বৃক্ষরোপন অভিযান রচনা | JSC, SSC |

বৃক্ষরোপন অভিযান রচনার সংকেত

  • ভূমিকা
  • পরিবেশ সংরক্ষণে বৃক্ষরােপণ
  • বৃক্ষহীনতার প্রতিক্রিয়া
  • বাংলাদেশে বৃক্ষ নিধন ও তার প্রভাব
  • বৃক্ষরােপণের প্রয়ােজনীয়তা
  • বনায়নের উপায়
  • বৃক্ষরােপণ কর্মসূচি ও গৃহীত পদক্ষেপ
  • সামাজিক সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রয়াস
  • উপসংহার

বৃক্ষরোপন অভিযান রচনা লিখন

ভূমিকা:

 বৃক্ষ প্রকৃতি ও জীবজগতের অপরিহার্য অংশ। একদিকে বৃক্ষ প্রকৃতির শােভাবর্ধক অন্যদিকে প্রাণিকুলের প্রাণ প্রদায়ক। একদিকে সে প্রকৃতিকে দেয় রাণীর সাজ, অন্যদিকে প্রাণিকুলকে দেয় প্রাণধারণের জন্য অক্সিজেন । তাই বৃক্ষ ছাড়া পৃথিবীর বুকে প্রাণের অস্তিত্ব কল্পনাতীত । কিন্তু মানুষের নিষ্ঠুরতা প্রতিনিয়ত কুঠারাঘাত করছে প্রাণপ্রদায়ী বৃক্ষের মূলে। ফলে প্রকৃতির বুকে অরণ্যের যে শােভা তা দিন দিন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। নির্বিচারে বৃক্ষনিধন প্রকৃতিকে করছে বিপন্ন। জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ হয়ে পড়েছে হুমকির সম্মুখীন। এমতাবস্থায় পরিবেশকে রক্ষা করতে হলে, দেশকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে হলে সচেতনভাবে বৃক্ষরােপণের বিকল্প নেই ।

পরিবেশ সংরক্ষণে বৃক্ষরােপণ: 

পরিবেশ বিজ্ঞানীদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিশ্ব পরিবেশের বিপর্যস্ততার কারণ বিশ্বের বনভূমি উজাড় । জীবন ও পরিবেশের সম্পর্ক অবিচ্ছিন্ন জীবনকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে পরিবেশকে সমুন্নত রাখতে হবে। পরিবেশকে সমুন্নত রাখার জন্য প্রয়ােজন প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা। আর প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষ পালন করে অনিবার্য ভূমিকা। বৃক্ষ বায়ুমণ্ডলের বিশুদ্ধকরণ ও শীতলীভবনের অন্যতম অনুঘটক। গাছ তার মূলের সাহায্যে মাটি থেকে পানি আহরণ করে প্রস্বেদন ও বাস্পীভবন প্রক্রিয়ার সাহায্যে আবহাওয়া মণ্ডলকে বিশু রাখে এবং জলীয়বাষ্প তৈরি করে বাতাসের আর্দ্রতা বাড়িয়ে বায়ুমণ্ডলকে রাখে শীতল । বৃক্ষ জলীয়বাষ্প তৈরির মাধ্যমে বৃষ্টি ঝরিয়ে ভূমিতে পানির পরিমাণ বৃদ্ধি করে। তাছাড়া মাটির ক্ষয় রােধ করে নদীর ভাঙন থেকে ভূভাগকে রক্ষা করে, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষার ক্ষেত্রেও পালন করে অনন্য ভূমিকা । বৃক্ষ প্রকৃতির বুক থেকে প্রাণিকুলের ত্যাগ করা কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেয় জীবনদানকারী অক্সিজেন। ফলে একদিকে বৃক্ষ প্রাণিকুল তথা মানুষকে উপহার দেয় বদ্বাসের উপযুক্ত পরিবেশ। অন্যদিকে, কার্বন ডাই-অক্সাইড-এর আধিক্যের কারণে সৃষ্ট উষ্ণতা থেকে পরিবেশকে রক্ষা করে । কেননা প্রকৃতিতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের আধিক্য জন্ম দেবে জলােচ্ছাস, বন্যা প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। যার ফলশ্রুতিতে বিলুপ্ত হবে অনেক প্রজাতির জীব, তাই মানুষের অর্থাৎ জীবজগতের বসবাসের উপযােগী ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টির জন্য বৃক্ষের কোনাে বিকল্প নেই।

বৃক্ষহীনতার প্রতিক্রিয়া: 

বৃক্ষহীনতার প্রতিক্রিয়া যে কী ভয়াবহ তার পরিচয় আজ পৃথিবীব্যাপী স্পষ্ট। আমাদের দেশেও এর প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে। বৃক্ষহীনতার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হচ্ছে ‘ গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া’ অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠে কার্বন ডাই- অক্সাইড আটকে পড়া। এর ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলােচ্ছাসের হার অনেক বেড়ে যাবে। এর প্রমাণ ইতােমধ্যে আমাদের দেশে ও বিশ্বের অনেক দেশে পাওয়া যাচ্ছে। আবার ওজোন স্তরের ক্ষয়ের কারণে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে চলে আসায় মানুষ ও জীবজন্তুর নানা রােগ দেখা দেবে। সুপ্রাচীনকাল থেকে মানুষ ও অন্যান্য জীবজন্তুর খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের প্রধান সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে বৃক্ষ। আবার প্রাকৃতিকভাবে বন্যপ্রাণীদের খাদ্য ও আশ্রয়দাতা হলাে বৃক্ষরাজি। ফলে বৃক্ষহীনতার ফলে জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি অবশ্যম্ভাবী। এককথায় বিশ্ব পরিবেশের বিপর্যয় ও হুমকি প্রধানত বৃক্ষহীনতারই ফল।

বাংলাদেশে বৃক্ষ নিধন ও তার প্রভাব:

বাংলা প্রকৃতির ঐতিহাময় সবুজ-শ্যামল রূপ আজ মানুষের স্বেচ্ছাচারিতা ও নির্মমতার আঘাতে বিলীন হতে বসেছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য যেকোনাে দেশের মােট জমির অন্তত ২৫ শতাংশ দরকার,সেখানে সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আমাদের দেশের বনভূমির পরিমাণ মাত্র ১৭ শতাংশ।ওয়ার্ল্ড রিসাের্সেস বনভূমি ইনস্টিটিউটের মতে, মাত্র পাঁচ শতাংশ, যা প্রয়ােজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। উপরন্তু অধিক জনসংখ্যার চাপে তাও দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। দেশের সর্বত্র বৃক্ষ নিধনের ব্যাপকতা লক্ষণীয়। কিন্তু বৃক্ষ লাগানােতে যেন সবারই অনীহা। ফলে বনজসম্পদে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বন উজাড়ের মাধ্যমে ধারণ করেছে কাঙালরূপ। বৃক্ষের ক্রমনিধন বাংলাদেশের আবহাওয়াতে সৃষ্টি করেছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। বিশেষত উত্তরাঞ্চলের আবহাওয়ায় দিনের বেলা দুঃসহ গরম আর রাতে প্রচণ্ড শীত। ঋতুবৈচিত্র্যের বাংলাদেশে এখন কেবলই বৈচিত্রতার অভাব, সময়মতাে বৃষ্টির অভাব, অসময়ে প্রবল বৃষ্টিপাত, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, সামুদ্রিক জলােচ্ছ্বাস, অস্বাভাবিক উষ্ণতা ইত্যাদি আমাদের দেশের আবহাওয়ায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে।

বৃক্ষরােপণের প্রয়ােজনীয়তা: 

দেশকে, দেশের পরিবেশকে তথা বিশ্ব পরিবেশকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে প্রয়ােজন বনায়ন। আধুনিক সভ্যতার শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে বহু জায়গা সম্পূর্ণ বৃক্ষহীন হয়ে পড়েছে। দেশ যেন দিন দিন মরুভূমির রূপ ধারণ করেছে। রুক্ষ নগরসভ্যতায় বৃক্ষের ছায়াশীতল স্নিগ্ধতা ফিরিয়ে দিতে হলে বৃক্ষরােপণ অপরিহার্য। বৃক্ষ নিধনের ফলে বায়ুমণ্ডলে প্রতিনিয়ত কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধি পেয়ে পরিবেশের যে বিপর্যয় নেমে আসছে তা থেকে রক্ষা পেতে হলে বৃক্ষরােপণ করা প্রয়ােজন। পর্যাপ্ত বনভূমির অভাবে সৃষ্ট অনাবৃষ্টির কারণে দেশের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দিনের পর দিন নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য, জীবনােপযােগী পরিবেশের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক গাছ। লাগানাে আজ অবশ্য পালনীয় দায়িত্বে পরিণত হয়েছে।

বনায়নের উপায়: 

বাংলাদেশে রয়েছে বনায়নের  বিপুল সম্ভাবনা। তাই পরিকল্পিত উপায়ে বৃক্ষরােপণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে । সামাজিকভাবে এ কর্মকাণ্ডে সবাইকে অংশগ্রহণ করতে হবে। বাঁধ, সড়ক, রেললাইন, খালের পাড়, পুকুর পাড়, খাস পতিত জমি অর্থাৎ যেখানেই খালি জায়গা থাকবে সেখানেই গাছ লাগানাের জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের জন্য অর্থনৈতিক প্রণােদনা অর্থাৎ অতিরিক্ত আয়ের উৎস প্রদান করতে হবে। গাছ নির্বাচনের ক্ষেত্রে লক্ষ রাখতে হবে যেন গ্রামবাসী এবং বনায়নের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তা থেকে খাদ্য, ফল ও জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারে। প্রয়ােজনে সরকারি ঋণ, ভর্তুকি, অনুদান এবং বিনামূল্যে বীজ ও চারা সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জনগণকে বৃক্ষরােপণের উপকারিতা সম্বন্ধে অবহিত করতে হবে। সর্বোপরি, সুপরিকল্পিতভাবে সরকারি ও বেসরকারি সহায়তার আওতায় বৃক্ষরােপণ কর্মসূচি ও পরিচর্যার ভার গ্রহণ করতে হবে।

বৃক্ষরােপণ কর্মসূচি ও গৃহীত পদক্ষেপ: 

বহুদিনের অবিবেচনা প্রসূত বৃক্ষ নিধনের ফলে পরিবেশ যে বিপর্যস্ত রূপ ধারণ করেছে তা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে বৃক্ষরােপণ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে এর মধ্যে উল্লেখযােগ্য হচ্ছে বন অধিদপ্তর কর্তৃক ১৯৮২ সালে উত্তরাঞলের বৃহত্তর রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলায় গৃহীত কমিউনিটি বনায়ন কর্মসূচি। ৭ হাজার গ্রামকে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হয়। আশির দশকে বৃক্ষরােপণ কর্মসূচির ব্যাপকতা লক্ষণীয়। ১৯৮৭-৮৮ সালে দেশের ৬১ জেলায় থানা বনায়ন ও নার্সারি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। এ প্রকল্পের আওতায় ৮০ হাজার ব্যক্তিকে বিভিন্ন মেয়াদে প্রশিক্ষণ  দেয়া এবং জনসাধারণের মধ্যে ৬ কোটি চারা বিতরণ করা হয়। ১৯৯৪ সালে বৃক্ষমেলার আয়ােজন এবং ১ কোটি ৮ লাখ চারা সরকারি নার্সারি থেকে বিতরণ করা হয়। বৃক্ষরােপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১৯৮৯ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দেশে গাছ কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

আমাদের দেশে প্রতিবছর বনজ সম্পদ রক্ষা ও সম্প্রসারণের জন্য বৃক্ষরােপণ অভিযান পরিচালনা করা হয়। সাধারণত প্রতিবছর বর্ষার মৌসুমে সরকারের বনবিভাগের উদ্যোগে এ অভিযান চালানাে হয়। এ সময় বৃক্ষের প্রয়ােজনীয়তা, চারারােপণ পদ্ধতি ইত্যাদি সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া হয় ।

সামাজিক সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রয়াস:

যেকোনাে কর্মসূচির সফলতা নির্ভর করে জনসাধারণের সচেতন ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর। বৃক্ষরােপণ অভিযানকে সফল করতে হলে সরকারের পাশাপাশি জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে। সাধারণ জনমনে এ প্রসঙ্গে সচেতনতার সার করতে হবে। কেননা সাধারণ জনগণ পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার ভয়াবহতা সম্বন্ধে অবহিত হলেই বৃক্ষরােপণের তাগিদ অনুভব করবে। আর তখনই পরিবেশকে বাঁচানাের এ মহৎ ও বৃহৎ প্রচেষ্টা সফল হবে। সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রয়ােজনে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ, পথনাটক, পােস্টার ছাপানাে, লিফলেট বিতরণ ও মাইকিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

উপসংহার:

গাছ মানুষ ও পরিবেশের অকৃত্রিম বন্ধু । মানবজীবনে গাছের রয়েছে নানামুখী ও ব্যাপক অবদান। তেমনি সুস্থ, সুন্দর, সুবিন্যস্ত পরিবেশের ক্ষেত্রেও রয়েছে এর বিরাট সহায়ক ভূমিকা। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নিত্যপ্রয়ােজনীয় আসবাব, খাদ্য, জ্বালানি, আয় ও  কর্মসংস্থান অনেক কিছুর চাহিদা পূরণ করে গাছপালা। বিশেষত গ্রামীণ দরিদ্র জনজীবনে গাছের ভূমিকা যেন আশীর্বাদস্বরূপ । তাই বিপন্ন পরিবেশকে বাঁচাতে এবং সাধারণ জনজীবনকে সমৃদ্ধ করতে বৃক্ষরােপণ কর্মসূচি বর্তমান সময়ের অনিবার্য দাবি। তাই ‘গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান’। – এ আন্দোলনে শরিক হয়ে বৃক্ষরােপণের বৃহৎ কর্মযজ্ঞে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *