নজরুল- জাতীয় কবি রচনা (700 words)

নজরুল- জাতীয় কবি রচনা লিখন

বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে ১৮৯৯ সালের ২৪ মে। বাবা কাজী ফকির আহমদ এবং মা জাহেদা খাতুন। তাঁদের চার পুত্রে অকাল মৃত্যুর পর নজরুলের জন্ম হওয়ায় তার নাম রাখেন দুখু মিয়া।

নজরুলের পুরাে ছেলেবেলাই কেটেছে অপরিসীম দারিদ্র্যে। ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র দশ বছর বয়সে গ্রামের মক্তব থেকে নিম্নপ্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর ভর্তি হন বর্ধমান জেলার একটি হাইস্কুলে। পরে সেখান থেকে চলে গিয়ে ময়মনসিংহের দরিরামপুর হাইস্কুলে ভর্তি হন। এখান থেকেই তিনি লেটো দলে যােগ দিয়ে পদ্য রচনা, গীত রচনা, পালাগান ও সুরারােপে অপূর্ব দক্ষতা দেখান। নজরুল হয়ে ওঠেন কবিয়াল-গাইয়ে। ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে সৈনিক হিসেবে ৪৯ নম্বর
পল্টনে যােগ দিয়ে লাহাের ও নৌশেরা হয়ে করাচি চলে যান। সৈনিক হবার আগে নজরুল শিয়ারশােল রাজ স্কুল থেকে প্রবেশিকা নির্বাচনি পরীক্ষা দিয়েছিলেন এবং এ পর্যন্তই ছিল তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা।

বাংলার সাহিত্য গগনে ঝড়ের মতাে এ কবির আবির্ভাব। তিনি বাঙালির জীবনে জাগিয়েছেন নতুনের স্বপ্ন, তুলেছিলেন নতুন জীবনতরঙ্গ। স্কুল জীবনেই নজরুল জেনেছিলেন সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের সম্পর্কে। সৈনিক জীবনে তার দেশপ্রেম আন্তর্জাতিকতাবােধ ও সমাজবিপ্লবী জীবনদর্শন বলিষ্ঠ হয়ে ওঠে। তাঁর প্রথম যুগের কবিতা ও গানে রয়েছে। সাম্রাজ্যবাদবিরােধী চেতনা, গভীর দেশপ্রেম ও আন্তর্জাতিকতা ।

নজরুলের সাহিত্য সাধনার শুরু হয়েছিল স্কুল জীবনে গল্প লেখার মধ্য দিয়ে। সেইসব গল্পের পটভূমি ও পাত্রপাত্রী ছিল তাঁর পরিচিত সমাজ এবং সমাজের নরনারীর প্রেম-বিরহ, সুখ-দুঃখ ও স্বপ্ন করাচিতে সৈনিক জীবনে তিনি মুখােমুখি হলেন যুদ্ধ ও বিপ্লবের, আর তার লেখনীও পেল নতুন মাত্রা। নজরুলের সৈনিক জীবনের অবসান ঘটে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে বাঙালি পল্টন ভেঙে দেবার পর। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা থেকে বের হতাে, ‘মােসলেম ভারত’ পত্রিকা। নজরুল এ পত্রিকার একজন। নিয়মিত লেখক হয়ে ওঠেন । যদিও সৈনিক থাকা অবস্থায়ও তিনি নিয়মিত লিখে গেছেন।

নজরুলের সাহিত্য জীবনের পরিধি মূলত তেইশ বছর (১৯১৯-১৯৪১)। এ তেইশ বছরে প্রথম দশ বছর প্রধানত কবিতা ও শেষ তেরাে বছর মুখ্যত সংগীত রচনা করেছেন তিনি। নজরুলের কবিতায় রয়েছে বক্তব্যের বলিষ্ঠতা, জীবনের তীব্রতা আর অকপটতা। এ ত্রয়ীর উৎস হলাে জীবনের গভীরে প্রােথিত বিশ্বাস ।

নজরুল বেদনার কবি। আর্ত-ব্যথিত-উৎপীড়িত মানবমনের ব্যথাই তার রচনায় তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর কাব্যে বেদনার বিশ্বরূপ আছে বলেই তাঁর রচনার মধ্যে বিশ্ব সৃষ্টির প্রতি এক অপূর্ব সাম্যের ভাব ফুটে ওঠে। আমরা উৎপীড়িত আর্ত জীবনের প্রতি এক অভূতপূর্ব সহানুভূতি দেখতে পাই। কুলি মজুর’ কবিতায় তিনি বলেছেন-

‘দেখিনু সেদিন রেলে কুলি বলে এক বাবুসাব তারে ঠেলে দিল নিচে ফেলে!
চোখ ফেটে এল জল,
এমনিভাবে জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?”

১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত নজরুলের কাব্যগ্রন্থ ‘
বিষের বাঁশী’ ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক বিরােধ ও দাঙ্গার বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িক কবি নজরুল তার শক্তিশালী কলমকে হাতিয়ার করেন। এ সময় তিনি লেখেন ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’, ‘পথের দিশা’, ‘হিন্দু-মুসলিম যুদ্ধ’ কবিতা; মন্দির ও মসজিদ’ প্রবন্ধ ইত্যাদি। তারুণ্যের উন্মাদনায় কবি জরাগ্রস্ত পুরােনাে সমাজসংস্কার ভেঙে ফেলার সংকল্পের কথা বলেছেন তার বিদ্রোহী’ কবিতায়নজরুল সংগীত রচনা করেছেন প্রচুর। এর মধ্যে অধিকাংশই প্রেম সংগীত । পাশাপাশি রচনা করেছেন ইসলামি সংগীত, শ্যামা সংগীত ও বৈষ্ণব সংগীত। নজরুল প্রতিভার অন্যতম দিক হলাে শিশু সাহিত্য। নজরুল বিদ্রোহী’ কবিরূপে আবির্ভূত হলেও শিশু মনের চেতনা  প্রকাশ করেছেন সরলভাবে। তার শিশুতােষ লেখাগুলাের মধ্যে খুকী ও কাঠবেড়ালি’, ‘প্রভাতী’, ‘লিচুচোর’, ‘খাদ্দাদু’, ‘ ঝিঙে ফুল’, ‘সংকল্প’, ‘পুতুলের বিয়ে’ নাটিকা) ইত্যাদি উল্লেখযােগ্য।

সংখ্যার দিক থেকে নজরুলের উনিশটি গল্পের সন্ধান পাওয়া গেছে। সেগুলাে প্রকাশ হয়েছে যথাক্রমে ব্যথার দান’, ‘রিক্তের বেদন’ ও ‘শিউলি মালা’ সংকলনে। নজরুল তিনটি পত্রিকার সম্পাদনা করেন। এগুলো হলাে— দৈনিক সাপ্তাহিক ধূমকেতু এবং সাপ্তাহিক লাঙল। ১৯২৯ থেকে ১৯৩৯– এ দশ বছর নজরুল সারাদেশ থেকে প্রভূত সংবর্ধনা পান, লাভ করেন অর্থ ও খ্যাতি। কিন্তু তারপরও অর্থকষ্টে পড়েন তিনি। মৃত্যুশােক, রােগ ও দারিদ্র্য ছিল তাঁর সারাজীবনের সঙ্গী। ১৯৩০ সালে শিশুপুত্র বুলবুলের মৃত্যু তাকে চরমভাবে আঘাত করে। ১৯৪০ সালে স্ত্রী প্রমীলা পক্ষাঘাত রােগে আক্রান্ত হন। তাঁর সব চিকিৎসা ব্যর্থ হয় । দেনা, শােক ও পত্নীর দুরারােগ্য ব্যাধি তাকে দিশাহারা করে তােলে। শেষ পর্যন্ত নজরুল নিজেই এক দুরারােগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। ১৯৪১ সালের আগস্টে পিকস ডিজিজ’ নামে এক রােগে তার মস্তিষ্ক বিকল হয়ে যায় । ভিয়েনায় কয়েক মাস চিকিৎসা শেষে ১৯৪৩ সালে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। মস্তিষ্ক বিকল কবি এভাবেই বেঁচে থাকেনদীর্ঘ পয়ত্রিশ বছর। স্ত্রীর মৃত্যুও কবি অনুধাবন করতে পারেননি। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নজরুলকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দিয়ে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। ব্যবস্থা করা হয় সুচিকিৎসার। কিন্তু সব ধরনের প্রচেষ্টাই কবিকে সুস্থ করতে ব্যর্থ হয়।

অবশেষে চির অশান্ত বিদ্রোহী কবি ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার পিজি হাসপাতালে ৭৭ বছর য়সে মৃত্যুবরণ করেন। একসময় কবি লিখেছিলেন, ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই, গােরে থেকেও যেন আমি মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।’ কবির এ ইচ্ছাপূরণ করতেই তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয় ।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *