Sabbir8986 / March 1, 2021

একজন রিকশাচালকের একদিন রচনা

Spread the love

একজন রিকশাচালকের একদিন রচনা লিখন

শহরের অলিতে গলিতে তাঁর বিচরণ। তিন চাকা আর প্যাডেলের এক ঐতিহ্যবাহী বাহনের চালক তিনি। কায়িক পরিশ্রমের অকৃত্রিম উদাহরণ । সমাজের নিম্নশ্রেণির একজন সাধারণ সদস্য, যার ঘাড়ে পরিবারের পাঁচজনের ভরণ-পােষণের ভার। তিনি একজন রিকশাওয়ালা । নাম রহমত মিয়া।বয়স চল্লিশের কোঠায়।

রাজধানী ঢাকায় মােহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের বস্তির এক ঝুপরি রহমত আর তার পরিবারের ঠিকানা। বস্তির অন্যান্য রিকশাওয়ালার মতাে তিনিও ডাল-ভাত খেয়ে গ্যারেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন সাত সকালে। তার নিজের কোনাে রিকশা নেই। গ্যারেজ থেকে রিকশা ভাড়া করে চালান। আএ ভাড়া মেটাতেই তার রোজগারের বেশ খানিকটা চলে যায়। তবে একটু একটু করে টাকা জমাচ্ছেন তিনি। তার অনেক দিনের স্বপ্ন নিজের একটা রিকশা হবে। তাঁর মতাে মানুষের পক্ষে টাকা জমানাে কঠিন কাজ। কয়েক মাস আগে ছেলের চিকিৎসার জন্যে অনেক কষ্টে জমানাে টাকার বেশ কিছু খরচ হয়ে গেল। মায়ের অসুখ-বিসুখেও ওষুধ কেনার টাকা লাগে। তবে তিনি দমে যান না। নিজের একটা রিকশা হলে তাে আর ভাড়ার টাকা গুনতে হবে না।

গ্যারেজ থেকে রিকশা নিয়ে রহমত চললেন হাউজিং সােসাইটির গলির দিকে। সরু গলির দু পাশে সারি সারি উঁচু দালান। এখন স্কুল-কলেজে যাওয়ার সময়। যাত্রী পেলে তিনি যাবেন মােহাম্মদপুর কলেজ গেইট বা ধানমন্ডিতে। সেখানে অনেক স্কুল। চটপট ভাড়াও পাওয়া যায়। তিন নম্বর রােডে যাত্রী পেয়ে গেলেন তিনি। একজন মা ও তার স্কুল পড়ুয়া ছেলে। চললেন ধানমন্ডির দিকে। রাস্তা এখন ফাকা। আর পনেরাে-বিশ মিনিট পরেই শুরু হবে যানজট। যানজটে রিকশা চালানাে বেশ কষ্ট। বারবার রিকশা থামাতে হয়। একবার থামালে আবার প্যাডেল ঘুরিয়ে রিকশা চালু করতে যে কী পরিশ্রম তা কেবল রিকশাওয়ালারাই জানে।

কথাবার্তার মৃদু আওয়াজ আসছে তার কানে। বারাে-তেরাে বছরের ছেলেটিকে তার মা ছুটির পর মাঠে খেলতে বারণ করছেন। বেশি খেলাধুলা করলে ঘামে ভিজে ঠান্ডা লেগে যাবে’— বললেন মহিলাটি বাইরের খােলা খাবার খেতেও মানা করলেন। রিকশা এগুতে লাগল । কখনাে বামে, কখনাে ডানে, কখনাে সােজা। স্কুল গেইটে মা-ছেলেকে নামিয়ে দিলেন। রহমত। স্কুলের পােশাক পরা ছেলেটিকে বেশ লাগছিল দেখতে। কঁাধে ব্যাগ, হাতে পানির ফ্ল্যাক্স । রহমতের ছেলেটা এবয়সেরই । মেয়েটা ছােট। দুজনেই রােজ স্কুলে যায়। তবে এমন সুন্দর পােশাক পরে নয় | স্বল্প বেতনের স্কুল । মনে কিছুটা দুঃখবােধ হলেও মুহূর্তে তা হাওয়ায় উড়ে গেল। ছেলেমেয়ে দুটোকে তিনি সঠিক বয়সে স্কুলে দিয়েছেন এটাই তার স্বস্তি। ওদের নিয়ে রহমতের চোখে অনেক স্বপ্ন । যত কষ্টই হােক, ভবিষ্যতেও তিনি সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে নেবেন।

এভাবে বিভিন্ন জায়গায় যাত্রী আনা-নেওয়া করে সকাল দশটার মধ্যে দেড় শ টাকার মতাে রােজগার হয়ে গেল । রাস্তায় ভিড় বাড়তে শুরু করেছে । ভিড় বাড়া মানেই ড্রাইভার-প্যাসেঞ্জার সবার মন মেজাজ খারাপ । একটু উনিশ-বিশ হলেই প্রাইভেট কারের ড্রাইভারগুলাে গালিগালাজ করতে থাকে। এমনই একজন ড্রাইভারের গালি শুনতে হলাে তাকে। তবে এটা নিত্যদিনের ঘটনা। তাই তিনি বিচলিত হলেন না। উল্টো ভাবলেন তাও ভালাে, গায়ে হাতে তােলেনি।

শার্টের পকেটে দেড় শ টাকা নিয়েও তিনি বিশেষ খুশি হতে পারলেন না। কারণ সকালে মেইন রােড দিয়ে আসতে না পারায় অনেক পথ ঘুরে তাঁকে নিউমার্কেট থেকে লালমাটিয়া ফেরত আসতে হয়েছে । এটুকু সময় তিনি আরও ভাড়া পেতে পারতেন। সকাল আটটার আগে মেইন রােড রিকশার জন্যে খােলা থাকে। কিন্তু তারপর সেখানে রিকশা চালানাে নিষেধ। মনে মনে ভাবলেন, সকালের দিকে আর নিউমার্কেট যাওয়া যাবে না। মেইন রােড দিয়ে গেলে ভাড়া কম । তার চেয়ে বেশি ভাড়া নিয়ে অলিগলি দিয়ে যাওয়াই ভালাে।

রহমত মিয়ার দিন শুরু হয় কাকডাকা ভাের থেকে। 

যত তাড়াতাড়ি তিনি রাস্তায় নামতে পারবেন ততই বেশি টাকা হাতে নিয়ে রাতে বাড়ি ফিরতে পারবেন। সােজা হিসাব । কিন্তু এ সহজ হিসাবই মাঝে মাঝে মিলতে চায় না ভাগ্যের দোষে । প্রায় ষােলো ঘণ্টা রাস্তায় থেকেও যেদিন সামান্য আয় নিয়ে বাসায় ফিরতে হয়, সেদিন তিনি ছেলেমেয়েদের মুখের দিকে তাকাতে পারেন। বাসায় বৃদ্ধ মা। নিজের আর স্ত্রীর কথা না হয় বাদই দিলেন। অল্প আয় মানেই পরের দিন ক্ষুধায় কষ্ট পাওয়া। মাসে বেশ কয়েকদিন এমন ক্ষুধার কষ্টে ভুগতে হয় তাদের। যার পেশা রিকশা টানা, তার আয় যে স্থিতিশীল নয় তা বলাই বাহুল্য।

দিন বাড়তে লাগল। আর তিনিও দিনের সাথে পাল্লা দিয়ে প্যাডেল চালিয়ে গেলেন। নিউমার্কেট, ইউনিভার্সিটি, জিগাতলা, ফার্মগেট, পান্থপথ, লালমাটিয়া— সব এলাকা তার নখদর্পণে । রহমত কখনাে ন্যায্য ভাড়ার বেশি চান না তারপরও যখন মানুষ দামাদামি করতে থাকে, তার একটু খারাপই লাগে। ধনবানদের কাছে দু-তিন টাকার মূল্য বেশি না, কিন্তু তার কাছে। অনেক কিছু। এমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এক অঙ্কে টাকা জমিয়েই তাে তিনি রিকশা কেনার স্বপ্ন দেখেন।

দুপুর সাড়ে বারােটা। সূর্য যেন ঠিক মাথার ওপরে। রহমতের কপাল বেয়ে ঘাম ঝরতে শুরু করল। এক চায়ের দোকানে। রিকশা থামিয়ে তিনি দুই গ্লাস পানি খেলেন। আজকাল পানিও টাকা দিয়ে কিনতে হয়। দুপুরে তিনি টংয়ের দোকানের সস্তা পাউরুটি কিনে খান। পাউরুটি খেলে পেট ভরা থাকে অনেকক্ষণ। এরপর খিদে পেলে বাদাম কিনে খান। বাদামেও পেট ভরে। দুপুর বেলা একটু ভাতের জন্যে মন বড় টানে। কিন্তু ভাতের অভ্যাস অনেক আগেই ছাড়তে হয়েছে। খরচ বেশি। আর ক্ষুধাও যেন আরও বেড়ে যায়। ধানমন্ডির দিকে রওনা হলেন রহমত ওখানকার স্কুলগুলােতে এখন ছুটির ঘণ্টা বাজবে।

কিন্তু স্কুলে আজ ভালো কোনাে ভাড়া পেলেন না। এত অল্প টাকায় কি রাজি হওয়া যায়? শেষমেশ উপায়ন্তর না দেখে সেই অল্প ভাড়াতেই তিনজন যাত্রীসহ রিকশা টানতে লাগলেন। যাত্রী তিনজন কলেজ পড়ুয়া ছেলে। গন্তব্যস্থলে পৌছে দেয়ার পর রহমত মনে মনে আশা করেছিলেন, এত কষ্ট করে তিনজনকে এনেছেন, হয়তাে দুটাকা বাড়তি দেবে তারা। কিন্তু সে আশা পূরণ হলাে না। একবার ভাবলেন চেয়ে দেখবেন, তারপরই মনে হলাে, কমবয়সি জোয়ান ছেলেগুলাে যদি খারাপ ব্যবহার করে । টাকা পকেটে রেখে আবার চলতে শুরু করলেন।

ধীরে ধীরে বিকেল গড়িয়ে সূর্য হেলে পড়ল । রােদের তেজ কমতে শুরু করেছে। হালকা বাতাস জুড়িয়ে দিচ্ছে শরীর। রাস্তার একপাশে রিকশা রেখে তিনি কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলেন। বয়স যত বাড়ছে, শরীরের বল তত কমছে। ক্লান্ত চোখ মেলে ধরলেন আকাশে। না, মেঘের ছিটেফোঁটাও নেই। আকাশে কালাে মেঘ জমলে তিনি দ্রুত গ্যারেজের দিকে রওনা হতেন। যদিও রিমঝিম বৃষ্টিতে রিকশা চালানাে যায় । তবে বড় হলে বিপদ। আর বজ্রপাত হলে তাে রাস্তায় থাকা মােটেই নিরাপদ নয় ।

সন্ধেবেলায়ও ঢাকা শহরে দুঃসহ যানজট। তাই এ সময়টায় তিনি সাধারণত বেশি দূরের ভাড়ায় যান না। শরীরও ক্লান্ত থাকে। তবে দিনে রােজগার কম হলে আর বেশি ভাড়ায় যাত্রী পেলে ভিন্ন কথা। রাতের বেলা বাড়ি ফেরার তাগিদ আর কোনাে যানবাহন না পেয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে অসহায় মানুষগুলাে। সেই অসহায় মুখের মায়ায় পড়ে গিয়েও তিনি এ পর্যন্ত কতজনকে যে রাত দশটার পর বাড়ি পৌছে দিয়েছেন তার হিসেব নেই।

রাত সাড়ে আটটার দিকে রহমত বাড়ির পথ ধরলেন। নিতান্ত মামুলি কিছু বাজার করে, রিকশা গ্যারেজে পৌছে দিয়ে। ফিরলেন বস্তিতে তার স্ত্রী খাবার নিয়ে তাঁর জন্যে অপেক্ষা করছে। গরম ভাত, কাচকি মাছ আর ডাল-অমৃতের মতাে খেলেন। তিনি। আজকের রােজগার থেকে ছয় টাকা রাখলেন টিনের কৌটায় । গুনে দেখলেন সেখানে নয়শ টাকা জমেছে। খুশি। ঝলমল করে উঠল তাঁর ক্লান্ত মুখটাতে। চোখের মণিতে যেন প্রতিফলিত হচ্ছে তার নতুন রিকশার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন নিয়েই চোখ বুজলেন রহমত। কারণ এ স্বপ্নটিই আরেকটি কঠিন দিন পার করার শক্তি জোগায় তাকে।

FILED UNDER : রচনা

Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content

রচনা, ভাবসম্প্রসারণ,অনুচ্ছেদ,পত্র, আবেদন পত্র, সারাংশ-সারমর্ম , লিখন , বাংলা, ১০ম শ্রেণি, ২য় শ্রেণি, ৩য় শ্রেণি, ৪র্থ শ্রেণি, ৫ম শ্রেণি, ৬ষ্ঠ শ্রেণি, ৭ম শ্রেণি, ৮ম শ্রেণি, ৯ম শ্রেণি,  for class 10, for class 2, for class 3, for class 4, for class 5, for class 6, for class 7, for class 8, for class 9, for class hsc, for class jsc, for class ssc, একাদশ শ্রেণি, দ্বাদশ শ্রেণি