বইমেলা রচনা (৮৫০ শব্দ) | JSC, SSC |

বইমেলা রচনার সংকেত (Hints)

  • ভূমিকা
  • বইমেলার ইতিহাস
  • বাংলাদেশে বইমেলা
  • বইমেলার তাৎপর্য
  • বইমেলার প্রভাব
  • বইকেনার আগ্রহ বৃদ্ধি ও পাঠক সৃষ্টি
  • লেখক, প্রকাশক ও ক্রেতার মিলনস্থল
  • আনন্দ আয়ােজনে বইমেলা
  • একুশের বইমেলা

বইমেলা রচনা

ভূমিকা:

বিশ্বের যেকোনাে দেশের ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির বিস্তার ও বিকাশে বইমেলার রয়েছে অনন্য ভূমিকা । আধুনিক রুচিশীল মানুষ তাদের চিন্তা ও মননের সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছে বইকে। তাই সংস্কৃতির বিকাশে বইমেলা হয়ে উঠেছে। অন্যতম আধুনিক মাধ্যম। সমাজের সবধরনের মানুষের মধ্যে ব্যবধান ঘুচিয়ে একই প্লাটফর্মে একই প্রাণের উৎসবে বইমেলা মাতিয়ে তােলে সবাইকে। বাঙালির জাতীয় জীবনেও বইমেলা একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, একটি অনন্য উৎসব।

বইমেলার ইতিহাস:

ছাপাখানা ও বইয়ের ইতিহাস অনেক পুরােনাে হলেও বইমেলার বয়স সে তুলনায় বেশি নয়। সম্ভবত ১৪৮০ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ডে একটি সাধারণ মেলার অংশ হিসেবে বই প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কাল থেকেই বইমেলা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বিশ্বাসনে। তবে সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ বইমেলার আয়ােজন করা হয় নিউইয়র্কে ১৮০২ সালে । এর পূর্ব পর্যন্ত বাণিজ্যিক পণ্য প্রদর্শনীর পাশাপাশি বই প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হতাে। ১৯২৪ সালে এককভাবে বই নিয়েই আয়ােজিত হয় লাইপজিগের বইমেলা। বর্তমান সময়েও লাইপজিগ বইমেলা জনপ্রিয়তার শীর্ষে। এভাবেই ধীরে ধীরে
বইমেলার পরিধি বিস্তৃত হয়ে পড়ে। তবে আয়ােজন ও জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে আরও কিছু উল্লেখযােগ্য নাম হলাে ফ্রাঙ্কফুট, লন্ডন, কায়রাে, সিঙ্গাপুর প্রভৃতি বইমেলা।

বাংলাদেশে বইমেলা:

বাংলাদেশে বইমেলার ইতিহাস বেশি দিনের নয়। ১৯৫৫ সালে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার পর থেকে বইমেলার অঙ্কুর গজাতে শুরু করে। তবে একটি সুপরিকল্পিত ও সুসজ্জিত বইমেলার সূচনা হয় মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে। মহান একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষ্যে নানা সভা-সমিতি ও অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই একটি পূর্ণাঙ্গ বইমেলার উদ্ভব ঘটে। ১৯৭২ সালে এ অনুষ্ঠানের সঙ্গে একাডেমির নিজস্ব বইপুস্তক, জার্নাল বিক্রি এবং পােস্টার, ছবি, বুলেটিন, পত্রপত্রিকা, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের নিষিদ্ধ বুলেটিন ও ইশতেহার প্রদর্শনের সূচনা হয়। তবে বইমেলার সূচনাকালের মাইলফলক হিসেবে ১৯৭৪ সালে অনুষ্ঠিত স্বাধীন দেশের প্রথম জাতীয় সাহিত্যসম্মেলনকে ধরা হয়। ১৯৭৫ সালে মুক্তধারা নিজেদের উদ্যোগে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বইমেলার আয়ােজন করে। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি প্রাতিষ্ঠানিক বইমেলার সূচনা করে। ১৯৮৪ সাল থেকে একুশের বইমেলা ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ নামে অভিহিত হয়। সরকারি উদ্যোগে ১৯৯৫ সাল থেকে আয়ােজিত ঢাকা বইমেলা জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। বর্তমানে ঢাকা বইমেলাকে আন্তর্জাতিক মেলার পর্যায়ে উন্নীত করার প্রক্রিয়া চলছে।

বইমেলার তাৎপর্য:

বইয়ের মাধ্যমে বিশ্বের নানা জ্ঞানী ও পণ্ডিত ব্যক্তির চিন্তাচেতনা, অভিজ্ঞতা-উপলব্ধি, দর্শন-ভাবনা ইত্যাদির সাথে পরিচিত হওয়া যায়। বইমেলা এ দুর্লভ সুযােগ সৃষ্টির অনন্য মাধ্যম। বিচিত্র গ্রন্থের সমাবেশ ঘটানাে
বইমেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাই বইমেলা বইপ্রেমিকদের গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়। বইমেলাকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত হয় নতুন নতুন বই, পত্র-পত্রিকা। ক্রেতার চাহিদা পূরণের জন্যে কালােত্তীর্ণ বইয়ের পুনঃপ্রকাশ ঘটে। লেখক ও পাঠকের সম্মুখ ও সরাসরি যােগাযােগের মাধ্যমে ভাব-বিনিময়ের সুবর্ণ সুযােগ পাওয়া যায়। তাছাড়া লেখক, প্রকাশক, পাঠক, মুদ্রক, বিক্রেতা খােলাখুলি মত প্রকাশের মাধ্যমে নিজেদের সমস্যাকে তুলে ধরার পাশাপাশি বইয়ের প্রচারণাও করতে পারেন। লেখকের সাথে সরাসরি ভাব-বিনিময়ের মাধ্যমে বই পড়ার প্রতি পাঠকের আগ্রহ সৃষ্টি হয়। বিষয়-বৈচিত্র্যের সম্ভার পাঠককে দেয় আবিষ্কারের আনন্দ। সর্বোপরি নানান বয়সের নানান রুচির মানুষের কৌতূহলী মনের ভাব বিনিময়ের মাধ্যমে কমে যায় মনের ব্যবধান। নবীন আর প্রবীণ মনের মিলনে ঘুচে যায় সংস্কৃতির ব্যবধান। সাধারণের মনে পাঠাভ্যাস গড়ে তােলা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশেও বইমেলার তাৎপর্য অপরিসীম।

বইমেলার প্রভাব:

বই মানুষের সুকুমার বৃত্তির অনন্য প্রকাশ। তাই মনুষ্যত্বের বিকাশে বইয়ের বিকল্প কিছু নেই। বইমেলা অর্থনৈতিক চিন্তার উর্ধ্বে একটি রুচিশীল আয়ােজন । তাই মানুষকে উন্নত জীবনবােধ ও মনুষ্যত্ববােধে উদ্বুদ্ধকরণে বইমেলার প্রভাব অপরিসীম। সামাজিক ভেদাভেদ ভুলিয়ে দিয়ে ভ্রাতৃত্ববােধের অঙ্গীকার সৃষ্টি করে বইমেলা। এ আয়ােজন একদল সংস্কৃতিবান মানুষের পবিত্র প্রাণের আয়ােজন। তাই সব সংস্কারের উর্ধ্বে উঠে জীবনকে মহৎ আদর্শে সুসংগঠিত করে বইমেলা । খ্যাতিমান লেখকের সাথে সরাসরি কথা বলা, তাদের কণ্ঠে আবৃত্তি শােনার যে আনন্দ ও সুখ তার সুযােগ করে দেয় বইমেলা । তাই বইমেলা সমস্যাসংকুল মানবজীবনে দেয় স্বপ্নময় আনন্দের স্পর্শ।

বইকেনার আগ্রহ বৃদ্ধি ও পাঠক সৃষ্টি:

যেকোনাে বিষয়কে অবলম্বন করে আনুষ্ঠানিক মেলার আয়ােজন সাধারণের মনে কৌতূহল ও উদ্দীপনার সৃষ্টি করে । বইয়ের ক্ষেত্রেও তেমনি। বইমেলার বিচিত্র বইয়ের সম্ভার পাঠকের মনে আগ্রহ সৃষ্টি করে । রুচিশীল পাঠকমাত্রই চায় বইয়ের মান যাচাই করতে ও পছন্দসই বই কিনতে । বইমেলায় অনেক ধরনের বই থাকে বলে পাঠক এ সুযােগ পায় অনায়াসে। তাছাড়া অন্যান্য সময়ের তুলনায় বইমেলায় কমমূল্যে বই বিক্রি হয় বলে পাঠক বই কেনার আগ্রহ পায় এবং কমমূল্যে বইকেনার সুযােগ কাজে লাগায়। বইমেলার স্টলগুলাের শৈল্পিক সজ্জা এবং আনন্দময় পরিবেশ সর্বসাধারণের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ বাড়ায়। তাছাড়া বইমেলায় যেহেতু বইয়ের প্রচার ও বিক্রি হয় বেশি সেহেতু লেখক ও প্রকাশক ভালাে বই বের করার চেষ্টা করেন। যা বই পাঠে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। এভাবেই মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধির মাধ্যমে বইমেলা আলােকিত সমাজ গড়ায় পালন করে অনন্য ভূমিকা।

লেখক, প্রকাশক ও ক্রেতার মিলনস্থল:

লেখক-পাঠকের সরাসরি যােগাযােগ মাধ্যম বইমেলা। বয়স, জাতিভেদ কিংবা বর্ণভেদ সবকিছুকে অস্বীকার করে নিঃসংকোচ প্রাণের মিলনমেলা এ আয়ােজন। প্রবীণ লেখকের পাশাপাশি নবীন লেখক, প্রবীণ পাঠকের পাশাপাশি নবীন পাঠক সবারই একই উৎসাহ, একই আগ্রহ। বইমেলা এমন এক আয়ােজন যেখানে একমাত্র লেখক, প্রকাশকদের সাথে ক্রেতাদের সরাসরি সংযােগসাধন সম্ভব। লেখক, প্রকাশক এবং ক্রেতার সমাবেশ বিক্রেতাকে করে উৎসাহিত । এককথায় ভাববিনিময়, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানে বইমেলা লেখক, প্রকাশক, ক্রেতা, বিক্রেতার মিলনক্ষেত্র।

আনন্দ আয়ােজনে বইমেলা:

বইমেলা কেবল বিচিত্র বইয়ের সম্ভার নয়, বরং উৎসবমুখর আনন্দপূর্ণ পরিবেশও এর অন্যতম
বৈশিষ্ট্য। মেলায় আসা মানুষকে বাড়তি আনন্দদান এবং উৎসাহ প্রদানের জন্যে এখানে আলােচনা, কবিতা আবৃত্তি, গান-বাজনার ব্যবস্থা করা হয়। প্রখ্যাত লেখক এবং খ্যাতিমান ব্যক্তিরা এসব আয়ােজনে অংশ নেন। সাহিত্যিক আলােচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, লেখক-প্রকাশকদের আড্ডা সব মিলিয়ে বইমেলা হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।

একুশের বইমেলা:

সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বইয়ের জন্যে অন্যান্য মেলার আয়ােজন করা হলেও এখন পর্যন্ত অমর একুশে বইমেলাই লেখক, প্রকাশক, বিক্রেতা এবং পাঠকদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্ববহ সৃজনশীল ও গবেষণাধর্মী লেখক ও পাঠকদের কাছে ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী বইমেলাটি তীর্থ উৎসবে পরিণত হয়। একুশে বইমেলার সাথে যুক্ত থাকে বাঙালির আবেগ ও জাতীয় চেতনা। জনপ্রিয়তার ফলে ঢাকার বাইরে দেশের অন্যান্য বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলােতেও একুশে বইমেলার আয়ােজন করা হয়। বাঙালির জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষায় এ মেলার রয়েছে অগ্রণী ভূমিকা।

উপসংহার:

বইমেলা একটি সৃজনশীল প্রেরণা সংস্কারমুক্ত, মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন সচেতন জাতি গঠনে বইমেলা পালন করে অপরিহার্য ভূমিকা। বইমেলা বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। একদিকে যে বাঙালি সংস্কৃতির লালন করছে, অন্যদিকে মানবমনে সম্মিলনী চেতনার সঞার করছে।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *