গ্রন্থাগার রচনা (১০০০ শব্দ) | JSC, SSC |

গ্রন্থাগার রচনার সংকেত

  • ভূমিকা
  • গ্রন্থাগার কী
  • গ্রন্থাগার নবজাগরণের উৎস
  • গ্রন্থাগারের উদ্ভব
  • গ্রন্থাগারের অতীত ও বর্তমান অবস্থা
  • গ্রন্থাগারের শ্রেণিবিভাগ
  • গ্রন্থাগারের গুরুত্ব
  • ছাত্রজীবনে গ্রন্থাগারের ভূমিকা
  • অতীত ও বর্তমানের বিখ্যাত গ্রন্থাগার
  • বাংলাদেশের গ্রন্থাগার
  • উপসংহার

গ্রন্থাগার রচনা

ভূমিকা:

যুগ-যুগান্তরের অগণিত মানুষের ভাবৈশ্বর্যের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার হলাে গ্রন্থাগার জ্ঞানপিপাসু মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু এ গ্রন্থাগার। শত শতাব্দীর মনীষীদের ভাব ও জ্ঞানের ডালি সাজিয়ে গ্রন্থাগার নিঃশব্দে আমন্ত্রণ জানিয়ে চলেছে বিশ্বমানকে। কালের প্রবাহে মানুষ আসে, আবার চলেও যায়। কিন্তু তার ধ্যানধারণা, অভিজ্ঞতা, চিন্তাভাবনা সে লিপিবদ্ধ
করে যায় বইয়ে গ্রন্থাগার সে বই সংরক্ষণ করে এবং পরবর্তী প্রজন্মের সাথে হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মের পরিচয় ঘটিয়ে দেয়।

গ্রন্থাগার কী:

গ্রন্থাগার বিচিত্র জ্ঞানের, বিচিত্র ভাবের শাশ্বত ভাণ্ডার মানুষের চিন্তার অমূল্য সম্পদ গ্রন্থাগারে সঞিত থাকে। সভ্যতার সূচনা লগ্নের মানবহৃদয়ের কলতান যেমন এখানে সঞ্চিত থাকে, তেমনি সঞ্চিত থাকে বর্তমান মানবহৃদয়ের উত্থান-পতন। তাই গ্রন্থাগার রচনা করে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের সেতুবন্ধন । রবীন্দ্রনাথের ভাষায়—

কে জানিত মানুষ
অতীতকে বর্তমানে বন্দি করিবে? অতলস্পর্শ কালসমুদ্রের ওপর কেবল এক একখানি বই দিয়া সাঁকো বাধিয়া দিবে
।’

গ্রন্থাগার ভাব তৃষিত ও জ্ঞানপিপাসু মানুষুের হৃদয় ও মনের ক্ষুধা দূর করার অসাধারণ ও বিপুল আয়ােজন। যেখানে এসে এক হৃদয়ের নীরব সান্নিধ্যে অন্য হৃদয় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

গ্রন্থাগার নবজাগরণের উৎস:

গ্রন্থাগার কালের নীরব সাক্ষী। তাতে বন্দি হয়ে আছে কত ভাবুক কত মনীষীর ভাব-চিন্তা, দেশবিদেশের কত ঘটনাপ্রবাহ, কত বিপ্লব ও সামাজিক অগ্রগতির ইতিহাস। যা মানবহৃদয়ে প্রেরণার সার করে, দেয়। পথনির্দেশনা, গ্রন্থাগারের মাধ্যমেই পাওয়া যায় নবসৃষ্টির উদ্দীপনা, নানা দুরূহ জিজ্ঞাসার উত্তর শত শত মনীষীর ভাব-চিন্তার সার ঘটিয়ে, ইতিহাসের নানামুখী ঘটনার সাথে পরিচয় ঘটিয়ে গ্রন্থাগার নবজাগরণে উদ্দীপ্ত করে মানবহৃদয়কে, পরিচালিত করে এক নতুন প্রভাতের অভিমুখে।

গ্রন্থাগারের উদ্ভব:

গ্রন্থাগারের ইতিহাসে দেখা যায়, এর প্রথম ধারণা দেন রােমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার । তার আদেশে
মার্কাস নামক একজন সুলেখক গ্রন্থাগারের ওপর রচনা করেন একটি গবেষণাগ্রন্থ । এর পাঁচ বছর পরেই তৈরি হয় গ্রন্থাগার। তবে এর আগেও গ্রন্থাগারের নিদর্শনের প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে ব্যাবিলনের নিপ্পর শহরের মন্দিরে এ ধরনের নিদর্শন পাওয়া যায়। অ্যাসিরিয়া রাজ আশুরবানিপালের নিজস্ব গ্রন্থাগারে সঞ্চিত পােড়ামাটির গ্রন্থ পাওয়া যায়। তবে খ্রিস্টপূর্ব চার শ বছর আগে গ্রিক শাসনকর্তা টলেমি প্রতিষ্ঠিত গ্রন্থাগারই প্রাচীনকালের বৃহত্তম গ্রন্থাগার । উদ্ভবকালীন গ্রন্থাগারের ইতিহাসে যাদের নাম পাওয়া যায় তারা সবাই ছিলেন দিগ্বিজয়ী, শাসক বা প্রশাসক।

গ্রন্থাগারের অতীত ও বর্তমান অবস্থা:

জ্ঞানপিপাসা মানবহৃদয়ের এক স্বাভাবিক ও শাশ্বত বৈশিষ্ট্য। মানবহৃদয়ের অদম্য জ্ঞানপিপাসার তাগিদেই শুরু হয় জ্ঞানচর্চা। জ্ঞানচর্চার পথ ধরেই রচিত হলাে গ্রন্থ। মানুষের চিন্তার অনন্য প্রকাশ এ
গ্রন্থগুলােকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌছে দেয়ার তাগিদ অনুভব করে বিদ্যানুরাগী মানুষ প্রবর্তন করেন গ্রন্থাগারের। সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই স্বনামধন্য ব্যক্তিগণ অত্যন্ত যত্ন সহকারে গ্রন্থ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখেন। ব্যাবিলন, আসিরিয়া, আলেকজান্দ্রিয়া, নালন্দা, তক্ষশীলা ও বিক্রমশীলা প্রভৃতি স্থানে প্রাপ্ত গ্রন্থাগার তাদের উন্নত মানসিকতারই পরিচয় বহন করে। অথচ মধ্যযুগে এসে দেখা গেল বিজেতা জাতি বিজিতের গ্রন্থাগারের ধ্বংস সাধনে ব্যস্ত । উদ্দেশ্য বিজিতের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করা। এ হিংসােন্মুখ মানসিকতায় ভস্মীভূত হয়েছে বহু বছরের সংগৃহীত অমূল্য সম্পদ। যেমন— ধ্বংস হয়েছে আলেকজান্দ্রিয়ার সুবিশাল গ্রন্থাগার, বাগদাদে বায়তুল হিকমাহ গ্রন্থাগার। বর্তমানে গ্রন্থাগার মানুষের কাছে অত্যন্ত সুপরিচিত একটি নাম। সরকারি, বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত হয় গ্রন্থাগার। আধুনিক মানুষ তাদের প্রাত্যহিকতার একটি অনুষঙ্গ হিসেবেই গ্রন্থাগারকে মূল্যায়ন করে। কিন্তু আজও স্বার্থান্বেষী মহলের হিংসাবহ্নি থেকে গ্রন্থাগার রেহাই পায় না। অতি সম্প্রতি আমেরিকা তাদের বর্বরতায় ধ্বংস করল ইরাকের ঐতিহ্য ও মূল্যবান গ্রন্থাগার। তবে এটা ঠিক যে, সচেতন জ্ঞানানুরাগী মানুষের মনে গ্রন্থাগার এক অমূল্য অবস্থান নিয়েছে প্রাচীনকালে বিদ্যানুরাগী মানুষ জ্ঞানপিপাসা মেটানাের জন্য ছুটে যেতেন দেশ হতে দেশান্তরে। আর বর্তমানে গ্রন্থাগার সে কষ্ট দূর করে বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারকে আমাদের হাতে পৌছে দিয়েছে।

গ্রন্থাগারের শ্রেণিবিভাগ:

গ্রন্থের ভাণ্ডারই হলাে গ্রন্থাগার । এ গ্রন্থাগার হতে পারে ব্যক্তিগত, হতে পারে রাষ্ট্রীয় । ব্যক্তিগত
গ্রন্থাগারে ব্যক্তির নিজস্ব রুচি ও চাহিদা অনুযায়ী বইয়ের সমাবেশ ঘটে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগার সাধারণের জন্য উন্মুক্ত। তাই সেখানে সাধারণের পছন্দ-অপছন্দ গুরুত্ব পায়। ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে গ্রন্থ সংখ্যা কম থাকে, সাধারণ গ্রন্থাগারে থাকে
প্রচুর সংগ্রহ। ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগার ছাড়াও স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রন্থাগার থাকে। আবার বেসরকারি উদ্যোগেও অনেকসময় গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়। এগুলাে সাধারণ গ্রন্থাগার হিসেবেই বিবেচিত।

গ্রন্থাগারের গুরুত্ব:

গ্রন্থাগারে এক সঙ্গে বিচিত্র বইয়ের সমাবেশ ঘটে। বিচিত্র ভাব, বিচিত্র চিন্তা, বিচিত্র অভিজ্ঞতার অফুরন্ত উৎস ভাণ্ডার গ্রন্থাগার । তাই জ্ঞানান্বেষী মানুষ আপন মনের খােরাক সহজেই এখানে খুঁজে পায়। জীবনসংগ্রামে লিপ্ত ক্লান্ত মানুষ গ্রন্থের এ বিচিত্র আয়ােজনে খুঁজে পায় এক অনির্বচনীয় আনন্দপূর্ণ প্রাণস্পন্দন। ‘ঐকতান’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ আপন জ্ঞানের অপূর্ণতার কথা বলেছেন এভাবে-

বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি!
দেশে দেশে কত না নগর রাজধানী
মানুষের কত কীর্তি, কত নদী গিরি সিন্ধু মরু,
কত না অজানা জীব, কত না অপরিচিত তরু
রয়ে গেল অগােচরে। বিশাল বিশ্বের আয়ােজন;
মন মাের জুড়ে থাকে অতি ক্ষুদ্র তারি এক কোণ।

মানুষের জ্ঞানের এ অপূর্ণতাকে পূর্ণতায় ভরিয়ে দিতে পারে বই। দেশ-বিদেশের হাজার হাজার মনীষীর অমূল্য গ্রন্থে গ্রন্থাগার সমৃদ্ধ। তাই মানুষের অনুসন্ধিৎসু মন গ্রন্থাগারে এসে খুঁজে পায় কাঙ্ক্ষিত খােরাক। একই ব্যক্তির পক্ষে চাহিদা অনুযায়ী সকল বই কেনা সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে গ্রন্থাগারই তার ভরসাকেন্দ্র। ফলে মানুষের জানার ভাণ্ডারকে পূর্ণ করতে গ্রন্থাগারের গুরুত্ব অপরিসীম। একটি জাতিকে উন্নত, শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান হিসেবে গড়ে তােলার ক্ষেত্রে গ্রন্থাগার উল্লেখযােগ্য ভূমিকা রাখে। তাছাড়া বিভিন্ন বয়সের পাঠক গ্রন্থাগারে একত্রে পাঠগ্রহণ করে বলে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে আন্তরিকতা, একতা, এক্ষেত্রে বিচারপতি ও লেখক মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের উক্তি প্রণিধানযােগ্য গ্রন্থাগারের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে সংহতি যা দেশগড়া কিংবা রক্ষার কাজে রাখে অমূল্য অবদান। সুতরাং, ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে
গ্রন্থাগারের প্রয়ােজনীয়তা অনস্বীকার্য।

ছাত্রজীবনে গ্রন্থাগারের ভূমিকা:

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাত্রদেরকে জ্ঞানের একটা দিগন্ত পর্যন্ত পৌছে দেয়। আর গ্রন্থাগার তাকে দেয় জ্ঞানের অগ্রগতির নতুন নতুন দিগন্তের ঠিকানা। শ্রেণিকক্ষের স্বল্প পরিসরতার ভেতরে জ্ঞানের যে ফুরণ ঘটায়, তার সমৃদ্ধি দান করে গ্রন্থাগার। তাই ছাত্রজীবনে গ্রন্থাগারের ভূমিকা অপরিসীম। গ্রন্থাগারেই ছাত্ররা খুঁজে পায় তাদের নানা জিজ্ঞাসার উত্তর, শত শত মনীষীর ভাব আপন হৃদয়ে সার করে তারা অর্জন করে প্রাণশক্তি । যা তাদেরকে জীবন গড়ার তাগিদ দেয়, প্রেরণা জোগায় দেশ গড়ার ও জাতির উন্নয়ন সাধনের।

অতীত ও বর্তমানের বিখ্যাত গ্রন্থাগার:

প্রাচীন যুগের বিখ্যাত গ্রন্থাগারের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য হলাে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া জাদুঘর। বর্তমানে পৃথিবীর বিখ্যাত গ্রন্থাগারের মধ্যে উল্পেখযােগ্য হলাে ব্রিটেনের ব্রিটিশ মিউজিয়াম, মস্কোর লেনিন লাইব্রেরি, ফ্রান্সের বিবলিওথিক ন্যাশনাল লাইব্রেরি, আমেরিকার লাইব্রেরি অব কংগ্রেস, কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরি ইত্যাদি।

বাংলাদেশের গ্রন্থাগার:

আমাদের দেশে শিক্ষার প্রসারের সাথে সাথে গ্রন্থাগারের প্রসারও বেড়েছে। ১৯৫৩ সালে ঢাকায়।
প্রতিষ্ঠিত হয় কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি । এ লাইব্রেরির সহযােগিতায় শতাধিক সরকারি ও বেসরকারি গ্রন্থাগার দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে আমাদের দেশে সরকারি গ্রন্থাগারের সংখ্যা ৬৮টি এবং বেসরকারি গ্রন্থাগারের সংখ্যা ৮৮৩টি। তাছাড়া গণ-উন্নয়ন পাঠাগারের পরিচালনায় রয়েছে ২৭টি গ্রন্থাগার । বিদেশি দূতাবাসের আনুকুল্যে এদেশে পরিচালিত লাইব্রেরির মধ্যে ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরি বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য।

উপসংহার:

গ্রন্থাগার বহু মানুষের সম্মিলিত প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের জ্ঞানপিপাসু মানুষের ভাব মিলনকেন্দ্র গ্রন্থাগার। কোনাে জাতির আত্রিক পরিচয়, হৃদয়ের স্পন্দন, জ্ঞানের গভীরতা সংগৃহীত থাকে এখানে। তাই জাতির ইতিহাস জেনে জাতিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে গ্রন্থাগার । তাই অজ্ঞানতার অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্ত করতে হলে, সমৃদ্ধ করতে হলে গ্রন্থাগারের প্রসার বাড়াতে হবে। গ্রন্থাগার আন্দোলনকে শহর থেকে নিয়ে যেতে হবে গ্রামে । তবেই জাতীয় জীবনে আসবে কাক্ষিত সফলতা

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *