আধুনিক জীবনে বিজ্ঞাপন রচনা | JSC, SSC |

আধুনিক জীবনে বিজ্ঞাপন রচনার সংকেত

  • ভূমিকা
  • বিজ্ঞাপনের মাধ্যম
  • বিজ্ঞাপনের ধরন
  • বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান
  • জনজীবনে বিজ্ঞাপনের প্রভাব
  • উপসংহার

আধুনিক জীবনে বিজ্ঞাপন রচনা

ভূমিকা:

আধুনিক জীবনে অভ্যস্ত মানুষের দিনযাপনে প্রয়ােজনীয় ও বিলাসবহুল নিত্য নতুন জিনিসের যেন কোনাে শেষ নেই।আর এসব পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের একটি জনপ্রিয় ধারা বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্য, সেবা প্রভৃতিসম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করা হয়। মূলত পণ্য বা সেবা গ্রহণে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করাই বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য।

বিজ্ঞাপনের মাধ্যম:

বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মানুষকে দৃষ্টি আকর্ষণ ও আকৃষ্ট করার রীতি সুপ্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি, শিক্ষাবিস্তার ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারের সাথে সাথে বিজ্ঞাপনের ধরন, প্রচারমাধ্যম প্রভৃতিতে এসেছে।বৈচিত্র্য। পথেঘাটে, হাটবাজারে, যানবাহনে খালি গলায় কিংবা চোঙা ফুকে পণ্যের গুণাগুণ প্রচার বিজ্ঞাপনের আদি রূপ। এ ধারাঅবশ্য এখনও প্রচলিত রয়েছে। মাইক্রোফোন এবং রেকর্ড করা ক্যাসেট বাজিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচারও চলে হরহামেশা। এ জাতীয়বিজ্ঞাপন আধুনিক বিজ্ঞাপনের তুলনায় সেকেলে কথা চটুল, উপস্থাপন রীতি সুরেলা এ ধরনের বিজ্ঞাপনও কম আকর্ষণীয় নয়।দেয়াল লিখন, পােস্টার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল ইত্যাদির মাধ্যমেও বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়ে থাকে। রঙের বৈচিত্র্যে, ভাষারবিন্যাসে বিজ্ঞাপনগুলাে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যাতে করে চলার পথে পথিকের চোখ এড়িয়ে না যায়।

বিজ্ঞাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম পত্রিকা। দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক সব ধরনের পত্রিকা, সাময়িক পত্র প্রভৃতিতেবিরাট অংশ জুড়ে থাকে বিজ্ঞাপন। বিশেষ করে কিছু কিছু দৈনিকে খবরকে ছাপিয়ে যায় বিজ্ঞাপন। রঙিন বিজ্ঞাপনগুলাে এতদৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয় যে, খবরের কাগজ মেলে ধরলে প্রথমেই চোখে পড়ে বিজ্ঞাপন।

বিজ্ঞাপন প্রচারের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলাে বেতার ও টেলিভিশন। বেতার শুধুই শ্রুতিমাধ্যম আর টেলিভিশন দৃশ্য-শ্রাব্য । সেদিক থেকে টেলিভিশন বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যম হিসেবে অনেক বেশি জনপ্রিয় ।

বিজ্ঞাপনের ধরন:

সম্ভাব্য ক্রেতা ও ব্যবহারকারীদের কাছে বিজ্ঞাপন উপস্থাপন করা হয় নানাভাবে আকর্ষণীয় করে।গ্রাহককে উদ্বুদ্ধ ও প্ররােচিত করাই বিজ্ঞাপনের লক্ষ্য। পণ্যের পাশাপাশি অসংখ্য সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়।গণমাধ্যমগুলােতে। শিক্ষাবিস্তার, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, বৃক্ষরােপণসহ নানাবিধ সামাজিক কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধকরণ, মাদকবিরােধীআন্দোলন, শিশুদের স্বাস্থ্য সচেতনতা প্রভৃতি কার্যক্রমকে সফল করতে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। পৃথিবীর অনেক দেশেইনির্বাচনে অংশগ্রহণের সময় রাজনৈতিক দলগুলাে তাদের নিজস্ব প্রচারণার কাজ চালায় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে। আবার কোনােকোনাে দেশে রাস্তার ধারের বিলবাের্ডগুলােতে বিজ্ঞাপনের রীতিতে প্রচার করা হয় রাস্তায় চলাচলের নিয়মাবলি। চলচ্চিত্র,ক্যাসেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আর মােবাইল ফোন কোম্পানিগুলাের বিজ্ঞাপনের দৌড় আরও বেশি প্রতিযােগিতামূলক। কে কতবেশি আকর্ষণীয় ও অভিনব উপায়ে বিজ্ঞাপন তৈরি ও প্রচার করতে পারবে তার জোর লড়াই চলছে প্রতিনিয়ত। তাই চলচ্চিত্রমুক্তি পাবার আগেই সেই চলচ্চিত্রের নায়িকা হারিয়ে যাওয়ার মিথ্যে বিজ্ঞাপন প্রচার করে সেই চলচ্চিত্রের কাটতি বাড়িয়েতােলার ঘটনাও ঘটছে বিশ্বের অনেক দেশে । জনসচেতনতামূলক বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি পণ্যসামগ্রীর বিজ্ঞাপনেও মডেল’হচ্ছেন দেশের জনপ্রিয় ও তারকাখ্যাতি সম্পন্নরা। মােবাইল ফোন ও কোমলপানীয়ের বিজ্ঞাপনে তারকাদের উপস্থিতি বেশিদেখা যায়। এ ধরনের বহুজাতিক কোম্পানিগুলাে তাদের পণ্যের বিক্রি বাড়াতে যে প্রতিযােগিতায় নামে বিজ্ঞাপন তার অন্যতমপ্রধান অস্ত্র।

পত্রপত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হয় বিশেষ কিছু বিজ্ঞাপন । যেমন— কর্মখালি, পাত্রপাত্রী চাই, নিখোঁজ সংবাদ, সাহায্য চাইপ্রভৃতি। এছাড়া সিনেমা, থিয়েটার, মেলা, বিভিন্ন প্রদর্শনী, লটারি, শেয়ার বাজার, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদিরবিজ্ঞাপন তাে রয়েছেই।

বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান:

বিজ্ঞাপন ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিংবা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে প্রচারিত হয়ে থাকে। যে মাধ্যমেই বিজ্ঞাপনপ্রচারিত হােক না কেন এর ব্যয়ভার বহন করতে হয় বিজ্ঞাপনদাতাকে। বিজ্ঞাপনের কথা সাজানাে, ছবি তৈরি, দৃশ্য গ্রহণ,উপস্থাপনা, প্রচার, প্রকাশনা সবই ব্যক্তিগতভাবে অথবা বিজ্ঞাপনী সংস্থার মাধ্যমে সম্পাদিত হতে হয়। বিজ্ঞাপন তৈরিতেপ্রচুর জনবলের প্রয়ােজন হয়। তাই বর্তমানে এটি একটি জনপ্রিয় ও সুসংগঠিত পেশা। তাই বিজ্ঞাপন তৈরির জন্য গড়েউঠেছে ছােট-বড় নানা বিজ্ঞাপনী সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে অনেক লােকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। আরবিজ্ঞাপন প্রচারমাধ্যমগুলােরও মােটা অঙ্কের অর্থ আসে প্রচারিত বিজ্ঞাপন তৈরি থেকে।

জনজীবনে বিজ্ঞাপনের প্রভাব:

মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞাপন নানাভাবে প্রভাব ফেলে। বিজ্ঞাপন মানুষের ভালােলাগা ওরুচির পরিবর্তন ঘটায়। বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে মানুষ নিজের পছন্দের জিনিসটি নির্বাচন করে নিতে পারে।বাজারে কোনাে নতুন সামগ্রী এলে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেই তা মানুষ জানতে পারে । আধুনিক জীবনে অভ্যস্ত সচ্ছল মানুষ চায়তার ব্যবহার্য জিনিসগুলাে হােক ভালাে মানের। বিজ্ঞাপন সেই সুযােগটিই নেয় । সব বিজ্ঞাপনী সংস্থাই তাদের তৈরিবিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পণ্যটির শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে চায় ।

বাংলাদেশে যেসব বিজ্ঞাপন তৈরি ও প্রচারিত হয় তার সবগুলাে দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে প্রতিনিধিত্ব করে না।পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির আদলে নির্মিত এ ধরনের বিজ্ঞাপন তরুণ প্রজন্মের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। বিজ্ঞাপনে রুচিবর্জিতএবং অপ্রয়ােজনীয়ভাবে পুরুষ কিংবা নারীকে উপস্থাপনের বিষয়টি কাম্য নয়। বিজ্ঞাপনের চাকচিক্যে বিদেশি কোম্পানিরপণ্যের সাথে বিক্রির প্রতিযােগিতায় পিছিয়ে পড়ে দেশি কোম্পানিগুলাে । বিশ্বজুড়ে পণ্য বিক্রির তীব্র প্রতিযােগিতায় পিছিয়েপড়ে অনুন্নত দেশ, মার খায় তাদের অর্থনীতি। অন্যদিকে, উন্নত দেশগুলাে কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নেয়।বাংলাদেশে বর্তমানে বিজ্ঞাপন শিল্পের যে প্রসার ঘটেছে তার সাথে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতারওযােগসূত্র রয়েছে। দেশের সব বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানই তীব্র প্রতিযােগিতার সম্মুখীন। বিজ্ঞাপন বর্তমানে শিল্পের একটি ধারাহিসেবে স্থান করে নিয়েছে।

উপসংহার:

শিল্প ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বহু লােকের জীবিকা নির্বাহের উপায় বিজ্ঞাপন। বাংলাদেশে বিজ্ঞাপন তৈরিরনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। বিজ্ঞাপন তৈরির সময় সংশ্লিষ্টদের তা অনুসরণ করতে হবে। কেননা বিজ্ঞাপন নির্মাতা থেকে শুরুকরে দর্শক শ্রোতা, বিজ্ঞাপনদাতা সকলেরই সমাজের প্রতি দায়িত্ববােধ রয়েছে। তাই সামাজিক নিয়মাচার ও নৈতিকমূল্যবােধকে গুরুত্ব দিয়েই বিজ্ঞাপন তৈরি করতে হবে। বিজ্ঞাপন হােক রুচিসম্মত, সুবিবেচিত দৃশ্যপট, সর্বোপরি দেশীয়সংস্কৃতি অনুযায়ী এটিই আধুনিক মানুষের কাম্য।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *