প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও এর প্রতিকার রচনা

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও এর প্রতিকার রচনার সংকেত

  • ভূমিকা
  • প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধরন
  • ঝড়
  • ঘূর্ণিঝড়
  • টর্নেডাে
  • কালবৈশাখি
  • বন্যা
  • নদীভাঙন
  • ভূমিধস
  • ভূমিকম্প
  • আর্সেনিক
  • বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রতিকার
  • উপসংহার

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও এর প্রতিকার রচনা

ভূমিকা: 

মানবসৃষ্ট নয় এমন দুর্ঘটনা, যা মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে তাই-ই প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এর বিস্তার অবশ্য পৃথিবীর সব দেশে সমান নয়। উন্নত দেশগুলাের তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলােতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির মাত্রা বেশি। বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এসব দুর্যোগে প্রাণহানি ও সম্পত্রে ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে ব্যাপক। ঝড়, বন্যা, খরা, জলােচ্ছ্বাসের মতাে ভয়াবহ দুর্যোগ মানুষের সযত্নে লালিত সংসার নিমেষে নিঃশেষ করে দেয় । অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দোলাচলে পড়ে অসহায় মানুষ।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধরন: 

ভৌগােলিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগসমূহকে প্রধান তিনটি ভাগে ভাগ

করা যায়। এগুলাে হলাে—

১. বায়ুমণ্ডলে সংঘটিত দুর্যোগ— এর মধ্যে পড়ে কালবৈশাখি, ঝড়, ঘূর্ণিঝড়, হারিকেন, টর্নেডাে, খরা, অতিবৃষ্টি ইত্যাদি।

 ২. ভূপৃষ্ঠে সৃষ্ট দুর্যোগ যেমন— বন্যা, ভূমিধস, নদীভাঙন, ভূ-অভ্যন্তরস্থ পানিদূষণ প্রভৃতি। ৩.ভূগর্ভস্থ দুর্যোগ ভূ-অভ্যন্তরে সৃষ্ট দুর্যোগের মধ্যে প্রধান হলাে ভূমিকম্প ও অগ্ন্যুৎপাত । এসব দুর্যোগের মধ্যে ঝড়ঝঞা,নদীভাঙন, খরা, ভূমিধস, ভূগর্ভস্থ পানিদূষণ ইত্যাদিতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশি। অগ্ন্যুৎপাতের সম্ভাবনা না থাকলেও ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। 

বাংলাদেশে সংঘটিত প্রধান প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলাে হলাে:

ঝড়:

তীব্র বাতাস ও বজ-বিদ্যুৎসহ ভারী বৃষ্টিপাত ঝড়ের সাধারণ চিত্র। এ সময় সমুদ্র থাকে উত্তল ।

ঘূর্ণিঝড়:

ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের তীব্রতা অনেক বেশি হয় কখনাে কখনাে তা ঘণ্টায় ২৫০ কিলােমিটার বেগে বয়ে যায়। সমুদ্রে সৃষ্টি হয় জলােচ্ছ্বাসের। প্রতিবছরই এপ্রিল-মে এবং অক্টোবর-নভেম্বরে বাংলাদেশে ছােট-বড় ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। প্রবল শক্তিসম্পন্ন এ ঝড়ে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নােয়াখালী, খুলনা, বরিশাল ও পটুয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চল এবং সমুদ্র তীরবর্তী দ্বীপসমূহ। ১৯৭০ সালে মেঘনা মােহনায় প্রবল ঘূর্ণিঝড় ও জলােচ্ছাসে প্রায় তিন লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়, গবাদিপশু ও ফসলেরও ক্ষতি হয় প্রচুর। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় ও জলােচ্ছাসে দেড় লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়, সম্পদহানি হয় ছয় শ কোটি টাকার। ২০০৭ সালে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে আঘাত হানে প্রচণ্ড শক্তিসম্পন্ন ঘূর্ণিঝড় সিডর’। এতেও জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বিশ্বের একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন সুবন’ ক্ষতিগ্রস্ত হয় সবচেয়ে বেশি।

টর্নেডাে:

বাংলাদেশে টর্নেডাে আঘাত হানে সাধারণত এপ্রিল মাসে, যখন তাপমাত্রা সর্বোচ্চ থাকে। এটি স্বল্পকালীন দুর্যোগ, আঘাতও হানে স্বল্প এলাকা জুড়ে। কিন্তু যেখানে আঘাত হানে মাত্র দশ-বিশ মিনিটের মধ্যেই ওই এলাকা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়ে যায়। টর্নেডাে আঘাত হানে ঢাকা জেলার বিভিন্ন অঞ্চল— গাজীপুর, টাঙ্গাইল, পাবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ি গােপালগঞ্জ প্রভৃতি জেলায়।

কালবৈশাখি:

কালবৈশাখি সাধারণত এপ্রিল-মে মৌসুমে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। এর গতিবেগ সাধারণত চল্লিশ থেকে ষাট কিলােমিটার হয়ে থাকে। ব্যাপ্তিকালও স্বল্প, কখনাে কখনাে এক ঘণ্টা স্থায়ী হয়। কালবৈশাখি সাধারণত আঘাত হানে শেষ বিকেলের দিকে। মাঝে মাঝে এ ঝড়ের সাথে শিলাবৃষ্টিও হয়

বন্যা:

প্রতিবছর বাংলাদেশের এক বিস্তৃর্ণ ভূভাগ বন্যায় প্লাবিত হয়। ঋতুগত কারণে, নদনদীর পানি বেড়ে যাবার ফলে প্রবল। বৃষ্টিপাতের ফলে পাহাড়ি ঢল নেমে, নদীর বাঁধ ভেঙে জলােচ্ছাস ও জোয়ারের ফলে বাংলাদেশে বন্যা দেখা দেয়। বন্যায় প্রাণহানি কম হলেও সম্পদ ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। অনেক গবাদিপশু মারা যায়। বন্যাপরবর্তী সময়ে খাদ্যাভাব এবং নানারকম রােগব্যাধি দেখা দেয়। গৃহহীন হয়ে পড়ে অনেক লােক। বাংলাদেশে ১৯৫৫, ১৯৭৪, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৪ ও ২০০৭ সালে সৃষ্ট বন্যায় প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল । ১৯৭৪ সালে বন্যার পরপরই দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং তাতে প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যায় মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যায় ।

নদীভাঙন:

বাংলাদেশে প্রতিবছর নদীভাঙনের ফলে বসতভিটা, ফসলি জমি নদীর বুকে বিলীন হয়ে যায়। লক্ষ লক্ষ লােক নদীভাঙনের কবলে পড়ে সহায়সম্বলহীন হয়ে গ্রাম থেকে শহরে আশ্রয় নেয়।

ভূমিধস:

ভূমিধস পাহাড়ি এলাকায় সংঘটিত হয়। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি প্রভৃতি পাহাড়ি অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে মাঝে মাঝে পাহাড় ধসে পড়ে। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা অনেক ঘরবাড়ি চাপা পড়ে, ঘটে প্রাণহানি। নির্বিচারে ও অনিয়মতান্ত্রিকভাবে পাহাড় কাটার কারণেও ভূমিধস হয়। ভূমিধসের কারণে পাহাড়ি এলাকায় সড়ক যােগাযোেগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

ভূমিকম্প:

ভূমিকম্প একটি ভয়াবহ ও মারাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে রয়েছে। বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চল ও আসাম এলাকায় ১৮৯৭ সালে ৮.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রায় দেড় হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এ ধরনের ভূকম্পন একই এলাকায় একশ থেকে একশ ত্রিশ বছর পর আবার আঘাত হানতে পারে। এছাড়া প্রতি বছরই চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, মহেশখালী, সিলেট, ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী প্রভৃতি এলাকায় এক বা একাধিক মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়।

আর্সেনিক:

ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতিতে বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্য বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল বিশেষ করে কুষ্টিয়া, যশাের, ফরিদপুর, চাঁদপুর, নােয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলার অধিবাসীরা ভয়াবহ আর্সেনিক দূষণের শিকার।

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রতিকার:

প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পূর্ণভাবেই প্রাকৃতিক। এ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া সম্ভব নয়। তবে গণসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে এবং পরিকল্পতভাবে দুর্যোগ মােকাবিলা করে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানাে যায়। যেমন-

১. জলােচ্ছ্বাস ও বন্যা সমস্যা মােকাবিলার জন্য উপকূলীয় অঞলে প্রচুর পরিমাণে বনায়ন ও নদীর পানি বহন ক্ষমতা বাড়ানাের জন্য নদী খনন করা যেতে পারে।

২. ঘূর্ণিঝড় ও জলােচ্ছাস মােকাবিলায় আবহাওয়া পূর্বাভাসের মাধ্যমে জনগণকে সতর্ক করতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চল থেকে দুত লােকজনকে সরিয়ে নিতে হবে নিরাপদ স্থানে। প্রয়ােজনে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়াতে হবে।

৩. ভূমিকম্প হলে তাৎক্ষণিকভাবে কোথায় আশ্রয় নিতে হবে সে সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে হবে। ধ্বংসযজ্ঞ হলে।দুত উদ্ধার তৎপরতা চালানাের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লােকবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করতে হবে ।

উপসংহার:

যেকোনাে ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ সাময়িকভাবে স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে স্তব্ধ করে দেয় । অর্থনীতি হয়। নানাভাবে বিপর্যস্ত। ভূপ্রাকৃতিক বিন্যাস অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল। তাই সব ধরনের দুর্যোগ মােকাবিলার জন্য সরকারিভাবে বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বেসরকারি উদ্যোগকেও দিতে হবে। প্রয়ােজনীয় পৃষ্ঠপােষকতা। স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে তুলতে হবে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। যেহেতু প্রাকৃতিক দুর্যোগ একটি জাতীয় দুর্যোগ। তাই দেশ ও দশের স্বার্থে দুর্যোগ মােকাবিলায় সকলকে দৃঢ়চিত্তে সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই দুর্যোগ পরবর্তী সমস্যা মােকাবিলা ও ক্ষয়ক্ষতি এড়ানাে সম্ভব।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *