বিজয় দিবস বা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস রচনা (৭০০ শব্দ)

বিজয় দিবস বা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস রচনার সংকেত (Hints)

  • সূচনা
  • বিজয় দিবসের প্রেক্ষাপট
  • বিজয় দিবসের তাৎপর্য
  • বিজয় দিবস উদ্যাপন
  • বিজয় দিবস এবং আমাদের প্রত্যাশা
  • বিজয় দিবস এবং আমাদের প্রাপ্তি
  • উপসংহার

বিজয় দিবস বা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস রচনা

সূচনা:

১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। বাঙালির প্রতীক্ষা অবসানের দিন, শৃঙ্খল থেকে মুক্তির দিন। এ দিনে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। দীর্ঘ নয় মাস অনেক রক্তের পিচ্ছিল পথ মাড়িয়ে, অনেক প্রাণের বিনিময়ে বাঙালি জাতি সেদিন অর্জন করে তাদের প্রিয় স্বাধীনতা। মুক্তিকামী জাতির কাছে সে দিনটি ছিল অনেক প্রতীক্ষিত একটি দিন । আজও বাঙালি জাতি অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে গেলেই ফিরে যায় সে দিনটির কাছে। তাই জাতীয় জীবনে বিজয় দিবসের আছে সুগভীর তাৎপর্য।

বিজয় দিবসের প্রেক্ষাপট:

১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে অবিভক্ত ভারতবর্ষ ভেঙে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিজাতিতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে আমাদের পূর্ববাংলা পূর্বপাকিস্তান নাম নিয়ে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে পূর্ব বাংলার মুসলমানরা স্বাধীন দেশ পাকিস্তান লাভ করলেও প্রকৃতপক্ষে তারা স্বাধীনতার ফল ভােগ করতে পারেনি। বাংলার অখণ্ডতাকে বাদ দিয়ে ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশীদার হয়ে তারা যে মস্ত বড় ভুল করেছে তা তাঁরা শীগগিরই উপলব্ধি করে। পশ্চিম পাকিস্তানিরা নিপুণ ছলে শশাষণ করতে চায় পূর্ব পাকিস্তানকে। উর্দুকে চাপিয়ে দিতে চায় বাঙালিদের ভাষা হিসেবে। এর প্রতিবাদে ফেটে পড়ে ছাত্রজনতা । তারা দাবি করে রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’। শুরু হয় আন্দোলন।

১৯৫২ সালের ২১-এ ফেব্রুয়ারি মিছিল করতে গিয়ে শহিদ হন সালাম, বরকত, রফিক, শফিক জব্বারসহ অনেকেই। গতি পেতে থাকে আন্দোলন। ঐতিহাসিক ছয় দফা এবং এগারাে দফার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয় ব্যাপক গণজাগরণ। ফলে ১৯৬৯ সালে সফল গণ-অভুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার আইয়ুব খানের পতন ঘটে। এর পর মার্শাল-ল -এর ক্ষমতা নিয়ে আসে ইয়াহিয়া খান। তীব্র আন্দোলনের চাপে ১৯৭০ সালে ঘােষণা করা হয় সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচনে বাঙালির অবিসংবাদী নেতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামীলীগের বিজয় ঘটে। সংগত কারণেই রাষ্ট্র পরিচালনার ভার তাঁকে দেওয়ার কথা। কিন্তু শুরু হয় ষড়যন্ত্রের নীল নকশা। ১৯৭১ সালের ২৫-এ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অতর্কিতে হামলা চালায়। নিরস্ত্র বাঙালির ওপর। তারা নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায় পিলখানা, রাজারবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। মধ্যরাতের পর হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গ্রেফতারের পূর্বেই, অর্থাৎ ২৬-এ মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘােষণা করেন। তার স্বাক্ষরিত ঘােষণা বার্তাটি তক্কালীন ইপিআর-এর ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে চট্টগ্রামে প্রেরণ করা হয়। এরপর চট্টগ্রামের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ২৬ ও ২৭-এ মার্চ বঙ্গবন্ধুর নামে প্রচারিত হয় স্বাধীনতার ঘােষণা। সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে স্বতঃস্ফূর্ত মুক্তির সংগ্রাম। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ১৯৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বর আসে সােন দিন। বাঙালি জাতি স্বাধীনতা লাভ করে, অর্জন করে একটি মানচিত্র, একটি পতাকা।

বিজয় দিবসের তাৎপর্য:

যুদ্ধজয়ের মধ্য দিয়ে পতাকা ও ভূখণ্ড পেয়েছে বলেই জাতি সফল হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না। বরং এ বিজয়ের আছে সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য। স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল বলেই জাতির মেধাবী সন্তানেরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে
অসামান্য অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে। নিজ ভাষা, নিজ সংস্কৃতি পালন করতে পারছে বাঙালি জাতি। বিশ্বে আজ বাংলাদেশ আর বাঙালি জাতি এখন অচেনা নয় বরং বিশ্বকে সমৃদ্ধ করবার কাজে এদেশেরও আছে গৌরবময় অবদান।

বিজয় দিবস উদ্যাপন:

বাঙালি জাতির এ আনন্দের দিনটি নানাভাবে উদ্যাপিত হয়ে থাকে। সেদিন বাঙালিরা মিলিত হয় প্রাণের মেলায়। দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ওড়ে আমাদের লাল-সবুজের পতাকা। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ অনুষ্ঠান। রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যম, সরকারি-বেসরকারি রেডিও টিভি চ্যানেল গ্রহণ করে নানা উদ্যোগ। সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় বিশেষ ক্রোড়পত্র । বিদেশের বাংলাদেশি দূতাবাসগুলােতে ওড়ে পতাকা। দেশের সর্বস্তরের মানুষ গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে তাদের বীর শহিদদের। বিজয়ের আনন্দে মানুষ স্মরণ করে এ দিনটিকে।

বিজয় দিবস এবং আমাদের প্রত্যাশা:

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ আমরা যেমন চেয়েছিলাম তেমনটা এখনাে পাইনি। স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক মুক্তি পেলেও আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি এখনাে আসেনি। জনজীবনে এখনাে আসেনি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা । দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত বেকারের কর্মসংস্থান এখনাে অনিশ্চিত। বরং এর বিপরীতে দুর্নীতির ভয়াল রূপ দেখে আশ্চর্য না হয়ে পারা যায় না। স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তুলতে হলে প্রয়ােজন অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সম্পদের সুষম বণ্টন।

বিজয় দিবস এবং আমাদের প্রাপ্তি:

অনেক না পাওয়ার মধ্যেও আমাদের প্রাপ্তি কম নয়। স্বাধীন বাংলাদেশ এখন শিক্ষায় যথেষ্ট এগিয়েছে। দেশের বাইরেও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছে। যােগাযােগব্যবস্থা, পল্লি জনপদে বিদ্যুতায়ন, স্বাস্থ্যখাত ইত্যাদি বিষয়ে উল্লেখযােগ্য উন্নতি ঘটেছে। ক্রীড়াক্ষেত্রেও সুখ্যাতি অর্জনে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পরিচিতি দিন দিনই বাড়ছে। তৈরি পােশাক, চামড়া, হিমায়িত চিংড়ি ইত্যাদির পর এবার জাহাজ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেও বাংলাদেশ পরিচিতি পাচ্ছে।

উপসংহার:

এক সাগর রক্ত আর ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের সোনার বাংলাদেশ। একটি নতুন দেশকে সােনার দেশ হিসেবে গড়ে তােলার দায়িত্ব সকলের। বিজয় দিবস স্বাধীনতাকামী বাঙালির পবিত্র চেতনার ধারক। সেই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *