Faria Hasan / December 30, 2020

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা (৬৫০ শব্দ)

Spread the love

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা লিখন

বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক বিস্ময়কর প্রতিভা। প্রধানত কবি হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পেলেও তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সংগীত রচয়িতা, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, চিত্রশিল্পী ও সমাজ সংস্কারক। সাহিত্যের প্রতিটি শাখাকেই তিনি সমৃদ্ধ করেছেন। বাঙালির কাছে তিনি বিশ্বকবি’ হিসেবে পরিচিত।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৮৬১ সালের ৭ মে কলকাতা শহরের জোড়াসাঁকোর অভিজাত ঠাকুর পরিবারে। তার বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মা সারদাসুন্দরী দেবী। পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন ধনাঢ্য জমিদার। পাশাপাশি ঠাকুর পরিবারটি ছিল শিক্ষিত, রুচিশীল ও সংস্কৃতিমনা। উনিশ শতকের বাঙালির নবজাগরণ, ধর্ম ও সমাজ সংস্কার আন্দোলনে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারটির ছিল উল্লেখযােগ্য ভূমিকা।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা রবীন্দ্রনাথকে আকৃষ্ট করেনি। স্কুলের ধরাবাধা লেখাপড়ার প্রতি তাঁর কোনাে আগ্রহই ছিল না বেশ কয়েকবার স্কুল পাল্টানাের পর অবশেষে বাড়িতেই তার লেখাপড়া চলতে থাকে গৃহশিক্ষকের কাছে তিনি পাঠ নেন সংস্কৃত,,ইংরেজি সাহিত্য, পদার্থবিদ্যা, গণিত, ভূগােল, ইতিহাস, প্রকৃতিবিজ্ঞান প্রভৃতির। পাশাপাশি চলতে থাকে সংগীত শিক্ষা,আঁকাআঁকি। ঠাকুরবাড়িতে ছিল সাহিত্য-সংস্কৃতি, মুক্তচিন্তা ও প্রগতিশীলতার আবহ । এর গভীর প্রভাব পড়েছিল রবীন্দ্রনাথের
ওপর।

কিশাের বয়সে রবীন্দ্রনাথ ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য ইংল্যান্ডে যান। এখানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পর্ব পরিপূর্ণভাবে সমাপ্ত না করলেও পাশ্চাত্যের জগৎ, সে দেশের সমাজ ও জীবনকে তিনি গভীরভাবে নিরীক্ষণ করেন, যা তাঁর প্রতিভা বিকাশে সহায়ক হয়েছিল। বাংলা সাহিত্যে এমন কোনাে শাখা নেই যেখানে রবীন্দ্রনাথের ছোঁয়া লাগেনি। গান, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, ছােটগল্প, নাটক, ভ্রমণকাহিনি, শিশুসাহিত্য, চিঠিপত্র, ভাষণ, ছবি আঁকা প্রভৃতি ক্ষেত্রে তার অসাধারণ সৃজনশীলতার সাক্ষর
মেলে।

রবীন্দ্রনাথের গান এক অসাধারণ সৃষ্টি। তিনি কেবল গান রচনা করেননি, তাতে সুরও দিয়েছেন। ইংল্যান্ডে অবস্থানকালে। ইউরােপীয় সংগীতের সাথে যথেষ্ট পরিচয় ঘটেছিল রবীন্দ্রনাথের। পাশাপাশি বাংলার একান্ত নিজস্ব বাউল, কীর্তন, ভাটিয়ালি প্রভৃতি সুরের প্রতিও আকৃষ্ট হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের গানের কথা ও সুর আশ্চর্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত, বাঙালির প্রাণে এমন কোনাে অনুভূতি জাগে না, যা তাঁর কোনাে না কোনাে গান আমাদের মনে করিয়ে দেয়। দুই বাংলার জাতীয় সংগীতের রচয়িতাও তিনি ।

মাত্র বিশ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন গীতিনাট্য ‘বাল্মীকি প্রতিভা’। ঠাকুরবাড়ির নিজস্ব অনুষ্ঠানে অভিনীত হয় গীতিনাট্যটি। এতে রবীন্দ্রনাথ বাল্মীকির চরিত্রে অভিনয় করেন। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন প্রধানত কবি। তাঁর কবিতায় স্বদেশ, সমাজ, প্রকৃতি বিচিত্রভাবে ধরা দিয়েছে। আর সবকিছু ছাপিয়ে প্রেম এবং মানবতার ক্ষেত্রে কবির গভীর অন্তদৃষ্টি মূর্ত হয়ে উঠেছে। তার হৃদয়জুড়ে ছিল শুভ ও কল্যাণবােধ । তার গানে উচ্চারিত হয়েছে এ মঙ্গলধ্বনি:-

‘সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে, শােনাে শােনাে পিতা।
কহাে কানে কানে, শুনাও প্রাণে প্রাণে মঙ্গলবারতা।’

রবীন্দ্রনাথের বিচিত্র প্রতিভার সমন্বিত রূপটি ফুটে ওঠে ছােটগল্পে। মানবসমাজের প্রতি পরম-প্রীতি, মানুষের কষ্ট-আনন্দ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, নৈরাশ্য, অদৃশ্য মনােজগৎ প্রভৃতি ছােটগল্পগুলাের অপূর্ব নাটকীয় কাহিনি এবং চরিত্রের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে। তাই বলা হয়ে থাকে, ছােটগল্পে রবীন্দ্রনাথের বিচিত্র প্রতিভার সমন্বিত রূপটি যত সহজে দৃষ্ট হয়, তেমন সহজে অন্য কোথাও হয় না। তার উপন্যাসগুলােতে সামাজিক, রাজনৈতিক বিষয় প্রধান। সেই সাথে তাতে মানবমনের বিচিত্র রূপ চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের উল্লেখযােগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে: ‘ঘরে বাইরে’, ‘যােগাযােগ’, ‘চোখের বালি’,
‘চার অধ্যায়’ ইত্যাদি।

পৈতৃকভাবে তিনি ছিলেন জমিদার । কিন্তু দরিদ্র প্রজাদের দুর্দশা লাঘরে জন্যে তিনি শিক্ষা, চিকিৎসা, পানীয় জলের সুব্যবস্থা, দরিদ্র কৃষকদের কৃষিঋণ থেকে মুক্তিদানসহ পল্লিউন্নয়ন ও পল্লি সংগঠনমূলক নানা কাজ করেছেন। পরবর্তীকালে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত ‘শান্তিনিকেতনে তিনি একটি বিদ্যালয় স্থাপন করেন। মাত্র পাঁচজন শিক্ষার্থী নিয়ে যে বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল তাই পরবর্তীকালে বিশ্বভারতীতে পরিণত হয়। শৈশব থেকেই প্রচলিত শিক্ষাবিধির বিপক্ষে ছিলেন তিনি। শান্তিনিকেতন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই তিনি জীবনমুখী শিক্ষাব্যবস্থার যে স্বপ্ন লালন করেছিলেন তার বাস্তব রূপ দেন । ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগের জনসমাবেশে ব্রিটিশ পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণে নারাকীয় হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশদের দেওয়া নাইট’ উপাধি প্রত্যাখ্যান করেন।

সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ নােবেল পুরস্কার পান ১৯১৩ সালে তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলির জন্য; যার ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ নিজেই। এ অনুবাদ গ্রন্থটির জন্যেই রবীন্দ্রনাথ নােবেল পুরস্কারের মতাে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্য সম্মানে ভূষিত হন। পল্লিসমাজ, পল্লিউন্নয়ন, সমাজদর্শন, শিক্ষাদর্শন, শিক্ষার প্রসার ইত্যাদি বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ গভীরভাবে চিন্তা করেছেন এবং এসব বিষয়ে কাজ করেছেন। তার অসংখ্য লেখায় এসবের সুস্পষ্ট ছাপ রয়েছে। শান্তিনিকেতন বিদ্যালয় স্থাপনের মধ্য দিয়ে যা পরিপূর্ণ রূপ লাভ করে।

রবীন্দ্রনাথ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহৎ ব্যক্তিত্ব। তাঁর কবিতার সাথে কাজের একাত্ম উপলব্ধি করলেই বােঝা যায়, বাঙালি জীবনে তার অবদান কত ব্যাপক, কত গভীর। তিনি বিশ্বাস করতেন, মনুষ্যত্ব এবং ভালােবাসার মৃত্যু নেই। মৃত্যুকে তিনি
দেখেছেন মানবজীবনের যতি হিসেবে। তাই তিনি লিখেছেন

আছে দুঃখ আছে মৃত্যু বিরহদহন লাগে
তবুও শান্তি তবু আনন্দ তবু অনন্ত জাগে।

মানুষের মনুষ্যত্বে চির আস্থাবান এ কবির জীবনাবসান ঘটে ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। জীবনের অবসান হলেও কালজয়ী সব সৃষ্টিতে আজও তিনি অমর, অম্লান। তিনি কেবল কাব্যেই কবি নন, জীবনেও কবি।

FILED UNDER : রচনা

Submit a Comment

Must be required * marked fields.

:*
:*

Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content

রচনা, ভাবসম্প্রসারণ,অনুচ্ছেদ,পত্র, আবেদন পত্র, সারাংশ-সারমর্ম , লিখন , বাংলা, ১০ম শ্রেণি, ২য় শ্রেণি, ৩য় শ্রেণি, ৪র্থ শ্রেণি, ৫ম শ্রেণি, ৬ষ্ঠ শ্রেণি, ৭ম শ্রেণি, ৮ম শ্রেণি, ৯ম শ্রেণি,  for class 10, for class 2, for class 3, for class 4, for class 5, for class 6, for class 7, for class 8, for class 9, for class hsc, for class jsc, for class ssc, একাদশ শ্রেণি, দ্বাদশ শ্রেণি