কেনা-বেচার সুবিধার্থে হাটের একেক অংশে একেক পণ্যের পসরা বসে। যেমন- ধান বিক্রির জন্যে একটা নির্দিষ্ট অংশে ধান রাখা হয়। তেমনি সবজি, মাছ কিংবা কুটিরশিল্পীদের তৈরি জিনিস বিক্রির জন্যে একেকটা অংশ নির্ধারিত থাকে। এছাড়াও হাটে স্বল্পমূল্যের কাপড় এবং সাজের জিনিস (পুঁতির মালা, লিপস্টিক, নেইল পলিশ, কানের দুল, হাতের চুড়ি ইত্যাদি) বিক্রয় করা হয়।হাট সাধারণত গ্রামের স্বল্পআয়ের মানুষের প্রয়ােজন মেটানাের জন্যেই বসে। তাই তাদের ক্রয়সীমার মধ্যেই সেখানে জিনিসপত্র আনা হয়। গ্রামের মানুষের প্রয়ােজনীয় সব জিনিসই সেখানে পাওয়া যায়। আর এসব হাটের ক্রেতা যেহেতু আশপাশের লােকজন তাই খুব বেশি পণ্যের আমদানি সেখানে হয় না। ফলে যা আনা হয়, তার প্রায় সবই বিক্রি হয়ে যায়। দিনের শেষে আবার হাটের স্থান পূর্বের ন্যায় শূন্য হয়ে যায় এবং অপেক্ষা করে আগামী হাটের।

গ্রামগুলাের স্বয়ংসম্পূর্ণতা সৃষ্টিতে হাটের ভূমিকা:

আমাদের দেশ গ্রামপ্রধান দেশ। তাই গ্রামের স্বয়ংসম্পূর্ণতার ওপরই দেশের উন্নতি নির্ভরশীল । আর গ্রামের স্বয়ংসম্পূর্ণতা সৃষ্টিতে হাটের অবদান অনস্বীকার্য। গ্রাম্যহাট মূলত গ্রামের মানুষের নিজেদের প্রয়ােজন মেটানাের লক্ষ্যেই সৃষ্টি । ফলে গ্রামীণ মানুষ এ লক্ষ্যেই পণ্য উৎপাদনে আত্মনিয়ােজিত হয়। পরমুখাপেক্ষিতা নয়। বরং আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমেই তারা নিজেদের প্রয়ােজন মেটাতে চায় । একেক পরিবার একেক ধরনের পণ্য তৈরিতে আত্মনিয়ােগ করে। কেউ ধান উৎপাদন করে, কেউ করে সুজি, কেউ বা নিজেদের প্রয়ােজনে তৈরি করে গৃহস্থালির নানা সামগ্রী। নিজ নিজ পরিবারের প্রয়ােজন মিটিয়ে তারা উদ্বৃত্ত পণ্য বিক্রির মাধ্যমে প্রতিবেশীর প্রয়ােজন মেটাতে উপস্থিত হয় হাটে। সেখানে কেউ পণ্য কিনে, কেউ বা বিক্রি করে নিজেদের চাহিদা পূরণ করে স্ব-উৎপাদিত পণ্য হাটে বিক্রি করে তারা পয়সা উপার্জন করে। যা তাদের জীবনে যােগ করে বাড়তি সচ্ছলতা, এভাবেই হাটব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রামের মানুষের জীবনে। যে সমৃদ্ধি আসে তা গ্রামগুলােকে করে তােলে সমৃদ্ধ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ।

হাটের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক অবদান:

দেশের অর্থনৈতিক জীবনের সাথে হাটের সম্পর্ক নিবিড়। উৎপাদিত পণ্য ব্যাপকভাবে বাজারজাতকরণের মাধ্যমেই দেশের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত হয়। এদেশের জনগােষ্ঠীর অধিকাংশের বসবাসই গ্রামে। তাই তাদের উৎপাদিত নানা সামগ্রীর বাণিজ্যিকীকরণই দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখবে। আর গ্রামীণ পণ্যসামগ্রীর প্রধান বিনিময় কেন্দ্র হলাে ‘হট’ । গ্রামের মানুষ তাদের পণ্যসম্ভার নিয়ে হাটে উপস্থিত হয়। আর মহাজন ও বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা গ্রামের পণ্যসম্ভার দূরে শহরে, গঞ্জে কিংবা রেলস্টেশনে চালান দেয়। অর্থাৎ হাটের মাধ্যমেই দেশের প্রয়ােজন মেটানাে সম্ভব। তাছাড়া গ্রামীণ মানুষের এবং দেশের প্রয়ােজন মেটানাের পর হাট থেকে সংগৃহীত পণ্য অনেক সময় রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করা সম্ভব । একদিকে, হাটের মাধ্যমে গ্রামের উৎপাদকরা তাদের পণ্য বাজারজাত করে ভালাে দাম পেতে পারে। অন্যদিকে, হাট থকে সংগৃহীত পণ্য সুপরিকল্পিতভাবে বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করা সম্ভব। আর এভাবেই গ্রামপ্রধান আমাদের দেশে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গ্রাম্যহাট পালন করে কার্যকর ভূমিকা।

ভাবের আদান-প্রদানে হাটের ভূমিকা:

গ্রামের হাট কেবল পণ্য বিনিময় কেন্দ্র নয়, ভাব বিনিময়েরও একটা অন্যতম কেন্দ্র। হাটের দিন আশপাশের অনেক গ্রামের নানা বয়সের লােক সমাগম ঘটে। একজনের প্রয়ােজন মেটায় আরেকজন। এ পণ্যের প্রয়ােজন মেটাতে গিয়ে তাদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদানও ঘটে স্বাভাবিকভাবে। একটা নির্দিষ্ট জায়গায় মিলিত হয়ে সবাই যেন একই প্রাণের-স্পন্দনে মেতে ওঠে। পারস্পরিক নির্ভরশীলতা গ্রাম্যহাটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফলে সমবেত লােকজনের
মধ্যে গড়ে ওঠে ভ্রাতৃত্ববােধ । যা তাদের শিক্ষা দেয় অহিংস জীবন বাণী । পারস্পরিক কুশল বিনিময়ের মাধ্যমে তাদের মনের দূরত্ব কমে যায়, দৃঢ় হয় সামাজিক বন্ধন । পরস্পরের প্রয়ােজন জানার মাধ্যমে এবং সে প্রয়ােজন মেটানাের তাগিদ অনুভবের মাধ্যমে সাধারণ এসব মানুষ যন্ত্রযুগের সকল হিংসা-বিদ্বেষের উর্ধ্বে উঠে একই ভাবের অংশীদারী হয়ে ওঠে। ফলে মানবমনের আদান-প্রদানে হার্টের ভূমিকা অপরিহার্য।

যােগাযােগের মাধ্যম হিসেবে হাট:

কর্মব্যস্ত মানুষের যােগাযােগের মাধ্যম হিসেবে হাটের বিকল্প নেই । গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষ। তাদের দিনের বেশিরভাগ সময়ই কাটিয়ে দেয় মাঠে-খেতে-খামারে। ফলে আশপাশের মানুষের সাথে যােগাযােগ করার সুযােগ তাদের হয়ে ওঠে না। পাশের গ্রামের যে মানুষগুলাের সাথে গড়ে ওঠে আত্মিক সম্পর্ক, সে মানুষগুলাের সাথে দেখা করার একটা তীব্র আকাঙ্ক্ষা হয়তাে কাজ করে মনের গভীরে, কিন্তু সময়ের স্বল্পতায় আর হয়ে ওঠে না, সে ক্ষেত্রে হাটই পালন করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বিপুল লােক সমাগমের মাধ্যমে হাটই যােগাযােগের অন্যতম উপায় হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ মানুষের সাথে মানুষের দূরত্ব কমানাের অন্যতম যােগাযােগ মাধ্যম এ গ্রাম্যহাট।

উপসংহার:

দেশের উন্নতিতে হাট পালন করতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তাই গ্রাম্যহাটের উন্নয়নের দিকে সরকার এবং জনগণকে মনােযােগী হতে হবে। আমাদের দেশে হাটগুলাে এখনাে অনেকাংশে অবহেলিত। হাটের পরিসর সীমিত বলে। অনেক সময় উৎপাদকরা ভালাে দাম পায় না এবং প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থার অভাবে অনেক পণ্যসামগ্রীও নষ্ট হয়ে যায়। অথচ প্রয়ােজনীয় উদ্যোগের সাহায্যে হাটের মাধ্যমে এসব পণ্যসামগ্রী সংগ্রহ করে দেশের ব্যাপক প্রয়ােজন মেটানাে সম্ভব, যা
দেশের উন্নতির সহায়ক । তাছাড়া গ্রামীণ ঐতিহ্যই এদেশের ঐতিহ্য। আর গ্রামীণ ঐতিহ্যের অন্যতম অংশ হলাে গ্রাম্যহাট। সুতরাং, হাটের প্রয়ােজনীয় উন্নতি সাধন করে দেশের অর্থনীতিকে জোরদার করতে হবে ।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *