পরীক্ষায় দুর্নীতি ও এর প্রতিকার রচনা (900 words) |

পরীক্ষায় দুর্নীতি ও এর প্রতিকার রচনার সংকেত

  • ভূমিকা
  • প্রচলিত পরীক্ষাপদ্ধতি ও দুনীতির স্বরূপ
  • দুর্নীতির কারণ
  • দুর্নীতি প্রতিরােধের উপায়
  • সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ
  • উপসংহার

পরীক্ষায় দুর্নীতি ও এর প্রতিকার রচনা

ভূমিকা:

শিক্ষা মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যম। আর পরীক্ষা একজন ছাত্রের মান যাচাইয়ের মাপকাঠি। কিন্তু দুর্নীতির মাধ্যমে পরীক্ষা একজন ছাত্রের মূল্যায়নে কতটুকু ভূমিকা রাখে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। পরীক্ষায় নকলপ্রবণতা বর্তমান সময়ের অতি পরিচিত
চিত্র। কিন্তু প্রশ্ন হলাে, নকল করে পাস করা তরুণ প্রজন্ম দ্বারা উন্নত জাতি গঠন সম্ভব কি না! এ প্রশ্ন আজ সচেতন। বিবেকবান প্রতিটি ব্যক্তিমনেই উথিত।

প্রচলিত পরীক্ষাপদ্ধতি ও দুনীতির স্বরূপ:

আমাদের দেশে শিক্ষাপদ্ধতি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীরা তাদের নির্ধারিত বিষয় অধ্যয়নের পর তাদের অর্জিত জ্ঞানের প্রমাণ দেয় তিন ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠিত পাবলিক পরীক্ষায় । আমাদের দেশে এ পরীক্ষাপদ্ধতি মূলত ব্রিটিশদের কাছ থেকে পাওয়া। ব্রিটিশ শাসকগােষ্ঠী তাদের প্রশাসনিক কাজ পরিচালনায় উপযুক্ত শিক্ষিত জনগােষ্ঠী গড়ে তােলার লক্ষ্যে একটি পাবলিক পরীক্ষার ধারণা সৃষ্টি করে। এরই পথ ধরে ১৮৫৭ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষা নাম দিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রথম পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় । আমাদের দেশের বর্তমান পরীক্ষাপদ্ধতি এ ধারণা এবং পরীক্ষাপদ্ধতির পরিবর্তিত পরিশীলিত রূপ।

আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতি মূলত পরীক্ষামুখী শিক্ষাপদ্ধতি। দীর্ঘদিনের শিক্ষাগ্রহণকে মাত্র তিন ঘণ্টায় মূল্যায়নের এ পদ্ধতি আসলে একপ্রকার প্রহসন মাত্র। কারণ এ ব্যবস্থার ফলেই যেকোনাে উপায়ে পরীক্ষা পাস তথা সার্টিফিকেট
অর্জনই একদল ছাত্রের মূল লক্ষ্য হয়ে পড়ে। ফলে তারা জড়িয়ে পড়ে নৈতিকতাহীন কর্মকাণ্ডে । যেকোনাে দেশের শিক্ষাপদ্ধতি সে দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই আমাদের দেশেও দেখা যায়, অন্যান্য ক্ষেত্রের দুর্নীতির প্রভাব আমাদের শিক্ষাপদ্ধতি তথা পরীক্ষাপদ্ধতির ওপরও পড়েছে। যেমন- পরীক্ষার হলে নকল কেবল নকলবাজ ছাত্ররাই করে না, রাজনৈতিক অপশক্তির প্রবল দৌরাত্ম্য নকলকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

দুর্নীতির কারণ:

পরীক্ষায় দুর্নীতির কারণ চিহ্নিত করতে গেলে দেখা যায়, এর সাথে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে অভিভাবক, প্রশাসন তথা গােটা আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটই দায়ী । নিচে পরীক্ষার দুর্নীতির উল্লেখযােগ্য কারণগুলাে চিহ্নিত করা হলাে –


১.যেকোনাে দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আমাদের সমাজে দেখা যায়, চাকরিক্ষেত্রে অনেক সময় যােগ্যতার অবমূল্যায়ন করে উর্ধ্বতনের পরিচিতি বেশি মূল্য পায়। এমতাবস্থায় অনেকের ক্ষেত্রে যােগ্যতার্জনের তুলনায় যেকোনাে উপায়ে সার্টিফিকেট অর্জনই মুখ্য হয়ে পড়ে। সার্টিফিকেট অর্জনের এ হিড়িক দুনীতির জন্ম দেয়।
২. অনেক শিক্ষক তার ব্যক্তিগত আয়ের উৎস হিসেবে টিউশনি ব্যবসাকে প্রাধান্য দেন। এক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত পাঠদানে তিনি বিরত থাকেন এবং পরীক্ষার হলে নিজের টিউশনির ছাত্রদের ফলাফল ভালাে করানাের জন্য তাদের অন্যায়ভাবে সহায়তা করেন।
৩, গ্রীক্ষাকেন্দ্রের ওপর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রভাব বিস্তারেও পরীক্ষাকেন্দ্রে দুর্নীতি হয়ে থাকে। নিজের পরিচিত ছাত্র-ছাত্রীদের ফলাফল ভালাে করানাের জন্য এদের ছত্রছায়ায় নকল হয়ে থাকে।
৪. অনেক সময় অভিভাবকের উদাসীনতার কারণে ছেলেমেয়ে পড়াশুনায় ফাকি দেয় এবং পরীক্ষায় পাস করার জন্য অন্যায় পথ বেছে নেয়। আবার অনেক অভিভাবক সন্তানম্নেহে অন্ধ হয়ে পরীক্ষার হলে নকলও সরবরাহ করেন।
৫. বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ফলে বছরের অধিকাংশ সময় স্কুলকলেজ বন্ধ থাকে। আবার শিক্ষকম্বল্পতার কারণেও অনেক সময় পর্যাপ্ত ক্লাস হয় না। এমতাবস্থায় পড়াশুনার সাথে ছাত্রদের সম্পৃক্ততা কমে যায় । কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা দেয়া বাধ্যতামূলক হওয়ায়, তারা পাসের উপায় হিসেবে নকলকে বেছে নেয়।
৬. আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটা আনন্দবিহীন বাধ্যতামূলক গ্রহণব্যবস্থা । মনের তাগিদে নয় ব্রং অভিভাবক ও শিক্ষকের বেতের ভয়ে ছাত্ররা জোরপূর্বক পাঠগ্রহণ করে। ফলে পরীক্ষার সময় ক্লাস টপকানােই তাদের উদ্দেশ্য হয় বলে
নকলের পন্থ বেছে নেয়।
৭. অর্থের লােভে অনেকসময় প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গ পরীক্ষায় নকলের সুযােগ দেন। একইভাবে প্রশ্নপত্রও ফাস করে ।

দুর্নীতি প্রতিরােধের উপায়:

পরীক্ষায় দুর্নীতি একটি জাতিকে ধ্বংসের অভিমুখে পরিচালিত করে। তাই জাতির মেরুদণ্ডকে শক্ত
রাখতে হলে পরীক্ষায় দুর্নীতি বন্ধের ব্যবস্থা গ্রহণ সময়ের এবং বিবেকের দাবি। আজকের ছাত্রসমাজই ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দান করবে। তাই ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে সুযােগ্য করে গড়ে তােলার জন্য দুর্নীতি প্রতিরােধে নিম্নলিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়:

১. শিক্ষকরা সঠিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে ছাত্রদেরকে অধিক নম্বর অর্জন নয় বরং সঠিক জ্ঞানার্জনের প্রতি উৎসাহিত করবেন। পাশাপাশি ছাত্রদের নৈতিক চরিত্র গঠনের প্রতি লক্ষ রাখতে হবে;
২. সন্তানের লেখাপড়ার প্রতি অভিভাবককে সচেতন ও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে এবং অন্যায় ও অসত্য সম্পর্কে নিরুৎসাহিত করতে হবে;
৩. পাবলিক পরীক্ষার বিষয়টি বাধ্যতামূলক না করে ঐচ্ছিক করে দিয়ে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমাতে হবে। এতে যােগ্যতাসম্পন্ন ছাত্রদের মান যাচাই সম্ভব হবে;
৪. প্রশ্নপত্রের প্রচলিত ধারা বর্জন করে এমনভাবে প্রশ্ন করতে হবে যাতে নকল করা সম্ভব না হয় এবং তাদের জ্ঞানের সঠিক মূল্যায়ন সম্ভব হয়;
৫. উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য বাের্ডের অধীনে সতর্কতা ও জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মূল্যায়নের জন্য অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষকদের নিয়ােগ করতে হবে;
৬. একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার হাতে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও গবেষণার যাবতীয় দায়িত্ব অর্পণ করা যেতে পারে। যাতে যুগােপযােগী প্রশ্নপত্রের ধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে নকল প্রতিরােধমূলক ব্যবস্থা নেয়া যায়;
৭. প্রয়ােজনে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ এবং সনদ প্রদানের দায়িত্ব বাের্ড থেকে তুলে নিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা একটি সাংবিধানিক সংস্থার ব্যবস্থা করা যেতে পারে;
৮. কুলকলেজগুলাের দৈনন্দিন কার্যক্রম আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে;
পরীক্ষায় দুর্নীতির সাথে জড়িত ছাত্র বা ব্যক্তির জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে;
১০. গতানুগতিক পাঠ্যসূচি পরিবর্তন করে যুগােপযােগী ও বাস্তবসম্মত পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করতে হবে। এতে নকল প্রবণতা হ্রাস পাবে।

উপরােক্ত বিষয়গুলাে পরীক্ষায় দুনীতি প্রতিরােধে যথার্থ ভূমিকা পালন করবে। তবে সর্বোপরি জনসচেতনতাই পরীক্ষায় দুর্নীতি প্রতিরােধের প্রধান সহায়ক। পাশাপাশি বেতার, টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকার মাধ্যমে নকলবিরােধী প্রচারকাজ চালিয়ে জনমত গঠনের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সাথে শিক্ষাবিষয়ক কার্যক্রমের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক দুর্ভাবনা থেকে মুক্ত করতে হবে। তবেই দুর্নীতিমুক্ত পরীক্ষা পরিচালনা সম্ভব।

সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ:

নকলের বিরুদ্ধে ইতােমধ্যে সরকার বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। পরীক্ষার্থী বা হল
পরিবর্তনের সাথে সাথে নকলের দায়ে বহিষ্কারের সঙ্গে জেল-জরিমানার ব্যবস্থা করেছে। দায়িত্বে অবহেলার জন্য শিক্ষকদেরকেও বহিষ্কার এবং জেল-জরিমানার ব্যবস্থা করেছে। অতিসম্প্রতি প্রশ্নপত্রের ধারা পরিবর্তনের উদ্যোগ হিসেবে প্রচলিত প্রশ্নপদ্ধতির পরিবর্তে কাঠামােভিত্তিক প্রশ্ন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সরকারের এসব উদ্যোগ নকল প্রতিরােধে প্রভাব রাখবে আশা করা যায়। অবশ্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের সুদৃঢ় নকলবিরােধী অবস্থানের ফলে ইতােমধ্যে নকল প্রবণতা অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে।

উপসংহার:

শিক্ষা মানুষকে পরিপূর্ণ ও বিকশিত করে তােলে। কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে পঙ্গু করে দেয়। এ পঙ্গুত্বের হাত থেকে নিজেকে, জাতিকে রক্ষা করতে হলে মেধার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে হবে। আর এজন্য চাই নকলমুক্ত সুস্থ পরিবেশ, সেজন্য চাই ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাক্ট, সরকার সর্বোপরি সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *