Sabbir8986 / December 29, 2020

সমুদ্রসৈকতে একদিন রচনা (১০০০ শব্দ) | JSC, SSC |

Spread the love

সমুদ্রসৈকতে একদিন রচনা

আমার নানা বাড়ি চট্টগ্রামে। সে এক ভারি মজার বাড়ি। দুই মামার বিশাল একান্নবর্তী পরিবার। সারাবছর সেখানেভাইবােনদের হই-হুল্লোড় লেগেই আছে । ঢাকা শহরের চার দেয়ালের বাড়িতে তাই সারাবছর আমরা দু ভাইবােন গুনতে থাকি ঈদের ছুটির দিনগুলাে। প্রতি ঈদে সব ভাইবােন চট্টগ্রাম যায় তাদের মায়ের সাথে ঈদ করতে, সাথে যাই আমরা ছেলেমেয়ের দল । কটা দিন কেটে যায় যা ইচ্ছে তাই করতে পারার আনন্দে। সেই সাথে চলে রাত জেগে আডডা, গান আর নানারকম গল্প । প্রতি বছরের ঈদের এ আনন্দ-উৎসবকে গত বছর কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটি, যার নাম কক্সবাজার।

আমার দুই মামিই খুব মিশুক । তারা মােটেও লােকছড়ার সেই ‘মামি এলাে লাঠি নিয়ে পালাই পালাই’ টাইপের না। বড় মামিই প্রস্তাব দিলেন ঈদের তৃতীয় দিন কক্সবাজার বেড়াতে যাওয়ার । বড়রা একটু গররাজি ছিল। আমরা ছেলেমেয়ের দল হই হই করে জানিয়ে দিলাম, কক্সবাজার যেতেই হবে। ঠিক হলাে ভােরে রওনা হব, রাতে ফিরে আসব । বড় মামার এক বন্ধু থাকেন কক্সবাজারে । মামা তাকে ফোনে জানাতেই সেদিন দুপুরে তিনি আমাদের দাওয়াত করে বসলেন । ঠিক হলাে দুপুরে ওনার বাসায় খাব । সারাবছর যে ইদের দিনের অপেক্ষা করি, সেই ইদের দিনটাই এবার খুব লম্বা মনে হচ্ছিল, সবাই শুধু প্ল্যান করছি ব্যাগে কী কী জিনিস নেব, কক্সবাজারে কেমন মজা হবে ইত্যাদি। অবশেষে এলাে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। সকাল দশটায়ও যাদের ঘুম ভাঙে না সেই আমরাই সকাল ছয়টায় ঘুম থেকে ওঠে ঝটপট রেডি হয়ে গেলাম । সকাল সাতটায় বাস ছাড়ল । আমরা বিভিন্ন বয়সের ছয় ভাইবােন সামনে পেছনে করে এক সাথে বসলাম। তবে সবার ছােট ভাইবােন দুটি বসল তাদের মায়েদের সাথে । দুই মামা-মামি, আমার বাবা-মা, আরও দুই খালা-খালুসহ বিশাল বাহিনী। সারাটা পথ পুরাে বাস মাতিয়ে রাখলাম গানে, সেই সাথে চলল গল্প আর হাসির ফোয়ারা। এরই মধ্যে খালাতাে ভাই বমি করে বসল পাশে বসা তার
বােনের গায়ে । বাসের মধ্যেই দু ভাইবােনের এক চোট ঝগড়া হয়ে গেল । আমরা বাকিরা ভারি মজা পেলাম। বড়রাও সারাটা পথ গল্পে মশগুল হয়ে থাকলেন। সারাবছর এত কাজের ভিড়ে তারাও তাে মজা করার সময় পান না। বাড়তি আনন্দ এনে। দিল রাস্তার দু ধারের গভীর জঙ্গল আর পাহাড়ের অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য । তবে সবচেয়ে মনকাড়া দৃশ্য ছিল বাস স্টেশনে ঢােকার একটু আগে হঠাৎ করে অনেক দূরে এক ঝলক দেখা সমুদ্রের সুবিশাল নীল জলরাশি। সমুদ্র যেন তার অপরূপ সৌন্দর্য এক পলক দেখিয়ে তাকে কাছ থেকে দেখার তৃষ্ণা বাড়িয়ে দিল। আমি আগে কখনাে সমুদ্র দেখিনি। এক ঝলকে প্রথম দেখা সেই রােদে ঝিকমিক জলরাশি আজও আমার চোখে লেগে আছে।

বাস থেকে নেমে আমরা একটা টেম্পু ভাড়া করে পুরাে পরিবার চড়ে বসলাম। পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে আমাদের টেম্পু মূল। শহরে ঢুকতে না ঢুকতেই আবার দেখলাম আকাশের নীলে, দুপুরের রােদে উচ্ছল সমুদ্রকে। টিভিতে অসংখ্যবার সাগর দেখেছি। কিন্তু বাস্তবে প্রথম সমুদ্র দর্শনের অভিজ্ঞতার কোনাে তুলনাই হয় না। আমরা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। ইচ্ছে হচ্ছিল দৌড়ে পানিতে নামি। কিন্তু সে উপায় নেই। বড়দের কড়া নির্দেশ আগে বাসায় গিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে খাওয়া সারতে হবে। বড় মামার বন্ধুর বাসায় পৌছে দেখি পরিবারটি একটি চাকমা পরিবার। সে বাড়িতে তিনটি ভাইবােন, আমাদের মতাে বয়স । মুহূর্তেই হাসিখুশি পরিবারটির সাথে আমাদের সবার বন্ধুত্ব হয়ে গেল । খুব খুশি হলাম আদিবাসী বন্ধু পেয়ে। তাড়াহুড়া করে খাওয়া-দাওয়া সারলাম। বড়রাও সমুদ্রসৈকতে যাওয়ার জন্যে আকুল হয়েছিল। বাসা থেকে খুব কাছে, তাই হেঁটেই রওনা হলাম সবাই। রাস্তায় অসংখ্য পর্যটক কেউ সমুদ্রসৈকতে যাচ্ছেন, কেউ সমুদ্র স্নান করে ফিরছেন সবার মনে ফুর্তি, তারা গান গাইছেন, গল্প করছেন।

হরেক রকম পণ্যের পসরা সাজানাে দোকান আর তপ্ত বালিয়ারির সৈকত পেরুতেই আদিগন্ত সমুদ্র। অসীম নীল আকাশকে ছুয়েছে তার নীল জলরাশি । সগর্জন সমুদ্রের সেই রূপ লিখে বর্ণনা করার মতাে নয়। যে সামনাসামনি দেখেছে, কেবল সেই জানে কেমন তার রূপ, কী তার আকর্ষণ। আমরা একমুহর্তও নষ্ট না করে সমুদ্রের পানিতে নেমে পড়লাম। সে এক মজার অভিজ্ঞতা। গায়ের ওপর দিয়ে একের পর এক ঢেউ ভেঙে পড়ছে। ফিরতি স্রোত আমাদের টেনে নিতে চাচ্ছে গভীর সমুদ্রের দিকে আর পরক্ষণেই জোয়ারি স্রোত আমাদের ঠেলে দিচ্ছে তীরে।

ঈদের ছুটিতে হাজার হাজার মানুষ কক্সবাজার এসেছে। সমুদ্রসৈকত জুড়ে গিজগিজ করছে নানা সি, নানা পােশাকের অজস্র পর্যটক। গােটা সৈকত তাদের আনন্দ-উচ্ছ্বাসে উচ্ছল । পানিতে ঢেউয়ের টানে কে কার গায়ে পড়ছে কোনাে ঠিকঠিকানা নেই । তাতে কেউই তেমন কিছু মনে করছে না। তবে বেপরােয়া কেউ কেউ সমুদ্রের গভীরে বিপজ্জনক জায়গায় চলে গিয়েছিল। আমরা অবশ্য বড়দের আগেই কথা দিয়েছিলাম যে বেশি গভীরে যাব না। তারপরও মাঝে মাঝে ঢেউয়ের মাতামাতি সব ভুলিয়ে দিতে চাইছিল । আনন্দে দিশাহারা হয়েই হয়তো সীমালঙ্ঘন করল আমার ছােটভাই। সে একটু দূরেই চলে গেল । তা চোখে পড়তেই শাস্তিস্বরূপ আমাদের সবাইকেই তখনই সমুদ্র থেকে উঠে আসতে বাধ্য করা হলাে । অবশ্য ততক্ষণে কখন দু ঘণ্টারও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি। প্রচণ্ড ক্ষিদে নিয়ে ভেজা গায়ে হাঁটতে হাঁটতে মামার বন্ধুর বাড়িতে ফিরলাম। সেখানে ফিরেই আরেক মজার ঘটনা শুরু হলাে। বাথরুম মাত্র দুটো। সমুদ্রে গােসল করেছি প্রায় পনেরাে জন। আমরা নতুন পরিচয় হওয়া পরিবারটিকেও আমাদের সাথে সমুদ্রে নামতে বাধ্য করেছিলাম। ঠিক হলাে দুটো,
বাথরুমের একটা বড়দের, অন্যটা ছােটদের । আমার দুষ্টু ছােটভাইটা যার জন্যে আমাদের সমুদ্র স্নান বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল এবং বকা খেতে হয়েছিল, সে এক দৌড়ে একটা বাথরুমে ঢুকে গেল। আমরা বাইরে দাড়িয়ে সব ভাইবােনে শীতে কাঁপছিলাম, আর ওকে বকা দিচ্ছিলাম ।

দুপুরের খাবার খেতে খেতে বিকেল হয়ে গেল । ততক্ষণে সারাবাড়ি আমাদের গায়ে লেগে থাকা সমুদ্রের বালিতে কাদাময় হয়ে গেছে। আতিথ্যদাত্রী মামি হাসিমুখে সব সহ্য করলেন। বরং আমাদের বার্মিজ মার্কেটে কেনাকাটা করতে নিয়ে যেতে চাইলেন। কিন্তু আমাদের ইচ্ছা সমুদ্রে সূর্য ডােবা দেখার। পানিতে আর নামব না— এ শর্তে বড় মামা আর তার বন্ধুর তত্ত্বাবধানে ছেলেমেয়েরা ফের গেলাম সমুদ্র দর্শনে দেখলাম সমুদ্রের নতুন রূপ, দুপুরে দেখা সমুদ্রের সাথে এর কোনাে মিলই নেই। পানি এখন আরও গভীর নীল, ঢেউগুলাে প্রচণ্ড গর্জনে তীরে আছড়ে পড়ছে। আকাশে নানা রঙের মেঘ ভাসছে ।
আমরা তীর ঘেঁষে হাঁটতে শুরু করলাম। অনেক ছবি তুললাম । সমুদ্রের মুক্ত হাওয়া সারাবছরের সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দিল। সন্ধ্যা যত কাছে আসছে সমুদ্র যেন ততই সুন্দর হচ্ছে, আকাশে তখন হাজার রঙের ছটা, সমুদ্রের পানিতে অস্তায়মান সূর্যের কমলা রঙের আভাস । ঠিক সূর্য ডােবার সময়কার সাগরের বর্ণনা দেয়ার সাধ্য আমার নেই, সম্ভবত কেউই তা পারবে না। আমরা সব ভাইবােন হাত ধরাধরি করে সূর্যের দিকে মুখ করে দাঁড়ালাম । সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে ভুলে ছবি তােলা হলো না।

শুনেছি সমুদ্রে সূর্য ডােবার মুহূর্তে মনে মনে কিছু চাইলে তা পাওয়া যায় । খোলা গলায় তাই সবাই গান ধরলাম:

‘সকাতরে ওই কাদিছে সকলে, শােনাে শােনাে পিতা।
কহাে কানে কানে, শুনাও প্রাণে প্রাণে মঙ্গলবারতা।’

রাত আটটায় বাস | ককুবাজার থেকে ফিরতেই ইচ্ছে করছিল না। এবার আর বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত যেতে হলাে না। শহরের মধ্য থেকেই বাস ছাড়ল । বাস ধীরগতিতে সামনে এগুতেই জানালা দিয়ে দেখলাম দুপুরের সেই ঝিলমিল সােনালি রং আর নেই, চাদের আলােয় রুপালি হয়ে গেছে সাগর । সে যেন ডাক দিয়ে আমায় বলল যাস নে, ফিরে আয় । আমি অপলক তাকিয়ে রইলাম। বাস কক্সবাজার শহর ছেড়ে দু পাশের সারি সারি পাহাড়ের পথ বেয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলল চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে।

চোখ বন্ধ করে তখনও আমি দেখছিলাম সমুদ্রকে, শুনছিলাম তার গর্জন। একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম । যথাসময়ে ফিরে এলাম চট্টগ্রামে। সঙ্গে রইল সাগরসৈকত থেকে নিয়ে আসা আনন্দ-স্মৃতি।

FILED UNDER : রচনা

Submit a Comment

Must be required * marked fields.

:*
:*

Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content

রচনা, ভাবসম্প্রসারণ,অনুচ্ছেদ,পত্র, আবেদন পত্র, সারাংশ-সারমর্ম , লিখন , বাংলা, ১০ম শ্রেণি, ২য় শ্রেণি, ৩য় শ্রেণি, ৪র্থ শ্রেণি, ৫ম শ্রেণি, ৬ষ্ঠ শ্রেণি, ৭ম শ্রেণি, ৮ম শ্রেণি, ৯ম শ্রেণি,  for class 10, for class 2, for class 3, for class 4, for class 5, for class 6, for class 7, for class 8, for class 9, for class hsc, for class jsc, for class ssc, একাদশ শ্রেণি, দ্বাদশ শ্রেণি