পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন রচনা | JSC, SSC |

পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন রচনার সংকেত

  • ভূমিকা
  • প্রাকৃতিক বনের স্বাভাবিক চিত্র
  • বাংলাদেশের বনাঞ্চল
  • বনাঞ্চলের বৃক্ষ নিধন ও তার প্রতিক্রিয়া
  • বনায়নের প্রয়ােজনীয়তা ও উপায়
  • বনায়নের লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপ
  • উপসংহার

পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন রচনা লিখন

ভূমিকা:

বাংলাদেশের কৃষির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপখাত বন। বৃক্ষ মানুষের জীবনের জন্যও অপরিহার্য। বৃক্ষহীন পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব অকল্পনীয়। বন আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য। কৃষি তাে বটেই, আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিও এর সাথে জড়িত। সেই সাথে জাতীয় অর্থনীতি, আবহাওয়া ও জলবায়ুসহ প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বনায়নের গুরুত্ব ও প্রয়ােজন অপরিসীম। 

প্রাকৃতিক বনের স্বাভাবিক চিত্র:

 প্রাকৃতিকভাবে একটি বন গড়ে ওঠে হাজার বছর ধরে। বনের মাটিতে আপনা থেকেই জন্মায় শত প্রজাতির বৃক্ষ, লতাগুল্ম, পুষ্টিকর নানা শাকসবজি ও ফলমূল । একেকটি বৃক্ষ একেক বয়সের । আর এসব বৃক্ষ আশ্রয় করে বেড়ে ওঠে নানা প্রজাতির, নানাবয়সি লতাগুল্ম। এ নিবিড় বনের পরতে পরতে থাকে অজস্র প্রাণ বৈচিত্র্য। শত প্রজাতির পাখ-পাখালি, জীবজন্তুর অবাধ বিচরণক্ষেত্র বন। এ অভয়ারণ্যে তাদের খাবারের অভাব নেই, নেই অজানা বিপদের আশঙ্কা। বনের আরেক অবিচ্ছেদ্য অংশ ক্ষুদ্র জাতিসত্তার আদিবাসী মানুষ। শত শত বছর ধরে বনকে আশ্রয় করেই এরা বেঁচে থাকে।

বাংলাদেশের বনাঞ্চল:

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ দেশের মােট ভূমির প্রায় আঠারাে। শতাংশ। এর মধ্যে রয়েছে দেশের দক্ষিণালের সমুদ্র উপকূলবর্তী সুন্দরবন; চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের কিছু অঞ্চল।

বনাঞ্চলের বৃক্ষ নিধন ও তার প্রতিক্রিয়া: 

যদিও সরকারি হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের বনভূমির পরিমাণ আঠারাে শতাংশ কিন্তু। বনভূমি, ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও টাঙ্গাইল জেলা এবং রংপুর ও দিনাজপুরের কিছু অঞ্চল। সত্যিকার অর্থে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দরবন বাদ দিলে বন বলতে যা অবশিষ্ট থাকে তা সামান্যই ওয়ার্ল্ড রিসাের্সেস ইনস্টিটিউটের মতে, এর পরিমাণ মাত্র পাঁচ শতাংশ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে এ বনভূমির পরিমাণ আরও হ্রাস পাচ্ছে। শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বনজ সম্পদ। পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃক্ষরাজি শােভিত পাহাড়গুলাের বেশিরভাগই ন্যাড়া। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বনভূমির পরিমাণ নেমে এসেছে ৩.৫ শতাংশে এরই বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে আবহাওয়ায়। বাতাস দূষিত হচ্ছে, ক্ষয়ে যাচ্ছে মাটি। বননির্ভর জীববৈচিত্র্য বিলীন হওয়ার আশঙ্কায়। খাদ্য, ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল, শক্তি ও পরিবেশ সেবার যে অংশ আসে বন থেকে, বৃক্ষ নিধনের ফলে তা সংকটের মুখােমুখি। পর্যাপ্ত বনভূমি না থাকায় অনাবৃষ্টি দেখা দিচ্ছে। ফলে দ্রুত কমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। বিলীন হয়ে যাচ্ছে অতুলনীয় সবুজ সৌন্দর্য।

বনায়নের প্রয়ােজনীয়তা ও উপায়: 

জাতীয় অর্থনীতি ও পরিবেশের ভারসাম্য টিকিয়ে রাখতে দেশের বনজ সম্পদ সংরক্ষণ, সম্প্রসারণ ও বনজ সম্পদের উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। আমাদের নগর জীবন থেকে যেন ছায়াশীতল-স্নিগ্ধতা একেবারেই হারিয়ে গেছে। প্রাকৃতিক পরিবেশের পাশাপাশি নগরের সৌন্দর্যও হুমকির মুখে। এক্ষেত্রে পরিকল্পিত বনায়নের বিকল্প নেই। আর বাংলাদেশে রয়েছে বনায়নের বিপুল সম্ভাবনা। এ সম্ভাবনাকে সুষ্ঠুভাবে কাজে লাগাতে হবে। এর জন্য যা করণীয় তা হলাে-

১. পাহাড়ের ঢাল, সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞলনদীর কিনারা, ও সড়কের দু পাশে গাছ লাগানাের ব্যবস্থা করতে হবে ;

২. নির্বিচারে ভূমির গাছ কাটা রােধ করতে হবে 

৩. অপরিণত গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে ;

৪. প্রয়ােজনে গাছ কাটা হলে সে অঞলে নতুন চারাগাছ লাগাতে হবে ;

৫, বনভূমি থেকে কাঠের চোরাচালান বন্ধ করতে হবে ;

৬. বিদেশি বা আগ্রাসী প্রজাতি দিয়ে কৃত্রিম বনায়ন না করে দেশীয় অর্থকরী বৃক্ষরােপণের ব্যবস্থা করতে হবে;

৭. গ্রামাঞ্চলে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে বৃক্ষরােপণে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণে উৎসাহ দিতে হবে। বিনামূল্যে সরবরাহ করতে হবে বীজ ও চারা ;

৮. গ্রামবাসীকে বসতভিটার চারপাশে খাদ্য, ফল, জ্বালানি ইত্যাদি আহরণ উপযােগী বিভিন্ন ধরনের বৃক্ষরােপণ করতে হবে;

৯. সরকারি ও বেসরকারি সহায়তায় বৃক্ষরােপণ ও পরিচর্যায় অংশগ্রহণকারীদের আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ দিয়ে উত্সাহিত করতে হবে ;

১০. সামাজিক বনায়ন সম্পর্কিত সকল বিষয় তদারকি করার জন্য ওয়ার্ড মেম্বারের নেতৃত্বে শিক্ষক, সমাজকর্মী, মসজিদের ইমাম প্রমুখের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করতে হবে ।

বনায়নের লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপ:

বাংলাদেশে বনজ সম্পদের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক, বিশেষ করে সরকারি ভূমিতে। তাই সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বনায়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন মেয়াদে জনগণকে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। জনসাধারণের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। চারা। তবে বাংলাদেশের সরকারি বনভূমিতে যে বনায়ন কর্মসূচি নেয়া হচ্ছে তা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। যেমন- দেশীয় প্রজাতির গাছ নিশ্চিহ্ন করে সেখানে রাবার, সেগুন,আকাশিয়া প্রভৃতির শিল্প বন তৈরি করা হচ্ছে। বিদেশি প্রজাতির গাছের সাথে ক্ষতিকর অনেক কীটপতঙ্গ আসে। এ ধরনের গাছ মাটি থেকে পানি শােষণ করে নেয় বলে আশপাশের জমিতে পানির পরিমাণও কমে যায়। পার্বত্য চট্টগ্রাম, মধুপুর প্রভৃতি পার্বত্য এলাকায় রাবার চাষ এবং বাণিজ্যিক ও শিল্প বনায়নের কারণে অধিক মাত্রায় মাটিক্ষয় ও পানির স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। এসব অঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসীরা বনাল থেকে তাদের প্রয়ােজনীয় শাকসবজি, ফলমূল ও নির্মাণ সামগ্রী সংগ্রহ করতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগত ভূমি অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছে।

উপসংহার: 

প্রাণীর অস্তিত্ব ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছপালার কোনাে বিকল্প নেই। গাছ প্রস্বেদন প্রক্রিয়া ও বাষ্পীভবনের মাধ্যমে আবহাওয়া বিশুদ্ধ রাখে। মাটির উর্বরতা বাড়ায়, মাটির ক্ষয় রােধ করে। ঝড়-ঝঞ্চা থেকে রক্ষা করে প্রকৃতিকে, বন্যা প্রতিরােধ করে। অর্থাৎ মানুষের বসবাস উপযােগী ভারসাম্যপূর্ণ পৃথিবী বৃক্ষেরই অবদান। তাই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে দেশকে বাঁচানাে ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বনায়নের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর বনায়নের জন্য প্রয়ােজন জনগণের সচেতনতা এবং সরকারি পৃষ্ঠপােষকতা। পরিকল্পিত ও সঠিক বনায়নের মাধ্যমেই নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা ব্রা সম্ভব।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *