আমার প্রিয় কবি (৮০০ শব্দ) | JSC, SSC |

আমার প্রিয় কবি রচনার সংকেত (Hints)

  • ভূমিকা
  • কেন প্রিয় কবি
  • জন্ম ও শিক্ষা
  • কর্মজীবন
  • কাব্যচর্চা
  • কাব্যিক বৈশিষ্ট্য
  • উপসংহার

আমার প্রিয় কবি রচনা

ভূমিকা:

আবহমান গ্রামবাংলার অকৃত্রিম রূপকার কবি জসীমউদ্দীন। বাংলা সাহিত্যে তিনি পল্লিকবি’ হিসেবে খ্যাত। তিনিই আমার প্রিয় কবি। তার কবিতা পল্লিপ্রকৃতি আর পল্লিজীবনেরই অনাড়ম্বর সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি। তাঁর কবিতায় মেঠো সুরের যে আলাপন তা মুগ্ধ করে সবাইকে মুগ্ধ করেছে আমাকেও। তার কবিতায় পল্লি রাখালের যে বাঁশির সুর তা যেন আমারই। প্রাণের সুরকে রূপ দিয়েছে। নগরজীবনের ব্যস্ততায় জসীমউদ্দীনের কবিতা এক অনাবিল প্রশান্তির পরশ।

কেন প্রিয় কবি:

কবিতা পাঠ ও কবিতা আবৃত্তি সবসময়ই আমার প্রিয় বিষয়। তাই রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত, জীবনানন্দ
প্রমুখ কবির কবিতা পড়া হয়েছে অনেক। নাগরিক জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত, নানা ভাবনা প্রকাশেই তারা তৎপর ছিলেন। কিন্তু জসীমউদ্দীনের কবিতায় পল্পির শ্যামল স্বর্ণশ্রী, শ্যামল দূর্বা, তরুছায়া, পল্লিবালার ঘরকন্না অপূর্ব মাধুর্য নিয়ে ধরা পড়েছে। তাই হারিয়ে যাওয়া শৈশবের স্মৃতি বিজড়িত পল্লিগ্রাম আমি খুঁজে পাই একমাত্র জসীমউদ্দীনের কবিতায়। আমার কাছে তাই তিনি প্রিয় কবি হিসেবে সমুজ্জ্বল।

জন্ম ও শিক্ষা:

জসীমউদদীনের জন্ম ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে ১৯০৩ সালের ১লা জানুয়ারি । পিতা মৌলভি আনসার উদ্দীন ছিলেন গ্রামের স্কুলের শিক্ষক। মা ছিলেন সরলা স্নেহময়ী পল্লিরমণী । জসীমউদ্দীনের পিতা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যানুরাগী ছিলেন এবং স্বাভাবিক কবিত্বশক্তিও তার ছিল । উত্তরাধিকার সূত্রে জসীমউদ্দীন এসব পৈতৃক গুণের অধিকারী ছিলেন। শৈশবে পিতামাতার তত্ত্বাবধানে তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় । ফরিদপুর জেলা স্কুল থেকে তিনি ১৯২৩ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। একই কলেজ থেকে ১৯২৯ সালের বিএ পাস করেন। ১৯৩১ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে এমএ পাস করেন।

কর্মজীবন:

স্কুলের ছাত্রাবস্থায় জসীমউদ্দীনের কর্মজীবনের সূচনা হয়। তিনি দীনেশচন্দ্র সেনের আনুকূল্যে কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পল্লিগীতি সংগ্রাহক হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯২৪ সাল থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত সংগ্রাহকের কাজ করেন। পরবর্তীতে এমএ পাস করার পর ১৯৩২ সাল থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত দীনেশচন্দ্র সেনের অধীনে রামতনু লাহিড়ী রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট’ নিযুক্ত ছিলেন। ১৯৩৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যােগদান করেন। ১৯৪৪ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত কবি সরকারের প্রচার বিভাগে কার্যরত ছিলেন। এখান থেকেই তিনি কর্মজীবন হতে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৭৬ সালের মার্চ মাসে কবি পরলােকগমন করেন ।

কাব্যচর্চা:

বিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় জসীমউদ্দীনের কবি প্রতিভার উন্মেষ ঘটে । নগরভিত্তিক শিল্পবিপ্লবের প্রভাবে মানবমন যখন নির্মল শান্তির অন্বেষণে অস্থির, তখনই কবিতায় ভিন্ন স্বাদ নিয়ে হাজির হন জসীমউদ্দীন। যান্ত্রিক সভ্যতার বিরুদ্ধে তিনি পল্লিনির্ভর কাব্য রচনা করে এক নবআন্দোলনের জন্ম দেন । পল্লির জীবন, পল্লির প্রকৃতি যেন স্বরূপেই তাঁর কবিতায় ধরা পড়ে। কলেজের ছাত্রাবস্থায় পল্লিবৃদ্ধের বেদনাতুর হৃদয়কে অবলম্বন করে রচিত ‘কবর’ কবিতা বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। পল্লিবৃদ্ধের স্বজন হারানাের ব্যথা ছুয়ে যায় সবার অন্তর। জসীমউদ্দীনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাখালী’, এই কাব্যগ্রন্থে তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘কবর’ ও ‘পল্লিজননী’ স্থান পেয়েছে। রােগাক্রান্ত ছেলের মুক্তি কামনায় দুঃখিনী মায়ের হৃদয়ের যে আকুলতা কবি এঁকেছেন তা চিরকালের স্নেহময়ী পল্লিমায়েরই প্রতিরূপ । কবির ভাষায়—

নামাজের ঘরে মােমবাতি মানে, দরগায় মানে দান,
ছেলেরে আমার ভালাে কোরে দাও, কাদে জননীর প্রাণ।
ভালাে করে দাও আল্লাহ রছুল! ভালাে করে দাও পীর!
কহিতে কহিতে মুখখানি ভাসে বহিয়া নয়ন নীর।’

জসীমউদ্দীনের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘নকশীকাঁথার মাঠ’। এতে এক পল্লিকিশাের ও পল্লিকিশােরীর বেদনামধুর প্রেমকাহিনি অপূর্ব কাব্যিক রূপ পেয়েছে। গ্রন্থটি ইংরেজিতে ‘Field of the embroidered (Quilt’ নামে অনূদিত হয়ে জসীমউদ্দীনকে আন্তর্জাতিক খ্যাতির অধিকারী করেছে | জসীমউদ্দীনের অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযােগ্য হচ্ছে- ‘সােজন বাদিয়ার ঘাট’, ‘সকিনা’, ‘বালুচর, ধানক্ষেত’, ‘রূপবতী’ ও ‘মাটির কান্না, শিশুদের জন্য তিনি হাসু’ ও ‘এক পয়সার বাঁশি’ নামে দুটি কবিতার বই প্রকাশ করেছেন। পল্লিজীবন ও পল্লিপ্রকৃতিকে ভালােবেসে তিনি কাব্যচর্চা করেছেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। তিনি বাংলার বিপুল লােকসাহিত্য সম্পদকে সার্থকতার সাথে তাঁর কাব্যসাধনার ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়েছেন ।

কাব্যিক বৈশিষ্ট্য:

জসীমউদদীনের কবিতায় গ্রামবাংলার মানুষের ছবি উঠে এসেছে গভীর মমতায়, আন্তরিকতায় ও
নিরবচ্ছিন্নতায় । গ্রামীণ জীবনকে চিত্রিত করার ক্ষেত্রে জসীমউদ্দীন প্রকৃতি ও মানুষকে একই সরলরেখায় এনেছেন, যা দিয়ে তিনি প্রকৃতি ও মানুষের স্বাভাবিক অবস্থানকে চিহ্নিত করেছেন। ফলে দুঃখ, দারিদ্র্য, বঞনা ও বিড়ম্বনা নিয়ে গ্রামের মানুষের যে বিবর্ণ জীবন তা ধরা পড়েছে স্পষ্টভাবে। তিনি আধুনিক শিক্ষিত পাঠকের চাহিদা ও রুচিকে মূল্য দিয়ে প্রকরণগত দিক থেকে পল্লিকবিতাকে আধুনিক শৈল্পিক পরিচর্যায় সমৃদ্ধ করে তুলেছেন। তাই তাঁর কবিতার মেঠোসুর মুগ্ধ করে সবাইকে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ জসীমউদ্দীনের মূল্যায়ন করে বলেছেন- ‘জসীমউদ্দীনের কবিতার ভাব, ভাষা ও রস সম্পূর্ণ নতুন ধরনের।’

গ্রামীণ জীবনের স্বাভাবিক গতিই জসীমউদ্দীনের কবিতাকে গতিশীল করেছে। গ্রামের মানুষের সহজ-সরল অনুভূতি ও প্রেম ভালােবাসার সুখ-দুঃখ-বেদনায় বিজড়িত জীবনের ভেতর বাহির তিনি চিত্রিত করেছেন তাঁর কবিতায়। একজন চিত্রশিল্পীর দৃষ্টি ও যােগ্যতা নিয়ে তিনি কবিতা লিখেছেন। ফলে তার গ্রামীণ জীবনের কবিতা হয়ে উঠেছে –

কাচা ধানের পাতার মতাে কচি মুখের মায়া
লাল মােরগের পাখার মতাে ওড়ে তাহার শাড়ি
শুকনাে চেলা কাঠের মতাে শুকনাে মাঠে ঢেলা
।’

তবে জসীমউদদীনের কবিতা মূলত পল্পিনির্ভর হলেও নাগরিক জীবনের ভাবনাও তাঁর কবিতায় লক্ষ করা যায়। এ ভাবনার প্রকাশ দেখা যায় তার বালুচর’, ‘রূপবতী’, ‘মাটির কান্না’, ‘জলের লেখন’, ‘হলুদ বরণী’ ইত্যাদি কাব্যে।

উপসংহার:

পল্লিপ্রকৃতির সকল অভিজ্ঞতার প্রান্ত ছুঁয়ে যাওয়া কবি জসীমউদ্দীন। গ্রামকে তিনি দেখেছেন অখণ্ড রূপে। গ্রাম ছিল তার কাছে পরিপূর্ণ এক বিশ্ব। তিনিই প্রথম কবি যিনি গ্রামীণ উপকরণই শুধু নয় গ্রামের মানুষের ভাব, ভাষা, কল্পনা প্রবণতা, মেজাজ তথা অন্তর্গত ভঙ্গিকে কাব্যে ধারণ করতে পেরেছিলেন। তাই একমাত্র তাঁর কবিতায় আমি খুঁজে পাই আমার স্বপ্নময় গ্রামের অকৃত্রিম ছবি । নগর সভ্যতার যান্ত্রিকতার বিপরীতে জসীমউদ্দীনের পল্লিবাসীর ভালােবাসার আকর্ষণ বােধ আমাকে মুগ্ধ করে। তাই তিনিই আমার প্রিয় কবি। বাংলা সাহিত্যে আধুনিক পল্লিকবি’ হিসেবে কবি জসীমউদ্দীন অমর থাকবেন চিরদিন।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *