গ্রামীণ জীবন রচনা (৮০০ শব্দ) | JSC, SSC |

গ্রামীণ জীবনে সুখদুঃখ বা গ্রামীণ জীবন রচনার সংকেত (Hints)

  • ভূমিকা
  • গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ
  • গ্রামের মানুষের প্রকৃতি
  • গ্রামের মানুষের পেশা
  • গ্রামের মানুষের আন্তঃসম্পর্ক
  • গ্রামের উৎসব-পার্বণ
  • গ্রামের মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য
  • গ্রামের মানুষের দুঃখ ও দুর্যোগ
  • গ্রামের মানুষের জীবনমূল্যায়ন
  • উপসংহার

গ্রামীণ জীবনে সুখদুঃখ বা গ্রামীণ জীবন রচনা লিখন

ভূমিকা:

সবুজ-শ্যামল-শস্যময় আমাদেরই এই দেশ। তবে এই বিশেষণ আমরা নাগরিক জীবন থেকে পাইনি। গ্রামের
প্রকৃতিলালিত পরিবেশই আমাদের এই চিত্র প্রদান করেছে। বাংলাদেশ গ্রামীণ বৈশিষ্ট্য নিয়েই বিশ্বের বুকে দাঁড়িয়েছে। প্রায় ৬৮ হাজার গ্রাম রয়েছে এদেশের অভ্যন্তরে। প্রতিটি গ্রামের রয়েছে আলাদা বা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এবং সেখানকার মানুষের প্রকৃতিও আলাদা। গ্রামের প্রকৃতি ও সেখানকার মানুষ— এই দুই মিলেই গ্রামীণ জীবন রচিত হয়েছে। এ জীবন কখনাে সহজ
আবার কখনাে জটিল হয়ে দেখা দিয়েছে আমাদের সামনে। স্থান পেয়েছে সেখানে সুখ-দুঃখ-অনুভূতির নানা গল্প ।

গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ:

বাংলাদেশের বেশিরভাগ গ্রামই সবুজময়। কারণ নগরায়ণের কাঠিন্য কোনােভাবেই গ্রামকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাই দু’চোখ ভরে সবুজ দেখতে মানুষ গ্রামে ছুটে যায় । আম-জাম-কাঁঠালের বাগান যেমন সেখানে দাঁড়িয়ে আছে; তেমনি মাঠময় সবুজ ফসল সেখানে হাওয়ায় দোলা দিয়ে যাচ্ছে । কবির ভাষায় গ্রামকে তাই বলা হয়েছে ‘ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়।’ সত্যিকার অর্থেই নাগরিক কোলাহল আর গতিময়তা যখন মানুষকে ক্লান্ত করে তােলে, তখন সে গ্রামে ফিরে যায় জীবনে একটুখানি সুখের পরশ পেতে। গ্রামের প্রকৃতি তাকে দু’হাতে জড়িয়ে সেই শান্তির পরশ দেয়। বেঁচে থাকার রসদ পায় মানুষ গ্রামের সান্নিধ্যে গিয়ে।

গ্রামের মানুষের প্রকৃতি:

এই শান্ত ও স্থিতধী গ্রামে যারা বসবাস করেন তারা খুব সাধারণ ও নিরীহ প্রকৃতির মানুষ। জীবনের রূঢ় জটিলতা ও বাস্তবতার সঙ্গে তাদের সেভাবে পরিচয় নেই । খুব সাধারণ ভাবনায় জীবন পরিচালনা করে তারা। শহরের মানুষের জীবনের যে সংঘর্ষ সেই সংঘর্ষ গ্রামের মানুষের মধ্যে নেই। তারা সারাদিন পরিশ্রম করে; রাত্রি বেলায় সুখের নিদ্রা নিয়ে বিছানায় যায় । জীবন নিয়ে তাদের অকুল পাথার চিন্তা নেই; প্রতিদ্বন্দ্বিতাও নেই পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে।

গ্রামের মানুষের পেশা:

বেশিরভাগ মানুষই সেখানে কৃষির ওপর নির্ভরশীল । কেউ নিজের জমি চাষ করে, কেউ আবার বর্গা নিয়ে জমি চাষ করে। গ্রামের পুকুরগুলােতে জেলেরা মাছ চাষ করে; আর নদীর বুকে নৌকা নিয়ে তারাই মাছ শিকার করে। তাঁতিরা যুগ পুরােনাে তাতে কাপড় বােনে। কুমাররা সযত্নে তৈরি করে মাটির নানা জিনিস । বাঁশ-বেত ও কাঠের কাজ করা মানুষেরা জীবিকার সঙ্গে সঙ্গে শিল্পের সম্প্রসারণ করে । ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের কিছু মানুষের পেশার পরিবর্তন হয়। হয়ত বর্ষায় যে মাছ ধরে, হেমন্তে সেই আবার ধান কাটার কাজে লেগে পড়ে। গাড়োয়ানরা গরুর গাড়িতে করে মাল পরিবহন করে। বর্ষাকালে শখের বশে গ্রাম্য নারীরা নকশিকাঁথা বুনলেও আজ তা একটা পেশার পরিচয় পেয়েছে।

গ্রামের মানুষের আন্তঃসম্পর্ক:

গ্রামের বাড়িগুলো সবুজে ঘেরা এবং প্রায় প্রাচীরবিহীন। তাই এক বাড়ি দিয়ে খুব সহজেই আরেক বাড়িতে যাওয়া যায়। এ কারণে মানুষের ভেতরের আন্তঃসম্পর্ক অত্যন্ত মজবুত। তারা প্রত্যেকের প্রয়ােজনে প্রত্যেকে এগিয়ে আসে বাড়িয়ে দেয় সাহায্যের হাত। এ কারণে আনন্দ ও দুঃখ সেখানে কারাে একার নয়। তারা সবাই সমানভাবে তা ভাগ করে নেয় । পেশাগত স্থানেও এই অন্তঃসম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে ।

গ্রামের উৎসব-পার্বণ:

গ্রামের মানুষের আবেগ অনুভূতি উৎসব-পার্বণের মধ্যে অনেকটাই প্রতিফলিত হয়। প্রধান ধর্মীয় উৎসব। ঈদ ও পূজা ছাড়াও গ্রামে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপিত হয়। তাছাড়া গ্রামের বিয়ে বা অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়ােজনের মধ্যে একটা নিজস্বতার পরিচয় পাওয়া যায় । পহেলা বৈশাখে গ্রামে মেলা বসে। হরেকরকম জিনিসের পসরা হয় সেই মেলায় । সার্কাসসহ অন্যান্য বিনােদনের মাধ্যমগুলাে হাজির হয় সেখানে। শহরের মতাে তাতে হয়তাে ততটা জৌলুস নেই কিন্তু সেগুলােই গ্রামীণ মানুষের বিনােদনের অন্যতম উৎস। শীতেও গ্রামে নানা অনুষ্ঠানের আয়ােজন করা হয় । পিঠে-পুলি তার অন্যতম অনুষঙ্গ। কারাে বিয়ে হলে সবাই মিলে তারা সে বিয়ের আয়ােজন করে সেখানে মেয়েলি গীতসহ নানা আচার-অনুষ্ঠানের আয়ােজন হয়। নতুন শিশু জন্মগ্রহণ করলেও গ্রামের নিজস্ব ভঙ্গিতে তাকে বরণ করা হয়।

গ্রামের মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য:

গ্রামের মানুষের সুখ তাদের কর্মময় জীবন ও আন্তঃসম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। শহুরে জীবনে সুখের পেছনে অর্থবিত্ত একটা বড় ভূমিকা পালন করে, কিন্তু গ্রামে অর্থ মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ওপর তেমন কোনাে ভূমিকা পালন করে না নিত্যপ্রয়ােজনীয় জিনিসপত্রের জন্যে গ্রামের মানুষকে সবসময় বাজারমুখী হতে হয় না। বাড়ির আশপাশের শাকসবজি পুকুরের মাছ আর গােয়ালের গরুর দুধ তাদের দৈনন্দিন খাদ্যের চাহিদা মেটায় । তাই অর্থের প্রাচুর্য না থাকলেও তারা অভুক্ত থাকে না। অল্প পুঁজির জীবন নিয়েই তারা সুখে-শান্তিতে দিনাতিপাত করে।

গ্রামের মানুষের দুঃখ ও দুর্যোগ:

বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয় গ্রামের মানুষের দুর্যোগের কারণ হয়। যেহেতু গ্রামের ঘরবাড়িগুলাে সাদামাটাভাবে প্রস্তুত তাই ঝড় ঝঞায় সেগুলাে কাবু হয়ে যায়। বন্যায় গ্রামের মানুষ ভীষণ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। তাদের ঘরবাড়ি গবাদি পশু সবকিছু তখন ভেসে যায়। বেশিরভাগ গ্রামেই ডাক্তার বা উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। তাই রােগগ্রস্ত মানুষের আরােগ্যলাভ সেখানে খুব সহজ নয়। এই অবস্থায় গ্রামের সাধারণ মানুষ সত্যিকার অর্থেই বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় এবং তাদের জীবনে ঘােরতর দুর্যোগ নেমে আসে।

গ্রামের মানুষের জীবনমূল্যায়ন:

সার্বিক বিবেচনায় গ্রামের মানুষের জীবন একটা সরলরৈখিক নিক্তির ওপর ভিত্তি করে চলে। সেখানে সুখ যেমন অনাবিল, দুঃখও অবধারিত। কোনাে একটি বিশেষ অনুভূতি সেখানকার মানুষকে গ্রাস করেনি । সুখ ও দুঃখকে আত্মস্থ করেই তারা জীবনযাপনে অভ্যস্থ হয়েছে। এ জীবন পরিবেশ ও পরিস্থিতির ওপর অনেকটা নির্ভর করে । তবে আর্থিক মানদণ্ড সেখানে সুখ বা দুঃখের জন্য খুব বেশি নিয়ামক হয় না ।

উপসংহার:

নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস ওপারেতে সর্ব সুখ আমার বিশ্বাস’- রবীন্দ্রনাথের এই উক্তিটি সাধারণ
মানুষের জীবনে খুব তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । শহরকেন্দ্রিক জীবনে যারা অভ্যস্থ তারা গ্রামে গিয়ে সুখ খোঁজার চেষ্টা করে, আবার গ্রামের কিছু মানুষের মধ্যেও এ প্রবণতা লক্ষ করা যায়। তবে জীবনের দৃষ্টি দিয়ে দেখলে গ্রামে সারল্য অনুভূত হয় বেশি, তাই সেখানে মানুষের সুখ বা দুঃখগুলােও খুব জটিল নয়। দুটোর সংমিশ্রণেই তারা অনন্য এক জীবন যাপন করে।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *