পরীক্ষার পূর্বরাত্রি রচনা (৭৫০ শব্দ) | JSC, SSC |

পরীক্ষার পূর্বরাত্রি রচনা লিখন

স্কুলে সারাবছর ছােটখাটো পরীক্ষা লেগেই থাকে। পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াও কত পরীক্ষা দিয়েছি। হঠাৎ করে হয়তাে শিক্ষক ক্লাসে এসে বললেন, আজ তােমাদের পরীক্ষা নেব। আমরাও খাতা-কলম নিয়ে বসে গেছি। তাই আমার পরীক্ষা-ভীতি তেমন নেই বললেই চলে। কিন্তু বার্ষিক পরীক্ষা হলে ভিন্ন কথা। যতই পরীক্ষা এগিয়ে আসে ততই আমাকে পেয়ে বসে অজানা ভয়। আর সেটা যদি হয় পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ক পরীক্ষা তাহলে তাে কথাই নেই।

কাল আমার সেই কঠিন পরীক্ষা। পদার্থ বিজ্ঞানের মােটা বইটা নিয়ে বসে আছি পড়ার টেবিলে। মনে আশঙ্কা, পারব তাে সব পড়া শেষ করতে। আমি পড়ছি সেই সাথে বাড়ছে রাত। একটু ঘুম ঘুম ভাব হলাে। চোখের সামনে বইয়ের লেখাগুলাে দেখে মনে হচ্ছে নতুন করে পড়তে বসেছি । ক্লাসে শিক্ষকের লম্বা লেকচারগুলাের কথা এখন খুব মনে পড়ছে। আর পড়বেই তাে, তখন তাে সব কথা এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করেছি। যদি একটু মনােযােগ দিয়ে শুনতাম!

রাত বাজে বারােটা দু-তিন মিনিট পড়ছি আর বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা করছি । পরীক্ষা ভালাে হবে তাে? এক লাইন মুখস্থ হলেই তার আগের লাইন ভুলে যাচ্ছি। এরই মধ্যে শুরু হলাে মশার যন্ত্রণা। কানের কাছে অনবরত ভনভন করেই যাচ্ছে।আর্কিমিডিসের সূত্রগুলাের দিকে এক ঝলক তাকাতেই মনে হলাে, কী দরকার ছিল বিজ্ঞানীদের এতকিছু আবিষ্কার করার। যদি এসব না হতাে তাহলে এ যুগের শিক্ষার্থীদের এত কষ্ট করতে হতাে না। বিশেষ করে আমার।

মা এক গ্লাস দুধ নিয়ে এসে বললেন দুত শুয়ে পড়তে। বাবা বলেছিলেন পরীক্ষার আগে পর্যাপ্ত ঘুম দরকার। বেশি রাত জাগলে নাকি মস্তিষ্কে চাপ পড়ে। ফলে পরীক্ষা খারাপ হয়। কিন্তু এখন সেই উপদেশ মানতে গেলে পরীক্ষায় দুটো গােল্লা ছাড়া কিছুই অর্জন করা যাবে না। নিজের অবস্থা দেখে নিজেরই হাসি পাচ্ছে। আচ্ছা আমার বন্ধুরা এখন কী করছে? আকাশে সােনার থালার মতাে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। টেবিলের পাশের জানালা দিয়ে অমন মনােরম দৃশ্য দেখে কবিতার লাইন মনে পড়ে যাচ্ছিল । আর অমনি চাদটা টুপ করে এক টুকরাে মেঘের আড়ালে লুকিয়ে গেল । হয়তাে বােঝাতে চাচ্ছে, আমার
পূর্ণিমা দেখে সময় নষ্ট না করে পড়াশােনায় ডুব দেয়া উচিত কিন্তু তা পারলে তাে হতেই পড়া তাে দূরের কথা, অদ্ভুত সব চিন্তা মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। আচ্ছা, নিউটনও তো সতেরাে-আঠারাে বছর বয়স পর্যন্ত খারাপ ছাত্র ছিলেন। তিনি যদি এত বড় বিজ্ঞানী হতে পারেন, আমি নিশ্চয়ই ছােটখাটো ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে পারব ।

ওফ! আমাদের ক্লাসের আবির বােধহয় এতক্ষণে নাক ডেকে ঘুমােচ্ছে। সে তাে পদার্থ বিজ্ঞানে নব্বইয়ের নিচে পায়ই না। স্যার ওকে যে রকম আদর করেন, দেখলে হিংসায় গা জ্বলে যায় । যাক গে, এসব মনে ক্রলে এখন শুধু মনােকষ্টেই ভুগতে হবে। তার চেয়ে বন্ধুর কাছ থেকে নেয়া নােটগুলাের দিকে একবার চোখ বুলানাে যাক। পরীক্ষার সিট যে কার পাশে পড়বে কে জানে! বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তরই এত বড় বড়, সময়মতাে শেষ করতে না পারলে অবস্থা টাইট। আহ! স্যার বলতেন। তাদের সময় নাকি এতকিছু পড়তে হতাে না, তাই পড়ার চাপও কম ছিল। কী মজাই না ছিল সে সময় ।

বসে থাকতে থাকতে পায়ে ঝি ঝি ধরে যাচ্ছিল । তাই বই নিয়ে হেঁটে হেঁটে পড়া শুরু করলাম । দেখি এ পন্থা
কোনাে কিছু মাথায় ঢােকাতে পারি কিনা । আশপাশের বাড়িগুলাে সব অন্ধকার। সবাই নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছে। চারদিকে পিনপতন নীরবতা। এমন জ্যোৎস্না রাতে চাঁদের আলােয় আলােকিত পৃথিবীকে যে এত রহস্যময় লাগে আগে কখনাে খেয়াল করিনি ।

কী বিপদ! পরীক্ষার আগের রাতেই এমন সুন্দর সব দৃশ্য চোখে ধরা দিতে হয়! হঠাৎ করে ঘর অন্ধকার হয়ে গেল। অর্থাৎ লােডশেডিং। শহরে লােডশেডিং হবে না, এটা অসম্ভব। রান্নাঘর থেকে অনেক কষ্টে একটা মােমবাতি জ্বালিয়ে আনলাম। কী আর করা। এর মধ্যেই এখন পড়তে হবে।

মশাদের ভনভন আরও বেড়ে গেল। অন্ধকারে আমাকে পেয়ে মশারা দলবল নিয়ে আসতে শুরু করেছে। পােকামাকড়দের কত মজা, স্কুলও নেই, পরীক্ষাও দিতে হয় না।

পড়তে পড়তে হঠাৎ চোখে পড়ল টেবিলে রাখা গ্লাসটির ওপর দুধটা ঠান্ডা হয়ে গেছে । মা আমার জন্যে কিছুক্ষণ জেগে থেকে অবশেষে ঘুমিয়ে পড়েছেন। বাবা-মা দুজনেরই তাে সকালে অফিস। আমারও চোখ জড়িয়ে আসছে ঘুমে । আচ্ছা, বিছানায় বালিশে হেলান দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলাে একবার দেখে নেই । তারপর ঘুমিয়ে পড়ব।

‘স্যার এসে একটা প্রশ্নপত্র দিয়ে গেলেন। পরীক্ষা শুরুর ঘণ্টা পড়ল । আমি প্রশ্নগুলােতে বার বার চোখ বােলাচ্ছি, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না । গতরাতে যা পড়েছি তার সাথে এ প্রশ্নের কোনো মিল নেই। এটা কোন ভাষা! চাইনিজদের লেখার মতাে। আর আমার চারপাশে সবাই ফটাফট লিখে চলেছে। কেবল আমি কলম হাতে নিয়ে অসহায় বসে আছি। অবশেষে উত্তরপত্রে নিজের নামটা লিখলাম। আর তক্ষণি উত্তরপত্র জমা দেবার ঘণ্টা বেজে উঠল । আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। এত তাড়াতাড়ি সময় শেষ! আমি যে খাতায় একটি শব্দও লিখিনি। স্কুলের ঘণ্টাটাও তাে বন্ধ হচ্ছে না। একটানা বেজেই চলেছে। কী আশ্চর্য এখানে মা এলাে কোত্থেকে!

চোখ খুলতেই দেখি মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আমাকে ডাকছেন। অ্যালার্ম ঘড়িটাও বেজে চলেছে । ঘরময় লুটোপুটি খাচ্ছে মিষ্টি রােদ। মাথার পাশে আমার পদার্থ বিজ্ঞানের বই । স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম আমি । পড়তে পড়তে কখন যে। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আর সেই ভীতিকর ঘটনাটি ছিল আমার অবচেতন মনের একটা দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *