মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রচনা (900 words) | JSC, SSC |

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রচনার সংকেত (Hints)

  • ভূমিকা
  • জাতীয়তাবাদী চেতনার জাগরণ
  • মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি
  • মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ
  • মুক্তিযুদ্ধের চেতনা
  • বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আজকের বাংলাদেশ
  • উপসংহার

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রচনা

ভূমিকা:

হাজার বছর ধরে বাঙালি জাতি স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করে আসছে। বাঙালির প্রাকৃতিক পরিবেশেই মিশে আছে প্রতিবাদের ভাষা । বিদেশি শক্তির আগ্রাসন এ জাতি কোনােদিনই মেনে নিতে পারেনি। তাই পরদেশি শােষকদের বিরুদ্ধে এ অঞ্চলে বার বার বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছে। স্বাধীনতার জন্য, মুক্তির জন্য আত্মদানের রক্তে বারংবার সিক্ত হয়েছে বাংলার মাটি।অবশেষে ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি অর্জন করে প্রাণপ্রিয় স্বাধীনতা। ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক সে মুক্তিযুদ্ধ যে বােধ বা চেতনাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছিল তারই নাম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা । ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি তাকে সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের প্রেরণা জোগাবে অনন্তকাল।

জাতীয়তাবাদী চেতনার জাগরণ:

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের জাতাকলে প্রায় দু’শ বছর ধরে নিষ্পেষিত হয়েছিল ভারতীয় উপমহাদেশ । ১৯৪৭ সালে সে নিষ্পেষণ থেকে উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষ মুক্তিলাভ করলেও মুক্তি মেলেনি বাঙালি জাতির । ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটলেও পাকিস্তানি শাসকদের শৃঙ্খলে বন্দি হতে হয় বাঙালি জাতিকে। সেসময় বাঙালির প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের সংকীর্ণ মনােভাব ও শােষণ-নিপীড়ন এদেশের মানুষকে ভাবিয়ে তােলে। এর মধ্য দিয়ে একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে বাঙালি নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। এ জাতীয়তাবাদী চেতনার নিরিখেই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে সংগ্রাম করে মুক্তির পথ খুঁজতে থাকে বাঙালি।

মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি:

‘পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ এ অঞ্চলের মানুষের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগােষ্ঠীর বৈষম্যমূলক আচরণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে এদেশের জনমানসে অসন্তোষ ও ক্ষোভ ক্রমশই তীব্র হতে থাকে। এরই অনিবার্য ফল হিসেবে ১৯৫৪ সালে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার জয়লাভ, ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরােধী আন্দোলন হতে ১৯৬৬-র ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর নজিরবিহীন গণ-অভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিকাশ লাভ করে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন। এরপর ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে ১৬৭টি আসনে। কিন্তু তারপরও ক্ষমতা হস্তান্তরে ইয়াহিয়ার গড়িমসি ও ভুট্টোর ভেটো অব্যাহত থাকে। অবশেষে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ১৯৭১-এর ১লা মার্চ হতে ২৫-এ মার্চ পর্যন্ত নজিরবিহীন অসহযােগ আন্দোলন চলতে থাকে। লাখ লাখ জনতার উপস্থিতিতে ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতা সংগ্রামে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মােকাবিলা করার আহ্বানে স্বাধীনতার ডাক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২৫-এ মার্চ রাতে নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত বাঙালির ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৫-এ মার্চ মধ্যরাত শেষে, অর্থাৎ ২৬-এ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘােষণা করেন এবং ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরাে, বাংলাদেশ স্বাধীন করাে’ -এ স্বতঃস্ফুর্ত স্লোগান দিয়ে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। আর এ যুদ্ধে সমগ্র বাঙালি জাতি একাত্ম হয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার নিরিখে শােষকশ্রেণির অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে।

মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ:

১৯৭১ সালের ২৫-এ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অতর্কিতে হামলা চালায় নিরস্ত্র বাঙালির ওপর। তারা নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায় পিলখানা, রাজারবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। মধ্যরাতের পর হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গ্রেফতারের পূর্বেই, অর্থাৎ ২৬-এ মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘােষণা করেন। তার স্বাক্ষরিত ঘােষণা বার্তাটি তৎকালীন ইপিআর এর ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে চট্টগ্রামে প্রেরণ করা হয়। এরপর চট্টগ্রামের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ২৬ ও ২৭-এ মার্চ বঙ্গবন্ধুর নামে প্রচারিত হয় স্বাধীনতার ঘােষণা। সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে স্বতঃস্ফুর্ত মুক্তির সংগ্রাম। ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। ১৭ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করে। এমনিভাবে নয় মাস যুদ্ধের ভেতর দিয়ে ১৯৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা:

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে আমাদের যে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে উঠেছে তার মূলে কাজ করেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা গত চার দশকে নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকশিত হয়েছে আমাদের সমাজজীবনে। ব্যক্তিস্বাধীনতা, নারীমুক্তি আন্দোলন, নারীশিক্ষা, গণশিক্ষা, সংবাদপত্রের প্রচার-প্রকাশনার বিকাশ সর্বোপরি গণতান্ত্রিক অধিকার ও চেতনা বিস্তৃত হয়েছে সমাজে। দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে যে প্রবল গণজোয়ারের মধ্য দিয়ে নবতর বিজয় অর্জন ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে তারও প্রেরণা জুগিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের সাহিত্যে বিশেষ করে কবিতা ও কথাসাহিত্যে এক নতুন ধারার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশে কবিতাচর্চা তথা সাহিত্যচর্চা আজকে যতটা ব্যাপ্তি পেয়েছে তার পেছনে বড় প্রেরণা হিসেবে ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্যাপ্তি ঘটেছে আমাদের গান এবং নাটকে। গণসচেতনতামূলক বক্তব্যধর্মী নাটক ব্যাপকভাবে রচিত হয়েছে স্বাধীনতার পর । আমাদের দেশাত্মবােধক গানের ক্ষেত্রে এক নতুন জোয়ার এনেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। অসংখ্য গীতিকার তাদের গানে রচনা করেছেন মুক্তিযুদ্ধের বিজয়গাথা। আমাদের চলচ্চিত্রেও মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা প্রকাশ পেয়েছে নিয়মিতভাবে।

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আজকের বাংলাদেশ:

যে স্বপ্ন বা আকাঙ্ক্ষা সামনে রেখে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল সেই স্বপ্ন নানা কারণেই গত চার দশকেও সাফল্যের লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করতে পারেনি। স্বাধীনতার পর বারবার সামরিক অভ্যুত্থান, হত্যা আর রক্তপাতের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরােধী দেশি ও বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের অপতৎপরতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, যুবসমাজের মধ্যে সৃষ্ট হতাশা, বেকারত্ব, জনস্ফীতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, ঘুষ, দুর্নীতি ইত্যাদি অবক্ষয় স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিপন্ন করে চলেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরােধী কার্যকলাপ বারবার সংঘটিত হয়েছে প্রশাসনের ভেতরে এবং বাইরে। প্রকৃত মুক্তিযােদ্ধারা তাদের প্রাপ্য সম্মান এবং অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আর তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রয়ােজন দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক শক্তির সংঘবদ্ধ প্রয়াস ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে আন্তরিক পদক্ষেপ । এজন্য দুর্নীতিমুক্ত ও কল্যাণমূলক শাসনব্যবস্থা যেমন প্রতিষ্ঠা করা প্রয়ােজন তেমনি প্রয়ােজন মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত গৌরবগাথা আর আত্মত্যাগের ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা।

উপসংহার:

মুক্তির চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯৭১ সালে আমরা কঠিন আত্মত্যাগের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তখনই সাফল্যে উদ্ভাসিত হবে যখন এ স্বাধীনতা আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতায় রূপান্তরিত হবে। সে লক্ষ্যে আজ সমাজের সর্বস্তরে মুক্তিযুদ্ধের মহান চেতনাকে ছড়িয়ে দেওয়া ও লালন করা প্রয়ােজন। দেশের প্রতিটি মানুষের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের মহৎ লক্ষ্যসমূহ জাগ্রত করা গেলে তবেই আমাদের স্বাধীনতা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এক গৌরবময় স্তরে উত্তীর্ণ হবে।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *