একটি কলমের আত্মকাহিনি রচনা (৬৫০ শব্দ) | JSC, SSC |

একটি কলমের আত্মকাহিনি লিখন

আমি একটা সাধারণ বলপয়েন্ট কলম । এ দেশের কোনাে একটা কোম্পানির কারখানায় আমার জন্ম । তবে কোন কোম্পানি তা মনে নেই। আমার যখন জ্ঞান হয়, তখন দেখি প্লাস্টিকের মােড়কে একটা কাচের শেলফে আমাকে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আমি অবশ্য ক্রেতাদের বিশেষ আকৃষ্ট করতে পারিনি। আমার গায়ে লাল-নীল রং ছিল না, রং-বেরঙের কাটুন আঁকা ছিল। আর তাই খুদে ক্রেতারা ফিরেও তাকাতাে না আমার দিকে। আমাকে প্রথম কিনে নেয় একজন গুরুগম্ভীর পরীক্ষার্থী। তার চোখে ছিল মােটা ফ্রেমের চশমা ।

আমি তার ঘরে খুব যত্নে ছিলাম বলা যাবে না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সে আমাকে ব্যবহার করত। তারপর খাপ বন্ধ না করে টেবিলের এক কোণে ফেলে রাখতে। পাতার পর পাতা সে লিখেই চলত। পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, রসায়ন, ভূগােল, গণিত, বাংলা, ইংরেজি আরও কত কী! নিউটনের সূত্র সে এতবার লিখেছে যে আমি নিজেই মুখস্থ বলতে পারব। কালি শেষ হয়ে গেলে সে রিফিল কিনে আনত; তারপর আবার লেখা শুরু করত । তার পরীক্ষাও ভালাে হয়েছিল। কেবল আমিই জানতামসে পদার্থবিজ্ঞান আর রসায়নে এ প্লাস পাবে। সে খাতায় যা যা নােট করেছিল, তা লিখতে তার কোনাে ভুল হয়নি! আরও দুটো কলম সাথে নিয়ে গেলেও সে আমাকেই ব্যবহার করেছিল ।

সে আমাকে বিশ্রাম করার সময় না দিলেও, আমি তাকে কখনাে সমস্যায় ফেলিনি। অনেকবার হাত থেকে পড়লেও আমার নিব ভাঙেনি। হঠাৎ করে এক গাদা কালিও বের হয়ে যায়নি। তবে হ্যা, দু-একবার এমন হয়েছে যে নিব থেকে কালি একেবারেই বের হচ্ছিল না। সে সময় আমার ভারি রাগ হয়েছিল । কালি বের না হলে কেন যে সবাই আমাকে ধরে ঝাকাতে আরম্ভ করে- বুঝি না। কাগজে একটু ঘষাঘষি করলেই তাে আবার কালি বের হয়। এ সহজ ব্যাপারটা মানুষ বােঝে না।

একদিন কলেজে তার পকেট থেকে আমি মাটিতে পড়ে যাই। একটা স্কুলপড়ুয়া বাচ্চা ছেলে আমাকে তুলে নেয়। আমাকে ব্যবহার করা শুরু করে। ব্যবহার না বলে দুর্ব্যবহার বললে বেশি উপযুক্ত হবে । ছেলেটা ছিল ভারি দুষ্টু। পড়ালেখায় তার মন ছিল না। ক্লাসে সবসময় সে পিছনে বসত আর তার বন্ধুদের সাথে ‘পেনফাইট’ নামের একটা ভয়ঙ্কর খেলা খেলত। সেই খেলায় আমরা কলমরা পরস্পরের সাথে ঠোকাঠুকি খাই । ঠোকাঠুকিতে যে আগে বেঞ থেকে পড়ে যাবে, সেই কলমটার মালিক হেরে যাবে। আমার হালকা পাতলা গড়ন, কতবার যে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছি তার হিসেব নেই। সেই ছেলেটার এক বন্ধু মাঝে মাঝে আমাকে দু আঙুলের মাঝে রেখে বনবন করে ঘােরতি। এটাও কম যন্ত্রণাদায়ক ছিল না।

লেখাপড়ায় ছেলেটা আমাকে তেমন কাজে লাগায়নি। একবার প্রায় দু দিনের মতাে তার স্কুল ব্যাগে পড়েছিলাম। কী ঘুটঘুটে অন্ধকার, বেশ ভয়ও লেগেছিল। একদিন ওই ছেলেটা আমার খাপ হারিয়ে ফেলল। এরপর থেকে আমি আশঙ্কায় থাকি, এ বুঝি পড়ে গিয়ে নিবটা ভেঙে যায়। তখন তাে আমি অকেজো হয়ে পড়ব । ছেলেটার বাবা একদিন ছেলের রিপাের্ট কার্ডে সই করেছিল আমাকে দিয়ে। পাঁচটা বিষয়ে তার ফেল মার্ক ছিল। ভয় পাচ্ছিলাম, রাগের মাথায় যদি বাবাটা আমাকে ছুঁড়ে ফেলে। দেয়! কিন্তু ভাগ্যিস সেরকম কিছু হয়নি ।

হাত বদলে একদিন আমি আরেক বাসায় চলে গেলাম । আমার মুখে তখন অন্য একটা কলমের খাপ । সেই বাসায় আমাকে বিভিন্ন ধরনের কাজে লাগানাে হতাে। গৃহকত্রী আমাকে দিয়ে বাজারের ফর্দ লেখাতেন। তার শাশুড়ি ছিলেন বয়স্ক মানুষ, তিনি সকালে পত্রিকা পড়তেন আর শব্দজব্দ মেলাতেন। সে কাজও আমি করতাম। বাসায় একটা ছােট বাচ্চাও ছিল, সে সারাক্ষণ আমাকে দিয়ে দেয়ালে আঁকিবুকি করত। প্রত্যেকটা দেয়ালে ছিল আমার নীল কালির চিহ্ন। অবস্থা বেগতিক দেখে তার জন্যে খাতা কিনে আনা হয়। তবে ততদিনে দেয়ালের যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে।

মাঝে মাঝে বড় কাজে অংশ না নিতে পারার দুঃখ আমাকে পেয়ে বসে। ভাবি, কোনাে জজ-ব্যারিস্টারের কলম হলে আমি বড় বড় মামলার রায় লিখতে পারতাম কোনাে ধনী ব্যবসায়ী আমার মালিক হলে হয়তাে জমির দলিলে সই করারও একটা অভিজ্ঞতা আমার হয়ে যেত। তবে শিক্ষা অর্জনের পথে কাজে লাগতে পেরে আমি সত্যিই গর্ব বােধ করি। আমার আশা আমার প্রথম মালিকের মতাে একজন জ্ঞানপিপাসুর কাছে আমি ফিরে যাব, যে সঠিকভাবে আমাকে কাজে লাগাতে পারবে । বর্তমানে আমার ঠিকানা একটি মুদি দোকান। এখন বােধহয় পরীক্ষার্থীরা জেল পেন ব্যবহার করে, বলপয়েন্ট কলমের চাহিদা দিন দিন কমে আসছে। একদিন আমি হয়তাে এতটাই পুরােনাে হয়ে যাব, আমার ব্রান্ডের রিফিলটাও হয়তাে বাজারে কিনতে পাওয়া যাবে না। তখন আমার পরিণতি কী হবে কে জানে!

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *