Sabbir8986 / March 7, 2021

রচনা লিখন

Spread the love

১। ডেঙ্গ জ্বর

ভূমিকা : ডেঙ্গু জ্বর বর্তমানে বহুল আলােচিত বিষয়গুলাের অন্যতম। বাংলাদেশ বা বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ডেঙ্গু জ্বরেরআবির্ভাব বেশ পুরােনাে হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলােতে এর নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তার এবং প্রচন্ডতা একে নতুন করে মনােযােগের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ, বিত্তশালী বা দরিদ্র কারােই যেন রেহাই নেই এই মরণঘাতি রােগ থেকে। সেজন্যই ডেঙ্গু জ্বর সম্পর্কিত আলােচনা আজ খুব বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

ডেঙ্গু জ্বর :

ডেঙ্গু’ একটি স্প্যানিশ শব্দ। এর অর্থ হাড়ভাঙা জ্বর। এ জ্বরের উৎপত্তি ডেঙ্গ ভাইরাস থেকে। ডেঙ্গমূলত মশাবাহিত একসূত্ৰক আরএনএ (RNA) ভাইরাস। কয়েক প্রজাতির স্ত্রী এডিস মশা এই ভাইরাস বহন করে।সেগুলাের মধ্যে এডিস ইজিপ্টাই অন্যতম। তবে এই মশা শুধু ডেঙ্গু জ্বরের ভাইরাসই নয়, ইয়েলাে ফিভার ভাইরাস, জিকাভাইরাস এবং চিকুনগুনিয়া ভাইরাসেরও বাহক।

ডেঙ্গু জ্বরের ইতিহাস :

ডেঙ্গু জ্বরের ইতিহাস বেশ পুরােনাে। ২৬৫-৪২০ খ্রিস্টাব্দের চীনা মেডিক্যালএনসাইক্লোপিডিয়ায় উড়ন্ত পতঙ্গের সাথে সম্পর্কযুক্ত যে জলীয় বিষ’ এর কথা বলা হয় তা এই ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহীমশাকেই নির্দেশ করে। তবে ডেঙ্গু মহামারির সবচেয়ে নির্ভরযােগ্য বিবরণ প্রথম পাওয়া যায় ১৭৭৯ ও ১৭৮০ সালে, যখনএশিয়া, আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকা এই মহামারির কবলে পড়ে। এরপর ১৮২৮ সালের দিকে ডেঙ্গু শব্দটির প্রচলন শুরুহয়। ১৯০৬ সালে এডিস ইজিপ্টাই মশার পরিবাহিতা সম্পর্কে সবাই নিশ্চিত হয়। ১৯০৭ সালে ভাইরাসঘটিত রােগেরমধ্যে ডেঙ্গু হয়ে উঠে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংক্রামক রােগ। পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ডেঙ্গুর লক্ষণীয়বিস্তার লক্ষ করা যায়। ১৯৭০ সালে আমেরিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এর ব্যাপক প্রাদুর্ভাবকে শিশু মৃত্যুর অন্যতমকারণ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।

ডেঙ্গু জ্বরের প্রকারভেদ :

ডেঙ্গু জ্বর সাধারণত দুধরনের হয়ে থাকে। যথা: ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বর ও হেমােরেজিকডেঙ্গু জ্বর। হেমােরেজিক ডেঙ্গু জ্বরকে আবার চারটি ধাপে বর্ণনা করা হয়েছে- গ্রেড ওয়ান, গ্রেড টু, গ্রেড থ্রি ও গ্রেডফোর। ডেঙ্গু ভাইরাসের আবার চারটি সেরােটাইপ রয়েছে। এগুলাে হলো- DEN-1, DEN-2, DEN-3 এবং DEN-4।তবে DEN-2 এবং DEN-3 সবচেয়ে মারাত্মক সেরােটাইপ।

ডেঙ্গু জ্বরের কারণ:

এডিস ইজিপ্টাই প্রজাতির ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী স্ত্রী মশা কোনাে ব্যক্তিকে কামড়ালে সেইব্যক্তি ৪ থেকে ৫ দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। আবার আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনাে জীবাণুবিহীন মশা কামড়ালে,সে মশাটিও ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। রােগীকে দংশনের দুই সপ্তাহ পর মশা সৎক্ৰমণক্ষম হয়ে উঠে এবংগােটা জীবনই সংক্রমণশীল থাকে। এভাবেই মশার মাধ্যমে একজন থেকে অন্যজনে এ রােগ ছড়িয়ে পড়ে।

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ :

যেকোনাে ভাইরাসজনিত জ্বরের মতাে ডেঙ্গতেও জ্বরের সাথে মাথাব্যথা, কাশি, গলাব্যথা, গাব্যথা, ক্ষুধামান্দ্য ও বমি ভাব থাকে। এছাড়াও হাড়ে ব্যথা অনুভূত হয়। এই জ্বরে মাথাব্যথার তীব্রতা চোখের পিছনে বেশিথাকে। চোখ ঘুরালে বা আই মুভমেন্টে ব্যথা আরও বেড়ে যায়। ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গতে উপযুক্ত সবগুলাে উপসর্গ দেখা দিতেপারে। তবে হেমােরেজিক ডেঙ্গতে গ্রেড ওয়ানে কোনাে রক্তক্ষরণ হয় না। গ্রেড টুতে চোখ, নাক ও চামড়ার নিচে রক্তক্ষরণহয়ে থাকে। এক্ষেত্রে বমি ও পেট ব্যথা ক্রমেই বাড়তে থাকে। গ্রেড থ্রি ও গ্রেড ফোরকে একত্রে শক সিনড্রোম বলে। গ্রেডথ্রিতে পালস বা নাড়ির স্পন্দন ক্ষীণ হয়ে আসে। গ্রেড ফোরে নাড়ির স্পন্দন ও রক্তচাপ কোনােটিই পাওয়া যায় না। শকসিনড্রোম হয়ে গেলে দেহের কোনাে অঙ্গে ঠিকমতাে রক্ত সরবরাহ না হওয়ায় অরগান ফেইল করে। একে বলে মান্টিঅরগান ফেইলর।

ডেঙ্গু জ্বরের বিভিন্ন পর্যায় :

ডেঙ্গু জ্বর সাধারণত তিনটি পর্যায়ে অতিবাহিত হয়। প্রথমত, জ্বর চলাকালীন বাকেব্রাইল স্টেজ। এ সময় বিভিন্ন মাত্রায় তাপমাত্রা বাড়ে। সাধারণত ছয় দিনের মধ্যে জ্বর কমে যায়। জ্বরের পরেরসময়টাকে বলে এফেব্রাইল ফেজ বা জ্বর প্রবর্তী পর্যায়। এটিকে ক্রিটিক্যাল ফেজও বলে। কারণ, ডেঙ্কর জটিলতাগুলাে এসময়ই শুরু হয়। সিভিয়ার ডেঙ্গু এফেব্রাইল বা ক্রিটিক্যাল পিরিয়ডে, অর্থাৎ রােগের ষষ্ঠ, সপ্তম বা অষ্টম দিনে দেখা দেয়।এর লক্ষণগুলাে হলাে দ্রুত রক্তচাপ কমে যাওয়া, রক্তবমি, কালাে পায়খানা, প্রস্রাবের সঙ্গে রক্তপাত ও ত্বকের নিচে রক্ত।জমা। এর সঙ্গে প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, বুকে-পেটে পানি জমা ছাড়াও ফুসফুসে পানি জমে শ্বাসকষ্ট হতে পারে।রক্তচাপ কমে যাওয়ায় রােগী প্রলাপ বকে, অস্থির আচরণ করে। কখনাে কখনাে মানি অরগান ফেইল করে। রােগের তৃতীয়পর্যায়ে জ্বর থাকে না। কিন্তু প্রচণ্ড দুর্বলতা গ্রাস করতে পারে। একে বলে ক্রোনিক ফ্যাটিগ সিনড্রোম।

বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বর :

বাংলাদেশে ২০০০ সালে প্রথম এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গ রােগীর সন্ধান পাওয়া যায়। এদেশের।চিকিৎসকদের কাছে অপরিচিত এ রােগটি সে বছর প্রায় শতাধিক লােকের প্রাণ কেড়ে নেয়। পরের বছরগুলােতে ডেঙ্গুআক্রান্ত রােগীর সংখ্যা কমলেও ২০১৬ সালের পর আবার তা উল্লেখযােগ্য হারে বাড়তে থাকে। ২০১৮ সালে এ রােগেবাংলাদেশে বেশকিছু প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ২০১৯ সালে এর তীব্রতা অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। লক্ষাধিক মানুষ।আক্রান্ত হয়। সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা প্রায় দেড়শত। সারা দেশে ডেঙ্গর প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা গেলেও সর্বাধিক আক্রান্তঅঞ্চল ঢাকা বিভাগ। সরকার, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট সকলের আপ্রাণ প্রচেষ্টায় ডেঙ্গ পরিস্থিতিসামলে উঠে।

ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা :

ডেঙ্গু জ্বরের সুনির্দিষ্ট কোনাে চিকিৎসা বা পেটেন্টকৃত কোনাে ওষুধ নেই। লক্ষণ বা উপসর্গদেখেই চিকিৎসা করতে হয়। ডেঙ্গু রােগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রথমেই প্রয়ােজন রােগ সনাক্তকরণ। জ্বরের সময়, বিশেষকরে দ্বিতীয় দিন থেকে চতুর্থ দিনের মধ্যে রক্ত পরীক্ষায় ডেঙ্গ এনএস-১ এন্টিজেন পজেটিভ হলে রােগ নিশ্চিতভাবেপ্রমাণিত হয়। ক্লাসিক্যাল ও গ্রেড-১ হেমােরেজিক ডেঙ্গর ক্ষেত্রে বাড়িতেই চিকিৎসা সম্ভব। সাধারণত এ ধরনের রােগী ৫থেকে ১০ দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে যায়। এক্ষেত্রে রােগীকে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বিশ্রামে থাকতে হবে।যথেষ্ট পরিমাণ পানি, শরবত, ডাবের পানি ও অন্যান্য তরল জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে। খাবার গ্রহণ করতে না পারলেশিরাপথে স্যালাইন দেওয়া যেতে পারে। জ্বর কমানাের জন্য শুধু প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধই যথেষ্ট। ব্যথা কমানাের জন্যএসপিরিন বা ডাইক্লোফেনাক জাতীয় কোনাে প্রকার ওষুধ খাওয়া যাবে না। গ্রেড-২, ৩ ও ৪ হেমােরেজিক ফিভারেররােগীকে দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে। এ ধরনের রােগীকে ঠিকমতাে ফুইড দিতে পারাটাই মূল চিকিৎসা। রােগী।শকে চলে গেলে নিবিড় পরিচর্যা বা আইসিইউ লাগবে।

ডেঙ্গ রােধে করণীয় :

যেকোনাে রােগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরােধই উত্তম। ডেঙ্গ জ্বর প্রতিরােধের মূলমন্ত্রই হলাে-এডিস মশার বিস্তার রােধ করা। কোনােভাবেই যেন মশা কামড়াতে না পারে তার ব্যবস্থা করা। তাই ডেঙ্গ প্রতিরােধে প্রথমএবং প্রধান করণীয় হলাে মশার ডিম পাড়ার উপযােগী স্থানগুলাে পরিষ্কার রাখা, মশা নিধনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। টব,ফুলদানি, অব্যবহৃত কৌটা, ডাবের খােসা, পরিত্যক্ত টায়ার, নির্মাণাধীন ভবনের চৌবাচ্চা ইত্যাদি স্থানে কোনাে ক্রমেই পানিজমতে দেওয়া যাবে না। ঘরে, বারান্দায় ও টয়লেটে কোনােক্রমেই পাঁচ দিনের বেশি পানি জমিয়ে রাখা যাবে না।একুরিয়াম, ফ্রিজ বা এয়ার কন্ডিশনারের নিচেও যেন পানি জমে না থাকে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এডিস মশাসাধারণত সকাল-সন্ধ্যায় কামড়ায়। তবে দিনের অন্য সময়ও কামড়াতে পারে। তাই দিনের বেলা শরীর ভালোভাবেকাপড়ে ঢেকে রাখতে হবে। প্রয়ােজনে মসকুইটো রিপেলেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়াও ঘরের জানালায় নেটব্যবহার করা যেতে পারে। দিনে ঘুমালে অবশ্যই মশারি টাঙিয়ে ঘুমাতে হবে। শিশুদের ফুলপ্যান্ট ও ফুলহাতার জামা গায়েস্কুলে পাঠাতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে সর্বদা মশারির ভেতর রাখতে হবে। এছাড়াও মশা নিধনের জন্য স্প্রে, কয়েল,ম্যাট ইত্যাদি ব্যবহার করতে হবে।

উপসংহার :

আমাদের অসচেতনতা এবং সুষ্ঠু ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণে ব্যর্থতার কারণে ডেঙ্গু জ্বর ভয়াবহ রূপপরিগ্রহ করেছে। এর মােকাবেলায় সর্বপ্রথম জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে বিশেষজ্ঞগবেষকবৃন্দকে সম্পৃক্ত করে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের উপায় এবং ডেঙ্গু জ্বরের প্রতিষেধক আবিষ্কারের উপর গুরুত্ব দিতে হবে।সর্বোপরি, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহকে সততা, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে ডেঙ্গ মােকাবেলায় কাজ করতে হবে।তাহলেই মানুষ এ সর্বনাশা রােগ থেকে মুক্তি পাবে।

২। বিজ্ঞানের জয়যাত্রা/ বিজ্ঞান ও আধুনিক জীবন/ দৈনন্দিন ও প্রাত্যহিক জীবনে বিজ্ঞান/ মানব কল্যাণ বিজ্ঞান

ভূমিকা :

বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের যুগ। বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে অভাবনীয় গতি, সভ্যতার অগ্রযাত্রাকে করেছে দুততরও বহুমাত্রিক। বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারের জাদুকরী স্পর্শে মানবজীবনের সর্বত্র এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সর্বক্ষেত্রেআজ পরিলক্ষিত হচ্ছে বিজ্ঞানের অব্যাহত জয়যাত্রা। মানব কল্যাণে বিজ্ঞানের অবদান যে কত ব্যাপক তা প্রতিদিনের বিচিত্রঅভিজ্ঞতা থেকে অনুভব করা যায়। বিজ্ঞানের কল্যাণে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এসেছে সুখ, শান্তি ওসমৃদ্ধি।

‘বিজ্ঞান’ শব্দটির অর্থ :

‘বিজ্ঞান’ শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘Science’, যা ল্যাটিন শব্দ ‘Scio’ থেকে এসেছে।এর অর্থ জানা বা শিক্ষা লাভ করা। আভিধানিক অর্থে বিশেষ জ্ঞানই হলাে বিজ্ঞান। মনীষী স্পেন্সারের মতে, বিজ্ঞান হলােসুশৃঙ্খল ও সুসংবদ্ধ জ্ঞান। অনুসন্ধিৎসু মানুষের বস্তুজগৎ সম্পর্কে ধারণা এবং বিচিত্র কৌশলে তার উপর আধিপত্যবিস্তারের প্রচেষ্টা থেকেই উদ্ভব ঘটেছে বিজ্ঞানের। এটি হয়েছে মানুষেরই প্রয়ােজনে, তার প্রভাব মেটানোর তাড়না থেকে।এভাবে সভ্যতার বিকাশের সহায়ক শক্তি হয়ে উঠার মাধ্যমে বিজ্ঞান ক্রমেই মানুষের জীবনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে।

জীবন ও বিজ্ঞান :

প্রয়ােজনই উদ্ভাবনের প্রেরণা জোগায়। মানুষের অভাববােধ থেকে বিশেষ জ্ঞান হিসেবে বিজ্ঞানেরউৎপত্তি। তাই জীবনের সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্ক যেমন পুরােনাে, তেমনি নিবিড়। মানুষের অনুসন্ধিৎসা, জিজ্ঞাসা ও আগ্রহথেকে বিজ্ঞানের বিচিত্র বিকাশ। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সংস্কার, বিশ্বাস ও প্রবণতা বদলে যাচ্ছে। আজবিজ্ঞানের দৃষ্টি দিয়ে আমরা সব কিছু যাচাই করে দেখতে চাই, প্রমাণ পেতে চাই অনেক কিছুর। এ জিজ্ঞাসা ও তর্কেরপ্রবৃত্তি আমাদের বৈজ্ঞানিক পরিবেশের ফসল। সুতরাং বিজ্ঞান সম্পর্কে আমরা যতই অজ্ঞ হই না কেন, বিজ্ঞানের প্রভাবআমাদের জীবনের মর্মমূলে প্রবেশ করেছে।

বিজ্ঞানের গুরুত্ব :

মানবসমাজের যে দিকেই দৃষ্টিপাত করা যায়, শুধু বিজ্ঞানের মহিমাই স্পষ্ট হয়ে উঠে। বিজ্ঞানেরবলে মানুষ জল, স্থল, অন্তরীক্ষ জয় করেছে; সংকট নিরসন ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিধানের বন্ধু অভাবনীয় কৌশল আবিষ্কারকরেছে। জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিজ্ঞানের গৌরবময় অবদান বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে আছে এবং মানবজীবনের উপর এর সুগভীরপ্রভাব পড়ছে। মানবজীবনকে অফুরন্ত সুখে পরিপূর্ণ করে তােলার সাধনায় সদা নিয়ােজিত বিজ্ঞান তার বিস্ময়কর আবিষ্কারচালিয়ে যাচ্ছে অবিরত। এ সাধনা যেমন ক্রমাগতভাবে চলছে, তেমনি তার কল্যাণকর সুফলও নিবেদিত হচ্ছে মানুষের| সেবায়। বিজ্ঞান আজ মৃত্যুকে জয় করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানের কর্মসাধনার পরিণতি হচ্ছে আধুনিক সভ্যতা।বিজ্ঞানের বলে বলীয়ান হয়ে মানুষ আজ আকাশ ও পাতালকে সাজিয়েছে নিজের পরিকল্পনা অনুসারে। তারা জীবনকে জয়করে মৃত্যুকে পদানত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এভাবে নব নব কৌশল ও প্রকরণ প্রবর্তনের মাধ্যমে এ জগতে বিজ্ঞানএনেছে যুগান্তর; দূরকে করেছে আপন আর জীবনকে করেছে সহজ।

চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞান

চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাহায্যে আজ মানুষ অকাল মৃত্যুর কবল থেকে রক্ষা পেয়েছে। কলেরা,বসন্ত, যক্ষ্মা ইত্যাদি মরণব্যাধির সু-চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যাণে আবিষ্কৃত হয়েছে। উন্নতমানের ওষুধ, অস্ত্রোপচার ব্যবস্থা,এক্সরে, আল্ট্রাভায়ােলেটরে, অণুবীক্ষণ যন্ত্র ইত্যাদি আবিষ্কারের ফলে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এসেছে এক আমূল পরিবর্তন। উন্নতচিকিৎসা সেবার ফলে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস পেয়েছে, বৃদ্ধি পেয়েছে মানুষের গড় আয়ু। কম্পিউটারকেন্দ্রিক টেলিমেডিসিন পদ্ধতিতে পৃথিবীর যে কোনাে প্রান্ত থেকে যে কোনাে ব্যক্তি উন্নত দেশের ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করে সুস্থ।থাকতে পারছে। আবিষ্কৃত হয়েছে কৃত্রিম হৃদযন্ত্র ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। অবলীলায় করা হচ্ছে ওপেন হার্ট সার্জারি, শরীর না কেটেবাইপাস সার্জারি, প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে একজনের অঙ্গ অন্যজনের শরীরে। বিজ্ঞানের কল্যাণে মানুষের জেনেটিক স্বরূপ।উদ্ঘাটনের দ্বারপ্রান্তে পৌছে গেছে বিজ্ঞানীরা, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে বয়ে আনবে যুগান্তকারী বিপ্লব।

কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞান :

আধুনিক বিজ্ঞান কৃষিক্ষেত্রেও অশেষ উন্নতি সাধন করেছে। প্রাচীন ভোতা লাঙলের পরিবর্তেআজ ব্যবহৃত হচ্ছে উন্নতমানের কলের লাঙল ও ট্রাক্টর। ফসলের উৎপাদন ও মান বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিকরাসায়নিক সার। কীটপতঙ্গের আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে উন্নতমানের কীটনাশক। প্রকৃতির দয়ার উপর।নির্ভরশীল না হয়ে গভীর ও অগভীর নলকূপের সাহায্যে পানি সেচের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। গবেষণার মাধ্যমে সরবরাহ করাহচ্ছে উন্নতমানের বীজ। তা ছাড়া থরা, শীত ও লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন কৃষি উৎপাদনে এক নীরব।বিপ্লবের সূত্রপাত ঘটিয়েছে। ফলে ধান, গমসহ সকল প্রকার খাদ্যশস্যের উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। উন্নত জাতেরমাছ, গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগি উদ্ভাবনের ফলে এসবের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে অভাবনীয় হারে। এভাবে বিজ্ঞান আজউর্বরতা দিয়ে ক্ষয়িষ্ণু বসুধাকে শস্যবতী করে ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে।

যােগাযােগ ক্ষেত্রে বিজ্ঞান :

আধুনিক যােগাযােগ ব্যবস্থার পুরােটাই বিজ্ঞানের উপর নির্ভরশীল। বুলেট ট্রেন, আধুনিককনকর্ড বিমান, মাটির তলায় ধাবমান টিউব রেল সবই বিজ্ঞানের অবদান। বিজ্ঞানের অবদানেই আজ আমরা এরােপ্লেনে।চড়ে শূন্যাকাশে শত শত মাইল পাড়ি দিচ্ছি, যা একসময় ছিল অচিন্তনীয়। তাছাড়া এখন আমরা হাতের মােবাইল টিপেমুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর যে কোনাে প্রান্তে অবস্থিত ব্যক্তির সাথে কথা বলতে পারি, ছবি বা ভিডিও আদান-প্রদান করতেপারি। সারা বিশ্বের প্রতি মুহূর্তের সংবাদও এখন আমরা মােবাইলে পাই। যা বিজ্ঞানেরই আশীর্বাদ।

শিল্পক্ষেত্রে বিজ্ঞান :

একদা মানুষ জীবনের প্রয়ােজনীয় উপকরণ সংগ্রহ ও উৎপাদনে কায়িক শ্রমের উপর সম্পূর্ণনির্ভরশীল ছিল। এতে মানুষের কাজ করতে অধিক সময় ও শ্রমের প্রয়ােজন হতাে। কিন্তু এর তুলনায় কাজ হতাে কম।বিজ্ঞানের কল্যাণে শিল্পবিপ্লবের ফলে কলকারখানা স্থাপিত হয়েছে, বেড়েছে উৎপাদন, লাঘব হয়েছে মানুষের কায়িক শ্রম।উৎপাদনের সর্বক্ষেত্রে আজ বিরাজ করছে যন্ত্রের আধিপত্য। ফলে মানুষ পেয়েছে স্বস্তি ও আয়াসপূর্ণ জীবন। শত মানুষেরআন্তরিক প্রচেষ্টায় যা আগে করার চেষ্টা করা হতাে এখন তা যন্ত্রের বােতাম টিপে মুহূর্তের মধ্যে সম্পন্ন করা যাচ্ছে। অনেকক্ষেত্রে মানুষের কর্মের স্থানটিও দখল করে নিচ্ছে কর্মী রােবট।

প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বিজ্ঞান :

বিজ্ঞানের কল্যাণস্পর্শে প্রকৃতির অনেক ধ্বংসাত্মক দিককে মানুষ কল্যাণকর দিকেপরিবর্তিত করতে সক্ষম হয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, নদীশাসন প্রভৃতি ক্ষেত্রে মানুষ আজ বিজ্ঞানের বদৌলতে অভূতপূর্বসাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। বায়ুশক্তিকে কাজে লাগিয়ে উইন্ডমিলের মাধ্যমে মানুষ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশিআরও অনেক কিছু করছে। মােটকথা, বিজ্ঞানের কল্যাণে একসময়ের ভয়ংকরী প্রকৃতি আজ শুভংকরী প্রেয়সীতে রূপান্তরিতহয়েছে।

দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান :

দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে স্বাচ্ছন্দ্য ও আরাম-আয়েশ। রেডিও,টেলিভিশন, সংবাদপত্র, বৈদ্যুতিক বাতি ও পাখা, টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ, বৈদ্যুতিক ইস্ত্রি, বৈদ্যুতিক হিটার ইত্যাদি।আবিষ্কারের ফলে আমাদের জীবনযাত্রা অত্যন্ত সহজ ও আরামদায়ক হয়ে উঠেছে। অফিস-আদালতে নিত্য ব্যবহৃত হচ্ছে।কম্পিউটার, ফটোস্ট্যাট মেশিন, টেলেক্স, ফ্যাক্স ইত্যাদি যন্ত্রপাতি। এমনিভাবে বিজ্ঞান মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কত রকমপ্রয়ােজন যে মেটাচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই।

বিজ্ঞানের ক্ষতিকর দিক :

বিজ্ঞান একদিকে যেমন মানুষের অশেষ কল্যাণ সাধন করে আসছে, অন্যদিকে তেমনিএনেছে বিভীষিকা। যন্ত্রের উপর নির্ভর করতে করতে মানুষের জীবনে এসেছে যন্ত্রনির্ভরতা, কর্মবিমুখতা। এটি অনেক।ক্ষেত্রে বেকার সমস্যা বাড়িয়ে তুলছে। ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট টেলিভিশনের মতাে আধুনিক প্রযুক্তির হাত ধরে অনেকক্ষেত্রে অনুপ্রবেশ ঘটছে বিজাতীয় অপসংস্কৃতির। এতে করে যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় ঘটছে। রাসায়নিক ও পারমাণবিকঅস্ত্রের ব্যবহার আজ মানব সভ্যতাকে ধ্বংসের মুখােমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। মিসাইল, বােমারু বিমান, ট্যাংক, সাবমেরিন ইত্যাদি আবিষ্কারের ফলে মানবজীবনে বিজ্ঞান অভিশাপে পরিণত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকার বােমাবর্ষণের পর জাপানের হিরােশিমা ও নাগাসাকি শহরের ধ্বংসযজ্ঞ তারই বাস্তব প্রমাণ।

উপসংহার :

বর্তমান সভ্যতার মূলে রয়েছে বিজ্ঞান। বিজ্ঞান আমাদের জীবনে এনেছে সুখ-সমৃদ্ধি এবং আমাদেরদৈনন্দিন জীবনকে করেছে গতিময়। মানব জাতি বর্তমানে প্রতি মুহূর্তে প্রতি পদক্ষেপে বিজ্ঞানের কাছে দায়বদ্ধ। বিজ্ঞানেরযথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হলে অদূর ভবিষ্যতে মানব সভ্যতা সমৃদ্ধি ও উন্নতির চরম শিখরে আরােহণ করবে।

কৃষিকাজে বিজ্ঞান/ কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অবদান

সূচনা : বর্তমান সভ্যতা বিজ্ঞানের আশীর্বাদপুষ্ট। বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারের জাদুকরী স্পর্শে মানবজীবনের সর্বত্র।এসেছে অভাবনীয় পরিবর্তন। সর্বক্ষেত্রে আজ পরিলক্ষিত হচ্ছে বিজ্ঞানের অব্যাহত জয়যাত্রা। সারা বিশ্বে বিজ্ঞানের অভিনবআবিষ্কারের প্রেক্ষিতে কৃষিক্ষেত্রেও এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

কৃষির অতীত কথা :

কৃষিই মানব সভ্যতার আদিমতম পেশা। তবে সুদূর অতীতে কৃষি ব্যবস্থা বলতে কিছুই ছিল না।জীবনধারণের তাগিদে আদিম অধিবাসীরা ফল-মূল সংগ্রহ করত এবং মাছ ও জন্তু-জানােয়ার শিকার করত। অনেক সময়বুনাে খাবার একেবারেই জুটত না। ফলে খাদ্যের সন্ধানে তারা একস্থান থেকে অন্যস্থানে ঘুরে বেড়াত। অবশেষে তারা পশুপালন ও বীজ বপন করতে শেখে। এরই ফলে খাদ্যদ্রব্য সুলভ হয় এবং জীবনযাত্রা হয়ে উঠে অপেক্ষাকৃত সহজ। তবে তখন।কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং চাষপদ্ধতি এতটা উন্নত ছিল না। সময়ের ব্যবধানে বিজ্ঞানের কল্যাণে কৃষিক্ষেত্রে নতুনপ্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে।

কৃষিতে বিজ্ঞানের অবদান:

বিজ্ঞান আজ উর্বরতা দিয়ে ক্ষয়িষ্ণু বসুধাকে শস্যবতী করে তুলছে। আদিম প্রযুক্তিরলাঙল, মই প্রভৃতি পরিহার করে বর্তমানে ট্রাক্টরের সাহায্যে অতি স্বল্প সময়ে, স্বল্প পরিশ্রমে অধিক পরিমাণ জমি চাষাবাদ করাহচ্ছে। বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণে বিজ্ঞানের সহায়তা নেয়া হচ্ছে। সার, সেচ ইত্যাদি ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানের ব্যবহার হচ্ছে।ভেটেরেনারি সায়েন্স বা পশুরােগ সংক্রান্ত বিজ্ঞান খামারের পশুদের মধ্যে রােগজনিত মৃত্যুহার বহুলাংশে হ্রাস করেছে।গাছপালা ও শস্যাদির মধ্যে নানা ধরনের পতঙ্গের উৎপাত, জীবাণু সংক্রমণ ও রােগ থেকে মুক্তির উপায় বের করেছেবিজ্ঞান। সর্বোপরি, বিভিন্ন কৃষিজ ফসল নিয়ে গবেষণা করে উন্নতমানের ও অধিক ফলনশীল বীজ আবিষ্কার করা হয়েছে।

আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি :

কৃষি খামারের আধুনিক যন্ত্রপাতির মধ্যে উল্লেখযােগ্য হলাে বৈদ্যুতিক দোহন যন্ত্র (মিস্কার),শীতলকারী যন্ত্র (কুলার), মাখন তােলার যন্ত্র (ক্রিম সেপারেটর), ভােজ্য দ্রব্য পেষক যন্ত্র (ফিড গ্রাইন্ডার), সার ছিটাবার যন্ত্র(ম্যানিউর স্প্রেডার) ইত্যাদি। সেলফ বাইন্ডার বা স্বয়ং বন্ধনকারী যন্ত্র ফসল কাটার সঙ্গে সঙ্গে শস্যের আঁটি বাঁধে। আর‘কম্বাইন হারভেস্টর’ যন্ত্রটি একই সাথে ফসল কাটে এবং ঝাড়াই-মাড়াই করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া,রাশিয়া প্রভৃতি দেশের খামারগুলােতে শক্তিশালী এক একটি ট্রাক্টর তিন-চারটি ফসল কাটার যন্ত্রকে একসঙ্গে কাজে লাগায়এবং ১০০ একর পর্যন্ত জমির ফসল একদিনে কাটতে পারে।

উন্নত বিশ্বের কৃষি ব্যবস্থাপনা :

বর্তমান বিশ্বের অনেক দেশই কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারকে কাজেলাগিয়ে সাফল্য লাভ করছে। এসব দেশে জমি কর্ষণ, বীজ বপন, সেচকাজ, ফসল কাটা, মাড়াই, বাছাই ইত্যাদি সব কাজইযন্ত্রের সাহায্যে সম্পাদন করা হয়। শীতপ্রধান দেশগুলাে গ্রিনহাউসের সাহায্যে গ্রীষ্মপ্রধান দেশের মতাে শাকসবজি ও ফলমূলউৎপাদন করছে। উন্নত বিশ্বে শুষ্ক মরুভূমির মতাে জায়গাতেও সেচ, সার ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় চাষাবাদ করে সােনার ফসল ফলানাে হচ্ছে। তারা কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সফল প্রয়ােগের মাধ্যমে আমাদের চেয়ে কম জমিতেঅধিক ফসল উৎপাদন করে খাদ্য সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হয়েছে। এশিয়ার অনেক দেশেই এখন কৃষিক্ষেত্রেগবেষণা আরও জোরদার করা হয়েছে। ফিলিপাইন, চীন, থাইল্যান্ডের মতাে দেশগুলাে তাদের কৃষি ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণপ্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তুলেছে। এ দেশগুলাে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে কাঙিক্ষত লক্ষ্য অর্জনেসক্ষম হচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব :

কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতি কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশেরঅর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন ঘটবে। কেননা, বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। এ দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনওকৃষিজীবী। বাংলাদেশের মােট জাতীয় আয়ের শতকরা ৫ ভাগ আসে কৃষি থেকে এবং রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ১৪ ভাগ আসে।কৃষিজাত দ্রব্য রপ্তানি থেকে। এ ছাড়া শিল্প-কারখানায় কাঁচামাল সরবরাহের উৎস হিসেবেও বাংলাদেশে কৃষি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের কৃষির বর্তমান অবস্থা :

বাংলাদেশ প্রকৃতির অপার স্নেহধন্য। এদেশের মাটি উর্বর এবং আবহাওয়াফসলবান্ধব। রয়েছে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক জলাধার। এ ছাড়া বাৎসরিক গড় বৃষ্টিপাতও চাষাবাদের পক্ষে অনুকূল। এরপরওবাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন সন্তোষজনক নয়। বাংলাদেশের কৃষকদের কাছে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা প্রয়ােগের মতাে জ্ঞান ওঅর্থ না থাকাই এর কারণ। ফলে জমি থেকে কাঙ্ক্ষিত ফসল আসছে না। তাই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্য পূরণেক্রমাগত ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে বাংলাদেশ।

আমাদের কৃষিকাজে বিজ্ঞান :

আমাদের দেশেও আজ কৃষিকাজে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। জমিকর্ষণের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে ট্রাক্টর। প্রকৃতির উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে পাম্প এবং গভীর ও অগভীর নলকূপের সাহায্যেপানি সেচ দেওয়া হচ্ছে। ক্ষেতের পােকা-মাকড় দমনের জন্যও সাহায্য নেয়া হচ্ছে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির। শস্য মাড়াই এবংভাঙানাের কাজ হচ্ছে কলের সাহায্যে। ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে উন্নতমানের রাসায়নিক সার। বীজ,সংরক্ষণ ব্যবস্থাও হচ্ছে বৈজ্ঞানিক প্রণালিতে। পূর্বের এক ফসলি জমিতে এখন বিজ্ঞানের কল্যাণে তিনবার ফসল ফলানােহচ্ছে। এ ছাড়া কৃষকদের মধ্যে বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। বেশি লাভবান হওয়ার আশায়এবং ঝুঁকিমুক্তভাবে চাষাবাদের লক্ষ্যে তারা বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারকে কৃষিক্ষেত্রে কাজে লাগাচ্ছে।

কৃষিকাজে বিজ্ঞানের সফল প্রয়ােগের উপায় :

কৃষিভিত্তিক দেশ হিসেবে কৃষির উন্নতির উপরই আমাদের দেশেরসামগ্রিক উন্নতি নির্ভরশীল। কিন্তু কৃষকদের অজ্ঞতার জন্য বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি এবং যন্ত্রপাতি আমরা ব্যাপকভাবে ব্যবহারকরতে পারছি না। তাই প্রথমেই দেশে শিক্ষার হার বাড়াতে হবে। কৃষকদের আধুনিক কৃষি পদ্ধতির সঙ্গে পরিচয় করাতেহবে। বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি কৃষি সংস্থা বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষির উপর গবেষণা চালাচ্ছে। দেশের কৃষকদেরএ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল জানিয়ে দেবার ব্যবস্থা করতে হবে এবং তারা যাতে বিজ্ঞানসন্মতভাবে কৃষিকাজ করতে পারেসেদিকে সক্রিয় দৃষ্টি দিতে হবে। কৃষিতে উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের গ্রামে গ্রামে গিয়ে কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তিরসাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। কৃষক সমপ্রদায়ের হাতে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি পৌছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষি সমবায় তৈরির উদ্যোগকে বেগবান করতে হবে। কেননা, কৃষিপণ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনের প্রতিটিধাপে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে কৃষি সমবায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়েব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

উপসংহার :

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষির উন্নতির উপরই নির্ভর করে আমাদের দেশের সার্বিক উন্নতি। তাইকৃষিকে উন্নত করার স্বার্থে কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সুজলা-সুফলা আমাদের এই দেশেরকৃষিতে বিজ্ঞানের জাদুর কাঠি ছোঁয়াতে পারলে খুলে যাবে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। কৃষির সার্বিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে গড়েউঠবে আমাদের এ সুখী সমৃদ্ধ বালাদেশ।

চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞান

ভূমিকা :

আধুনিক বিশ্বসভ্যতার ক্রমবিকাশে বিজ্ঞানের অবদান অপরিসীম। সেই আদিম যুগ থেকে শুরু করে বর্তমানযুগ পর্যন্ত জীবনের সকল ক্ষেত্রে অগ্রগতির জন্য বিজ্ঞান অমূল্য অবদান রেখে আসছে। চিকিৎসাক্ষেত্রেও বিজ্ঞান আবির্ভূতহয়েছে আশীর্বাদ হিসেবে। স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী না হলে, অঢেল ধন সম্পদে সুখী হওয়া যায় না।আর এ স্বাস্থ্য সংরক্ষণের জন্য প্রয়ােজন উন্নততর চিকিৎসা ব্যবস্থা। একসময় যেসব দুরারােগ্য ব্যাধি থেকে মানুষের মুক্তিরকোনাে উপায় ছিল না, বিজ্ঞান বর্তমানে সে সব ব্যাধি থেকে মুক্তির উপায় উদ্ভাবন করেছে।প্রাচীন চিকিৎসা ব্যবস্থা : প্রাচীনকালে রােগ নির্ণয়ের জন্য তেমন কোনাে ব্যবস্থা ছিল না। চিকিৎসাক্ষেত্রে তাইঅনুসরণ করা হতাে প্রথাগত পদ্ধতি। সে সময় মানুষ বিভিন্ন গাছ-গাছালি, তাবিজ-কবজ, দোয়া-কালাম, পানি পড়া এবংঝাড়ফুঁকের উপর নির্ভরশীল ছিল। তখন মানুষের জীবনও ছিল সংকটাপন্ন। বিভিন্ন রােগে আক্রান্ত হয়ে মানুষ অসহায়ভাবেমারা যেত।

আধুনিক চিকিৎসার সূত্রপাত :

আধুনিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন আবিষ্কারের ফলে চিকিৎসাক্ষেত্রে মানুষের ধ্যান-ধারণায়পরিবর্তন এসেছে; রােগ নির্ণয়ে এসেছে নতুন নতুন যন্ত্রপাতি। বিজ্ঞানের বদৌলতে প্রাচীন পদ্ধতির কবিরাজি চিকিৎসারভুলে হােমিওপ্যাথিক ও অ্যালােপ্যাথিক চিকিৎসার উদ্ভব হয়। মরণঘাতি রোগের ওষুধ আবিষ্কারের ফলে মানুষ গাছ-গাছালি,তাবিজ-কবজ ও ঝাড়ফুকের মতাে কুসংস্কারের উপর থেকে নির্ভরশীলতা কমিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসার প্রতিআকৃষ্ট হয়েছে। এসব চিকিৎসা ব্যবস্থা আধুনিক বিজ্ঞানেরই বিস্ময়কর অবদান।

চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞানের সাফল্য :

বর্তমান চিকিৎসা শাস্ত্র পুরােপুরি বিজ্ঞানের উপর নির্ভরশীল। ১৯০৩ সালেআবিষ্কৃত হয় জিনের গঠন প্রণালি, ইসিজি মেশিন এবং মরণব্যাধি ক্যান্সার চিকিৎসার রেডিওথেরাপি, ১৯২৮ সালে আবিষ্কৃতহয় পেনিসিলিন। ১৯৪৩ সালে আবিষ্কৃত হয় কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিন, ১৯৭৮ সালে আবিষ্কৃত হয় টেস্টটিউব প্রজননপদ্ধতি এবং ১৯৯৭ সালে আবিষ্কৃত হয় ক্লোন পদ্ধতি। বিজ্ঞানের এসব আবিষ্কারের ফলে চিকিৎসা ক্ষেত্রে এসেছে অভাবনীয়উন্নতি।

রােগ নির্ণয়ে বিজ্ঞান :

প্রাচীনকালে মানুষের দেহে কোনাে রােগব্যাধি হলে তা নির্ণয়ের ব্যবস্থা ছিল না। চিকিৎসকরাতখন নিজেদের অভিজ্ঞতার সাহায্যে ওষুধপত্র নির্ধারণ করতেন। ফলে অনেক সময় সঠিক চিকিৎসা সম্ভব হয়ে উঠত না।কিন্তু কালক্রমে রােগ নির্ণয়ের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের ফলে চিকিৎসা পদ্ধতি অনেকটা সহজ হয়েছে। অধ্যাপক রঞ্জনকর্তৃক আবিষ্কৃত ‘রঞ্জন রশ্মি’ বা ‘এক্সরে’, ‘আলট্রাসনােগ্রাফি’ এবং অধ্যাপক কুরি ও মাদাম কুরির আবিষ্কৃত ‘রেডিয়াম’চিকিৎসা ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। রঞ্জন রশ্মির সাহায্যে শরীরের অদৃশ্য বস্তু দেখার ব্যবস্থা রয়েছে এবংরেডিয়ামের সাহায্যে ক্যান্সারের ভয়ংকর ব্যাধির বিষক্রিয়াকে প্রতিহত করা অনেকাংশে সম্ভব হয়েছে। তাছাড়া রােগীররক্ত, মল-মূত্র ইত্যাদি উপাদান পরীক্ষার জন্য আধুনিক যে সব পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে, তা-ও বিজ্ঞানেরই অবদান।

রােগ প্রতিরােধের ক্ষেত্রে বিজ্ঞান :

এমন কিছু রােগব্যাধি রয়েছে, যা দেহে সৃষ্টির আগেই প্রতিরােধের জন্য বিজ্ঞানআগাম ব্যবস্থা করেছে। যেমন- শিশুর জন্মের পর বিভিন্ন মেয়াদে ডি.পি.টি, পােলিও, হাম, গুটি বসন্ত ইত্যাদির টিকাদেওয়া হচ্ছে। ফলে অনেক রােগ দেহে সৃষ্টি হওয়ার আগেই প্ররােধ করা সম্ভব হচ্ছে। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা।পাচ্ছে অগণিত শিশু।

রােগ নিরাময়ে বিজ্ঞান :

রােগ নির্ণয় এবং রােগ প্রতিরােধের ব্যবস্থাই চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় অবদান। এক্ষেত্রে বিজ্ঞানের বড় সাফল্য হলাে বিভিন্ন রােগ নিরাময়ের জন্য নানা রকম ওষুধপত্রের আবিষ্কার। একসময়দুরারােগ্য ব্যাধির চিকিৎসার কোনাে ব্যবস্থাই ছিল না। বিজ্ঞান সে সব রােগ নিরাময়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। যেমন-যক্ষ্মার ব্যাপারে একটি প্রবাদবাক্য প্রচলিত ছিল যে, যার হয় যক্ষ্মা, তার নাই রক্ষা’। ওষুধ আবিষ্কারের মাধ্যমে বিজ্ঞানমারাত্মক ব্যাধিকেও জয় করেছে। যক্ষ্মা এখন আর কোনাে দুরারােগ্য ব্যাধি নয়। তাছাড়া ভয়ংকর জলাতঙ্ক রােগ, কুষ্ঠ রােগইত্যাদি নিরাময়ের জন্যও বিজ্ঞান কার্যকর ওষুধ ও ইনজেকশন আবিষ্কার করেছে। এককালের মহামারি বসন্ত রােগ থেকেমুক্তির জন্য আবিষ্কৃত হয়েছে ‘ভ্যাক্সিন। মানবদেহে অন্য মানুষের হৃৎপিণ্ড সংযোজনের মতাে অলৌকিক ক্ষমতা বিজ্ঞানেরই বিস্ময়কর অবদান। কৃত্রিম হৃৎপিণ্ড তৈরি করা হচ্ছে এবং রােগীর দেহে সংযােজন করে তাকে দীর্ঘদিন কর্মক্ষম রাখার।কৃতিত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত বিজ্ঞানেরই সৃষ্টি। বর্তমান বিশ্বে যে দুটি রোগ সবচেয়ে দুরারােগ্য বলে গণ্য হচ্ছে তা হলাে ক্যান্সার ও এইডস। এ দুটি রােগের চিকিৎসার কোনাে সুব্যবস্থা করা এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়ে উঠেনি। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এর প্রতিরােধের উপায় নিরূপণের জন্য অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আশা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতে যাবতীয় রােগব্যাধিনিরাময়ের ব্যবস্থা বিজ্ঞানই নিশ্চিত করতে পারবে।

উপসংহার :

বিজ্ঞান বিশ্বসভ্যতার জন্য একাধারে আশীর্বাদ ও অভিশাপ দুটোই। তবে চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞান কেবল।আশীর্বাদই নিয়ে এসেছে। প্রবাদ আছে যে, ‘সুস্থ শরীরে সুস্থ মন বিরাজ করে। মানুষের এ সুস্থ শরীরের নিশ্চয়তা বিধানেরজন্য বিজ্ঞান নিঃসন্দেহে মুখ্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বিশ্বখ্যাত মনীষী কিপলিং- এর মতে, “বিজ্ঞানের আশীর্বাদেবিশ্বমানবতা কখনাে উল্লসিত হয় আবার কখনাে তার বিভীষিকাময় রূপে বিশ্বসভ্যতা থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু চিকিৎসাক্ষেত্রেবিজ্ঞান এনেছে শুধু আশীর্বাদ আর আশীর্বাদ।”

বিদ্যুৎ ও আধুনিক জীবন/ দৈনন্দিন জীবনে বিদ্যুৎ

ভূমিকা :

আধুনিক যুগ বিজ্ঞানের যুগ। এ যুগের এক বিস্ময়কর আবিষ্কার হচ্ছে বিদ্যুৎ। বিদ্যুতের আবিষ্কারে মানবসভ্যতার ইতিহাসে সূচিত হয়েছে এক কালজয়ী অধ্যায়। এর অবদানে মানবজীবন ও সভ্যতার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। এরঐন্দ্রজালিক শক্তি গােটা বিশ্বকে এনে দিয়েছে মানুষের হাতের মুঠোয়। আমাদের আধুনিক জীবনকে করেছে অত্যাধুনিক।এর অভাব আমাদের কর্মচঞ্চল দিনকে করে দেয় স্থবির, প্রাত্যহিক জীবনকে করে তােলে দুর্বিষহ।

আধুনিক জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য ও বিদ্যুৎ :

আধুনিক জীবনের স্বাচ্ছন্দ্যের মূলে বিদ্যুতের ভূমিকা অনন্য। দৈনন্দিনজীবনের সঙ্গে রয়েছে বিদ্যুতের অপরিহার্য ব্যবহার। সুইচ টিপলেই জ্বলে উঠে আলাে। প্রচণ্ড গরমে স্বাচ্ছন্দ্য বয়ে আনে।বৈদ্যুতিক পাখা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদ্যুৎ শীতল পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে ঘরবাড়ি, গাড়ি, বাস ও ট্রেনে। সেলফোন, টেলিফোন, টেলিগ্রাফের মাধ্যমে মুহূর্তেই সহস্র মাইল দূরের কারাে সঙ্গে যােগাযােগ করা সম্ভব হচ্ছে। বিদ্যুতেরসাহায্যে মানুষ খাবার সংরক্ষণ করতে পারছে ফ্রিজে। শুনতে পারছে বেতার অনুষ্ঠান। মানুষের বিনােদন চাহিদা মেটাতেওগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ডিভিডি, টেলিভিশন, টেপ রেকর্ডার; যা বিদ্যুতের কল্যাণেই সম্ভব হচ্ছে। এভাবে আধুনিক জীবনেস্বাচ্ছন্দ্যের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ রাখছে অসামান্য অবদান।

শিল্পোৎপাদনে বিদ্যুৎ :

শিল্পোৎপাদনে বিদ্যুৎ অপরিহার্য। বিশাল বিশাল সব যন্ত্রদানব আজ বিদ্যুৎ শক্তির বলে পরিণতহয়েছে মানুষের ক্রীতদাসে। বৈদ্যুতিক তথা ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ঢেলে সাজানাে হচ্ছে সারা বিশ্বের উৎপাদনব্যবস্থা। এর ফলে শিল্প ও কৃষি উৎপাদন বহুগুণ বেড়ে গেছে। বিদ্যুতের সাহায্যেই আজ গড়ে উঠেছে অত্যাধুনিক বিমান ওজাহাজ নির্মাণ শিল্প। বিশালাকৃতি যেসব জাহাজ সাগর-মহাসাগর পাড়ি দিচ্ছে, যেসব ডুবােজাহাজ সমুদ্র তলে বিচরণ করছেসেগুলাে চলছে বিদ্যুৎ শক্তিতে। সভ্যতার পুরােভাগে যন্ত্রশিল্প যত বিকশিত হচ্ছে বিদ্যুতের ব্যবহারও তত বাড়ছে।- যাতায়াত ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ : যাতায়াত ব্যবস্থায় অভাবনীয় উন্নতি ও অগ্রগতি সাধন করেছে বিদ্যুৎ। বৈদ্যুতিক ট্রেন ওপাতাল রেল বিদ্যুতেরই অবদান। তাছাড়া বুলেট ট্রেন, বিলাসবহুল আরামপ্রদ এয়ারবাস ও দ্রুতগতির বিমান পৃথিবীর একপ্রাতথেকে অপর প্রান্তের দূরত্ব কমিয়ে দিয়ে যােগাযােগ ব্যবস্থায় এনেছে বিপ্লব।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিদ্যুৎ :

চিকিৎসা বিজ্ঞানেও বিদ্যুতের অবদান যুগান্তকারী। আধুনিক চিকিৎসায় সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মযন্ত্রপাতি নির্মাণে বিদ্যুৎ পালন করছে অনন্য ভূমিকা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের নানা শাখায় রােগ নিরূপণ, উপশম ও নিরাময়ে।বিদ্যুৎ চালিত যন্ত্রপাতি অভাবনীয় অবদান রাখছে। এক-রে, ইলেকট্রো কার্ডিওগ্রাম, আল্টাসনােগ্রাফি, ইকো কার্ডিওগ্রাম,সিটি স্ক্যান, এমআরআই, এন্ডােস্কোপি, কোলনক্কোপি ইত্যাদি রােগনিরূপণ যন্ত্র এবং পরমাণু চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ধরনেরথেরাপি চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব এনেছে। এ বই বিদ্যুৎ নির্ভর।

কৃষিতে বিদ্যুৎ :

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বালাদেশের কৃষিকাজে বিদ্যুতের ব্যাপক ব্যবহার এখনও সম্ভব হয়নি।তবে ইতােমধ্যে বিদ্যুতের প্রভাব আমাদের কৃষি ক্ষেত্রেও পড়েছে। সীমিত আকারে হলেও কোনাে কোনাে দিক দিয়েবিদ্যুতের অবদানে দেশের কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে। প্রকৃতির উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে বিদ্যুতের সাহায্যেগভীর ও অগভীর নলকূপ চালিয়ে পানি সেচ দেওয়া হচ্ছে। শস্য মাড়াই এবং শস্য ভাঙানাের কাজ হচ্ছে বিদ্যুতের সাহায্যেচালিত কলের মাধ্যমে। ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত উন্নতমানের বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণে বিদ্যুতের সহায়তানেয়া হচ্ছে।মুদ্রণশিল্পে বিদ্যুৎ ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশের জন্য মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার বিজ্ঞানের একটি বিস্ময়কর সাফল্য। এইমুদ্রণযন্ত্রের সাহায্যে আজ হাজারাে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই প্রকাশিত হচ্ছে, যা আমাদের সভ্যতার অগ্রগতিতে অবদান রাখছে।তা ছাড়া মানুষ সংবাদপত্রের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের তরতাজা, চাঞ্চল্যকর ও আনন্দদায়ক সংবাদ পাঠ করার দুর্লভ সুযােগলাভ করছে। এগুলাে ছাপার জন্য মুদ্রণযন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু বিদ্যুৎ আবিষ্কারের পূর্বে এ মুদ্রণযন্ত্রের মাধ্যমে প্রকাশনারকাজ চলত শম্বুক গতিতে। একটি ছােট আকারের প্রকাশনার জন্যও মাসের পর মাস সময় লেগে যেত। বর্তমানে বিদ্যুৎচালিত মুদ্রণযন্ত্রে হাজার হাজার ফর্মার মুদ্রণ কাজও অল্প সময়ের মধ্যে করা সম্ভব হয়।

মহাকাশ অভিযানে বিদ্যুৎ :

মহাকাশ অভিযান ও মহাকাশ বিজয়ে মানুষের সমস্ত সাফল্যের মূলে বিদ্যুতের অবদান বিস্ময়কর। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম গণনা, নির্ভুল দিকস্থিতি নির্ণয়, পরিমিত তাপমাত্রা সংরক্ষণ এবং মহাকাশ অভিযানের হুবহু ছবি পৃথিবীতে প্রেরণ ইত্যাদির মতাে অকল্পনীয় কাজ এখন বাস্তবে সম্পন্ন করতে সাহায্য করছে বিদ্যুৎ। গ্রহে-উপগ্রহে বিভিন্ননভােযান ও নডােখেয়া উৎক্ষেপণও চলছে বিদ্যুতের সাহায্যে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা নাসা (NASA) সম্পূর্ণভাবে ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক প্রযুক্তিনির্ভর।

শিক্ষা ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ :

বর্তমানে শিক্ষা ব্যবস্থায়ও বিদ্যুৎ এনে দিয়েছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। স্কুল, কলেজ ওবিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম এখন ডিজিটাল করা হয়েছে। প্রজেক্টরের মাধ্যমে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করেশিক্ষকরা লেকচার দিচ্ছে। এতে করে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হচ্ছে। যা বিদ্যুতেরই অসামান্য অবদান।

বিদ্যুৎ ও বাংলাদেশ :

অত্যধিক জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক মেরুকরণ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা-পীড়িত বাংলাদেশেরবিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল একটি বড় সমস্যা। ২০০৯ সালের আগে বিদ্যুতের অভাবে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল ভঙ্গুর, শিল্প,বাণিজ্য ছিল অনেকটা স্থবির এবং জনজীবনে লােডশেডিং ছিল অসহনীয়। তবে বর্তমান সরকারের দূরদর্শী ও সময়ােপযােগীসিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের ফলে জ্বালানি সক্ষমতা অর্জনে বিদ্যুত্থাতে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে। প্রতিবছরইদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল বিদ্যুৎ উৎপাদন ১০ হাজার মেগাওয়াটের মাইলফলক পেরােয়।বিগত এগারাে বছরে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নতুন ১১০টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করাহয়েছে। যেখানে ২০০৯ সালে ছিল মাত্র ২৭টি। বর্তমানে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা ১৩৭টি। বিদ্যুৎ সুবিধাপ্রাপ্ত জনগােষ্ঠীর হার ৯৬%। সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে দেশের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ সংযােগ দেওয়া হবে।

উপসংহার :

জনজীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনতে এবং প্রযুক্তির বিকাশ ঘটাতে গেলে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের বিকল্প নেই।তৃতীয় বিশ্বের কিছু দেশ আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতির ধারা থেকে ছিটকে পড়েছে শুধু বিদ্যুতের অভাবে। আমাদের দেশেওবিদ্যুৎকে ভালােভাবে কাজে লাগাতে না পারলে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে। তাই বিদ্যুতের অপচয় রােধ করে এরযথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

বিজ্ঞান শিক্ষার প্রয়ােজনীয়তা

ভূমিকা :

মানুষের অভাববােধ থেকে বিশেষ জ্ঞান হিসেবে বিজ্ঞানের উৎপত্তি। এটি এসেছে মানুষের প্রাত্যহিকতারপ্রয়ােজনে। সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী বিজ্ঞানের একটি সুন্দর সংজ্ঞা প্রদান করেছেন বিজ্ঞান শুধু এক বিশেষ জ্ঞানের নামনয়, একটি বিশেষ প্রণালি অবলম্বন করে যে জ্ঞান লাভ করা যায়, আসলে তারই নাম হচ্ছে বিজ্ঞান। অক্সিজেন ছাড়া যেমনপ্রাণিকুলের জীবন ধারণের কথা কল্পনা করা যায় না, তেমনি বিজ্ঞানকে বাদ দিয়ে আধুনিক সভ্যতাকে কল্পনা করা যায় না।

বিজ্ঞান শিক্ষার প্রয়ােজনীয়তা :

বিজ্ঞানের বলে মানুষ জল, স্থল, অন্তরীক্ষ জয় করেছে; সংকট নিরসন ও অসংখ্যসুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিধানের বহু অভাবনীয় কৌশল আবিষ্কার করেছে। জীবনের সর্বক্ষেত্রে আজ বিজ্ঞানের জয়যাত্রা পরিলক্ষিতহয়। কোনাে জাতি বা রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নতি নির্ভর করে বিজ্ঞানের ব্যাপক বিস্তার ও বিকাশে। ছােট বড় কলকারখানা গড়েতােলা, কৃষির উন্নয়ন, চিকিৎসাক্ষেত্রে উন্নয়ন, যােগাযােগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কুসংস্কার দূরীকরণ, বেকারত্ব লাঘব, বন্যানিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি কাজে বিজ্ঞানের অবদান অনস্বীকার্য। মানুষ বিজ্ঞানকে জীবনযাত্রার সহচর করে জীবনকে করে তুলেছে।সহজ। উপভােগ্য। এককথায়, মানব সভ্যতাকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করেছে বিজ্ঞান। কাজেই বিজ্ঞান শিক্ষার গুরুত্বঅপরিসীম।

বিজ্ঞান শিক্ষার প্রভাব :

যে শিক্ষা ধারাবাহিক, বিশ্লেষণপন্থী ও বাস্তবসম্মত বিজ্ঞান আমাদের সে শিক্ষা দেয়। বিজ্ঞানআমাদের জ্ঞানান্ধকার দূর করে সঠিক জ্ঞানের আভাস দেয় এবং মনুষ্যত্বের জাগরণ ঘটিয়ে আত্মােপলদ্ধি তথা বিশ্বজগতেরস্বরূপ উপলদ্ধিতে সাহায্য করে। বিজ্ঞান শিক্ষা কুসংস্কার বিনাশকারী। ধর্মের নামে যারা গোড়ামিকে প্রশ্রয় দেয়, প্রকৃতবিজ্ঞান তাদেরও সচেতন হতে সাহায্য করে। যারা বিজ্ঞানশিক্ষা অর্জন করেছেন, তারা কখনাে কুসংস্কার বিশ্বাস করেন না।বিজ্ঞানশিক্ষায় শিক্ষিতরা যে কোনাে ঘটনা বা সমস্যার প্রকৃত কারণ জানতে সচেষ্ট হয়। তাই কুসংস্কার থেকে মুক্তি ওবিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে বিজ্ঞানচর্চার বিকল্প নেই।

সমাজজীবনে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রভাব :

আমাদের সমাজে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ বাস করে। প্রত্যক্ষ কিংবাপরােক্ষভাবে তাদের প্রত্যেকের জীবনেই বিজ্ঞান শিক্ষার প্রভাব ও প্রয়ােজনীয়তা রয়েছে। বিজ্ঞানের জ্ঞান আজ তাদেরকেকরে তুলেছে কর্মকুশলী, নিয়মনিষ্ঠ, নিরলস ও সুশৃঙখল। বিজ্ঞান বিষয়ে সামান্যতম জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিও চাষাবাদেরক্ষেত্রে বা পানি সেচের ক্ষেত্রে প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল না থেকে বিকল্প কোনাে উপায়ে সমস্যার সমাধান করে নিচ্ছে। তাছাড়া উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষিবিপ্লব ঘটাতে সচেষ্ট হচ্ছে। বিজ্ঞানশিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তির সাফল্য দেখে সমাজের অন্যরাও অনুপ্রাণিত হয়। আবার শিল্প কারখানায় অনেক ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করতে হয়। সংশ্লিষ্ট শ্রমিকরা যদি বিজ্ঞানশিক্ষায় শিক্ষিত হয় তাহলে উৎপাদন বেশি হয় এবং দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও কম থাকে। আজকাল গরু,হাস-মুরগি, মাছ ইত্যাদির উৎপাদন বৃদ্ধি করতে চাইলে সংশ্লিষ্টদের বিজ্ঞানশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া জরুরি। নতুবা আশানুরূপ সাফল্য লাভ করা যায় না। ধান, গমসহ মানুষের খাদ্যের উৎপাদন বৃদ্ধিতেও বিজ্ঞানশিক্ষার প্রভাব অনস্বীকার্য।

দেশ ও জাতি গঠনে বিজ্ঞানশিক্ষা :

মানুষের অভাববােধ থেকে বিশেষ জ্ঞান হিসেবে বিজ্ঞানের উৎপত্তি বলেইজীবনযাত্রার মানােন্নয়নে বিজ্ঞানের সম্পর্ক খুবই নিবিড়। তাই দেশ ও জাতি গঠনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানশিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।যে কোনাে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে প্রচুর চিকিৎসক ও প্রকৌশলীর যেমন দরকার, তেমনি কৃষিবিজ্ঞানী ও পশুবিজ্ঞানীও খুবইপ্রয়ােজনীয়। বিজ্ঞানের কল্যাণেই মানুষ মরুভূমির ঊষর বালুকায় শস্য উৎপাদন করতে পারছে। বিজ্ঞানের শক্তিই আজমানুষকে দিয়েছে নতুনতর স্বপ্নের স্বর্গরাজ্য গড়ে তােলার সার্থক ও সুন্দর সুযােগ। বিজ্ঞানের জ্ঞান ব্যবহার করেই মানুষ তারসংকট থেকে উত্তরণ ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য হাজারাে কৌশল-পদ্ধতি আবিষ্কারে সক্ষম হয়েছে। যে জাতি বিজ্ঞান শিক্ষায়আজ যত বেশি অগ্রসর, তারা তত বেশি উন্নতি লাভ করছে দেশ ও জাতি গঠনের সর্বক্ষেত্রে। কারিগরি বিজ্ঞান শিক্ষারমাধ্যমে অনেকে নিজের ভাগ্য বদলাতে সক্ষম হচ্ছে। তাই বলা যায়, দেশ ও জাতি গঠনে বিজ্ঞানশিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।

বিজ্ঞানশিক্ষার বিভিন্ন স্তর ও প্রভাব :

বিজ্ঞানশিক্ষার বিভিন্ন স্তর রয়েছে। যেমন— উচ্চতর, মাধ্যমিক ও প্রাথমিক।প্রত্যেক মানুষেরই বিজ্ঞান সম্পর্কে অন্তত প্রাথমিক জ্ঞান বা শিক্ষা অর্জন জরুরি। যাদের পক্ষে মাধ্যমিক পর্যায়ের বিজ্ঞানশিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব হয়েছে, তাদের পক্ষেই জীবন-সংসারের বিভিন্ন জটিল বিষয় উপলব্ধি করা সম্ভব। আবার যারাউচ্চতর পর্যায়ের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, তারা নতুন কোনাে প্রযুক্তির উদ্ভাবনে সক্ষম হয়। প্রাথমিক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদেরসাধারণ কোনাে রােগ বা সমস্যায় ফকির বা কবিরাজ ডাকতে হয় না। ব্যক্তিগতভাবে সমস্যার সমাধানে অক্ষম হলে তারাসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞদের সঙ্গে যােগাযােগ বা পরামর্শ করে সমস্যার সমাধান করতে পারে।

বিজ্ঞান শিক্ষা প্রসারে উদ্যোগ :

বিজ্ঞানের সুফল ভােগ করতে হলে আবিষ্কারসমূহের ব্যবহার সম্পর্কে জ্ঞান থাকাচাই। এ জ্ঞানার্জনের জন্য বিজ্ঞান শিক্ষার কোনাে বিকল্প নেই। পুঁথিগত ও ব্যবহারিক জ্ঞানের সমন্বয়েই বিজ্ঞানের সুফলসর্বোচ্চভাবে ভােগ করা সম্ভব। তাই জাতিকে বিজ্ঞান শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এজন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়েবিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিজ্ঞান শিক্ষা :

উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বালাদেশও বিজ্ঞান শিক্ষায় দ্রুত এগিয়েযাচ্ছে। বিজ্ঞান শিক্ষার গুরুত্ব উপলদ্ধি করে বর্তমান সরকার এ খাতে বিশেষ জোর দিয়েছে। এ শিক্ষাকে কাজে লাগিয়েডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যােগাযােগ ক্ষেত্রে বিজ্ঞান শিক্ষাকে কাজেলাগিয়ে বাংলাদেশে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটেছে। টেলিযােগাযােগ খাতকে আরও সহজ ও দ্রুততর করার জন্য সারা দেশকেইতােমধ্যে ফোর জি নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয়েছে। বিজ্ঞান গবেষণার পথকে সুগম করার জন্য বাংলাদেশ মহাকাশেবঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ করেছে। যা আমাদের বিজ্ঞান অগ্রযাত্রার সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। তাছাড়া এদেশেরস্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলােতে বিজ্ঞান শিক্ষায় ব্যাপক জোর দেওয়া হচ্ছে। এ শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীরারােবট থেকে শুরু করে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়েযাচ্ছে। বিজ্ঞান শিক্ষায় যে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে তা সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে অচিরেই বালাদেশ।বিশ্বের বুকে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে সক্ষম হবে।

উপসংহার :

ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র তথা জীবনের সর্বস্তরে বিজ্ঞানশিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। জীবনকে গতিময় রাখারজন্য চাই বিজ্ঞানশিক্ষা। আদিম যুগ থেকে আরম্ভ করে বর্তমান যুগ পর্যন্ত মানব সভ্যতার যে বিকাশ ঘটেছে, তার মূলেরয়েছে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানকে বাদ দিয়ে আধুনিক সভ্যতা কল্পনা করা যায় না। তাই আমাদের প্রত্যেককে বিজ্ঞানশিক্ষায়।আন্তরিক হতে হবে।

স্বদেশপ্রেম/ দেশপ্রেম

ভূমিকা :

স্বদেশপ্রেম হলাে নিজ দেশের প্রতি এক ধরনের অনুরাগময় পবিত্র ভাবাবেগ। এটি মানব চরিত্রের সুকুমারবৃত্তিগুলাের অন্যতম। মানুষের মধ্যে সহজাতভাবেই এ গুণের উদ্ভব হয়। সুষ্ঠু শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে এ গুণেরবিকাশ ঘটে। দেশপ্রেম দেশের মঙ্গল ও উন্নতির জন্য সবকিছু সঠিক ও নিয়মসিদ্ধভাবে করতে মানুষকে উৎসাহিত করে।তাই মানব চরিত্রের এ বিশেষ গুণটির অনুশীলন দেশ, জাতি তথা বিশ্বের জন্য কল্যাণ ও সমৃদ্ধি বয়ে আনতে সক্ষম।

দেশপ্রেমের স্বরূপ :

যে দেশে জন্ম, বেড়ে উঠা ও জীবন অতিবাহিত করা হয়, তা-ই তাে স্বদেশ। স্বদেশ বা নিজেরদেশের প্রতি মানুষের সুগভীর অনুরাগ বা ভালােবাসার নামই স্বদেশপ্রেম। স্বদেশ মায়ের সাথে তুলনীয়। মা যেমন তারসন্তানকে জন্মের পর থেকে অসীম মমতায় আগলে রেখে লালন-পালন করেন, তেমনি স্বদেশও তার বুকে ধারণ করে আলাে-বাতাস, অন্ন-জলে আমাদের লালন-পালন করে। স্বদেশপ্রেম প্রকাশক তিনটি প্রধান মাধ্যম হচ্ছে মা, মাতৃভাষা ওমাতৃভূমি। তাই বলা যায়– মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির প্রতি অনুরাগ বা ভালােবাসার সমন্বয়ই হচ্ছে স্বদেশপ্রেম!

স্বদেশপ্রেমের বিকাশ :

মা, মাতৃভাষা এবং মাতৃভূমি স্বদেশপ্রেম বিকাশের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার একেকটি পর্যায়। এপর্যায়সমূহ সফলতার সাথে অতিক্রমের মাধ্যমে একজন মানুষ তার স্বদেশপ্রেমের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে।মা দশমাস গর্ভধারণ করে অনেক কষ্টের মাঝেও পরম মমতায় আমাদের পৃথিবীর আলাে দেখান। মায়ের সাথেআমাদের রয়েছে নাড়ির বন্ধন, যা কোনােভাবেই ছিন্ন হবার নয়। সন্তানের প্রতি মায়ের অকৃত্রিম ভালােবাসা সন্তানকে শেখায় ভালােবাসতে। মায়ের স্নেহপ্রসূত ভালােবাসার এ পাঠ মানুষের মধ্যে স্বদেশপ্রেমের সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করে।

“যে ভাষাতে প্রথম বােলে ডাকনু মায়ে মা মা বলে”-সে ভাষাই আমাদের মাতৃভাষা।

এ ভাষার বর্ণালি ছটায় আমরা প্রতিনিয়ত প্রকাশ করি আমাদের অন্তরের অনুভূতি ও আকুতি। মাতৃভাষাকে ভালােবেসে ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হিসেবেঅন্তরের অন্তঃস্থলে অধিষ্ঠিত করার দ্বারা মানুষের স্বদেশপ্রেমের বিকাশ পরিপূর্ণতার দিকে আরেক ধাপ অগ্রসর হয়।বৃহত্তর অর্থে মানুষ ধরিত্রীর সন্তান। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে পৃথিবী তার জন্মপরিচয়ের ঠিকানা নয়। পৃথিবীরনির্দিষ্ট যে ভূ-খণ্ডে মানুষ জন্মগ্রহণ করে, যে মাটির আলাে-বাতাস, অন্ন-জলে সে বেড়ে উঠে, তা-ই তার জন্মভূমি তথামাতৃভূমি। জন্মভূমির ভৌগােলিক ও সামাজিক পরিবেশ, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি প্রভৃতির সাথে পরিচিত হতে হতে জন্মভূমির এক চির আরাধ্য, চির পবিত্র, চির ভাস্বর মাতৃসম ভাবমূর্তি গড়ে উঠে মানুষের হৃদয়ে। অতঃপর সেই তীব্র আবেগস্বদেশ বন্দনার বাণী হয়ে ঝরে পড়ে-

“সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে।সার্থক জনম মাগাে তােমায় ভালােবেসে”

দেশপ্রেমের গুরুত্ব :

স্বদেশপ্রেম এমন একটি গুণ, যা একজন মানুষকে দেশের কল্যাণার্থে তার স্বার্থ, স্বাচ্ছন্দ্য, আনন্দএমনকি নিজ জীবন উৎসর্গ করতে অনুপ্রাণিত করে। স্বদেশপ্রেমের অনন্ত স্পৃহা মানুষকে দায়িত্বপরায়ণ, উদ্যমী ও গভীরআত্মপ্রত্যয়ী করে তােলে। ফলে মানুষের মধ্যে জাতির কল্যাণ চিন্তা, জাগ্রত হয়। দেশপ্রেমের মহৎ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েপ্রতিটি মানুষ তার স্ব স্ব অবস্থানে থেকে দেশের জন্য কাজ করে। একটি সমৃদ্ধ জাতি, উন্নত দেশ, সুখী মানুষ সবইস্বদেশপ্রেমের অবদান। দেশপ্রেমিক দেশবাসীর দ্বারা উচ্চ প্রশংসিত ও সম্মানিত হন। অন্যদিকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেওস্বদেশপ্রেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মদ (স.) বলেন, “তুববুল ওয়াতান মিনাল ঈমান” অর্থাৎ“স্বদেশপ্রেম ইমানের অঙ্গ।” অন্যান্য ধর্মেও একইভাবে স্বদেশপ্রেমকে মহিমান্বিত করা হয়েছে। স্বদেশপ্রেমের মহানআদর্শে উজ্জীবিত হয়ে আত্মােৎসর্গকারী ব্যক্তি অমর হয়ে থাকেন।

স্বদেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত :

ইতিহাস থেকে জানা যায়, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যুগে যুগে অনেক মহাপুরুষ বিভিন্নভাবে নজিরস্থাপন করে গেছেন। নিজ দেশের পবিত্র মাটিকে শত্রুর বিষাক্ত নিঃশ্বাস থেকে মুক্ত করতে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।স্বদেশের মাটি থেকে ইংরেজদের তাড়াতে গিয়ে তিতুমীর হাসিমুখে তার বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন, স্বদেশের গান গেয়েবালক ক্ষুদিরাম ফাসির কাষ্ঠে ঝুলেছিলেন, নজরুল কারাগারের শিকল ভাঙার গান গেয়েছিলেন। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষারজন্য শহিদ হয়েছেন- রফিক, বরকত, সালাম, জব্বার প্রমুখ। বাংলার মাটি থেকে পাকিস্তানিদের বিতাড়িতজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বহুবার কারাবরণ করেছিলেন। স্বদেশের স্বাধীনতা রক্ষায় এদেশের ত্রিশ লক্ষ মানুনতাদের জীবন, দুই লাখ মা-বােন তাদের সন্ত্রম বিসর্জন দিয়েছিলেন। অর্থাৎ দেশমাতৃকার প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে এরা স্বদেশেরবৃহৎ স্বার্থে নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন। তাছাড়া তিতুমির, ক্ষুদিরাম, রানা প্রতাপ, প্রফুল্ল চাকী, প্রীতিলতকরতে জাতিরওয়াদ্দেদার, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধী প্রমুখ দেশপ্রেমিক নিজেদের জীবনের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে স্বদেশপ্রেমেরউজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।স্বদেশপ্রেম ও বিশ্বপ্রেম । নদী যেমন প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে দুর্বার বেগে ছুটে চলে সাগর পানে, তেমনি। স্বদেশপ্রেমের মহিমান্বিত বীণার তারে মুহুর্মুহু অনুরণিত হয় বিশ্বপ্রেমের অনিন্দ্য সুরমূৰ্ছনা। তাই প্রকৃত স্বদেশপ্রেম ও বিশ্বপ্রেমের মধ্যে কোনাে বিরােধ থাকতে পারে না। স্বদেশবাসীকে ভালােবাসার মধ্য দিয়ে মানুষ বিশ্ববাসীকে ভালােবাসতেশেখে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ, সম্প্রদায়ের উর্ধ্বে মানুষ বিশ্বপ্রেমের এই বাণীকে জাতীয় জীবনে গ্রহণ করলেই সংকীর্ণ অন্ধজাতীয়তাবােধ থেকে আমাদের মুক্তি আসবে। বিশ্বকবির লেখায়ও আমরা সে কথারই প্রমাণ পাই-

“ও আমার দেশের মাটি, তােমার ‘পরে ঠেকাই মাথাতােমাতে বিশ্বময়ীর- তােমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা।”

দেশপ্রেমের নামে নৈরাজ্য :

স্বদেশপ্রেম হবে নিষ্কলুষ ও নির্লোভ। কিন্তু স্বদেশপ্রেমের মহান এ আদর্শ বিস্মৃত হয়েদেশপ্রেমের নামাবলি গায়ে জড়িয়ে অনেকে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে, অনেক রাষ্ট্রনায়ককায়েম করে একনায়কতন্ত্র। এরা দেশপ্রেমিক নয়, বরং এরা দেশ ও জাতির শত্রু। এদের কারণেই দেশ ও জাতি বিপর্যয়েরমুখােমুখি হয়। ইতালির মুসােলিনি, জার্মানির হিটলার-এরা স্বদেশপ্রেমের ইতিহাসে কলঙ্ক। এরা কেবল নিজের দেশের অশ্রুই ঝরায়নি, বিশ্বমায়েরও অশ্রু ঝরিয়েছে। তাই মানুষ তাদের কথা স্মরণ করে সুতীব্র ঘৃণার সাথে।

উপসংহার :

স্বদেশপ্রেম মানুষকে স্বার্থপরতা, সম্প্রদায় ও গােষ্ঠীগত সংকীর্ণতা এবং রাজনৈতিক মতাদর্শগতভেদাভেদের উর্ধ্বে তুলে এক স্বপ্নিল ও সমৃদ্ধ দেশ গঠনে সক্ষম করে তােলে। অসংখ্য স্বাধীনতাকামী দেশপ্রেমিকেরআত্মদানের ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ আজ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্রের সামনে আজ একবিংশ শতাব্দীর নতুনচ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সকল জড়তা ও পশ্চাৎপদতাকে পেছনে ফেলে শৌর্য-বীর্য-সমৃদ্ধিতে বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করেদাড়ানাের। এজন্য আমাদেরকে দেশ গঠনের কাজে স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ও সমবেত হয়ে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় জাগরণ সৃষ্টিকরতে হবে।

পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার

ভূমিকা :

পরিবেশ হলাে আমাদের চারপাশের অবস্থা। পরিবেশ মানবসভ্যতা ও সমাজব্যবস্থার বহিঃপ্রকাশ। জন্ম থেকেমৃত্যু পর্যন্ত মানুষ পরিবেশের অনুগ্রহে লালিত-পালিত হয়। পরিবেশ মানবজীবনে মুখ্য প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে।মানুষের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য দূষণমুক্ত নির্মল পরিবেশ আবশ্যক। অথচ প্রতিদিনই এ পরিবেশ নানা কারণে দূষিত হচ্ছে এবং ক্রমেই তা মানুষের বসবাসের অযােগ্য হয়ে পড়ছে।

পরিবেশ দূষণ

মানুষ তথা জীবজগতের বাসযােগ্য এলাকাই হলাে তার পরিবেশ। বেঁচে থাকার জন্য আমরাপরিবেশকে নানাভাবে ব্যবহার করি। ফলে পরিবেশের বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তন যখন জীবের জন্য ক্ষতিকর।হয়, তখন তাকে পরিবেশ দূষণ বলে। পরিবেশ দূষণ বিভিন্নভাবে হয়ে থাকে। বায়ু দূষণ, পানি দূষণ, মাটি দূষণ এবং শব্দদূষণ এর মধ্যে অন্যতম।

পরিবেশ দূষণের কারণ :

মানুষের বিভিন্ন কর্মকান্ডের দ্বারা প্রতিনিয়তই পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাপরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে। অধিক জনসংখ্যার চাপে লােকালয়ের প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্যবিনষ্ট হয়। অধিক জনসংখ্যার বাসস্থান সংকুলানের জন্য নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন করা হচ্ছে। ফলে বনভূমির পরিমাণ ক্রমশএস পাচ্ছে। শিল্পায়ন ও নগরায়ণের প্রভাবেও পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। যানবাহন ও ইটভাটার ধোঁয়ায় বায়ু দূষিতহচ্ছে। কলকারখানার বর্জ্য নদীতে ফেলার কারণে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে এবং জলজ প্রাণীর ক্ষেত্রে মারাত্মক বিপর্যয় দেখাদিচ্ছে। তা ছাড়া মানুষের কার্যাবলি বায়ু, পানি ও শব্দ দূষণের সৃষ্টি করে পরিবেশকে দূষিত করছে। এভাবেই বিপন্ন হচ্ছেআমাদের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।

পরিবেশ দূষণ ও বাংলাদেশ :

অগণিত সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলাে পরিবেশ দূষণ।বর্তমানে পরিবেশ দূষণ এমন ভয়াবহ পর্যায়ে পৌছেছে যে, আমাদের ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে নেমে এসেছে চরমবিপর্যয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বিভিন্ন যন্ত্র ও গাড়িঘােড়ার বিরূপ প্রভাব, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, নির্বিচারে বনউজাড়, বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণ সমস্যাটি প্রকট আকার ধারণকরেছে। বাংলাদেশে, বিশেষ করে শহরাঞ্চলের রাস্তাঘাটে বর্ধিত এবং মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন চলাচলের ফলে সৃষ্ট ধোঁয়াবাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইড ও সিসার পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। যা মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির সৃষ্টি করছে। তাছাড়া যানবাহনেরবিকট শব্দে প্রতিনিয়তই শব্দ দূষণ হচ্ছে। এতে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। প্রতি বছর আমাদের দেশেযেসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়, তার মূলেও রয়েছে পরিবেশ ও প্রতিবেশগত সমস্যা। এদেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে বনভূমি না থাকায়বন্যা, খরা, অনাবৃষ্টি ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংঘটিত হচ্ছে। দেশে মরুময়তা দেখা দিচ্ছে। দেশের উত্তরাঞ্চলে।ইতােমধ্যেই মরুময়তার আবির্ভাব ঘটেছে।

পরিবেশ দূষণের প্রতিকার :

পরিবেশের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার প্রভাবে মানুষের সামগ্রিক যে সব ক্ষতি সাধিত হয় তাথেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের অবশ্যই প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার পথ বের করতে হবে। এর জন্য নানা পদ্ধতি প্রয়ােগকরা যেতে পারে। বায়ুদূষণের বেলায় কীট নিধনে জৈব নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ, নিবিড় বনায়ন, রাসায়নিক পদার্থের শােধন,ধোয়ার পরিশুতিকরণ, বসতি ও শিল্পাঞ্চলের মধ্যে দূরত্ব রাখা ইত্যাদি ব্যবস্থা গৃহীত হতে পারে। পানি দূষণ দূর করার জন্যরাসায়নিক পদার্থ ও ময়লার বিশশাধন দরকার। শব্দ দূষণ দূর করতে হলে শব্দ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং সুনাগরিকতারবিকাশ ঘটাতে হবে।

পরিবেশ সংরক্ষনে গৃহীত পদক্ষেপ :

বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযােগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে বর্তমানসরকার সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বায়ুদূষণকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও হ্রাসের লক্ষ্যে ‘ক্লিন এয়ার অ্যাক্ট’ বা‘নির্মল বায়ু আইন’ এর খসড়া প্রণয়ন করা হচ্ছে। দেশে বিদ্যমান ইটভাটাসমূহকে জ্বালানিসাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব উন্নতপ্রযুক্তিতে রূপান্তর করা হয়েছে। উন্নত প্রযুক্তিতে তৈরি ছিদ্রযুক্ত ইট ও মাটির বিকল্প উপাদানে তৈরি বিভিন্ন ধরনের ব্লকউৎপাদন ও ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। আইন অমান্যকারী ইটভাটার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরসহ অবৈধ ইটভাটা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। যানবাহনের কালাে ধোঁয়া নির্গমন হ্রাসের লক্ষ্যে ২০ বছরের পুরাতন যানবাহন ঢাকাসহ বড় বড় শহরের রাস্তা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। সারা দেশের শহরগুলােতে যানবাহনের ক্ষতিকরধোয়ার বিরুদ্ধে মােবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। যানবাহনে ব্যবহূত ডিজেলে বিদ্যমান সালফারের পরিমাণ যথেষ্ট।কমানাের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া পরিবেশ দূষণ রােধে যানবাহনে কমপ্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস (সিএনজি) এবংলিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এর ব্যবহার বাড়ানাে হচ্ছে। এ লক্ষ্যে দেশের নানা প্রান্তে অসংখ্য সিএনজি ও এলপিজি স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। দেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলােতে প্রায় ৫৫ লক্ষ সােলার হােম সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে।ফলে প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষ কেরােসিন বাতি জ্বালানাে বন্ধ হয়েছে।

দেশকে অধিকতর বাসযােগ্য করে তােলার লক্ষ্যে সরকার আরও যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তন্মধ্যে রয়েছে পরিবেশআদালত স্থাপন। এ আদালতে পরিবেশ দূষণজনিত সকল অপরাধের দ্রুত বিচার সম্পন্ন হবে। প্রাথমিকভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীসহ ৬টি বিভাগীয় শহরে পরিবেশ আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ঢাকাসহ দেশেরঅন্যান্য বিভাগীয় ও শিল্পঘন শহরগুলােতে মােট ১৬টি কন্টিনিউয়াস এয়ার মনিটরিং স্টেশন’ (সিএএমএস) নামক বায়ুদূষণপরিমাপক যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে। এসব যন্ত্রের মাধ্যমে বায়ুদূষণের মাত্রা জানা যাবে এবং যথাসময়ে প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা নেয়হবে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রধান উপায় জলাভূমি রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে গুলশান, বারিধারা লেক, হাতিরঝিল এআশুলিয়ায় সরকার সময়ােপযােগী ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় পাহাড় কাটা বন্ধে উল্লেখযােগ্য সাফল্য অর্জিতহয়েছে। শীতলক্ষ্যা, কর্ণফুলী, তুরাগ, বুড়িগঙ্গাসহ সারা দেশে নদী দূষণ বন্ধ করার জন্য নেয়া হয়েছে কার্যকর পদক্ষেপভেঙে ফেলা হচ্ছে নদীর পাড়ে গড়ে তােলা অবৈধ স্থাপনা।

দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার লক্ষ্যে ইতােমধ্যে ১৩টি এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকাঘােষণা করা হয়েছে। কক্সবাজার, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও রংপুরসহ বেশ কিছু শহরের কঠিন বর্জ্য পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কম্পােস্ট সার তৈরির জন্য কম্পােস্ট প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সচেতনতাসৃষ্টিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

উপসংহার :

পরিবেশ দূষণ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা তথা মানব জাতির জন্য এক মারাত্মক হুমকি। আমাদের মতােউন্নয়নশীল দেশে এ সমস্যা আরও ভয়াবহ। পরিবেশ দূষণ বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে জীববৈচিত্র্যঅস্তিত্বের সংকটে পড়বে। এ ব্যাপারে সারা বিশ্বের মানুষের সচেতনতা প্রয়ােজন। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে তথা অস্তিত্ব রক্ষারপ্রশ্নে আমাদেরকেও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও তার প্রতিকার(দিনা, বাে, ২০২০, ২০১৩; ‘ঢা, বাে, ২০১৫, ২০১৩;চট্ট, বাে, ২০১৩; রা. বাে, ২০১৩; বরি, বাে, ২০১৩।ভূমিকা : মনােরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব লীলাভূমি আমাদের এ বাংলাদেশ। ভৌগােলিক অবস্থানের কারণেবিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব-দ্বীপ আকৃতির এ দেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী। প্রায় প্রতি বছরই বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে এদেশের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে দেয়।প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলাে একপ্রকার প্রাকৃতিক ঘটনা, যাতে মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতিসাধিত হয়ে থাকে। এর ফলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারা ব্যাহত হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের সম্পদ ও পরিবেশেরএমনভাবে ক্ষতিসাধন করে যে, তা থেকে উত্তরণের জন্য আক্রান্ত জনগােষ্ঠীর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়ােজনপড়েবাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ : প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের জন্য একটি মারাত্মক অভিশাপ। ভৌগােলিক অবস্থান,আবহাওয়া ও জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে প্রতি বছর ভাটির দেশ বাল্লাদেশ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ছে। এলনিনাে ওলা-নিনার প্রভাবে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিনিয়তই বাংলাদেশে হানা দিয়ে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তােলে।এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে উল্লেখযােগ্য হলাে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, সাইক্লোন, জলােচ্ছ্বাস, ঝড়-ঝঞা, অতিবৃষ্টি, খরা,নদীভাঙন, ভূমিকম্প, লবণাক্ততা ইত্যাদি।বন্যা : বন্যা বাংলাদেশের একটি মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ভৌগােলিক অবস্থান, ভূ-তাত্ত্বিক কাঠামাে, অতিবৃষ্টি,একই সময়ে প্রধান নদীসমূহের পানি বৃদ্ধি, নদীতে পলল সঞ্চয়ন, পানি নিষ্কাশনে বাধা, ভূমিকম্প, নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনইত্যাদি কারণে প্রায় প্রতি বছর বাংলাদেশে বন্যা হয়ে থাকে। প্রতি বছরই এ বন্যার আকস্মিক আঘাতে বাংলাদেশের মানুষেরজীবনযাত্রা চরমমাত্রায় বিঘ্নিত হয়ে থাকে। অসংখ্য মানুষ ও গৃহপালিত পশু প্রাণ হারায়, ঘরবাড়ি ও কৃষি ফলন বিনষ্ট হয়।১৯৫৪ ও ১৯৫৫ সালের বন্যা মানুষের মনে এখনও বিভীষিকারূপে বিরাজ করছে। ১৯৬৪ সালের বন্যায় সারা দেশ প্রাবিতহয়েছিল। ১৯৭০ সালেও দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৭৪ ও ১৯৮৭ সালের বন্যায় দেশেরমারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। ১৯৮৮ সালের বন্যাও ছিল ভয়াবহ। এ বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানিসহ ফসল ও সম্পদের প্রচুরক্ষতি সাধিত হয়। শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা হয় ১৯৯৮ সালে। এ বন্যায় বাংলার মানুষের জীবনে অবর্ণনীয় কষ্টনেমে আসে। ১৯৯৮ সালের পর ২০০৪ সালে আবার বাংলাদেশের বুকে এক প্রলয়ঙ্করী বন্যা আঘাত হানে। এ বন্যায়দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০১৭ সালের বর্ষার শেষার্ধে দেশজুড়ে দেখা দেয় ভয়াবহ বন্যা। এই বন্যাএতটাই ভয়ংকর রূপ ধারণ করে যে, দেশের প্রায় ৪২টি জেলা প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।সাইক্লোন ও জলােচ্ছ্বাস : বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগ সাইক্লোন ও জলােচ্ছ্বাস। এ দুর্যোগ প্রায় প্রতিবছরই বালাদেশে কম বেশি আঘাত হানে। বাংলাদেশে সংঘটিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ১৯৭০ ও ১৯৯১ সালে দেশের২০৮পপি এসএসসি রচনা শিক্ষা।দক্ষিণাঞ্চলের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সাইক্লোন ও জলােচ্ছ্বাস ছিল স্মরণকালের ভয়াবহ দুর্যোগ। এ সব সাইক্লোন ওজলােচ্ছ্বাসে ১৯৭০ সালে প্রায় ৫ লাখ এবং ১৯৯১ সালে প্রায় দেড় লাখ লােকের প্রাণহানি ঘটে। আশ্রয়চ্যুত হয় লক্ষ লক্ষনারী-পুরুষ। এ সাইক্লোন ও জলােচ্ছ্বাসের ফলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতিসহ যােগাযােগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, লণ্ডভণ্ডহয়ে পড়ে সবকিছু। ফলে মানুষ পতিত হয় অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশায়।১৫ নভেম্বর, ২০০৭-এ ‘সিডর’ নামে প্রচন্ড এক সাইক্লোন বাংলাদেশে আঘাত হানে। এটা ছিল বাংলাদেশের অতীতের।সবগুলাে সাইক্লোনের চেয়ে শক্তিশালী। বাতাসে এর গতিবেগ ঘণ্টায় ২৪০ কি. মি. রেকর্ড করা হয় এবং কোনাে কোনােস্থানে জলােচ্ছ্বাসের উচ্চতা ছিল ২০ ফুটের বেশি। মাত্র দুঘণ্টা স্থায়ী এ সাইক্লোনে কমপক্ষে ১০,০০০ লােকের মৃত্যু ঘটেছে।বলে ধারণা করা হয়। অনেক ফসলি জমি ধ্বংস হয়ে যায়। পাশাপাশি নয় লাখ পরিবার ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রায়।আড়াই লাখ গবাদিপশুর প্রাণহানি ঘটে। সুন্দরবনের পূর্বাঞ্চল পুরােপুরিভাবে বিপর্যস্ত হয়। পুরাে এলাকা মাটির সাথে মিশে যায়এবং যােগাযােগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।২০১৯ সালে ‘ফনী’ ও ‘বুলবুল’ নামে দুটি প্রবল ঘূর্ণিঝড় পরপর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আঘাত হানে। ৪ মে ২০১৯ ‘ফনী’ নামের ঘূর্ণিঝড়টির কবলে পড়ে দেশের উপকূলবর্তী এলাকার প্রায় ২৫ জন মানুষ প্রাণ হারায় এবং বিপুল ফসলহানি সহ বহু ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। গত ১০ নভেম্বর ২০১৯ তারিখে ‘বুলবুল’ নামের আরেকটি ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়েবাংলাদেশ। এর ভয়াবহতা বিবেচনা করে বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখানাে হয়। যারগতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১৪০ কিলােমিটার। এর প্রভাবে সারাদেশে প্রায় ১৭ জন প্রাণ হারায় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিতহয়।অনাবৃষ্টি বা খরা : বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের কৃষি ব্যবস্থা সম্পূর্ণ রূপে প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। কিন্তুপ্রকৃতির হেয়ালিপনার শিকার এ দেশ প্রায় প্রতি বছরই অনাবৃষ্টি বা খরার মতাে মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পতিতহয়। খরার প্রচণ্ড তাপদাহে মাঠ-ঘাট ফেটে চৌচির হয়ে যায়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে সংঘটিত খরার প্রকোপে খরাপীড়িতএলাকার শস্যাদি পানির অভাবে শুষ্ক হয়ে লাল বর্ণ ধারণ করে এবং গাছপালা শুকিয়ে যেতে থাকে। আবাদি জমির ফসলেরব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়। জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠে। খরার হিংস্র থাবার ফলে দেখা দেয় খাদ্যাভাব ও বিভিন্ন রােগ-শােক।নদী-ভাঙন : নদীমাতৃক বাংলাদেশের বুক চিরে বয়ে গেছে হাজারাে ছােট-বড় নদী। নদীর ধর্মই হলাে এপাড় ভেঙেওপাড় গড়া। কিন্তু নদীর এ সর্বনাশা ভাঙন এক মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রতি বছরই এ দেশের প্রচুর সম্পদ নদীগর্ভেবিলীন হয়ে যায়। এক জরিপে উঠে এসেছে এদেশে প্রতি বছর নদী ভাঙনে প্রায় ২০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয় এবংপ্রায় ১০ লক্ষ পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষভাবে নদী ভাঙনের শিকার হয়। এ দুর্যোগের কবলে পড়ে এদেশের বহুলােককেতাদের ঘর-বাড়ি, ধন-সম্পদ হারিয়ে উদ্বাস্তু জীবনযাপন করতে হয়।ভূমিকম্প : প্রাকৃতিক দুর্যোগের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ হচ্ছে ভূমিকম্প। ভূমিকম্পই একমাত্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ যার কোনােপূর্বাভাস নেই। ফলে এ দুর্যোগে আগাম সতর্কতা অবলম্বন করা সম্ভবপর হয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ ভূমিকম্পেরঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ। বিভিন্ন কারণে এ দেশে মাঝে মাঝে ভূমিকম্প আঘাত হানে। তবে গত ৯০ বছরে কোনাে বড় ভূমিকম্পেরকবলে পড়েনি বাংলাদেশ। সর্বশেষ ১৯১৮ সালে ১৮ জুলাই শ্রীমঙ্গলে ৭.৬ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিহয়। সিডিএমপি এর এক গবেষণায় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামে ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। ধারণা করা হয়।৬-৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে কয়েক লাখ মানুষ ও প্রায় ৯৫ ভাগ বাড়ি-ঘর ধ্বংস হয়ে যাবে।লবণাক্ততা : সমুদ্র তীরবর্তী এদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলের এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হচ্ছে লবণাক্ততা। একদিকে বিশ্বেরতাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে নদীর উজানে বাঁধ নির্মাণের ফলে নদীর স্রোত প্রবাহ হ্রাসপাচ্ছে। এর ভয়াবহ পরিণতি হিসেবে বাংলাদেশের উপকূলবর্তী নদীসমূহের পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে এদেশেরবিস্তীর্ণ অঞ্চল লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। এতে মরুকরণ প্রক্রিয়ার সৃষ্টি হচ্ছে, যার ফলে ফসল উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে এবং সুপেয়পানির অভাবে জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠছে।২০৯পপি এসএসসি রচনা শিক্ষাদুর্যোগ প্রতিরােধের উপায় : আমাদের দেশের অধিকাংশ লােকের ধারণা প্রাকৃতিক দুর্যোগ স্রষ্টা প্রদত্ত। এ কথা সত্যযে, কোনাে প্রাকৃতিক দুর্যোগই মানুষের পক্ষে ঠেকানাে সম্ভব নয়। তবে সময়মতাে উদ্যোগ ও পদক্ষেপ গ্রহণ করলেক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকটা কমানাে সম্ভব। জাতীয় দুর্যোগ মােকাবেলায় সতর্কবাণী দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও বেশি সচেতনতারক্ষা করতে হবে এবং এ ব্যবস্থাকে দক্ষ ও কার্যকর করে তুলতে হবে। অতিমাত্রায় দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলােতে চাহিদানুযায়ীআশ্রয়স্থল গড়ে তুলতে হবে। সাধারণ মানুষদের মাঝে নির্ভুল তথ্য সরবরাহ করতে হবে। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্নসংস্থার মাঝে সমন্বয় সাধন করতে হবে। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটিগুলােকে নিয়ে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণকরতে হবে। দুর্যোগ পরবর্তীতে ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের ত্রাণসামগ্রী প্রদানার্থে সরকারকে সচেষ্ট থাকতে হবে।উপসংহার : প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের দেশের জন্য অভিশাপস্বরূপ। এটি আমাদের জনজীবনকে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ওঅবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রতিনিয়তই এ দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণে সরকার এবং দেশের সর্বস্তরের জনগণেরসম্মিলিত প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

বাংলাদেশের ষড়ঋতুঅথবা, বাংলাদেশের ঋতু বৈচিত্র্যচি, বা, ২০২০, ২০১৯, ২০১৫; রা. বা. ২০১৯, ২০১২;দি. বাে.২০১৭, ২০১৬, ২০১৪, ২০১২; কু. বাে, ২০১৪; ঢা. বাে, ২০১৩ভূমিকা : ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত এ ছয় ঋতুর আবর্তন বাংলাদেশকেবৈচিত্র্যময় করে তােলে। প্রত্যেকটি ঋতুরই রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। এক এক ঋতু আমাদের জীবনে আসে এক এক রকমফুল, ফল আর ফসলের সম্ভার নিয়ে। বাংলার প্রকৃতিতে ষড়ঋতুর পালাবদল আল্পনা আঁকে অফুরন্ত সৌন্দর্যের। তাতেআমাদের চোখ জুড়িয়ে যায়, আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠে হৃদয়। ঋতুচক্রের আবর্তনে প্রকৃতির সাজবদল বাংলাদেশকে রূপেররানিতে পরিণত করেছে। বাংলার অপরূপ রূপে মুগ্ধ হয়ে তাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় –“জগতের মাঝে কত বিচিত্র তুমি হে –তুমি বিচিত্ররূপিণী ॥”ঋতুচক্রের আবর্তন : বাংলাদেশের ঋতু পরিবর্তনের মূলে রয়েছে জলবায়ুর প্রভাব ও ভৌগােলিক অবস্থান। এ দেশেরউত্তরে সুবিস্তৃত হিমালয় পর্বতমালা, দক্ষিণে প্রবাহিত বঙ্গোপসাগর। মধ্যখানে দেশের বুক চিরে বয়ে গেছে হাজার নদীরস্রোতধারা। এখানে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে প্রচুর বৃষ্টি হয়। বৃষ্টির ধারা এ দেশের মাটিকে করে উর্বর, ফুল ও ফসলে করেসুশােভিত। নদীর স্রোত বয়ে আনে পলিমাটি। সে মাটির প্রাণরসে প্রাণ পায় সবুজ বন-বনানী, শ্যামল শস্যলতা। তারসৌন্দর্যে এ দেশের প্রকৃতি হয়ে উঠে অপরূপ। এভাবেই নব নব সাজে সজ্জিত হয়ে এ দেশে পরপর।বৈচিত্র্যময় ঋতুর দেশ পৃথিবীর আর কোথাও নেই।ঋতু পরিচয় : বর্ষপঞ্জির হিসাবে বছরের বারাে মাসের প্রতি দুই মাসে এক ঋতু। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মিলে গ্রীষ্মকাল,আষাঢ়-শ্রাবণ বর্ষাকাল, ভাদ্র-আশ্বিন শরৎকাল, কার্তিক-অগ্রহায়ণ হেমন্তকাল, পৌষ-মাঘ শীতকাল এবং ফাল্গুন-চৈত্রবসন্তকাল। তবে ঋতুর পালাবদল দিন-কাল মাসের হিসাব মেনে চলে না। অলক্ষে বিদায় নেয় একেক ঋতু, নিঃশব্দেআগমন ঘটে নতুন কোনাে ঋতুর। প্রকৃতির এক অদৃশ্য নিয়মে যেন বাধা ঋতুচক্রের এই আসা-যাওয়া।গ্রীষ্মকাল : ঋতু আবর্তনের শুরুতেই আসে গ্রীষ্মকাল। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপে খাল-বিল, ডােবা, পুকুর শুকিয়ে যায়। নদ-নদীর পানি কমে যায়। মাঠ-ঘাট খা খা করতে থাকে। সবুজ ঘাসের উপর পড়ে ধুলার আস্তরণ। প্রকৃতিতে কখনাে তিন চারদন গুমােট ভাব বিরাজ করে। আবার কখনাে শুরু হয় কালবৈশাখীর তাণ্ডব নৃত্য। ভেঙে যায় গাছপালা, ঘরবাড়ি, লণ্ডভণ্ডছয়টি ঋতু।২১০পপি এসএসসি রচনা শিক্ষাকরে দেয় সবকিছুকে। অন্যদিকে বাংলার প্রকৃতি অকৃপণ হাতে উপহার দেয় নানা ধরনের ফল-ফলাদি যেমন-আম, জাম,লিচু, কাঠাল ইত্যাদি। গ্রীষ্মের প্রকৃতির বর্ণনা দিতে গিয়ে কবির মুখে শােভা পায় –“রােদ যেন নয় শুধু ঘন ঘন ফুলকিআগুনের ঘােড়া যেন ছুটে চলে দুলকি।”বর্ষাকাল : গ্রীষ্মের পরেই বর্ষা আসে মহাসমারােহে। আকাশে কালাে মেঘের ঘনঘটা। শুরু হয় অঝাের বৃষ্টিপাত ।অবিরাম বর্ষণে নদী-নালা ও খাল-বিল পানিতে ভরে যায়। বর্ষার নতুন পানিতে গ্রামের দামাল ছেলেরা বাধাহীনভাবে হৈ-হুল্লোড়ে মেতে ওঠে। অনেক সময় দিনের পর দিন আকাশে সূর্যের মুখ দেখা যায় না। সারা দিন মুষলধারে বৃষ্টিপাত হয়।প্রকৃতিতে ফিরে আসে সজীবতা। জমিতে জমিতে ধান, কৃষকের মুখে হাসির বান। এ দৃশ্য দেখে কবিমন গেয়ে উঠে“বাদলের ধারা ঝরে ঝর ঝরআউসের ক্ষেত জলে ভর ভর।কালিমাখা মেঘে ওপারে আঁধারঘনিয়েছে দেখ চাহিরে।”শরৎকাল : বর্ষা শেষে শরৎ আসে তার মনােমুগ্ধকর রূপ নিয়ে। এ রূপের জন্যই শরৎকে বলা হয় ঋতুর রানি।আকাশে তখন সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়। শরতের মায়াময় রৌদ্রকিরণে প্রকৃতি চঞ্চল হয়ে উঠে। গাছপালা, তরুলতায় তখনদেখা যায় সবুজের সমারােহ। নদীতীরে কাশফুল ফোটে। রাত্রিতে শিশির ঝরে। শিউলি ফুলের গন্ধে মন উদাস করেতােলে। বাংলাদেশের রূপ-লাবণ্য যেন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠে। শুরু হয় শারদীয় উৎসব। শরতের সৌন্দর্যে বিমােহিতকবির উচ্চারণ“আজিকে তােমার মধুর মুরতিহেরিনু শারদ প্রভাতে।”হেমন্তকাল : শরতের পর আসে হেমন্ত। মাঠে মাঠে তখন ফসল কাটার গান। ঘরে ঘরে চলে নবান্ন উৎসব, আত্মীয়-স্বজনকে পিঠাপুলি খাওয়ানাের নিমন্ত্রণ। প্রভাতে সূর্যকিরণে দূর্বাঘাসের উপরে শিশির বিন্দুগুলাে মুক্তার মতাে উজ্জ্বল হয়েউঠে। হেমন্তের প্রকৃতিতে সৌন্দর্যের জৌলুশ নেই, রূপসজ্জার প্রাচুর্য নেই, কিন্তু আছে এক কল্যাণী মূর্তি। তাই রূপালি হেমন্তমানবমনে বয়ে নিয়ে আসে আনন্দ। রাশি রাশি ভারা ভারা সােনার ধান কৃষকের চোখে জাগায় নতুন স্বপ্ন। হেমন্ত প্রকৃতিরদিকে তাকিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গেয়েছেন –“কী শােভা কী ছায়া গাে –কী স্নেহ কী মায়া গােকী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলেনদীর কূলে কূলে।”শীতকাল : হেমন্তের পর আসে মাঘের সন্ন্যাসী শীত। প্রকৃতি তখন শীর্ণ, শুষ্ক ও ম্লান থাকে। সর্বত্রই রিক্ততার আভাস।উত্তুরে হাওয়া বইতে থাকে। লেপ, চাদর ও গরম কাপড় মুড়ি দিয়ে সবাই শীত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে।মানুষের মন থাকে ক্লান্ত ও নিস্তেজ। তবু খেজুর রসের পায়েস, টাটকা শাকসবজি, নানা রকমের পিঠা বাঙালির জীবনে বয়েআনে খুশির জোয়ার। এ খুশিতে একাত্ম হয়ে কবি গেয়ে উঠেন“পৌষ-পার্বণে পিঠা খেতে বসে খুশিতে বিষম খেয়ে,আরও উল্লাস বেড়েছে মনে মায়ের বকুনি খেয়ে।”বসন্তকাল : সবশেষে আসে ঋতুরাজ বসন্ত। প্রকৃতি তার সন্ন্যাসবেশ ত্যাগ করে নতুন রূপ ধরে। তখন গাছে গাছে ফুল,ফুলে ফুলে অলি, সুন্দর ধরাতল। পাখির কলকাকলি, কোকিলের সুমধুর তান, দক্ষিণের হাওয়া, আম্রমুকুলের গন্ধ, ফুলেরপপি এসএসসি রচনা শিক্ষা২১১সমারােহ প্রভৃতি মিলিয়ে সৃষ্টি হয় এক অপূর্ব মায়ানােক। মানুষের প্রাণে তখন আনন্দের জোয়ার। আনন্দে আত্মহারা কবি।গেয়ে উঠেন।* ওগাে দখিনা মলয় , আজি তব পরশনেকার কথা পড়ে মনে।মধুপ হয়েছে আজি পাগলপারাকুসুমে কুসুমে তাই জেগেছে সাড়া।”উপসংহার : রূপসি বাংলার রঙ্গমঞ্চে ষড়ঋতুর বিচিত্র লীলা যুগ যুগ ধরে অভিনীত হচ্ছে। এ অভিনয়ের পালায় মানুষেরমনেও বিচিত্র রূপের প্রতিফলন ঘটছে। প্রকৃতির এমন রূপবৈচিত্র্য পৃথিবীর আর কোথাও নেই। তাই প্রতিটি ঋতুই আপনবৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। ছয়টি ঋতু যেন ছয়টি রঙের পাখি, নিজস্ব সুরে করে ডাকাডাকি। রূপবৈচিত্র্যের প্রাকৃতিক খেলারকারণেই বাংলার মানুষের মন এত উদার ও কোমল।

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকুি. বাে, ২০১৬; সি. বাে, ২০১৬; য, বাে, ২০১৩; রা. বাে, ২০১৩]ভূমিকা : বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশির বুক চিরে গাঙ্গেয় অববাহিকায় সগর্বে জেগে উঠা পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপআমাদের এ প্রিয় বাংলাদেশ। এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার পাঁচশত সত্তর বর্গ কিলােমিটারের উর্বর পলল-সমৃদ্ধ ছােট্ট এইদেশটি রূপবৈচিত্র্যের বিচারে পৃথিবীতে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। সাগরের গর্জন, অসংখ্য নদীর বহমানতা,ভূলভাগের সবুজ শ্যামলিমা, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র আর অতুলনীয় ঋতুবৈচিত্র্যের পটভূমিতে এদেশে যে অনুপম দৃশ্যেরঅবতারণা হয় তা মানুষকে মুহূর্তেই ভাবুক করে তােলে। তাই মনের অজান্তেই কবিমন গেয়ে উঠে।“এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমিসকল দেশের রানি সে যে আমার জন্মভূমি।”সমুদ্র সৈকত : বাংলাদেশের জক্সবাজার সমুদ্র সৈকত পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত। এ ছাড়া কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতবিশ্বের আকর্ষণীয় সমুদ্র সৈকতগুলাের একটি। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের এক অনন্য স্বাক্ষর এ দুটি সমুদ্র সৈকত।এ দু’টি সৈকত ফেনিল সাগরের সুনীল বুকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের যে মােহনীয় আবেশ সৃষ্টি করে তা দেশি-বিদেশিপর্যটকদেরকে দুর্বার বেগে আকর্ষণ করে। এ দু’টি স্থানের নান্দনিক সৌন্দর্য প্রতিটি মানুষকে আবেশে উন্মনা করে দেয়।নদ-নদী ও হাওর-বাঁওড় : বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রসহ অসংখ্য নদী সারাদেশেজালের মতাে ছড়িয়ে থেকে এর রূপবৈচিত্র্যে সৃষ্টি করেছে এক অসাধারণ আমেজ। নদ-নদীর ভূমিকাতেই শস্য-শ্যামল ওসমৃদ্ধ বাংলাদেশ। মাঠের সবুজ, ফসলের হাসি, কিংবা বন-বনানীর শ্যামলতা নদ-নদীর জলধারার গৌরবকেই প্রকাশকরে। নদীর বুকে পানকৌড়ি, গাংচিলসহ অসংখ্য পাখির জলকেলি আর সারি বেঁধে বয়ে চলা রং-বেরঙের পালতােলা নৌকারদৃষ্টিনন্দন রূপ হৃদয়-মনে এক অনির্বচনীয় আনন্দের সৃষ্টি করে। তদুপরি পালতােলা নৌকার উদাস মাঝি আনমনে গেয়েউঠে—“মন মাঝি তাের বৈঠা নেরেআমি আর বাইতে পারলাম না।”তখন আমাদের হৃদয়ও যেন হারিয়ে যেতে চায় দূর অজানায়। অপরদিকে পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জজুড়ে অবস্থিতচলনকিল এবং সিলেট অঞ্চলের হাকালুকি হাওরসহ অসংখ্য হাওর-বাঁওড় এদেশের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে বিশিষ্টতা দানকরেছে। তাই আজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এগুলাে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে।বিস্তীর্ণ সমভূমি অঞ্চল : বাংলাদেশের বেশিরভাগ স্থান পলিগঠিত বিস্তীর্ণ সমভূমি অঞ্চল। উর্বর এ সমভূমি অঞ্চলেদৃষ্টিগােচর হয় সবুজের সমারােহ। সমুখের বিস্তীর্ণ মাঠের দিকে তাকালে মনে হয় এ যেন সবুজের বিশাল সমুদ্র। শস্যসম্ভবাপপি এসএসসি রচনা শিক্ষাতৃণরাশি যখন মৃদুমন্দ বাতাসে আলােড়িত হয় তখন মনে হয় সবুজ উর্মিমালা ধেয়ে যাচ্ছে দিগন্তের পানে। আর এমনইকোনাে অপরূপ মুহূর্তে কবিমন অকস্মাৎ গেয়ে উঠে।“ধানের ক্ষেতে বাতাস নেচে যায়।দামাল ছেলের মতােডাক দে বলে আয়রে তােরা আয়ডাকব তােদের কত।”পাহাড়িয়া অঞ্চল : পাহাড়িয়া অঞ্চল বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে। এ অঞ্চলটি বৃহত্তর ময়মনসিংহ,সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামজুড়ে বিস্তৃত। ময়মনসিংহের মধুপুরের গড়, গাজীপুরের ভাওয়ালের গড় ও কুমিল্লার লালমাইপাহাড় যেন অপার সৌন্দর্যের আধার। এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িয়া অঞ্চল, গারাে পাহাড়ের পাদদেশ ও সিলেটেরসবুজে সবুজে ছাওয়া বিস্তীর্ণ চা বাগানসহ সমগ্র পাহাড়িয়া অঞ্চল জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ।পল্লি প্রকৃতি : বাংলাদেশ গ্রামপ্রধান দেশ। এখানে শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে। প্রকৃতির অপরূপ রূপবৈচিত্র্যগ্রামবাংলাকে ঋদ্ধ করেছে। গ্রামের সৌন্দর্য অকৃত্রিম। যতদূর দৃষ্টি যায় সবুজ মাঠ আর সােনালি শস্যের সমারােহ। মেঠোপথ বেয়ে গাছপালায় ঘেরা ছােট ছােট ঘরগুলাে যেন এক একটি শান্তির নীড়। পুকুর, নালা বা বিলের কাকচক্ষু জলে ফুটেথাকা শাপলা কিংবা পদ্মের সৌন্দর্য মানুষকে মুগ্ধ করে। ক্লান্ত রাখালের অপূর্ব বাঁশির সুর দশদিক আলােড়িত করে। চিরন্তনগ্রামবাংলার এই নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে মুগ্ধ কবি গেয়ে উঠেছেন।“অবারিত মাঠ, গগন ললাট, চুমে তব পদধূলিছায়া সুনিবিড়, শান্তির নীড়, ছােট ছােট গ্রামগুলি।পল্লব ঘন আম্রকানন রাখালের খেলাগেহ।স্তব্ধ অতল দীঘি কালাে জল নিশীথ শীতল স্নেহ।”ঋতুবৈচিত্র্য : ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। এ ছয় ঋতুর আবর্তন বাংলাদেশকেবৈচিত্র্যময় করে তােলে। বছরের শুরুতে নতুনের বার্তা নিয়ে আগমন ঘটে গ্রীষ্মের। এর আগমনে বাংলার প্রকৃতি রুক্ষ, বিবর্ণও বিশুষ্ক হয়ে উঠে। হারিয়ে যায় সবুজ প্রকৃতির শ্যামল শােভা। ভয়াল রুদ্র রূপ নিয়ে ধুলাের ঝড় তুলে আসে কালবৈশাখী।প্রকৃতিকে নবরূপে সজ্জিত করার জন্যই বুঝি গ্রীষ্মের এই দুর্দান্ত আগমন। অতঃপর বর্জের কাড়া-নাকাড়া বাজিয়ে, বিদ্যুতেরপতাকা উড়িয়ে বর্ষা আসে দিগ্বিজয়ী যােদ্ধার মতাে। প্রকৃতির সমগ্র অবয়বে বর্ষা আনে এক সতেজ কোমলতা। বৃষ্টিরঅঝাের ধারায় গাছে গাছে, পাতায় পাতায় লাগে শিহরণ, জাগে সজীবতা। আর এই সজীবতা দোলা দেয় মানব মনকেও।রবীন্দ্রনাথের ভাষায়-“ এমন দিনে তারে বলা যায়।এমন ঘনঘাের বরিষায়।”বর্ষা যখন অলস মন্থর, একঘেয়েমি আর বিষন্ন বিধুর নিঃসঙ্গতায় রূপান্তরিত হয় ঠিক সেই মুহূর্তে মেঘ ও রৌদ্রেরলুকোচুরি খেলতে খেলতে হালকা চপল ছন্দে শরৎ আসে। এ যেন একটু মেঘ, এক পশলা বৃষ্টি, এক ঝলক হাওয়া আরপরক্ষণেই সােনালি রােদ্র। এ সময় বাতাসে এক খুশির সুর বেজে উঠে। এরপর আসে হেমন্ত । সঁঝের পর হালকাকুয়াশায় জোনাকির মিটিমিটি জ্বলার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা যায় এ ঋতুতেই। এই আলাে-আঁধারি কুয়াশা গায়ে মেখেই বড়কুণ্ঠিত পদক্ষেপে সমৃদ্ধি নিয়ে কৃষকের দুয়ারে আবির্ভূত হয় হেমন্ত। হেমন্তের উৎসবমুখর গ্রামবাংলার হিমেল পরশ বুলিয়েএকদিন শীত আসে। প্রকৃতি এ সময় যেন সমস্ত সাজ-সজ্জা ফেলে দিয়ে রিক্ত বৈরাগীর রূপ পরিগ্রহ করে। অপরদিকে বিচিত্রবর্ণ ও গন্ধের ফুলে ফুলে প্রকৃতির আঁচল ভরে উঠে। অবশেষে মাঘের তুহিন শীতল বন্ধন ছিন্ন করে বেরিয়ে আসে সুসজ্জিতা।ফাগুন, আসে বসন্ত তার রাজসিক রূপমাধুর্য নিয়ে। সবুজ কিশলয়ে বিকশিত হয় পত্রহীন শূন্য বৃক্ষশাখা। অশােক, পলাশ,২১৩পপি এসএসসি রচনা শিক্ষাকৃষ্ণচূড়া আর শিমুলের বনে যেন আগুন লাগে রক্তরঙিন ফুলের। এভাবে ছয়টি ঋতুর পালাবদলে বাম্পার প্রকৃতি হয়ে উঠেছে।রূপমাধুর্যের এক অপরূপ লীলাকেন্দ্র।উপসংহার : সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা আমাদের এই বাল্লাদেশের অপরূপ সৌন্দর্য পৃথিবীখ্যাত। প্রকৃতির বিচিত্রসৌন্দর্য মানুষের মনের উপর গভীর প্রভাব ফেলে, যা যুগে যুগে বাছায় কালজয়ী গীতি-কাব্যসাহিত্য সৃষ্টিতে অবদানরেখেছে। বাংলার সবুজ-শ্যামল প্রান্তর, বয়ে চলা নদী, ঋতুবৈচিত্র্যের অপূর্ব সমাহার এদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকেমনােমুগ্ধকর করে তুলেছে। এজন্যই বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম সুরম্য লীলা-নিকেতন।

বৃক্ষরােপণ ও বনায়নঅথবা, পরিবেশ সংব্রক্ষণে বনায়নঅথবা, বৃক্ষরােপণ অভিযানবিরি, বাে, ২০২০, ২০১৫; রা. বাে, ২০২০, ২০১৩। বরি. বাে, ২০১১; সি. বাে. ২০১৯;]ভূমিকা : “দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর”- কবির এ আবেদন অরণ্য সৃষ্টির জন্য। কারণ, অরণ্য জীবনেরমতােই প্রয়ােজন। বৃক্ষ আমাদের পরম বন্ধু। বৃক্ষ শুধু প্রাকৃতিক শােভাই বর্ধন করে না, মাটির ক্ষয় রােধ করে, বন্যাপ্রতিরােধ করে, ঝড়-তুফানকে বাধা দিয়ে জীবন ও সম্পদ রক্ষা করে। আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণেও বৃক্ষের ভূমিকা অপরিসীম।বৃক্ষ ছাড়া পৃথিবী মরুভূমিতে পরিণত হতাে। বৃক্ষ অক্সিজেন সরবরাহ করে আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। তাই বৃক্ষকে বলা হয়,প্রাণের অগ্রদূত।বৃক্ষরােপণ কী : দেশের প্রাকৃতিক বন ছাড়া বৃক্ষের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমেবিজ্ঞানসম্মতভাবে ব্যাপকভিত্তিক গাছ লাগানাে, পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিই বৃক্ষরােপণ ।বাংলাদেশে বনাঞ্চলের বর্তমান অবস্থা : বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বন দিনে দিনে কমছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে,কোনাে দেশের কাম্য পরিবেশের জন্য সে দেশের মােট আয়তনের ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়ােজন। কিন্তু প্রয়ােজনের।তুলনায় বাংলাদেশে বনভূমি খুবই কম। এখানে ৫৫,০০০ বর্গমাইল এলাকায় মাত্র ১০,০০০ বর্গমাইল বনভূমি রয়েছে, যাদেশের মােট আয়তনের মাত্র ১৭ ভাগ।বৃক্ষ হ্রাসের কারণ : এককালে এদেশের বনভূমি মুখরিত থাকত পাখির কলতানে। ছিল ফলবান বৃক্ষের বাগানে শ্যামলশােভা, অরণ্যে বিপুল বৃক্ষরাজি। কিন্তু আধুনিক জীবন ও সভ্যতার গ্রাসে সবুজ বাংলার সেই শ্যামল সুন্দর রূপ আজঅনেকটাই ম্লান। প্রয়ােজনে-অপ্রয়ােজনে নির্বিচারে প্রতিনিয়ত কাটা হচ্ছে বৃক্ষ। ক্রমবর্ধমান বিপুল জনসংখ্যার আবাসস্থলেরপ্রয়ােজনে বন কেটে উজাড় করা হচ্ছে। ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে চাষাবাদ সম্প্রসারণ, জ্বালানির চাহিদা মেটানাে এবংবিভিন্ন নির্মাণ কাজে ব্যবহার, আসবাবপত্র তৈরি ইত্যাদির জন্য প্রতিনিয়ত বৃক্ষনিধন করা হচ্ছে। তা ছাড়া ঝড়-ঝঞা, বন্যাইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় অধিক সংখ্যক বৃক্ষ বিনষ্ট হচ্ছে। ভূমিক্ষয়ে নষ্ট হচ্ছে বনভূমি।বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় অনুপ্রবেশকারীর কার্যাবলি বেড়ে গিয়ে বন ধ্বংস হচ্ছে। বন সংরক্ষণ আইনে ফাঁক থাকা ওযথাযথ প্রয়ােগ না হওয়াও বন ধ্বংস তথা বৃক্ষ হাসের অন্যতম কারণ।পরিবেশের উপর বৃক্ষ হ্রাসের প্রভাব : প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষের ভূমিকা অপরিসীম। বনভূমির অভাবেঅনাবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, জলােচ্ছ্বাস দেখা দেয়। বায়ুমণ্ডল ক্রমাগত উত্তপ্ত হয়ে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে। দেশের নিম্নাঞ্চলতলিয়ে যাবার সম্ভাবনা দেখা দেয়। বৃক্ষনিধনের ফলে আবাসস্থল হারিয়ে অনেক পশুপাখির অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন। বৃক্ষ২াসের ফলে ভূমিক্ষয় বৃদ্ধি পায় ও মৃত্তিকার উর্বরতা কমতে থাকে। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস বৃদ্ধি, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচেচলে যাওয়া, নদীর পানি বৃদ্ধি ও গতি প্রবাহ পরিবর্তন এবং পলি পতন বৃদ্ধি ক্রমাগত বৃক্ষ হ্রাসের ফল। পর্যাপ্ত গাছ না।২১৪পপি এসএসসি রচনা শিক্ষাথাকলে বায়ু প্রবাহের অনিয়ন্ত্রিত গতির ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। বায়ুমন্ডলে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বেড়েআবহাওয়ার চরমভাবাপন্নতা বৃদ্ধি পায়। বৃক্ষ হ্রাসের ফলে পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হয় ও গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়ার মতােবিভিন্ন মারাত্মক প্রাকৃতিক সমস্যা সৃষ্টি হয়।বৃক্ষরােপণের প্রয়ােজনীয়তা : বৃক্ষের প্রয়ােজনীয়তা অপরিসীম। বিভিন্ন জৈবিক ক্রিয়ার মাধ্যমে অনাদিকাল থেকেবৃক্ষরাজি প্রাকৃতিক ভারসাম্য এবং পরিবেশ দূষণ থেকে আমাদেরকে রক্ষা করে আসছে। বৃক্ষ বাতাসের অতিরিক্ত কার্বন।ডাইঅক্সাইড শােষণ করে এবং অক্সিজেন ত্যাগ করে। এতে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ও কার্বন ডাইঅক্সাইডের ভারসাম্য রক্ষাপায়। বৃক্ষ শিকড়ের মাধ্যমে মাটিকে আটকে রেখে ভূমিক্ষয় রােধে সাহায্য করে, ভূ-গর্ভস্থ পানির মজুদ বৃদ্ধি করে এবংনদ-নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে। তাছাড়া বৃক্ষ উচ্চ তরঙ্গবিশিষ্ট শব্দকে শােষণ করে শব্দ দূষণ থেকে পরিবেশকে রক্ষাকরে। বন্য জীবজন্তু, পাখি ও কীটপতঙ্গকে আশ্রয় দেয় ও খাদ্য যােগায় বৃক্ষরাজি। প্রয়ােজনীয় ও পর্যাপ্ত বৃক্ষ ঝড়,জলােচ্ছাস, বন্যা প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে জনপদ রক্ষা করে। বৃক্ষ মানুষকে খাদ্য ও পুষ্টি যােগায়, গৃহ ও অন্যান্যনির্মাণ কাজে কাঠের যােগান দেয়। মানুষকে আর্থিক সংকট থেকে রক্ষা করে বৃক্ষ। বৃক্ষ ছায়া দেয়, জীবনরক্ষাকারীঅক্সিজেন দেয়, ওষুধ দেয় এবং জ্বালানি দেয়। বৃক্ষ থেকে কাগজের মণ্ড এবং রেয়ন শিল্পের কাঁচামাল ও দিয়াশলাই তৈরিহয়। বৃক্ষ থেকে ধুনা, লাক্ষা, গদ, কপুর, তারপিন তেল ও রাবার পাওয়া যায়। বনাঞ্চলে ফল-ফুল, মধু ও মােম পাওয়া।যায়। এক কথায় মানুষ ও প্রাণীর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বৃক্ষের প্রয়ােজনীয়তা অপরিসীম।বৃক্ষরােপণ অভিযান : পরিবেশের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার প্রভাবে মানুষের যে সব ক্ষতি সাধিত হয় তা থেকে রক্ষা পেতেহলে আমাদের অবশ্যই প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার পথ বের করতে হবে। এ জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়ােজন নিবিড় বনায়ন। এলক্ষ্যেই দেশে প্রতি বছর পালিত হচ্ছে ‘বৃক্ষরােপণ অভিযান।বৃক্ষরােপণে গৃহীত পদক্ষেপ : বৃক্ষরােপণ ও বনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার এরই মধ্যে বিরাটকর্মসূচি হাতে নিয়েছে। সরকারিভাবে প্রতিটি থানা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড এবং গ্রামপর্যায়ে এ কর্মসূচিকে সফল করার নির্দেশদেওয়া হয়েছে। দেশের সর্বত্র অনাবাদি জায়গায়, বাঁধের উপর, রাস্তার দুই পাশে, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালতেরআঙিনায় এবং বাড়ির আশেপাশে বৃক্ষরােপণের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানাে হচ্ছে।গত ১০০ বছরে বনাঞ্চল ব্যাপকভাবে উজাড় হওয়ায় বাংলাদেশ যে ব্যাপক ক্ষতির মুখােমুখি তা পূরণের চেষ্টা এখনচলছে। এর মধ্যে কমিউনিটি বনায়ন কর্মসূচির আওতায় ১২ হাজার একর জ্বালানি কাঠের বাগান, ৩০০ একর বন বাগান,তিন হাজার একর স্ট্রিপ বাগান স্থাপন উল্লেখযােগ্য। সাত হাজার গ্রামকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়। বনায়ন সম্পর্কেসচেতনতা সৃষ্টির জন্য ৮০ হাজার ব্যক্তিকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয় এবং জনসাধারণের মাঝে ছয় কোটি চারা বিতারণ করাহয়। এভাবে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।বৃক্ষরােপণ অভিযান সফল করার উপায় : বৃক্ষরােপণ অভিযানকে সফল করতে হলে সরকারের পাশাপাশিজনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের দেশের ষােলাে কোটি লােকের প্রত্যেকে যদি কমপক্ষে একটা করে বৃক্ষরােপণকরি, তাহলে সহসাই আমাদের এ অভিযান সফল হবে। মােটকথা, বৃক্ষরােপণকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে নাপারলে এ থেকে সর্বতােভাবে সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। সমাজে বসবাসরত মানুষকে যদি বিপন্ন পরিবেশের ভয়াবহতাসম্পর্কে অবহিত করা যায়, তাহলে অনেকেই বনায়নের কাজে এগিয়ে আসবে। তাছাড়া চারা উৎপাদন করে বিনামূল্যে তাজনগণের মাঝে সরবরাহ করে বৃক্ষরােপণের জন্য জনমনে চেতনা সঞ্চার করতে হবে। এ ব্যাপারে রেডিও, টেলিভিশন,মিনিপর্দা, মাইকে প্রচার, পােস্টার বিলি এবং সভা-সমিতি ব্যাপক ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রয়ােজনে বনবিভাগেরকর্মকর্তা-কর্মচারীরা উদ্বুদ্ধকরণ কাজে অংশ নিয়ে সাধারণ মানুষকে বােঝাবেন এবং বনায়নে উৎসাহিত করবেন।উপসংহার : মানুষ তথা সামগ্রিক পরিবেশের অস্তিত্ব রক্ষার্থে বৃক্ষরােপণ অভিযান একটি বিরাট পদক্ষেপ। একটিপরিচ্ছন্ন, নির্মল ও বাসােপযােগী পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অরণ্যের ভূমিকা অপরিসীম। তাই আসুন, বৃক্ষরােপণঅভিযানের মাধ্যমে আমরা লাগাই বৃক্ষ, তাড়াই দুঃখ, বাচাই পরিবেশ এবং দেশকে করি সমৃদ্ধ।

কম্পিউটারবি. বাে. ২০২০)।অথবা, কম্পিউটার ও আধুনিক জীবনঢিা.বাে, ২০২০, ২০১৪; ব, বাে, ২০২০, ২০১৭; চ. বাে, ২০১৭; ২০১৫, ২০১৪, ২০১২;দি. বাে, ২০১৬; সি. ২০১৫; কু. বাে, ২০১৩; বরি. বাে, ২০১৪]ভূমিকা : কম্পিউটার আধুনিক বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর অবদান। মানুষের সকল চাওয়াকে পাওয়ায় পরিণত করছেকম্পিউটার। কম্পিউটার মানুষের চিন্তা ও চেতনার বিকল্প হিসেবে কাজ করছে। মানুষ মস্তিষ্ক দিয়ে যে জটিল সমস্যার সহজসমাধান দিতে পারছে না, কম্পিউটার তার সমাধান দিচ্ছে অতি দ্রুত। আজকের দিনে কম্পিউটার নানা বৈচিত্র্যে এবংবহুমুখী পথ ধরে এগিয়ে চলছে অনাগত ভবিষ্যতের দিকে।কম্পিউটার : গ্রিক শব্দ ‘Compute’ থেকেই ‘Computer’ শব্দের উৎপত্তি; যার আভিধানিক অর্থ গণনাকারী বাহিসাবকারী যন্ত্র। কিন্তু এখন কম্পিউটারকে কেবল গণনাকারী যন্ত্র বলা চলে না। কম্পিউটার বলতে বর্তমানে এমন একটিযন্ত্রকে বােঝায়, যা অগণিত উপাত্ত বা তথ্য গ্রহণ করে অত্যন্ত দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে সংরক্ষণ, গণনা, বিশ্লেষণ ইত্যাদি করাসহসিদ্ধান্ত উপস্থাপন করতে পারে। ইলেকট্রনিক প্রবাহের মাধ্যমে এটি তার যাবতীয় কার্য সম্পাদন করে।কম্পিউটারের ইতিহাস : সভ্যতার শুরু থেকে বিভিন্ন গণনার যন্ত্র উদ্ভাবনের প্রচেষ্টাকে কম্পিউটারের ইতিহাস হিসেবেধরা হয়। অব্যাকাস নামক একটি প্রাচীন গণনা যন্ত্রকেই কম্পিউটারের ইতিহাসে প্রথম যন্ত্র বলে মনে করা হয়। ১৬৪২ সালে।ফরাসি বিজ্ঞানী ব্রেইজ প্যাসকেল আবিষ্কার করেন যান্ত্রিক ক্যালকুলেটর। ১৮১২ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী চার্লস ব্যাবেজগাণিতিক সমস্যা সমাধানে ডিফারেন্সিয়াল ইঞ্জিন এবং ১৮৩৩ সালে আরও উন্নত স্বয়ংক্রিয় গণকযন্ত এনালিটিক্যাল ইঞ্জিনউদ্ভাবন করেন। আজ আমরা যে কম্পিউটার ব্যবহার করি তা ব্যাবেজের গঠনতত্ত্ব অনুযায়ী নির্মিত। এ কারণে চার্লসব্যাবেজকে কম্পিউটারের জনক বলা হয়। জন ভন নিউম্যানকে বলা হয় আধুনিক কম্পিউটারের জনক। মার্ক-১ হলাে।প্রথম ডিজিটাল কম্পিউটার। ১৯৪৪ সালে এটি নির্মাণ করেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাওয়ার্ড একিন এবংআবিএম-এর প্রকৌশলীরা। তবে আজকাল যে মডেলের কম্পিউটার প্রচলিত এ ধরনের কম্পিউটার প্রথম তৈরি করেছিল।যুক্তরাষ্ট্রের পেনিনসুলা বিশ্ববিদ্যালয়। এর নাম রাখা হয় এনিয়াক (ENIAC-Electronic Numerical Integrator andComputer)। এটি নির্মিত হয় ১৯৪৬ সালে।কম্পিউটারের প্রজন্ম : কম্পিউটার আবিষ্কার হওয়ার পর থেকে এর প্রযুক্তিগত উন্নতি, কাজের গতি এবং আকৃতিগতপরিবর্তন বা বিবর্তন ঘটতে থাকে। এ বিবর্তন ও বিকাশের এক একটি ধাপকে প্রজন্ম বলে। প্রযুক্তিগত উন্নয়নকম্পিউটারকে উন্নত থেকে উন্নততর করেছে। একটি প্রজন্ম থেকে আরেকটি প্রজন্মের পরিবর্তনের সময় সমস্যাগুলােরসমাধান করে নতুন কিছু বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় ঘটিয়ে এক একটি প্রজন্মের আত্মপ্রকাশ ঘটানাে হয়। প্রথম প্রজন্মেরকম্পিউটারে ভ্যাকুয়াম টিউব ব্যবহার করা হতাে। হাজার হাজার ডায়ােড, রেজিস্টার, ক্যাপাসিটর ইত্যাদি দিয়ে তৈরি হতােবলে এরা আকারে অনেক বড় ছিল। তবে এগুলাের তথ্য ধারণ ক্ষমতা খুবই কম ছিল। চালু অবস্থায় ভীষণ গরম হয়ে যেত,তাই মাঝে মাঝে ঠাণ্ডা পানি ব্যবহার করতে হতাে। এ কম্পিউটারগুলাে ব্যয়বহুল হলেও কম নির্ভরযােগ্য ছিল। কাজেরগতিও ছিল মন্থর। তারপর ধাপে ধাপে উন্নত হয়ে সত্তরের দশকে চালু হয় চতুর্থ প্রজন্মের কম্পিউটার। আশির দশকে চতুর্থপ্রজন্ম থেকে মাইক্রো কম্পিউটার চালু হয়। ফলে কম্পিউটারের আকার ছােট হয়। তবে এর গতি বেড়ে যায়। অচিরেইপঞ্চম প্রজন্মের কম্পিউটার আসছে। মানুষের কণ্ঠস্বর সনাক্ত করার ক্ষমতা ও কণ্ঠের নির্দেশ বুঝতে পেরে কাজ করার ক্ষমতাথাকবে এসব কম্পিউটারের।কম্পিউটারের গঠন : কম্পিউটারের অনেক যন্ত্রাংশ থাকলেও গঠনরীতিতে প্রধান দুটি দিক লক্ষ করা যায়। একটিহলাে যান্ত্রিক সরঞ্জাম বা হার্ডওয়্যার এবং অন্যটি প্রােগ্রাম সম্পর্কিত বা সফটওয়্যার। হার্ডওয়্যারের মধ্যে রয়েছে তথ্য।৬পপি এসএসসি রচনা শিক্ষা।সব্রক্ষণের স্মৃতি, অভ্যন্তরীণ কার্যের জন্য ব্যবহৃত তাত্ত্বিক দিক, তথ্য সংগ্রহের জন্য ইনপুট অংশ, ফলাফল প্রদর্শনের জন্যআউটপুট অংশ এবং সকল বৈদ্যুতিক বর্তনী। এসব যান্ত্রিক সরঞ্জামের কাজ হলাে প্রােগ্রামের সাহায্যে কম্পিউটারকে কর্মক্ষমকরে তােলা।বাংলাদেশে কম্পিউটার : বাাদেশে কম্পিউটারের পদ্যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৪ সালে আণবিক শক্তি কমিশনে IBM -1620 সিরিজের একটি কম্পিউটার আমদানির মাধ্যমে। আশির দশক পর্যন্ত এদেশে কম্পিউটার বিষয়ে শিক্ষার কোনােসুযােগ ছিল না। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে এদেশে আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কম্পিউটার শিক্ষা শুরু হয়। বিদেশিকোম্পানির মাধ্যমে কম্পিউটারের আগমন আমাদের দেশে ঘটলেও বর্তমানে তা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে ।কম্পিউটারের ব্যবহার : কম্পিউটার গণনাকারী যন্ত্র হিসেবে তৈরি হলেও আজকের দিনে তা সব কাজের উপযােগীহয়ে উঠেছে। দ্রুত ও নির্ভুল গণনা এবং তথ্য সংগ্রহ করে সঠিক হিসাবের ক্ষেত্রে কম্পিউটারের অবদান অপরিসীম। যেসবকাজ মানুষের পক্ষে অসম্ভব, সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ, কম্পিউটারের মাধ্যমে সেসব কাজ অনেক সহজ ও দ্রুততর হয়েছে।কম্পিউটার এখন রােগীর রােগ নির্ণয় করতে পারে, চিকিৎসার পদ্ধতি সম্পর্কে দিতে পারে সঠিক তথ্য ও দিক নির্দেশনা।কোনাে প্রতিষ্ঠানের সমস্ত কর্মীর মাসিক বেতন, আয়-ব্যয় সংক্রান্ত হিসাব-নিকাশ কম্পিউটারের সাহায্যে করা যায়।কম্পিউটারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের বহুবছরের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি নির্ভুলভাবে এবং সুসংবদ্ধভাবে সংরক্ষণ করা যায়।কম্পিউটার যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে, প্লেনের বা ট্রেনের আসন সুশৃঙ্খলভাবে বণ্টনের ক্ষেত্রে সহায়তা করে। বর্তমানেশিক্ষাক্ষেত্রেও ব্যাপকভাবে কম্পিউটার ব্যবহৃত হয়। কম্পিউটারের মাধ্যমে পরীক্ষার ফলাফল তৈরি এবং জমা রাখা হয়।গবেষণা পরিচালনা, তথ্য উপস্থাপন ও সংরক্ষণে কম্পিউটার ব্যবহৃত হচ্ছে। তাছাড়া বই ছাপার কাজে কম্পিউটার ব্যবহারেরফলে দেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর মধ্যে সহজে বই বিতরণ করা সম্ভব হচ্ছে। ভাস্কর কম্পিউটার নির্দেশ পেলে যে কোনােজটিল ভাস্কর্য খােদাই করতে পারে। কম্পিউটারের মাধ্যমে আসামিকে চিহ্নিত করা যায়। আবার কম্পিউটারে দাবাসহবিভিন্ন ধরনের খেলা রয়েছে, যা আমাদের চিত্তবিনােদনের অন্যতম মাধ্যম। আর এভাবে কম্পিউটার ব্যবসায়-বাণিজ্য,চিকিৎসা, খেলাধুলা, শিল্প-কারখানা, শিক্ষা, জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক, সামাজিক সর্বক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকরছে।আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও কম্পিউটার : গত দুই দশকে বিশ্বজুড়ে তথ্যপ্রযুক্তিতে ঘটেছে অভাবনীয় সব পরিবর্তন ওসাফল্য। তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে সময় ও দূরত্ব জয় হয়েছে। বাংলাদেশও তথ্য প্রযুক্তির এ জীয়নকাঠির স্পর্শে ধীরে ধীরেজেগে উঠছে। আর এই তথ্য প্রযুক্তির মূলে রয়েছে কম্পিউটার। বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এর পথে তথ্য-যােগাযােগ প্রযুক্তিতে বিপ্লব সাধিত হবে বলে আশা করা যায়। কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি ওতপ্রােতভাবে জড়িত। তথ্য সংগ্রহ,সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ ও বিতরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাই হলো তথ্য-যােগাযােগ প্রযুক্তি (ICT)। এর জন্যএকমাত্র উপায় হলাে কম্পিউটার নির্ভর যােগাযােগ ব্যবস্থা।কম্পিউটারের নেতিবাচক দিক: কম্পিউটার আবিষ্কার এবং ব্যবহারে আধুনিক বিশ্ব তথা মানবসমাজে বিপুল কল্যাণেরপাশাপাশি কিছু বিরূপ প্রতিক্রিয়াও লক্ষ করা যায়। যুদ্ধ-বিগ্রহ, অস্ত্র নির্মাণ, আকাশ দখলের প্রতিযােগিতা প্রভৃতির পেছনেকম্পিউটারের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। এছাড়া কম্পিউটারের মাধ্যমে সৃষ্ট ইন্টারনেট, ভিডিও গেম প্রভৃতির মাধ্যমে নানাকুরুচিপূর্ণ বিনােদন ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। তাছাড়া দীর্ঘ সময় কম্পিউটারের সামনে বসে থাকা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তবেকম্পিউটারের উপকারের তুলনায় তার নেতিবাচক দিক খুবই নগণ্য। যা আমরা আমাদের সচেতনতা ও সদিচ্ছার মাধ্যমেইকাটিয়ে উঠতে পারি।উপসংহার : কম্পিউটারের বিস্তৃত কর্মকাণ্ড নিয়েই আজকের জগৎ। এর সফল প্রয়ােগে আমরা অতি সহজেই আমাদেরকাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে উপনীত হতে পারি। শতাব্দীর এ বিস্ময়কর আবিষ্কারটিই সমস্যাসঙ্কুল দেশের মানুষকে আঁধার থেকেআলােতে আনার পথ দেখাবে। আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মকে কম্পিউটারের প্রতি আকৃষ্ট করতে পারলে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

শিক্ষাক্ষেত্রে কম্পিউটার।ভূমিকা : আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এক বিস্ময়কর অবদান কম্পিউটার। সভ্যতার উষালগ্ন থেকেই মানুষ আপনউদ্ভাবনী ক্ষমতার বলে নতুন নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের উচ্চ প্রযুক্তিসমন্বিত যে আবিষ্কারটি পৃথিবীকে অতীতের যে কোনাে নির্দিষ্ট শতাব্দীর চেয়ে বহুগুণে অগ্রসর করে ভবিষ্যতের এক অনন্তসম্ভাবনার দ্বার উন্মােচন করে দিয়েছে সেটি হলাে কম্পিউটার। এক অবিশ্বাস্য দুতগতিতে দিন দিন বেড়েই চলেছে এরপ্রয়ােগের ক্ষেত্র ও প্রয়ােজনীয়তা। কম্পিউটারকে বাদ দিয়ে আধুনিক সভ্যতার কথা কল্পনাও করা যায় না। আমাদেরপ্রাত্যহিক জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রের পাশাপাশি জাতীয় মেরুদণ্ড শিক্ষাক্ষেত্রেও কম্পিউটারের অবাধ বিচরণ।কম্পিউটার : গ্রিক শব্দ “Compute” থেকেই “Computer” শব্দের উৎপত্তি; যার আভিধানিক অর্থ গণনাকারী বাহিসাবকারী যন্ত্র। কিন্তু আজকাল কম্পিউটারকে কেবল গণনাকারী বলা চলে না। এখন তা এমন এক ইলেকট্রনিক যন্ত্রেরধারণা দেয় যা অগণিত তথ্য বা উপাত্ত গ্রহণ করে অত্যন্ত দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে সংরক্ষণ, গণনা, বিশ্লেষণ ইত্যাদি করতে পারেএবং সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করতে পারে। কম্পিউটার আসলে এক ধরনের যন্ত্রমস্তিষ্ক। মানুষ যেমন করে মগজে ধরে রাখা স্মৃতি,অভিজ্ঞতা, তথ্য ও তত্ত্ব কাজে লাগিয়ে সমস্যার সমাধান করে কম্পিউটারের কাজও ঠিক তেমনি।শিক্ষাক্ষেত্রে কম্পিউটার : আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতির অনন্য বাহন কম্পিউটার। আজকের উন্নত বিশ্বের সামগ্রিকশিক্ষাব্যবস্থা কম্পিউটারের উপর নির্ভরশীল। কম্পিউটারের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে প্রয়ােজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা এবং জ্ঞানরাজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিচরণ করা যায়। বিস্ময়কর ক্ষমতাধর এ যন্ত্রটি শিক্ষাক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হতে পারে। এরউল্লেখযােগ্য ব্যবহার নিচে তুলে ধরা হলাে-১. শিক্ষাদান : কোনাে একটি কাহিনি পড়া বা শােনার চেয়ে ঐ কাহিনি নিয়ে তৈরি সিনেমা বা চলচ্চিত্র মনে অনেকবেশি রেখাপাত করে। কম্পিউটারের সাহায্যে শিক্ষাদান বা গ্রহণের ক্ষেত্রে এর সবকটি সুযােগ কাজে লাগানাে যায়। নিচেরক্লাসে বর্ণ পরিচয়, গল্প , ইতিহাস ইত্যাদি কার্টুনের মাধ্যমে তুলে ধরলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী হয়।উপরের ক্লাসেও বিজ্ঞান, ভূগােল, ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়গুলাে রঙিন চিত্রে তুলে ধরে পাঠদান করা যায়। আর বিজ্ঞানেরবিভিন্ন ব্যবহারিক কার্যাবলি, প্রাণিজগতের বিচিত্র জীবনযাপন প্রণালি, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ কম্পিউটারে সচল।চিত্রে তুলে ধরা যায়। মাত্র দু-একটি বােতাম টিপলেই যখন প্রয়ােজন তখনই দেখা-শােনা-জানা যায় জন্ম বা মৃত্যুহার,রাজধানীর নাম, শিক্ষার হার প্রভৃতি তথ্য। কাজেই প্রচলিত শিক্ষাদান পদ্ধতির চেয়ে কম্পিউটারের মাধ্যমে শিক্ষাদান যেঅধিক কার্যকর, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।২. তথ্য সক্ষণ : তথ্য সংরক্ষণের এক সহজ ও গুরুত্বপূর্ণ ভান্ডার হচ্ছে কম্পিউটার। কম্পিউটারে যে কোনাে তথ্যঅনায়াসে নিরাপদে সংরক্ষণ করা যায়। যে কোনাে তথ্য উদ্ধারে সক্ষম কম্পিউটারে উপাত্তগুলাে ইচ্ছামাফিক সাজিয়ে রাখাযায়। কম্পিউটারের স্মৃতিতে গােপনীয়তার সাথে সরক্ষিত যে কোনাে তথ্যের নিরাপত্তার পূর্ণ নিশ্চয়তা থাকে। প্রযুক্তিগতউৎকর্ষতার কারণে দিন দিন কম্পিউটার তথ্য সংরক্ষণের অভিনব পন্থা আবিষ্কৃত হচ্ছে। ফলে ক্রমেই বেড়ে চলছে এরউপযােগিতা।৩. যােগাযােগ : কম্পিউটারের কল্যাণে সমগ্র পৃথিবী চলে এসেছে মানুষের হাতের মুঠোয়। ফলে যােগাযােগ ক্ষেত্রেএক অভিনব বিপ্লব সাধন করেছে কম্পিউটার। কম্পিউটারের মাধ্যমে কোনাে শিক্ষার্থী সহজেই অন্য কোনাে শিক্ষক,শিক্ষার্থী বা বিশ্বের যে কোনাে অত্যাধুনিক লাইব্রেরির সাথে অনায়াসে যােগাযােগ স্থাপন করতে পারছে ইন্টারনেটেরসাহায্যে। ফলে সে ঘরে বসেই পেয়ে যাচ্ছে প্রত্যাশিত তথ্য বা সংবাদ। বিভিন্ন ওয়েবসাইটে প্রদর্শিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য,ফিচার, অনায়াসেই একজন শিক্ষার্থী কাজে লাগাতে পারে কম্পিউটারের কল্যাণে।৪. পরীক্ষার ফলাফল তৈরি ও মূল্যায়ন : বর্তমানে দেশে প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতি কম্পিউটার নির্ভর। পরীক্ষার খাতাদেখা, ফলাফল তৈরি ও প্রকাশ করার সমুদয় গুরুদায়িত্ব কম্পিউটারের। এক্ষেত্রে কম্পিউটার দ্রুত গতি ও নির্ভুলতার সম্পূর্ণHALONalea২১৮পপি এসএসসি রচনা শিক্ষানিশ্চয়তা দিয়ে থাকে। ফলে শিক্ষা পদ্ধতিতে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। কম্পিউটারের কার্যপদ্ধতির প্রতি আস্থা রেখেইদেশে প্রচলিত হয়েছে ফলাফল মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গ্রেডিং পদ্ধতি। আর এ জটিল কাজটি সম্পাদন কম্পিউটার ছাড়া কল্পনাইকরা যায় না।৫. উচ্চশিক্ষা : বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং বুয়েটসহ বিশ্বের অনেক দেশেই আজউচ্চশিক্ষায় কম্পিউটারের ব্যবহার অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে।। প্রােগ্রাম করা বিভিন্ন সফটওয়্যারে ব্যবহারিক বিষয়সহপ্রয়ােজনীয় পাঠ আজ ঘরে বসেই কম্পিউটারের মনিটরে দেখে শেখা যায়। মােটকথা, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কম্পিউটার আজশিক্ষার প্রধান উপকরণ হয়ে উঠেছে।৬. শিক্ষামূলক গবেষণা : বিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি, কৃষি, চিকিৎসা প্রভৃতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতির পূর্বশর্ত হলােগবেষণা। এজন্য প্রতিটি দেশেই রয়েছে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু মুশকিল হলাে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সর্বশেষ তথ্যসবসময় এক জায়গায় পাওয়া যায় না। এর সমাধানে এগিয়ে এসেছে কম্পিউটার বিষয় শিরােনামসহ প্রতিটি গবেষণামূলকপ্রকাশনার সার-সংক্ষেপ কম্পিউটারে তুলে রেখে প্রয়ােজনের সময় দু-এক মিনিটেই খুঁজে দেখা সম্ভব, সম্ভব কম্পিউটারনেটওয়ার্কিং-এর মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্যের আন্তঃপ্রবাহ।৭. শিক্ষার বাহন পুস্তক প্রকাশনা : সিসার অক্ষর দিয়ে কম্পােজ করে হস্তচালিত লেটার প্রেসে যে বইটি বের করতেএক বছর লাগত, কম্পিউটারের কল্যাণে সম্পূর্ণ অটোমেটিক মেশিনে এখন তা দু-এক দিনেই বের করা সম্ভব হচ্ছে।এক্ষেত্রে নেই কোনাে অস্পষ্ট ছাপা বা ভাঙা অক্ষরের বিড়ম্বনা, নেই লাইন আঁকাবাঁকা হওয়ার ভয় বা লাইনস্পেস ছােট-বড়করার ঝামেলা। হাজার পৃষ্ঠার পুস্তক কম্পিউটারের স্মৃতিতে রেখে দেয়া যায়, প্রয়ােজনে পুনর্মুদ্রণও করা যায় যখন তখন।পুস্তক প্রকাশনার সূতিকাগার রাজধানী ঢাকার বাংলাবাজার আজ তাই অনেকটাই কম্পিউটার নির্ভর।৮, সংবাদ প্রচার ও প্রকাশনা : শিক্ষার অন্যতম হাতিয়ার সংবাদের প্রচার ও প্রকাশে কম্পিউটারের অবদান।অনস্বীকার্য। টিভির প্রতিদিনকার সচিত্র সংবাদ পরিবেশনে ও সংবাদপত্রের প্রকাশনায় কম্পিউটার আজ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃতহচ্ছে।বাংলাদেশে কম্পিউটার শিক্ষা : আশির দশকে বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে কম্পিউটারের আবির্ভাব হলেও নব্বইয়েরদশকের শুরুতে এখানে আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কম্পিউটার শিক্ষা শুরু হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে কম্পিউটারের দ্রুতও ব্যাপক বিকাশ ঘটছে। কম্পিউটার শিক্ষাও যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে। আমাদের দেশে কম্পিউটার বিজ্ঞান অধ্যয়নের সুযােগঅবশ্য এখনাে যথেষ্ট সীমিত। কেবল ঢাকায় ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়সহ গুটিকয়েক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাএ সুযােগ পেয়ে থাকে। এখান থেকে যারা শিক্ষা লাভ করেছে তাদের অনেকেই আন্তর্জাতিক মানের সফটওয়্যার তৈরি করছে।বাংলাদেশে শিক্ষার সর্বস্তরে কম্পিউটারের ব্যবহার : উন্নত বিশ্বের দেশসমূহে শিক্ষা ব্যবস্থার সর্বস্তরে কম্পিউটারেরব্যবহার শুরু হলেও আমাদের দেশে এখনাে তা পুরােপুরিভাবে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। আমাদের দেশে কেবল উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেইকম্পিউটারের ব্যবহার হয়ে থাকে। মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে কম্পিউটার শিক্ষার প্রচলন খুবই কম। অবশ্য ইতােমধ্যেমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বাের্ডের সিলেবাসে কম্পিউটার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করাহয়েছে। বালাদেশে কম্পিউটার শিক্ষার প্রচলনে এটা একটা মহতী উদ্যোগ।উপসংহার : কম্পিউটারের বহুমুখী ব্যবহার থাকলেও শিক্ষাক্ষেত্রে এর অবদান অসামান্য। জাপান, আমেরিকা, ব্রিটেন,ফ্রান্সসহ উন্নত বিশ্বের প্রতিটি দেশে কম্পিউটার শিক্ষা কার্যক্রমের প্রধান উপকরণে পরিণত হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থায় কম্পিউটারব্যবহারে বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। কম্পিউটারের কল্যাণে বাংলাদেশ থেকেই আজ ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেশ-বিদেশেরঅনলাইন ডিগ্রি অর্জন সম্ভব হচ্ছে। সেদিন আর বেশি দূরে নয় যেদিন শিক্ষা ব্যবস্থায় কম্পিউটার প্রধান মাধ্যম হয়ে শিক্ষাকে সকলের কাছে করে তুলবে আনন্দময় ও উপভােগ্য।

শীতের সকালঅথবা, একটি শীতের সকাল।রাি, বাে, ২০১৩; দিনা, ২০১৩, ২০১১; বরি, ২০১৩; চট্ট, ২০১৩]ভূমিকা : ঋতুচক্রের আবর্তে বাংলাদেশে শীত আসে। হেমন্তের ফসল ভরা মাঠ যখন শূন্য ও রিক্ত হয়ে পড়ে, তখনইবােঝা যায়, ঘন কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে শীত আসছে। উত্তরের হিমেল হাওয়ায় ভর করে হাড়ে কঁপন লাগিয়ে সে আসেতার নিজস্ব রূপ নিয়ে। প্রকৃতি তখন তার সমস্ত আবরণ খুলে ধারণ করে দীনহীন বেশ। প্রকৃতিতে সৃষ্টি হয় এক ভিন্ন।সৌন্দর্য। এ সৌন্দর্য পূর্ণতা পায় শীত সকালে।।শীতের সকালের আগমন : শীতের সকালের আবির্ভাব হয় কুয়াশাচ্ছন্ন অনন্য রূপ নিয়ে। পূর্ব দিকে আলাের সুষমাপুরােপুরি ফুটে উঠার আগেই পাখিদের হৃদয়ে তার গােপন সংবাদ সবার অলক্ষে ছড়িয়ে পড়ে। তাকে স্বাগত জানাতে বনেবনে পাখির কণ্ঠে ভেসে উঠে মধুর আবাহন-গীতি। একসময় কুয়াশার বুক ভেদ করে ফুটে উঠে আলাের রেখা। ভেসে আসেমুয়াজ্জিনের আযানের ধ্বনি। তীব্র শীতের কামড় উপেক্ষা করে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ছুটে চলেন মসজিদে। গৃহত্যাগী গবাদিপশুর ডাক আর রাখালের পদচারণা শুরু হয়। লাঙল ও গরু নিয়ে কৃষকরা মাঠে যায়। তাদের গায়ে থাকে সামান্য শীতবস্ত্র ।।অনেকের হয়তাে তা-ও নেই। কাঁপতে কাঁপতে চলে মাঠে।শীতের সকালের দৃশ্য : শীতের সকাল থাকে কুয়াশায় ঢাকা। দিগন্ত বিস্তৃত সাদা শাড়ি পরে কে যেন প্রকৃতিকে ঢেকেরাখে কুয়াশার আড়ালে। ঘড়ির দিকে তাকালে বােঝা যায় বেলা হয়েছে। সমস্ত প্রকৃতি থাকে শিশিরসিক্ত। বাইরেহাড়কাপানাে কনকনে শীত। কঁাথা ছেড়ে উঠতে কিছুতেই মন চায় না। ছােট ছােট ছেলেমেয়েরা সূর্যের মুখ দেখার জন্যবারবার জানালার ফাঁকে উঁকি মারে। কোথাওবা আগুন পােহাবার দৃশ্য চোখে পড়ে। শীতের সকালের এক অসাধারণ আকর্ষণসর্ষে ফুলের হলুদ মাঠ। সকালের সূর্যালােক যেন তার নিপুণ হাতে প্রতিটি সর্ষে গাছকে নবরূপে ঢেলে সাজায়।শীতের সকালে গ্রামাঞ্চল : গ্রামের মুক্ত প্রকৃতির কোলে শীতের সকাল যেন আড়মােড়া ভেঙে জেগে উঠে। গ্রামেরখেটে খাওয়া মানুষগুলাের একটু আরাম করার জো নেই শীতের সকালে। শীতের সকাল গ্রামগঞ্জের মানুষের জন্য খুবকষ্টদায়ক। শীত নিবারণের মতাে প্রয়ােজনীয় কাপড় অনেকেরই থাকে না। শীতের তীব্রতা উপেক্ষা করে খুব সকালেতাদেরকে মাঠে-ময়দানে কাজে যেতে হয়। কৃষকরা রবিশস্যের পরিচর্যায় ব্যস্ত থাকে। কিষাণ বধূরাও তখন ধান মাড়াই,ধান সিদ্ধ ইত্যাদি নানা কাজে ব্যস্ত থাকে। সকালে গ্রামেগঞ্জে শীতের সকালে এক ধরনের ফেরিওয়ালা দেখা যায়। এরা বাড়িবাড়ি ঘুরে মােয়া-মুড়কি, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি, খেজুরের রস ইত্যাদি বিক্রি করে। শীতের সকালে সােনার রােদ হীরকজ্যোতি ছড়িয়ে দেয় মাঠে। সূর্যালােকিত শিশিরকণাগুলাে চোখ ধাধিয়ে দেয়। এ দৃশ্য বড়ই মনােরম। শীতের সকালে নদীথেকে জলীয় বাষ্প যখন কুয়াশার সঙ্গে মিশে বাতাসে ভেসে বেড়ায়, তখন এক অপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়।শীতের সকালে শহর : শীতের সকালে শহরের অবস্থা ভিন্নতর। গ্রামের অনাবৃত দিগন্ত বিস্তৃত প্রকৃতির মাঝখানেশীতের সকাল যে সৌন্দর্য মহিমায় সেজে উঠে, শহরের ইট-পাথর ঘেরা কৃত্রিম পরিবেশে তার আভাস নেই। নিত্য দিনেরকর্মচঞ্চলতা নিয়ে জেগে উঠে শহর। শিশির ভেজা কালাে পিচের রাস্তায় হেডলাইট জ্বালিয়ে চালাতে হয় গাড়ি। রিকশাওয়ালাঘন কুয়াশা কাটিয়ে ধীরে ধীরে রিকশা চালায়। রাস্তার মােড়ের চায়ের দোকানগুলােতে জমে উঠে ভিড়। হকার পত্রিকা নিয়েছুটে যায় দ্বারে দ্বারে। শিশিরসিক্ত পথে শীতের কাপড় জড়িয়ে রাস্তায় বের হয় লােকজন। তাদের পােশাকের কত নাবৈচিত্র্য। ছােট ছােট ছেলেমেয়েরা রং-বেরঙের শীতের পােশাক পরে ছুটতে থাকে বিদ্যালয় পানে। অপরদিকে শহরেরবস্তিতে শীত আসে নির্মমতা নিয়ে। শীত নিবারণের ব্যবস্থা তাদের থাকে না। নির্মম শীতে তারা কাঁপতে থাকে ঠক্ ঠককরে।২২০পপি এসএসসি রচনা শিক্ষাশীতের সকাল উপভােগ : শীতের সকালে চিড়া, মুড়ি খেতে খুব ভালাে লাগে। কোচর ভরা চিড়া, মুড়ি নিয়ে শীতেরসকালের রােদকে উপভােগ করার দৃশ্য গ্রাম বাল্লায় প্রায়ই দেখা যায়। এ সময় ঘরে ঘরে তৈরি হয় হরেক রকমের পিঠা।শীতে গরম গরম পিঠা খেতে ভারি মজা। কবি সুফিয়া কামালের ভাষায়-“পৌষ পার্বণে পিঠা খেতে বসে খুশিতে বিষম খেয়েআরও উল্লাস বাড়িয়েছে মনে মায়ের বকুনি খেয়ে।”শীতের সকালে গাছি খেজুরগাছ থেকে তাজা রস নামায়, তা পান করা খুবই তৃপ্তিকর। খেজুর রস দিয়ে তৈরি পিঠা-পায়েস খুবই মজাদার। শীতের সকালে রােদের বিপরীতে বসে জমাট বাঁধা মাছের তরকারি দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার মধ্যেওরয়েছে এক অনাবিল সুখ ও আনন্দ।শীতের প্রভাব : শীতের সকাল মানবজীবনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। শৈত্যপ্রবাহে অসুবিধা সৃষ্টি হলেও মানুষেরকাছে শীতের মনােরম সকাল পরম উপভােগ্য বলে বিবেচিত হয়। শীতের সকাল আসে নির্জনতা নিয়ে। বৈরাগ্যবেশ ধারণকরে প্রকৃতি। চারদিকে রিক্ততার সুর প্রতিধ্বনিত হয়। মানুষ তখন কোলাহলমুখরিত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।তবুও প্রকৃতির শিশিরঝরা রূপটি মানুষের কাছে এক অনাবিল সৌন্দর্য নিয়ে উপভােগ্য হয়ে উঠে। শীতের সকালের শীতলহাওয়া আর শিশিরস্নিগ্ধ পরিবেশ মানুষের জীবনে বিস্তার করে প্রগাঢ় শান্তির মায়াজাল। শীতে রবি-শস্যের প্রাচুর্য মানুষকেউপহার দেয় আহারের পরিতৃপ্তি। আবহাওয়ার স্নিগ্ধতায় মানুষের জীবন তখন হয়ে উঠে একান্ত উপভােগ্য। মনের আনন্দেরখোঁজে মানুষ বনভােজনে চলে শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে। শীতের সকাল এক অনাবিল প্রশান্তি আনে মানুষের জীবনে।উপসংহার : শীতের সকালের একটা চিরন্তন সৌন্দর্য ও মাধুর্য রয়েছে। রাতের অবসানের সাথে সাথে শীতের সকালতার অনবদ্য সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে বসে। এক সময় সূর্য উঠে, ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে রােদ, বাড়তে থাকে উত্তাপ।রাতের ঝরা শিশির তার কর্তব্য শেষে উধাও হয়। শীতের প্রভাব কাটিয়ে মানুষ বেরিয়ে পড়ে নিজ নিজ কাজে। শরীর থেকেমুছে ফেলে কুয়াশা ঘেরা শীতের সকাল। শুরু হয় কর্মমুখর জীবনের ব্যস্ততা।

বর্ষাকাল।য, বাে, ২০১৪; চ, বাে, ২০১৩; বরি বো. ২০১২; সি. বাে, ২০১৩।অথবা, বর্ষায় বাংলাদেশবি, বাে. ২০২০]ভূমিকা : ষড়ঋতুর রঙ্গশালা আমাদের বাংলাদেশ। এখানে প্রকৃতি একেক ঋতুতে সাজে একেক রূপে। প্রতিটি ঋতুইনিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড কাঠফাটা রৌদ্রে প্রকৃতি যখন শুকদধ, তখন দ্বিগ্বিজয়ী যােদ্ধার মতাে মেঘেরপিঠে সওয়ার হয়ে আসে বর্ষাকাল। খটখটে মাটির জমিন সাত করে কোমল ও শ্যামল করে তােলে বর্ষার মমতা রস। তখনমাঠ-ঘাট, নদী-নালা, পথ-প্রান্তর, খাল-বিল জলমগ্ন হয়ে উঠে। বসন্তকে ঋতুরাজ বলা হলেও রূপের গৌরব ও প্রাকৃতিকসৌন্দর্যের জন্য বর্ষাই শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার।বর্ষার সময় : সাধারণত আষাঢ় ও শ্রাবণ এ দু’মাস বর্ষাকাল। কিন্তু আমাদের দেশে বর্ষার আগমন অনেক আগেই ঘটেথাকে। কোনাে কোনাে সময় বর্ষা জ্যৈষ্ঠ মাসে আরম্ভ হয়ে আশ্বিন মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়। তবে আষাঢ় শ্রাবণেই বর্ষার পরিপূর্ণরূপ-বৈভব।বর্ষার আগমন :“আমি বর্ষা, আসিলাম গ্রীষ্মের প্রদাহ শেষ করি,মায়ার কাজল চোখে, মমতায় বর্মপুট ভরি।”পপি এসএসসি রচনা শিক্ষাগ্রীস্মের দিনগুলােতে মানুষ যখন অসহ্য গরমে ছটফট করতে থাকে তখন নিজস্ব রূপ ও বৈচিত্র্য নিয়ে বর্ষা আসে তারআপন মহিমায়। প্রকৃতি যেন নিজের বুক জুড়ানাের জন্যই বর্ষাকে আহ্বান করে। দিনভর চলে সূর্য আর মেঘের লুকোচুরিখেলা। এমনিভাবে বর্ষা আসে নব সমারােহে জয়বাদ্য বাজিয়ে। কবিগুরু বর্ষার আগমনকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন-“ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষেজল সিঞ্চিত ক্ষিতি সৌরভ ভরসেঘন গৌরবে নব যৌবনা বরষা।শ্যাম গম্ভীর সরসা।”বর্ষার রূপ : বর্ষায় প্রকৃতিতে নব প্রাণের সঞ্চার হয়। বর্ষার পানিতে নদী-নালা, খাল-বিল ভরে একাকার হয়ে যায়।চারদিকে পানি থৈ থৈ করে। আকাশ থাকে ঘন মেঘে আচ্ছন্ন। তারই বুকে চলে বিদ্যুতের খেলা। অনেক সময় কয়েকদিনপর্যন্ত মেঘাচ্ছন্ন আকাশে সূর্যের দেখা মেলে না। মাঝে মাঝে মেঘগুলাে বায়ুতাড়িত হয়ে একদিকে সরে যায়, আবার ফিরেআসে। গুড়ুম গুডু গর্জনে চারদিক মুখরিত হয়। আকাশের বুক চিরে বৃষ্টি নেমে আসে শত সহস্র ধারায়। এমন দিনে ঘরেরবাইরে যাওয়া যায় না। তাই কবিগুরু গেয়েছেন-“নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাই আর নাহিরে।ওগাে আজ তােরা যাসনে ঘরের বাহিরে।”এ সময় ব্যাঙেরা মনের আনন্দে গান জুড়ে দেয়। নদীপথে মাঝি মাল্লার কণ্ঠে জেগে উঠে মন মাতানাে ভাটিয়ালি গান। বর্ষারনতুন পানিতে পল্লি গ্রামের দামাল ছেলেরা হৈ হুল্লোড় করে বেড়ায়। কৃষকেরা বৃষ্টিতে ভিজে ফসল তােলার কাজে ব্যস্ত থাকে।বর্ষার প্রাকৃতিক দৃশ্য : বর্ষা প্রকৃতিকে সাজায় নতুন সাজে । বৃষ্টির ফলে সতেজ হয়ে উঠে গাছপালা। তৃণলতা ওসবুজ শস্যে ভরে উঠে মাঠ। এ সময় উঁই, কেয়া, কদম, হিজল ফুল ফোটে। গাছে গাছে সবুজ পাতা আর নানা ফুলেরসমারােহ। বর্ষা সব মিলিয়ে প্রকৃতিতে এক অফুরন্ত সৌন্দর্যের জোয়ার বয়ে আনে। দিগন্ত বিস্তৃত পানিতে একাকার মাঠেরপ্রান্তদেশে বাড়িগুলাে নারকেল, সুপারি, আম, জাম গাছের কুঞ্জ নিয়ে ভাসতে থাকে। নদীর বুকে ছােট ছােট অজস্র নৌকারছােটাছুটি, জেলের মাছ ধরা, কলার ভেলায় চড়ে ছােট ছেলেমেয়েদের আনন্দ, শাপলা ফোটা খাল-বিল, নদী-নালা ইত্যাদিবর্ষারই কল্যাণে।গ্রামীণ জীবনে বর্ষার প্রভাব : প্রকৃতির রূপবৈচিত্র্যের সঙ্গে মিল রেখে পল্লির মানুষের প্রাত্যহিক জীবনেও বৈচিত্র্যসৃষ্টি হয়। পল্লিগ্রামের মানুষের জীবন গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ থেকে রক্ষা করতে অনাবিল শান্তি ও পরিতৃপ্তি নিয়ে হাজির হয়বর্ষা। এসময় অধিকাংশ কৃষকের হাতে কোনাে কাজ থাকে না। অফুরন্ত অবসর কাটানাের জন্য গ্রামের চাষিরা জড়াে হয়মােড়লের বাইরের ঘরে। কেউ বাখারি ঊছে, কেউ দড়ি পাকায়, কেউ কাঠ দিয়ে সারিন্দা তৈরি করে, কেউ গান করে।গ্রামের মেয়েরা এ দিনে তৈরি করে সমুদ্রকলি শিকা এবং নকশিকাঁথায় বুনেরঙিন।ফুল।শহুরে জীবন বর্ষার প্রভাব : শহুরে জীবনে বর্ষা আসে নানা দুর্ভোগ আর বিরক্তি নিয়ে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি জমেশহরের পরিবেশ হয়ে উঠে অস্বাস্থ্যকর। বিঘ্নিত হয় স্বাভাবিক জীবনযাপন। শহরের কর্মব্যস্ত মানুষগুলাের কর্মপ্রবাহে আসেস্থবিরতা। বর্ষার অবিরাম বর্ষণের সময় রাস্তা-ঘাটে যানবাহনের সংখ্যা কমে আসে। ফলে কর্মস্থলে যাতায়াতকারী লােকদেরচরম দুর্ভোগ পােহাতে হয়। বস্তি এলাকার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বিভিন্ন রােগ-ব্যাধির প্রাদুর্ভাব ঘটে।মানবমনে বর্ষার প্রভাব : মানবমনে বর্ষার প্রভাব অপরিসীম। বর্ষা মানবমনকে সৃষ্টিশীল করে তােলে। হৃদয়ে আনে।অফুরন্ত প্রাণের প্রবাহ। বৃষ্টির সাথে ঝড়াে হাওয়া মানুষের মনকে উদাস করে দেয়। কিসের যেন অভাব, না পাওয়ার বেদনামানুষকে ভাবিয়ে তােলে। কবিগুরু বলেন -“এমন দিনে তারে বলা যায়।এমন ঘন ঘাের বরিষায়।”পপি এসএসসি রচনা শিক্ষারবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যের এক বিরাট অংশে বর্ষা স্থান করে নিয়েছে। তা ছাড়া অক্ষয়কুমার, গােবিন্দচন্দ্র দাস, নজরুলইসলাম, জসীমউদ্দীন প্রমুখ কবি বর্ষাকে অনেক কবিতায় উপজীব্য করেছেন। বর্ষা বাংলার কাব্য সাহিত্যকে করেছে।রসসমৃদ্ধ।উপকারিতা : বাংলাদেশে বর্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। বর্ষাই বালাদেশকে সুজলা-সুফলা ও শস্য-শ্যামলা করে তুলেছে।বর্ষার ফলে অনুর্বর মাটি হয়ে উঠে উর্বর। গ্রীষ্মের উত্তপ্ত পৃথিবী বর্ষার পানিতে শান্ত-শীতল হয়। এ সময়ে নৌকাযােগেচলাচল ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বেশ সুবিধা হয়। বৃষ্টির পানিতে বাতাসের দূষিত পদার্থ মাটিতে নেমে বাতাস বিশুদ্ধ হয়।অপকারিতা : বর্ষার উপকারিতার পাশাপাশি অপকারিতাও কম নয়। বৃষ্টির পানিতে পল্লির রাস্তাঘাট কাদায় ভরে উঠে,কোথাওবা ডুবে যায়। চলাচলে হয় অসুবিধা। তখন গরিব ও দিনমজুরদের দুঃখের সীমা থাকে না। তাদের ভাঙা চাল দিয়েবৃষ্টির পানি পড়ে। সমস্ত ঘর ভেসে যায়। তারা কর্মজগৎ থেকেও হয় বঞ্চিত। কখনও কখনও অতি বর্ষণের ফলে প্রাবনেরসৃষ্টি হয়। খাদ্যাভাবে দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। মানুষের দুঃখ-দুর্দশা চরমে উঠে। এ সময় দূষিত পানি পানের ফলে কলেরা,টাইফয়েড, আমাশয় প্রভৃতি রােগ মহামারী আকারে দেখা দেয়।উপসংহার : বাংলার বর্ষা রূপ-বৈচিত্র্যে তুলনাহীন। বর্ষা বাঙালির প্রাণের ঋতু। বর্ষা, মানবমনে সঞ্চার করে অনন্তবিরহ-বেদনা। মনকে দেয় চিরসৌন্দর্যলােকের আভাস। বর্ষার এক হাতে বরাভয়, অন্য হাতে ধ্বংসের প্রলয়- ডমরু। একপদপতে সৃজনের প্রাচুর্য, অন্য পদপাতে ধ্বংসের তাণ্ডব,একচোখে অশু, অন্যচোখে হাসি। বর্ষা তাই আমাদের কাছে চিরআদরের ঋতু, অনন্ত বেদনার ঋতু।

একটি বর্ষণমুখর সন্ধ্যারা, বাে, ২০১৪; সি, বাে, ২০১২]“ এমনি বরষা ছিল সেদিন।শিয়রে প্রদীপ ছিল মলিন।তব হাতে ছিল অলস বীণ।মনে কি পড়ে প্রিয়।”এ-ই হচ্ছে বর্ষণমুখর সন্ধ্যা। এরূপ সন্ধ্যাই বিস্মৃতপ্রায় অতীতের ঝকঝকে চিত্র ফুটিয়ে তােলে মানসপটে। বস্তুতবর্ষণমুখর সন্ধ্যার একটা নিজস্ব রূপ রয়েছে। একান্তভাবে অনুভব না করলে তার মহিমা বােঝা যায় না। এতে কান্না-হাসিএক হয়ে আছে। একদিকে হৃদয়ের বেদনাময় স্মৃতি বর্ষণমুখর সন্ধ্যার বুক ভরে জেগে থাকে, অন্যদিকে এর সৌন্দর্যচারিদিকের প্রকৃতিকে এক রহস্যময় স্বপ্নপুরীতে পরিণত করে। এমনই এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যার অনির্বচনীয় রূপ-মাধুর্য আমারহৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে।আষাঢ় মাস। সারাদিন আকাশ ছিল ঘন মেঘে ঢাকা। বর্ষার ঝ ঝর বৃষ্টি সারাদিন ঝরছে তাে ঝরছেই- বিরাম নেই,বিশ্রাম নেই। অবিশ্রান্ত বর্ষণের এ যেন মহােৎসব। বৃষ্টি-বিধৌত পথের দু’পাশে জমে উঠেছে পানি। আশেপাশের ডােবা-নালাও পানিতে টইটুম্বুর। এমনি এক সময়ে হয়ত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন ।“নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে।তিল ঠাই আর নাহিরেওগাে আজ তােরা যাসনে ঘরের বাহিরে।”বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় বৃষ্টি ও সন্ধ্যার মধ্যে এক নিবিড় বন্ধন সৃষ্টি হয়, দুয়ের মধ্যে গড়ে উঠে এক অনন্য ঘনিষ্ঠতা।বৃষ্টির একটানা রিমঝিম বর্ষণ ও সন্ধ্যার স্নিগ্ধতার মিলনে সৃষ্টি হয় অনিন্দ্য সুন্দর পরিবেশের এক বিমূর্ত মুহূর্ত, যাএকটানে মানুষকে নিয়ে যায় দূর অতীতে। এমনটি প্রত্যক্ষ করেই মহাকবি কালিদাস তার প্রখ্যাত ‘মেঘদূত’ কাব্য রচনাকরেছিলেন। আর ‘মেঘদূতের সৌন্দর্যে মুগ্ধ কবি রবীন্দ্রনাথ গেয়ে উঠেছিলেন –পপি এসএসসি রচনা শিক্ষা“কবিবর, কবে কোন বিস্মৃত বরষেকোন পুণ্য আষাঢ়ের প্রথম দিবসেলিখেছিলে মেঘদূত। মেঘচন্দ্র শ্লোক,বিশ্বের বিরহী যত সকলের শােক।”সারাদিন কাটল ঘরে বসেই। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বাইরে বের হওয়া সম্ভব হয়নি। এক সময় আঁধার ঘনিয়ে এলাে।বুঝতে পারলাম গােধূলি বেলা সমাগত। তবে প্রকৃতির বুকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার অনেক পূর্বেই যেন আজ সন্ধ্যা এসেছে।পশ্চিম আকাশের সূর্যাস্তের বর্ণবাহার আজ কারাে চোখে পড়ল না। আজকের সন্ধ্যা অন্যান্য দিনের সন্ধ্যা থেকে ভিন্নতর।ঘরের ভেতর আঁধারের আল্পনা। জানালা খুলে দূরে দৃষ্টি দিতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু চারদিক ঝাপসা। প্রকৃতি যেন স্নিগ্ধ,শান্ত ও পরিচ্ছন্ন। একদিকে সন্ধ্যার অন্ধকার, অন্যদিকে বৃষ্টির প্রচণ্ডতা। দু’য়ে মিলে কী চমৎকার এ সন্ধ্যা প্রকৃতি!বর্ষণমুখর সন্ধ্যার এ রূপ ধরা পড়েছে রবীন্দ্রনাথের কবিতায়-“আষাঢ় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল, গেল রে দিন বয়েবাঁধন-হারা বৃষ্টি ধারা ঝরছে রয়ে রয়ে।একলা বসে ঘরের কোণে কী যে ভাবি আপন মনে,সজল হাওয়া যূথীর বনে কী কথা যায় কয়ে”রাস্তায় কোনাে জন-মানব নেই। রাখাল বালকেরা আজ ঘরে আবদ্ধ। নিত্যদিনের মতাে গােধূলি লগ্নে গরুর পাল ঘরেফিরছে না। মাঠে খেলার উৎসব নেই। উঠানে নেই বউ-ঝিদের ব্যস্ততা। দূরের কদম গাছটা শ্যামল সৌন্দর্যে মেঘের সাথিহয়েছে। ডালে বসে ভিজে কাক অসহায় আর্তনাদে প্রকৃতিতে কারুণ্য ফুটিয়ে তুলেছে। সাথিহারা বেদনায় তার আত্মা অজস্রবর্ষণের ভেতরেও পিপাসাকাতর। প্রয়ােজনের তাগিদে কেউ কেউ ছাতা মাথায় চাল, ডাল, লবণ ইত্যাদি আনতে পথেবেরিয়েছে। সব মিলে চারদিকে সৃষ্টি হয়েছে বিষন্ন অথচ অপূর্ব এক পরিবেশের।ধীরে ধীরে অন্ধকার আরও গাঢ় হয়ে আসছে। বৃষ্টির ফোঁটা দেখা যাচ্ছে না। মাঠের পাশের বটগাছটি , যা যুগ যুগ ধরেঅপরাজেয় সৈনিকের মতাে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তা-ও দেখা যাচ্ছে না। ব্যাঙের একটানা সুর কানের কাছে বাঁশিবাজাচ্ছে। মসজিদ থেকে ভেসে আসছে আযানের সুমধুর ধ্বনি। ঘন ঘন শিয়ালপণ্ডিতের করুণ হাহাকার শােনা যাচ্ছে। দূরেদেখা যাচ্ছে মিটিমিটি আলাে। মনে হলাে লণ্ঠন হাতে নিয়ে কেউ গরু গােয়ালে দিচ্ছে।সন্ধ্যা হয়ে গেল। মা কখন যে হারিকেন ধরিয়ে দিয়ে গেলেন তা নিজেই জানি না। জানালা থেকে সরে এলাম পড়ারটেবিলে। দু’একটা বই নাড়াচাড়া করলাম। কিন্তু মন কিছুতেই বসল না। রাজ্যের যত গান, যত সুর, যত কথা সবই আজ।মনের কোণে এসে বাসা বেঁধেছে। আজ হৃদয়ে কেবলই বিরহ। কী যেন নেই, কিসের যেন অভাব। থেকে থেকে মনবলছে, “এমন দিনে তারে বলা যায়?” কিন্তু কাকে বলা যায়? তার উত্তর তাে মনে আসে না।“হৃদয়ে আজ ঢেউ দিয়েছে, খুঁজে না পাই কূলসৌরভে প্রাণ কাঁদিয়ে তােলে ভিজে বনের ফুল।।আঁধার রাতে প্রহরগুলি, কোনাে সুরে আজ ভরিয়ে তুলি,কোনাে ভুলে আজ সকল ভুলি আছি আকুল হয়ে।”এই বর্ষণমুখর সন্ধ্যা আমার মনের উপর থেকে এক সুদীর্ঘকালের পর্দা সরিয়ে ফেলেছে। হৃদয়ে এক অনন্ত সত্যেরজ্যোতি অনুভব করলাম। এ সংসার, এ বাড়িঘর কিছুই আমাদের নয়। বিশ্ব আত্মার সাথে আমাদের আত্মা একদিন বিলীনহয়ে যাবে।হঠাৎ ঘর থেকে খাওয়ার ডাক এল। আমার চিন্তার জাল গেল ছিন্ন হয়ে। বর্ষণমুখর সন্ধ্যার বৈশিষ্ট্য আজ স্পষ্ট হয়েউঠল। এর কোনাে তুলনা নেই। বৃদয় দিয়ে যদি এ মুখরিত সন্ধ্যার সবকিছু উপভােগ করা যায়, তবেই মনের দুয়ার খুলেযায়, নেচে উঠে হৃদয়।

অধ্যবসায়।দি, বাে, ২০২০, ২০১৭, ২০১৬; ২০১৫; সকল বাে, ২০১৮; ঢা. বাে, ২০২০, ২০১৭, ২০১৩; কু. বাে. ২০১৭, ২০১৫চট্ট, বে, ২০১৬, ২০১৫; বরি. বাে, ২০১৫, ২০১৩; রা. বাে, ২০১৪; য, বাে, ২০১৩; সি. বাে, ২০১৬সূচনা : পৃথিবীতে সফলতার জন্য চাই সাধনা; সাধনার জন্য চাই একাগ্রতা এবং নিষ্ঠা। এ পৃথিবীতে যারা বড়হয়েছেন, খ্যাতনামা হয়েছেন, তারা সবাই অধ্যবসায়ের দ্বারাই হয়েছেন। অধ্যবসায়ী হতে না পারলে জীবনে পরমআকাঙিক্ষত জিনিসটি অধরাই থেকে যায়। অবিচল সংকল্প নিয়ে, সকল প্রতিকূলতা অতিক্রম করে, অপরিসীম ধৈর্যেরপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সাফল্য লাভ করার গুণটিই অধ্যবসায়। তাই ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন -“কোনাে কাজ ধরে যদি উত্তম সে জন।হউক সহস্র বিঘ্ন ছাড়ে না কখন।”অধ্যবসায় : অধ্যবসায় হলাে কোনাে কাজে অবিরাম সাধনা বা ক্রমাগত প্রচেষ্টা। বার বার কোনাে কাজের ব্যর্থতার।গ্লানি মুছে ফেলে নিজেকে সাফল্যের দ্বারে পৌছে দেয়ার জন্য যে মহান প্রচেষ্টা, তারই নাম অধ্যবসায়। অর্থাৎ পরম ধৈর্যেরসাথে কঠোর পরিশ্রমের নামই অধ্যবসায়।অধ্যবসায়ের প্রয়ােজনীয়তা : মানবসভ্যতার বিকাশের অন্যতম চালিকাশক্তি অধ্যবসায়। যা মানুষের যাপিত জীবনেরপ্রতিনিয়ত যে সংগ্রাম, তার মূল প্রেরণা। মানবজীবনে অধ্যবসায়ের প্রয়ােজনীয়তা অপরিসীম। কারণ, অধ্যবসায় ছাড়া এজগতে কেউ সাফল্য অর্জন করতে পারে না। পৃথিবীতে যা কিছু মহৎ, যা কিছু সুন্দর, যা কিছু কল্যাণকর সবই অধ্যবসায়েরদ্বারা অর্জিত হয়েছে। তাই অধ্যবসায় মানব সভ্যতার অগ্রগতির চাবিকাঠি, ব্যক্তিগত জীবনের উন্নতির সােপান। মানবজীবনেচলার পথে নানা বাধা-বিপত্তি আসতে পারে। এ সমস্ত বাধা-বিপত্তিকে পায়ে ঠেলে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।তবেই জীবনে উন্নতি আসবে। তাই কবি কালিপ্রসন্ন ঘােষ বলেছেন,“পারিব না এ কথাটি বলিও না আরকেন পারিবে না তাহা ভাব একবার।পঁচজনে পারে যাহা,তুমিও পারিবে তাহা।পার কি ন পার কর যতন আবার।একবার না পারিলে দেখ শতবার।”মনে রাখতে হবে, রাতের ঘাের অন্ধকার কেটে গিয়ে যেমন দেখা দেয় সােনালি উষা, তেমনি বারবার চেষ্টার ফলেমানুষের ভাগ্যাকাশে উদিত হয় সাফল্যের শুকতারা! অধ্যবসায়ের দ্বারাই মানুষ এ জগতে অসাধ্য সাধন করেছে। বড় বড়শিল্পী, সাহিত্যিক, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, স্থপতি, সেনানায়ক, ধর্মপ্রচারক সবাই অধ্যবসায়ের ফলে সার্থকতা লাভ করেছে।তাই কবি বলেন -“ধৈর্য ধরাে, ধৈর্য ধরাে! বাধাে বাধাে বুক,শত দিকে শত দুঃখ আসুক আসুক।”ছাত্রজীবনে অধ্যবসায় : ছাত্রজীবন ভবিষ্যৎ জীবন রচনার অনুশীলন ক্ষেত্র। তাই অধ্যবসায় ছাত্রজীবনের সবক্ষেত্রেইগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ছাত্ররা জাতির ভবিষ্যৎ। বিশ্বের কোটি কোটি ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষ চেয়ে আছে তাদের দিকে।আলস্যপরায়ণ এবং শ্রমবিমুখ ছাত্র-ছাত্রী কখনাে বিদ্যার্জন করতে পারে না। অধ্যবসায়ী ছাত্র-ছাত্রী অল্প মেধাসম্পন্ন হলেওসফলতা লাভ করতে পারে। কোনাে ছাত্র একবার বিফল হয়ে বসে থাকলে চলবে না, পুনরায় দ্বিগুণ উৎসাহে তারঅধ্যবসায়ে মনােনিবেশ করা প্রয়ােজন। ছাত্র-ছাত্রীদের সবচেয়ে বেশি অধ্যবসায়ী হওয়া দরকার। কারণ, তাদের সাফল্যেরউপরই জাতির সাফল্য নির্ভর করে। তাই শিক্ষার্থীদের শ্লোগান হওয়া প্রয়ােজন।২২৫পপি এসএসসি রচনা শিক্ষা‘আসবে পথে আঁধার নেমেতাই বলে কি রইব থেমে?”কোনাে জাতি উন্নতি ও অগ্রগতি লাভ করতে পারে না। একমাত্র অধ্যবসায়ী জাতিই উন্নতির স্বর্ণ শিখরে আরােহণ করতেজাতীয় জীবনে অধ্যবসায় : জাতীয় জীবনে অধ্যবসায়ের কোনাে বিকল্প নেই। ছাত্রজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনে যেমনঅধ্যবসায়ের প্রয়ােজনীয়তা রয়েছে, একইভাবে জাতীয় জীবনেও অধ্যবসায়ের প্রয়ােজনীয়তা রয়েছে। অধ্যবসায়ী না হলেপারে এবং সার্বিক সাফল্যের প্রতীক হিসেবে বিশ্বের দরবারে পরিচিত হতে পারে। আর এতে করে জাতীয় জীবনেঅধ্যবসায়ের গুরুত্ব কতখানি তা সহজেই অনুমেয়।অধ্যবসায় ও প্রতিভা : অধ্যবসায় ছাড়া সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত হয় না। অধ্যবসায়ের সাথে প্রতিভা যােগ হলেই মানুষবড় কিছু হতে পারে। অধ্যবসায় না থাকলে শুধু প্রতিভার দ্বারা কিছু হয় না। আবার অধ্যবসায় থাকলে অসাধারণ প্রতিভারঅধিকারী না হলেও বড় কার্য সাধন করা যায়। জগতে বহু বিখ্যাত লােক আছেন যাঁরা প্রতিভাবান অপেক্ষা অধ্যবসায়ী ছিলেনবেশি। বৈজ্ঞানিক নিউটন বলেন, “প্রতিভা বলে কিছু নেই। পরিশ্রম এবং সাধনা করে যাও, তাহলে প্রতিভাকে অগ্রাহ্যকরতে পারবে।” ডালটন স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “লােকে আমাকে প্রতিভাবান বলে, কিন্তু আমি পরিশ্রম ছাড়া কিছুই জানি।”অধ্যবসায়। সফলতা : জীবন যুদ্ধে পরাজিত হয়ে হাল ছেড়ে দেয়া কোনাে সুবিবেচকের কাজ নয়। বলা হয়ে থাকে”Failure is the pillar of success”, অর্থাৎ ব্যর্থতাই সফলতার সােপান। যে লােক ব্যর্থতার তিক্ত অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেঅধ্যবসায়ের সাথে কাজে অগ্রসর হয়, সফলতা তার জন্য নিশ্চিত। অবিচলিত অধ্যবসায়ের দ্বারা সফলতার চরম লক্ষ্যে।পৌছানাে অসম্ভব কিছু নয়। তাই বলা যায়, একমাত্র অধ্যবসায়ই মানবজীবনে সােনালি অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।অধ্যবসায়হীনের অবস্থা : অধ্যবসায়ের অভাবে অনেক সম্ভাবনা অকালে শেষ হয়ে যায়। অধ্যবসায়হীন ব্যক্তি জগতেরকোনাে কাজেই সফলতা লাভ করতে পারে না। তার জীবন ধ্বংস হয়, ব্যর্থ হয়। তার স্মৃতি বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়।সমাজের আস্তাকুঁড়ে নির্ধারিত হয় তার ঠিকানা।অধ্যবসায়ীর জীবনাদর্শ : জীবন সংগ্রামে সাফল্য লাভের মূলমন্ত্র অধ্যবসায়। স্কটল্যান্ডের রাজা রবার্ট ব্রুস ইংল্যান্ডেররাজা এডওয়ার্ডের সাথে ছয়বার যুদ্ধে পরাজিত হয়ে নিরাশ মনে জঙ্গলে ঘুরছিলেন। এমন সময় একটি মাকড়সাকেসাতবার চেষ্টা করে দুটি কড়িকাঠে সুতা জড়াতে দেখে তিনি অদম্য উৎসাহে শত্রুরাজ্য সপ্তম বারের মতাে আক্রমণ করেস্বদেশ উদ্ধার করেন। অর্ধ পৃথিবীর অধীশ্বর নেপােলিয়ন তাঁর জীবনের কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে রেখে গিয়েছেন অধ্যবসায়েরঅপূর্ব নিদর্শন। কোনাে কাজকে তিনি অসম্ভব বলে মনে করতেন না। তাই তিনি একটি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেওফরাসি জাতির ভাগ্যবিধাতা হতে পেরেছিলেন। রবার্ট পিল অধ্যবসায়ের মাধ্যমে একজন বিখ্যাত অর্থবিদ হতে পেরেছিলেন।অধ্যবসায়ের দ্বারা কলম্বাস আবিষ্কার করেছিলেন আমেরিকা। শুধু অধ্যবসায়ের বলেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শেরেবাংলা এ. কে.ফজলুল হক, জগদীশচন্দ্র বসু ও কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিখ্যাত হতে পেরেছিলেন। বিজ্ঞানী নিউটন নিজেই স্বীকারকরেছেন, বিজ্ঞানে তার অবদানের মূলে আছে বহু বছরের একনিষ্ঠ ও নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম।।উপসংহার : জীবনে সাফল্য লাভ করে জাতিকে গৌরবান্বিত করার ক্ষেত্রে অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই। লক্ষ্যে পৌছানােরনিরন্তর প্রচেষ্টা থাকলে শত প্রতিকূলতাও নিরস্ত করতে পারে না। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাই সবাইকে হতে হবে কঠোরঅধ্যবসায়ী। যখনই কোনাে ব্যর্থতা, কোনাে দুঃখ, কোনাে বিপদ আমাদের জীবনকে বিষময় করে তােলে, তখনইঅধ্যবসায়ী মহৎপ্রাণ ব্যক্তিদের কথা স্মরণ করে তাদের আদর্শ অনুসরণ করা উচিত। মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তাদেরইসাহায্য করেন, যারা অধ্যবসায়ী এবং পরিশ্রমী।

শ্রমের মর্যাদা[চট্ট, বাে, ২০২০, ২০১৪; সি, বাে, ২০২০, ২০১৭; রা. বাে, ২০২০, ২০১৯; য. বাে. ২০২০, ২০১৭ঢা, বৌ, ২০১৬, ২০১৫, ২০১৪; কু. বাে, ২০১৪;]।ভূমিকা : মানুষের সমস্ত সম্পদ এবং মানব সভ্যতার বুনিয়াদ রচনা করেছে যে শক্তি তার নাম শ্রম। ইংরেজিতে একটিকথা আছে “Industry is the key to success.” অর্থাৎ পরিশ্রম সাফল্যের চাবিকাঠি। পরিশ্রম দ্বারা মানুষ সৌভাগ্যেরস্বর্ণশিখরে আরােহণ করতে পারে। একটি জাতির সভ্যতা বিকাশে এর অবদান অপরিসীম। পরিশ্রমলব্ধ কার্যের কৃতকার্যতায়যে আনন্দ পাওয়া যায়, তার মতাে আনন্দ আর কিছুতেই পাওয়া যায় না।শ্রমের মর্যাদা : শ্ৰম শব্দের আক্ষরিক অর্থ মেহনত বা দৈহিক খাটুনি। আর মর্যাদা শব্দের অর্থ মূল্যায়ন বা সম্মানপ্রদর্শন। সুতরাং শ্রমের মর্যাদা বলতে বুঝায় মানুষের সকল প্রকার মেহনত বা খাটুনিকে যথাযথ মূল্যায়ন করা এবং সম্মানদেখানাে।1972 তরল ৩১ রান.শ্রমের পুরুত্ব : মানবজীবনে যে উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে এবং মানব সভ্যতার যে বিকাশ ঘটেছে তাতে শ্রম দানের গুরুত্বঅপরিসীম। মানুষ শ্রম দেয় বলেই সভ্যতার চাকা ঘােরে। Virgil বলেন, “The dignity of labour makes a man self-confident and high ambitious. So the evaluation of labour is essential.” সুতরাং জীবনের উন্নতির চাবিকাঠিপরিশ্রমের মধ্যে বিদ্যমান। শ্রমই ব্যক্তিকে দিতে পারে ঐশ্বর্য। এজন্য ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে- “Industry is themother of good luck” অর্থাৎ পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি। মানব সভ্যতার প্রতিটি স্তরে আছে শ্রমের অবদান। সভ্যতারআদিপর্বে মানুষ কায়িক আর মানসিক শ্রমের সহায়তায় তীর ও নৌকা চালানাে শিখেছে, তারপর সভ্যতার কৈশােরে চাষাবাদশুরু করেছে, পরিশ্রমে গড়ে তুলেছে শস্য আর যৌবনে শিখেছে প্রাসাদ নির্মাণ, নগর পত্তন। এভাবে শ্রম মানুষের জীবনেএনে দিয়েছে সমৃদ্ধি। শ্রম যে শুধু সকল সমৃদ্ধির উৎস তা নয়, শ্রম মানুষকে দেয় সৃষ্টির আনন্দ। পরিশ্রমের মধ্য দিয়েইবিকশিত হয় মানুষের সৃষ্টিশীল প্রতিভা। পরিশ্রমের মাধ্যমেই মানুষ নিজের ভাগ্যকে গড়ে তােলে। পৃথিবীতে যা কিছুস্মরণীয়-বরণীয় তা পরিশ্রমের মাধ্যমেই অর্জিত হয়েছে। তাই শ্রমের গুরুত্ব উল্লেখ করে প্রখ্যাত লেখক ম্যাক্সিম গাের্কিবলেছেন, “শ্রম ও সৃজনের বীরত্বের চেয়ে গরীয়ান আর কিছু দুনিয়ায় নেই।” ।প্রদত্ত শ্রমের ক্ষেত্র : যােগ্যতা অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষেরই রয়েছে নিজস্ব কর্মক্ষেত্র। এ কর্মক্ষেত্রে জীবনের প্রয়ােজনেমানুষের ব্যস্ত পদচারণা। পরিশ্রমের মাধ্যমেই এ কর্মক্ষেত্রে মানুষ সফলতা অর্জন করে। প্রবাদে আছে— ‘Man is thearchitect of his own fortune.’ অর্থাৎ মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্য নির্মাতা। এ ভাগ্যকে নির্মাণ করতে হয় শ্রম দ্বারা।সৌভাগ্যের স্বর্ণশিখরে আরােহণের একমাত্র উপায় শ্রম। কর্মমুখর মানব জীবনে নিরন্তর কোনাে না কোনাে প্রতিকূলতায়টিকে থেকেই অস্তিত্ব রক্ষা করতে হয়। তাই বলা যায়, জগৎ কর্মশালা আর জীবন মাত্রই পরিশ্রমের ক্ষেত্র।7. আমাদের দেশে শ্রম সম্পর্কে ধারণা ; আমাদের দেশে অনেকের ধারণা নিজে কাজ করলে আত্মসম্মানের হানি ঘটে।এজন্য ছােট ছােট কায়িক শ্রমভিত্তিক কাজকে তারা মর্যাদাহীন মনে করে। কিন্তু উন্নত দেশগুলাের দিকে তাকালে আমরাদেখতে পাই যে, কায়িক শ্রমের মাধ্যমে তারা উন্নতির স্বর্ণশিখরে আরােহণ করছে। তাই আমাদের মতাে উন্নয়নশীল দেশেশ্রমবিমুখতা উন্নতির পথে অন্যতম প্রতিবন্ধক। কায়িক শ্রম মােটেই আত্মসম্মানের পরিপন্থী নয়; বরং তা সমাজে প্রতিষ্ঠালাভের প্রধান উপায়।WA।তউন্নত দেশসমূহে শ্রমের মর্যাদা : পৃথিবীর উন্নত দেশসমূহের প্রতি লক্ষ করলে দেখা যায় যে, শ্রমের প্রতি তারা বেশমর্যাদাশীল। কোনাে কাজকেই তারা মর্যাদা হানিকর মনে করে না। ছােট-বড় বলে সেখানে কোনাে পার্থক্য নেই। শ্রমেরপ্রতি তারা বেশ আগ্রহ দেখিয়ে থাকে। একমাত্র শ্রমের বলেই আজ জাপান, জার্মান প্রভৃতি দেশ সাফল্যের স্বর্ণশিখরেআরােহণ করেছে। পৃথিবীর যে জাতি যত বেশি পরিশ্রমী, সে জাতি তত বেশি উন্নত।পপি এসএসসি রচনা শিক্ষা।২২৭শ্রমের প্রকারভেদ : জনৈক মনীষী বলেছেন, “অস্থায়ী জীবনটাকে যত বেশি পার কাজে লাগাইয়া লও।” শ্রমেরমাধ্যমেই মানুষ তার জীবনকে সার্থক করতে পারে। শ্রম সাধারণত দুই প্রকার যথা – মানসিক শ্রম ও কায়িক শ্রম। কাজ| মানসিক উন্নতি শ্রম ছাড়া হয় না। কথায় আছে- “অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা।” যে লােক শ্রমবিমুখ তার মনেকখনাে সুচিন্তা ও সম্ভাব উদয় হয় না; বরং কুচিন্তার আশ্রয়স্থল হয়ে পড়ে। পরিশ্রমী ব্যক্তির মন ও মস্তিষ্ক কুক্রিয়া শক্তি থেকেসর্বদা দূরে থাকে। পৃথিবীতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতির পেছনে যত তত্ত্ব রয়েছে, সাহিত্য-দর্শন প্রভৃতি বিষয়ে যত গ্রন্থ রচিতহয়েছে তা সবই জগখ্যাত মনীষীদের মানসিক শ্রমের ফসল। মানসিক শ্রম ব্যতীত এ সকল বিষয়ে জ্ঞান অর্জনও সম্ভবনয়।জগতের সকল জীবকেই বেঁচে থাকার তাগিদে কম-বেশি শারীরিক ও মানসিক শ্রম দিতে হয়। মানসিক শ্রম একটাকাজের উদয় করে আর শারীরিক শ্রমে তা সমাধা হয়। বিশ্বনিয়ন্তা আমাদের শারীরিক শ্রমের নিমিত্তে হাত-পা ইত্যাদিঅঙ্গ-প্রত্যঙ্গা দিয়েছেন। শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে আমরা যেমন জনকল্যাণে অবদান রাখতে পারি, তেমনি নিজের দেহ,মনও সুস্থ থাকে। চাষি, শ্রমিক, কুলি, মজুর এরা দেশ ও জাতিকে রক্ষার মহান দায়িত্ব নিয়েই শারীরিক শ্রমে অবতীর্ণ হয়।কবি নজরুলের ভাষায় -{}“শ্রম-কিনাঙ্ক-কঠিন যাদের নির্দয় মুঠিতলে দিচ্ছে। টিসিয়ামী দিন চাচিতরাজ সিন চাষ এস্তা ধরণী নজরানা দেয় ডালি ভরে ফুলে ফলে। এক সাকা তে পেলাম,শ্রমশীল ব্যক্তির উদাহরণ : পৃথিবীর বিখ্যাত ব্যক্তি ও মনীষীগণের জীবনী আলােচনা করলে দেখা যায়, তারা সকলেইপরিশ্রমী ছিলেন। ওয়াশিংটন, আব্রাহাম লিংকন, বিজ্ঞানী আইনস্টাইন এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হযরতমুহম্মদ (স.) কঠোর পরিশ্রমী ছিলেন। তিনি নিজ হাতে সকল কাজ সমাধা করতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজনবলতেন, “নিজ হাতে নিজের কাজ করার মতাে পবিত্র জিনিস আর নেই।””””””সৈনিক। আবার মাটি কাটার কাজে সাধারণ শ্রমিকের মতাে কাজ করে গেছেন। তাতে তিনি লজ্জাবােধ করেননি। তিনি. উপসংহার : শ্রমশক্তি সমাজ-সভ্যতা নির্মাণ ও সাফল্যের চাবিকাঠি। একমাত্র শ্রমশক্তিই পারে।মানুষকে সাফল্যেরস্বর্ণশিখরে আরােহণ করাতে। এ শক্তিকে জাগরিত করার মাঝেই আমাদের মঙ্গল নিহিত। তাই আমাদেরকে শ্রম সম্পর্কিতসকল ভ্রান্ত ধারণা পরিহার করে এবং কোনাে শ্রমকে মর্যাদা হানিকর মনে না করে পরিশ্রমী হতে হবে। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন।শ্রমজীবী মানুষকে অলস বিজ্ঞজনের চেয়ে বেশি মর্যাদা দিয়ে বলেছেন, “…a hard working street cleaner is a betterman than a lazy scholar. ” সুতরাং জাতীয় ও ব্যক্তিগত জীবনে শ্রমের কোনাে বিকল্প নেই।

চরিত্রকুি বাে. ২০২০]সূচনা : The crown and glory of life is character. চরিত্র মানবের মহার্ঘতম বিষয়, শ্রেষ্ঠতম অলংকার।চরিত্রবান ব্যক্তি সমাজের শিখাস্বরূপ। চরিত্র মানুষকে ন্যায়, সত্য, সহম ও শ্রদ্ধাবােধের শিক্ষা দেয় এবং সৎপথে চলতেউদ্বুদ্ধ করে। চরিত্র গৌরবে গরীয়ান মানুষ দেবতার মহিমায় পৃথিবীতে বিরাজ করে। তারচরিত্র : মানুষের জীবনে চলাফেরায়, কথাবার্তায়, কাজকর্মে ও চিন্তাধারায় যে সদাচার ও মহৎ ভাব পরিলক্ষিত হয়,তা-ই চরিত্র। গুরুজনদের প্রতি ভক্তি, ন্যায়পরায়ণতা, সত্যনিষ্ঠা, আত্মসংযম ইত্যাদি গুণাবলির মধ্য দিয়ে চরিত্র প্রকাশপায়। যার মধ্যে এসব গুণের সমাবেশ ঘটে তাকে বলে চরিত্রবান। সবচেয়ে অমূল্য সম্পদ এ চরিত্রের জন্যই পশুর সঙ্গেমানুষের ব্যবধান। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব এর দ্বারাই নির্ধারিত।সচ্চরিত্রের লক্ষণ : চরিত্রবান লোেক কখনাে অন্যায় ও অসৎ কার্যে প্রবৃত্ত হন না। তিনি অনমনীয় মহীরুহের ন্যায়অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন। তিনি কখনাে সত্য ত্যাগ করেন না, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন না, ক্রোধে অন্ধ হয়ে কারও সাথেনিষ্ঠুর আচরণ করেন না। উজ্জ্বল চরিত্রবান ব্যক্তি সদালাপী, বিনয়ী ও জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন। সৃষ্টিকর্তাকে ছাড়া তিনি২২৮পপি এসএসসি রচনা শিক্ষাআর কাউকে ভয় করেন না। তার জীবনে হিংসা, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা থাকে না। চরিত্রবান ব্যক্তি সদা প্রফুল্ল চিত্তেরঅধিকারী।চরিত্র গঠনে শৈশব : চরিত্র গঠনের কাজ শিশুকাল থেকে মরণের আগ পর্যন্ত চলতে থাকে। তাই চরিত্রের উপরপরিবার, সমাজ ও পারিপার্শ্বিক সামাজিক বিধি-ব্যবস্থা প্রভাব বিস্তার করে। বিশেষ করে শিশুর চরিত্র গঠনে তার পরিবারই।মুখ্য। শিশুকাল চরিত্র গঠনের উৎকৃষ্ট সময়। শিশুর চরিত্র যেন নির্মল ও স্বচ্ছ হয় সেজন্য উপযুক্ত শিক্ষাদানের পাশাপাশিঅভিভাবককে তৈরি করতে হবে অনুকূল পরিবেশ। শিশুকে সৃষ্টিশীল কাজে উৎসাহিত করা হলে তার সৃজনী প্রতিভাবিকশিত হয়। শিশুর চরিত্রে মহৎ গুণের সমাবেশ ঘটাতে হলে চাই সৎ সঙ্গ। “সৎসঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ”,কিংবা “সঙ্গ দোষে লােহা ভাসে”- এসব প্রবাদ বাক্যকে শিশুর চরিত্র গঠনে উপযুক্তভাবে ব্যবহার করতে হবে।চরিত্র গঠনে শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের ভূমিকা : শিশুর নৈতিক চরিত্র বিকাশে বিদ্যালয় ও শিক্ষক-শিক্ষিকার ভূমিকাগুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকের কাজ শিশুকে সুশিক্ষা দেওয়া, লেখাপড়ার মধ্য দিয়ে শিশুদের চরিত্র কিরূপে গড়ে উঠছে সেদিকে লক্ষরাখা। তবে আজকাল শিশুর ভালাে-মন্দ চরিত্র গঠনে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখছে টেলিভিশন ও স্যাটেলাইট চ্যানেলের মতােগণমাধ্যমও।চরিত্র গঠনে পরিবারের ভূমিকা : বাসগৃহকে চরিত্র গঠনের উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রত্যেক শিশুইনিস্পাপ হয়ে জন্মগ্রহণ করে। শিশুরা স্বভাবতই অনুকরণপ্রিয়। তাই শৈশবে শিশুর কোমল হৃদয়ে যা প্রবিষ্ট হয় তা চিরস্থায়ীরূপ পরিগ্রহ করে। তাই শিশুর পরিবার যদি সৎ ও আদর্শবান হয়, তবে সে-ও সৎ ও আদর্শবান হতে বাধ্য। এক্ষেত্রে শিশুরপিতামাতাকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, শিশু সর্বপ্রথম তার মধ্যে নিজের মা কিংবা বাবার দোষবা গুণকেই ধারণ করার চেষ্টা করে।* চরিত্র গঠনে সামাজিক প্রভাব ; মাতাপিতা, আত্মীয়-স্বজন থেকে আরম্ভ করে পাড়া-প্রতিবেশীর পরিবেশের মধ্যদিয়েই শিশুর চরিত্র গঠিত হয়। শিক্ষাজীবনে বিদ্যালয়ে বা সমবয়স্কদের সাথে খেলাধুলায় এবং সঙ্গ-প্রভাবে শিশুরা আসলচরিত্ররূপ পরিগ্রহ করে। কার সস্তান, ধনীর সন্তান নাকি দরিদ্রের সন্তান-এসব বিচার বিবেচনা না করে সমাজের সকলেরউচিত শিশুর চরিত্র গঠনে সহায়তা করা।চরিত্র গঠনে স্বীয় সাধনা : চরিত্র গঠনের প্রধান উপায় হলাে স্বীয় সাধনা। চরিত্র সাধনার ধন। বহুদিনের সাধনারবলে তা অর্জন ও রক্ষা করতে হয়। সংসার প্রলােভনময়। পাপের হাজার প্রলােভন মানুষকে বিপথে চালিত করতে সদাসচেষ্ট। আত্মিক শক্তির বলে সেই সব প্রলােভনকে দমন করে সত্যের পথে অবিচল থাকতে হবে। এর জন্য সর্বাগ্রে দরকারনিজের শক্তিতে দৃঢ় আস্থা স্থাপন। যে বলহীন, নিজেকে ক্ষুদ্র মনে করে, সংসারের যাবতীয় প্রলােভনকে জয় করার মতােমনােবল যার নেই, সে কখনাে চরিত্ররূপ অমূল্য ধনের অধিকারী হতে পারে না। সে মানব সমাজে অধম।চরিত্র গঠনে মহামানবের আদর্শ ও চরিত্র গঠনে মহামানবদের আদর্শ অনুপ্রেরণার উৎস। পৃথিবীর যে সব মহামানবতাদের কীর্তিতে প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে আছেন, তাদের সকলেই সচ্চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। কোনাে প্রলােভনই তাদেরকেন্যায় ও সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। অন্যায়, অসত্য ও পাপের বিরুদ্ধে তারা আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন।তারা আপন চরিত্র বলে জগতে অসাধ্য সাধন করেছেন। হযরত মুহম্মদ (স.), হযরত ঈসা (আ.), হযরত আবুবকর (রা),আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.), হাজী মােহাম্মদ মহসীন প্রমুখ মহামানবগণ আপন চরিত্র বলে পৃথিবীর সমস্ত মানুষের হৃদয়েঅমর হয়ে আছেন। তাদের চরিত্রে মানবের জন্য শিক্ষণীয় অনেক কিছু রয়েছে। তাদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরাও,পারি উন্নত চরিত্রের অধিকারী হতে। কবি বলেছেন- “এমন জীবন করিবে গঠন, মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন”।চরিত্রের মূল্য : জ্ঞানী ব্যক্তিরা চরিত্রকে মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলে অভিহিত করেছেন। সকল সম্পদ অপেক্ষা চরিত্রঅধিক মূল্যবান। চরিত্রবান ব্যক্তি সম্পদে দীন হলেও গৌরবে মহান। সকলেই তাকে শ্রদ্ধাভক্তি করে, মান্য করে। চরিত্রশক্তিতে বলীয়ান হলে মানুষ অসাধ্য সাধন করতে পারে। চরিত্র ভালাে থাকলে মানুষ সুন্দর ও সুস্থ থাকে। তার অহেতুকপপি এসএসসি রচনা শিক্ষাভয়-ভীতি থাকে না। কথায় আছে, “রাজার জোর অর্থের আর চরিত্রবানের জোর হৃদয়ের।” চরিত্রবান ব্যক্তি মহাপুরুষরূপেসমাজে সমাদৃত। হাদিসে আছে,“সব চাইতে পূর্ণ ইমানদার সেই ব্যক্তি, যার আখলাক বা চরিত্র ভালাে।”চরিত্রহীনভার কুফল : কথায় বলে-যার চরিত্র নেই তার কিছুই নেই। চরিত্রহীন ব্যক্তি বিদ্বান হলেও সে সমাজেরশত্র। সে সকলের ঘৃণার পাত্র। মানব সমাজে তার স্থান নেই। সে মানুষ নামের অযােগ্য। প্রবাদে আছে-When money islost nothing is lost, when health is lost something is lost but when character is lost everything is lost. petteটাকা কড়ি হারালে কিছুই হারায় না, স্বাস্থ্য হারালে কিছু হারায়; কিন্তু চরিত্র হারালে সব কিছুই হারাতে হয়। চরিত্রহীনব্যক্তির বিদ্যা-বুদ্ধি, ধন-সম্পদ যতই থাকুক না কেন-এসবের কোনাে মূল্য নেই। মানুষ তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে না।তারা শুধু মানুষের অভিশাপ ও ঘৃণার পাত্র হয়ে থাকে। সাপের মাথায় মণি থাকলেও সবাই যেমন সাপকে ভয় পায়, তেমনিবিদ্বান চরিত্রহীন হলেও তাকে সকলেই এড়িয়ে চলে।উপসংহার : মানুষ জ্ঞানী ও ধনী হলেই পূর্ণ মনুষ্যত্ব লাভ করতে পারে না। চরিত্র বলে বলীয়ান মানুষই পূর্ণ মনুষ্যত্বেরঅধিকারী হয়। চরিত্রবান ব্যক্তি জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ। আর চরিত্রহীন ব্যক্তি মনুষ্যত্বহীন পশুর সমান। কেউ তাকে পছন্দ করে। সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করাই তার কাজ। তাই আমাদের সবাইকে চরিত্র গঠনে মনােযােগী হতে হবে!

সত্যবাদিতা।কু, বাে. ২০১০)সূচনা : সত্যবাদিতা একটি মহৎ গুণ। এটি মানুষকে নিয়ে যায় মর্যাদার পথে, গৌরবময় স্থানে, যা তাকে সকলমানুষের কাছে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরে। সত্যবাদিতা মানব চরিত্রের অলঙ্কার। সত্যবাদিতা মানুষের আদর্শের বৈজয়ন্তী।এই গুণ অন্যের পরিপূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা অর্জনের সহায়ক। বাল্যশিক্ষার প্রথম শিক্ষা-সদা সত্য কথা বলিবে, মিথ্যা বলিবে। তাই এ গুণ অর্জন ও সংরক্ষণের জন্য মানুষকে নিরলস চর্চা করতে হয়।সত্যবাদিতা : আরবি ‘আস-সিদৃক’ শব্দের অর্থ সত্যবাদিতা। সত্য কথা বলার গুণই হলাে সত্যবাদিতা। অন্যভাবে বলাযায়, সত্যকে অবলম্বন করে যে বৈশিষ্ট্য বিকশিত হয়, তার নাম সত্যবাদিতা। সত্য জীবনের স্বরূপ বিকশিত করে এবং এরমাধ্যমে মহান আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়। সত্যের মধ্য দিয়েই মানুষ অর্জন করে সততা। কোনাে ঘটনা বা বিষয় সম্পর্কেকোনােরূপ পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা বিকৃতি ব্যতিরেকে হুবহু বা অবিকল বর্ণনা উপস্থাপন করাই হলাে সত্যবাদী ব্যক্তিরবৈশিষ্ট্য। সত্যের অনুসারী মানুষ সৎ থাকার মাধ্যমে সত্যবাদিতার বৈশিষ্ট্যকে রূপায়িত করে তােলে। সত্যবাদিতার মধ্যদিয়েই বিবেকবান মানুষের পরিচয় পাওয়া যায়। তাই সত্যবাদিতা মহত্তর জীবনের অলঙ্কার হিসেবে বিবেচিত হয়।দৈনন্দিন জীবন ও সত্যবাদিতা : দৈনন্দিন জীবনে সর্বক্ষেত্রে সত্যবাদিতা চর্চার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিদিন আমরাঅসংখ্য ঘটনা, কাজ ও অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই। পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে অনেক সময় আমাদেরকে মিথ্যার মুখােমুখিহতে হয়। এরূপ অবস্থায় সত্যবাদিতাকে কেবল তখনই প্রয়ােগ করা যায়, যদি দৈনন্দিন জীবনে আমরা সত্যবাদিতার চর্চাকরি। প্রতিদিন সত্যবাদিতার অনুশীলন করলে আমাদের সমগ্র জীবনই বদলে যাবে। দৈনন্দিন জীবনে সত্য বলার সুরঅভ্যাস আমাদের জীবনকে মহিমান্বিত করবে। ব্যক্তিজীবনের পাশাপাশি সমাজজীবনও এর ফলে উপকৃত হবে। সুতরাংআমাদের দৈনন্দিন জীবনে সত্যবাদিতাকে মূলমন্ত্র করে কল্যাণময় ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবন গড়ে তােলার প্রত্যয়ে বলীয়ানহতে হবে। তাহলেই জীবন সার্থক ও সুন্দর হয়ে উঠবে।সত্যবাদিতার প্রয়ােজনীয়তা : ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনে সত্যবাদিতার প্রয়ােজনীয়তা অপরিসীম। এটি মানুষকেনৈতিক চরিত্র গঠনে সাহায্য করে। সত্যবাদী ব্যক্তি কোনােরূপ অন্যায়-অত্যাচার করতে পারে না। ফলে সমাজজীবনেশান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকে। সত্যবাদিতার শক্তিও কল্পনাতীত। এর মাধ্যমে সমাজ থেকে সকল অন্যায়, অকল্যাণ ওঅসুন্দরকে বিদূরিত করা যায়। সত্যের সামনে কোনাে অশুভ শক্তি দাঁড়াতে পারে না। সত্যবাদিতার জয় তাই অনিবার্য।মিথ্যা যেখানে অনাকাঙিক্ষত জটিলতা ও ধ্বংসের সূচনা করে, সত্য সেখানে মুক্তি ও কল্যাণের পথকে আলােকিত করে।২৩০পপি এসএসসি রচনা শিক্ষাসেই আলােকিত পথ ধরে সফল জীবনের দিকে অগ্রসর হওয়া যায় এবং জীবনকে তৃপ্তির সাথে উপলদ্ধি করা যায়। সুতরাংদেখা যাচ্ছে, সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে, সমাজ থেকে দুর্নীতি দূরীকরণে এবং কল্যাণময় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সত্যবাদিতারকোনাে বিকল্প নেই। তাই আমাদেরকে জীবনের সকল ক্ষেত্রে সত্যবাদিতার আলােয় উদ্ভাসিত হতে হবে, সত্যকেভালােবাসতে হবে। আমাদেরকে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতে হবে যে, সত্য সবসময়ই মুক্তি দেয় এবং কখনােই তা বঞ্চনাকরে না। এজন্যই কবিগুরু বলেছেন-olio 10 todafig for a“সত্য যে কঠিন,১ম কঠিনেরে ভালােবাসিলাম11. সব সময় ১০ সে কখনাে করে না বঞ্চনা।”জান্নাত লাভের মাধ্যম : জান্নাত লাভের অনেকগুলাে গুণের মধ্যে সত্যবাদিতা অন্যতম। মহান রাব্বল আলামিনসত্যবাদীকে পুরস্কার স্বরূপ জান্নাত প্রদানের কথা ঘােষণা করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, “এই তাে সে দিন যে দিন।সত্যবাদীগণকে তাদের সত্যবাদিতা বিশেষ উপহার দেবে। তাদের জন্য রয়েছে পরম সুখময় জান্নাত।” তিন ব্যাককল্যাণের বাহক ; সত্যবাদিতা মানুষের মধ্যে কল্যাণময় জীবনের উন্মেষ ঘটায়। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “হেমুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদী লােকের সঙ্গে থাক”। মানুষ মুক্তি ও সফলতা লাভ করে সত্যবাদিতারমাধ্যমে। মহানবি (স.) বলেছেন, “সত্যবাদিতা মানুষকে মুক্তি দেয়, আর মিথ্যা ডেকে আনে ধ্বংস।”সৎ জীবন গঠনের উপায় : সুন্দর ও পুণ্যময় জীবনের জন্য সত্যবাদিতার অনুশীলন অত্যাবশ্যক। এ জন্য জীবনেরশুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সত্যবাদিতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে সারা জীবনসত্যবাদিতাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে হবে। সততার সঙ্গে মানবজীবনকে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত করার জন্য শিশুকাল থেকেইসত্যবাদিতার আদর্শকে সমুজ্জ্বল করে রাখতে হবে। পারিবারিক পরিবেশে পিতামাতার কাছ থেকেই প্রথমে শিশুরা।সত্যবাদিতার ধারণা লাভ করে এবং জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। তাই প্রতিটি শিশুর সৎ জীবন-যাপনে পিতামাতারদায়িত্ব সর্বাধিক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও সত্যবাদিতার শিক্ষা প্রাধান্য পাওয়া উচিত। কোনাে প্রকার অন্যায় আচরণ যাতে শিক্ষা।জীবনে অনুপ্রবেশ করতে না পারে, সে ব্যাপারে শিক্ষক সমাজকে সচেতন থাকতে হবে। কর্মক্ষেত্রে সত্যবাদিতার আদর্শসমুন্নত রাখতে লােভ-লালসার ঊর্ধ্বে থেকে দেশ ও জাতির কল্যাণকে প্রাধান্য দিতে হবে। বিবেককে জাগ্রত রাখার মাধ্যমেজীবনে সত্যবাদিতার নিদর্শন দেখানাে যায়। সততাবিরােধী কাজের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে যথােপযুক্ত শাস্তি বিধানের ব্যবস্থাথাকতে হবে। তিনি জানিহারসত্যহীনতার পরিণাম । মানুষের নৈতিকতার অধঃপতন ঘটলে সত্যবাদিতার অবক্ষয় ঘটে। ফলে মানুষের জীবন ওসমাজ নানা রকম অন্যায়-অনাচার, অবৈধ কার্যকলাপ, পাপাচার ইত্যাদিতে সংক্রমিত হয়। তখন মানুষ হিতাহিত জ্ঞানশূন্যহয়ে অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়। সত্যবাদিতার অভাব থেকে সকল পাপাচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে মানুষের মহৎ গুণাবলিরঅপমৃত্যু ঘটে এবং মানুষ আদিম যুগের অন্ধকারের দিকে এগিয়ে চলে। এ অবস্থায় মানব জীবন থেকে সুখ বিতাড়িত হয়,সমাজে ব্যাপক আকারে অন্যায়-অনাচার প্রবেশ করে জাতিকে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দেয়, সমাজে সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খলার।তাছাড়া মানুষ যদি একবার সত্যবাদিতা বিসর্জন দেয়, তবে আর কোনাে অবৈধ কাজই তার কাছে অন্যায় বলে বিবেচিত হয়।।উপসংহার : জগৎ থেকে সকল অন্ধকার দূরীভূত করতে সত্যের কোনাে বিকল্প নেই। তাই সত্যকে জীবন পথেরপাথেয় বানাতে হবে। সত্যবাদিতার সম্মােহনী শক্তিকে মূলমন্ত্র করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। জীবনের সর্বক্ষেত্রে সর্বদাসত্যবাদিতার অনুশীলন ও চর্চার মাধ্যমে কল্যাণময় পৃথিবী গড়ে তােলাই হােক আমাদের শপথ। সত্যের আলােয় আলােকিতহােক সারা বিশ্ব, উদ্ভাসিত হােক প্রতিটি মানবহৃদয়। আর ১৭ ভা, সিটি চিকন আলী ?দিক তলী =V/S ফেসব মিলিত}{ক কি ?Wধু ) ( দিয়? সতিজী এনামান।

স্বাবলম্বনভূমিকা : ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে, “Self help is the best help” অর্থাৎ আত্মনির্ভরতাই সবচেয়ে বড় সাহায্য।অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকার মতাে এমন লজ্জাকর, গ্লানিকর এবং অসম্মানজনক আর কিছুই নেই। নিজেরপ্রচেষ্টায় জীবনযাপন করার মধ্যেই মানবজীবনের সার্থকতা। তাই আত্মনির্ভরতার কোনাে বিকল্প নেই। শুধু ব্যক্তি পর্যায়েনয়; পরিবার, সমাজ ও জাতীয় পর্যায়েও স্বাবলম্বনের গুরুত্ব অপরিসীম।স্বাবলম্বন : স্বাবলম্বন কথার অর্থ নিজেই নিজের অবলম্বন। অর্থাৎ অন্যের উপর নির্ভর না করে নিজের চেষ্টা, সাধনাও মেধা দ্বারা জীবনযাপন করার নামই স্বাবলম্বন বা আত্মনির্ভরতা। আত্মনির্ভরতাই সবচেয়ে বড় সাহায্য, যার মাঝেইলুকিয়ে আছে সাফল্যের চাবিকাঠি।স্বাবলম্বনের প্রয়ােজনীয়তা : ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে উন্নতির একমাত্র সােপান হচ্ছে স্বাবলম্বন। একজন ছাত্র তখনইতার মেধা সম্পূর্ণরূপে বিকশিত করতে পারবে যখন সে স্বাবলম্বী হয়ে লেখাপড়া করবে। সারকথা হচ্ছে, কোনাে ব্যক্তি বাজাতিকে উন্নতি করতে হলে অবশ্যই স্বাবলম্বী হতে হবে। স্বাবলম্বী হতে না পারলে আল্লাহও তাকে সাহায্য করেন না।বিশ্বমানব হযরত মুহাম্মদ (স) তাঁর অনুসারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার উপদেশ দিয়েছেন। ইসলাম ধর্ম ছাড়াও অন্যান্য সকল ধর্মেমানুষকে স্বাবলম্বী হতে বলা হয়েছে। ইংরেজিতে একটি কথা আছে- “Allah helps those who help themselves.” অর্থাৎ“আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করেন, যারা নিজেদেরকে নিজেরা সাহায্য করে।”স্বাবলম্বিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থা : স্বাবলম্বিতা অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে মডেল। বেকারসমস্যা সমাধানে সরকার আত্মকর্মসংস্থানের উপর জোর দিয়েছে। সে লক্ষ্যে কারিগরি, কর্মমুখী ও হস্তশিল্প শিক্ষার প্রসারেগুরুত্বারােপ করেছে। অদক্ষ জনশক্তিকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। প্রান্তিকজনগােষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তােলার জন্য একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প চালু করা হয়েছে। সেখান থেকে ঋণ নিয়ে।গ্রামীণ জনগােষ্ঠী স্বাবলম্বী হওয়ার সুযােগ পাচ্ছে। যা বেকার সমস্যা সমাধান ও জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনISOকরছে।ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে স্বাবলম্বিতা অর্জনের উপায় : ব্যক্তি জীবনে স্বাবলম্বিতা অর্জনের প্রধান উপায় হচ্ছেপরনির্ভরশীলতা পরিহার ও আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি। কোনাে কাজকে ছােট মনে না করে বরং পরিশ্রম করে নিজের ভাগ্যোন্নয়নেব্রতী হতে হবে। জাতিকে স্বাবলম্বিতা অর্জন করতে হলে নিজ দেশের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশিউৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে চাষাবাদ করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবেএবং শিল্পের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালসহ যত বিদেশি পণ্য আমদানি করা হয় সবকিছুর আমদানি ক্রমান্বয়ে বন্ধ করতে হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট প্রত্যেককে হতে হবে সৎ ও কঠোর পরিশ্রমী। এভাবে সার্বিকভাবে দেশের উন্নয়ন সাধিত হলে বিদেশি10sBdসাহায্যের উপর নির্ভরতা কমানাে অনেকাংশে সম্ভব হবে।স্বাবলম্বনের অনুশীলন : নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখার মাধ্যমে একটি শিশুর স্বাবলম্বী হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। শৈশবহচ্ছে স্বাবলম্বন অনুশীলনের উপযুক্ত সময়। স্কুল জীবনে এসে এ প্রয়ােজনীয় গুণটির চর্চা শুরু করা উচিত। যেমন, ছাত্রছাত্রীরাযদি পুরােপুরি শ্রেণিশিক্ষক বা গৃহশিক্ষকের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে তাহলে প্রকারান্তরে সে পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে।নিজের উপর তার আস্থা থাকে না। ফলে পরবর্তী জীবনে সে মৌলিক ও সৃজনশীল প্রতিভার পরিচয় দিতে পারে না। তাইস্বেচ্ছায়, সচেতনভাবে এবং নিষ্ঠার সাথে কোনাে কিছু করার সামর্থ্য অর্জনের মধ্য দিয়েই স্বাবলম্বনের অনুশীলন করতেহবে। {}}স্বাবলম্বনের পথে বাধা : স্বাবলম্বনের পথে প্রধান বাধা হচ্ছে আলস্য ও জড়তা। যারা অলস তারা ছােটখাট কাজেওবাবা-মা, ভাই-বােনের উপর নির্ভর করে। এভাবে পরনির্ভরশীলতা তাদের এমনভাবে আচ্ছন্ন করে যে তারা নিজেকে দুর্বল।ও২৩২• পপি এসএসসি রচনা শিক্ষাভাবতে শুরু করে। বড় হয়ে এরা যে কোনাে সমস্যা মােকাবেলা করতে গিয়ে অসহায় বােধ করে। এরূপ অলস, বিলাসী ।কর্মবিমুখ মানুষ অন্যের উপর নির্ভর করে বাঁচতে চায়। তারা সমাজ তথা দেশের অগ্রগতির অন্তরায়।স্বাবলম্বিতা অর্জনে সরকার ও শিক্ষিত লোেকদের ভূমিকা : ব্যক্তি ও জাতীয় পর্যায়ে স্বাবলম্বিতা অর্জনে সরকার ওশিক্ষিত লােকদের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। স্বাবলম্বিতা অর্জনের ব্যাপারে সরকার জাতীয় প্রচার মাধ্যমগুলাের সহায়তায়দেশবাসীকে সচেতন করে তুলতে পারে এবং এ ব্যাপারে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারে। স্বাবলম্বিতা সম্পর্কেশিক্ষিত লােকদের প্রচুর জ্ঞান রয়েছে; কিন্তু অশিক্ষিত লােকেরা এ ব্যাপারে অনেক পিছিয়ে আছে। শিক্ষিত লােকজন।স্বাবলম্বিতা সম্পর্কে অশিক্ষিত জনগােষ্ঠীকে প্রয়ােজনীয় জ্ঞান দিতে পারে।স্বাবলম্বিতার দৃষ্টান্ত : আর্কিমিডিস, গ্যালিলিও, নিউটন, মাদাম কুরী, আইনস্টাইনের মতাে বিজ্ঞানী; শেকস্‌পিয়র,দান্তে, কালিদাস, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের মতাে সাহিত্যিক, লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির মতাে শিল্পী, নেপােলিয়ন, মেন্ডেলা,লেনিন, মাও সেতুং-এর মতাে রাষ্ট্রনায়ক জীবনে সফলতা পেয়েছেন স্বাবলম্বনের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে। তাই বলা যায়,জীবনে যাঁরা বড় হয়েছেন, তারা সবাই ছিলেন আত্মনির্ভরশীল বা স্বাবলম্বী।উপসংহার : স্বাবলম্বিতাই উন্নতির চাবিকাঠি। স্বাবলম্বনের পথ ধরেই মানুষের বিজয় সূচিত হয়। আধুনিক বিশ্ব যেখানেজ্ঞান, বিজ্ঞান, ব্যবসায়-বাণিজ্য ইত্যাদি যাবতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রচণ্ড প্রতিযােগিতায় মেতে উঠেছে, সেখানে কোনােজাতি স্বাবলম্বী না হলে তার পিছিয়ে পড়া ছাড়া অন্য কোনাে গতি নেই। তাই স্বাবলম্বনের পথ ধরেই আমাদেরকে এগিয়েযেতে হবে।

নিয়মানুবর্তিতা। শৃঙ্খলাবােধভূমিকা : পৃথিবীটা নিয়মের রাজত্ব। প্রকৃতির কোথাও অনিয়ম নেই। সৃষ্টি চরাচরের দিকে তাকালে আমরা প্রতিক্ষেত্রেই নিয়মানুবর্তিতার প্রকাশ দেখতে পাই। আকাশের চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র—সবকিছু একটা নির্দিষ্ট নিয়মে আবর্তিতহচ্ছে। নির্দিষ্ট নিয়মে আকাশে সূর্য উঠে, চাঁদ হাসে। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ যথা নিয়মে আসে। প্রাণিজগতেও এ নিয়মবিরাজমান। নিয়মানুবর্তিতার কারণেই প্রকৃতি ও প্রাণিজগৎ এত বৈচিত্র্যময় ও সুন্দর।নিয়মানুবর্তিতা : অণু থেকে অট্টালিকা পর্যন্ত, এই মহাবিশ্বে যা কিছু দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য সবকিছুই একটি বিশেষসজ্জায় সাজানাে, একটি বিশেষ শৃঙ্খলে বাধা। এই সজ্জা বা শৃঙ্খলাই নিয়ম। আর পার্থিব জীবনে যখন যা করার নিয়ম বাবিধি রয়েছে তা সঠিক সময়ে পালন করার নামই নিয়মানুবর্তিতা। জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত এই পৃথিবীর সব কাজেখাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলতে হয়। নিয়মানুবর্তিতা মানবজীবনে অনিবার্য ওআবশ্যকীয়। নেপােলিয়ন বলেছেন, “Discipline is the key stone to success which is compulsory to follow tobalance the systems.”নিয়মানুবর্তিতার প্রয়ােজনীয়তা : মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে চলতে হলে তাকে সমাজের কিছু নিয়ম-কানুন বাবিধি-নিষেধ অবশ্যই মেনে চলতে হয়। সেসব নিয়ম-কানুন মেনে না চললে জীবন-যাপন সুখের হয় না। কেননা,বিশৃঙ্খলা সব সময়ই মন্দের পথে চালিত করে। এজন্য মানুষকে সামাজিক জীবনের মতাে রাষ্ট্রীয় জীবনেও কতগুলোআইন-কানুন মেনে চলতে হয়। সেসব আইন মেনে চলার মাঝেই জাতীয় জীবনের সমৃদ্ধি নির্ভরশীল।| জীবনের সর্বক্ষেত্রে নিয়মানুবর্তিতা : জীবনের সর্বস্তরেই নিয়মানুবর্তিতার প্রয়ােজন রয়েছে। পরিবারের সদস্যদেরমধ্যে নিয়মানুবর্তিতা না থাকলে পরিবারে বিশৃঙ্খলা অনিবার্য হয়ে উঠে। স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, খেলার মাঠ, কল-কারখানা, হােটেল ইত্যাদিতে নিয়মানুবর্তিতার অভাবে দেখা দেয় চরম নৈরাজ্য। খেলার মাঠে ও যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ম-শৃঙ্খলারপ্রয়ােজন গভীরভাবে অনুভূত হয়ে থাকে।পপি এসএসসি রচনা শিক্ষাছাত্রজীবনে নিয়মানুবর্তিতা : ছাত্রজীবন নিয়মানুবর্তিতা অনুশীলনের প্রকৃত সময়, প্রকৃত প্রয়ােগক্ষেত্র। ‘Work whileyou work, play while you play, and that is the way to be happy and gay.’ ‘খেলার সময় খেলা, পড়ার সময় পড়া’-এ নিয়ম ছাত্রদেরকে মেনে চলতে হবে। যে ছাত্র নিয়মিত পড়াশােনা করে তার উন্নতি অবশ্যম্ভাবী। আর যে নিয়মিত।পড়াশােনা করে না, তাকে জীবনভর অনুতাপের আগুনে পুড়ে মরতে হয়।নিয়মানুবর্তিতা ব্যক্তিস্বাধীনতার অন্তরায় কিনা : অনেকেই এমনটি ধারণা করে থাকেন যে, কঠোর নিয়মানুবর্তিতাব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী বা বিরােধী। আসলে এ ধারণা আদৌ সত্য নয়, বরং নিয়ম মানার মাধ্যমে নিজের অধিকারপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরের অধিকারকেও স্বীকার করে নেয়া হয়। নিয়মানুবর্তিতা ব্যক্তির স্বাভাবিক বিকাশকে সুন্দর ও সুগমকরে। অন্যদিকে অনিয়ম স্বেচ্ছাচারিতার বিকাশ ঘটায়। এতে করে জীবন হয়ে উঠে দুর্বিষহ ও দুঃখময়। তাইনিয়মানুবর্তিতা কখনাে ব্যক্তি স্বাধীনতার পরিপন্থী নয়, বরং সহায়ক।নিয়মানুবর্তিতার ফলাফল : জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিয়মানুবর্তিতা ভালাে ফলাফলের প্রতীক হিসেবে কাজ করে।সেনাবাহিনীতে নিয়ম-শৃঙ্খলা অত্যন্ত কঠিনভাবে পালন করা হয়। সেজন্য তারা এত কর্মঠ, বলিষ্ঠ ও কর্তব্যপরায়ণ। এপৃথিবীতে যিনি যত বড়, তিনি তত বেশি নিয়মানুবর্তী। নিয়মিত কাজ করলে অত্যন্ত কঠিন কাজও সহজ হয়ে পড়ে।নিয়মানুবর্তিতাকে মানবজীবনের সাফল্যের চাবিকাঠিও বলা হয়। বিশ্বের মনীষীরাও জীবনে কঠোরভাবে নিয়মানুবর্তিতারঅনুশীলন করে গেছেন। তাদের সাফল্যের মূলে ছিল শৃঙ্খলাবােধ।নিয়মানুবর্তিতা ভঙ্গের পরিণতি : নিয়মভঙ্গের পরিণতি কখনাে ভালাে হয় না। ব্যক্তি জীবনে, সমাজ জীবনে কিংবাজাতীয় জীবনে যে কোনাে নিয়মের হেরফের হলে অনিবার্যভাবে নেমে আসে বিপর্যয়। নিয়মভজোর ফলাফল যে খারাপ তারবহু নজির ইতিহাসে রয়েছে। হযরত মুহাম্মদ (স)-এর নির্দেশ অমান্য করে মুসলিম বাহিনী ‘ওহুদের যুদ্ধে’ বিশৃঙ্খলভাবেশত্রুর উপর আক্রমণ চালাতে গিয়ে ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হয়েছিল। নিয়মানুবর্তিতার অভাবে অনেক প্রতিভাবান মানুষকেওজীবনে ব্যর্থতার গ্লানিকে বরণ করতে হয়েছে। তাই সার্থক জীবনের জন্য নিয়মানুবর্তিতার বিকল্প নেই।উপসংহার : মানবজীবনকে সুন্দর ও সার্থক করতে নিয়মানুবর্তিতার কোনাে বিকল্প নেই। যে জাতি যত বেশি নিয়ম-শৃঙ্খলার অধীন, সে জাতি তত বেশি উন্নত। পাশ্চাত্যের দেশসমূহের শক্তি, ধন, জ্ঞান ইত্যাদির মূলে রয়েছে তাদের কঠোরশৃঙ্খলাবােধ। শৃঙ্খলহীন জাতি কখনাে উন্নতি করতে পারে না। তাই ব্যক্তি তথা জাতীয় জীবনে উন্নতির জন্য সর্বস্তরে কঠোরভাবে নিয়মানুবর্তিতার অনুশীলন করা বাঞ্ছনীয়।

জাতি গঠনে নারীসমাজের ভূমিকাঅথবা, জাতি ও নারী সমাজরা, বাে. ২০২০; ব. বাে, ২০১১; সি. বাে, ২০১৭; দিনা, বাে, ২০১৫কু, বাে, ২০১৪; ঢা. বাে, ২০১৪)ভূমিকা :“স্বর্ণ রৌপ্য অলংকারের যক্ষপুরীতে নারীকরিল তােমায় বন্দিনী বলাে কোন সে অত্যাচারী?”নারীর প্রতি অবহেলা দেখে কবির সেই আক্ষেপ করার দিন এখন ফুরিয়ে এসেছে। শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-গরিমায় আজনারীসমাজ পুরুষের পাশাপাশি সমান যােগ্যতায় অগ্রসর হয়ে চলেছে। কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও চার দেয়ালের গন্ডি থেকে বের হয়েতারা আজ নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে চায়। নারী আজ জয়যাত্রার পথে পা বাড়িয়েছে।অতীত ও বর্তমান নারীসমাজ : উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর গােড়ার দিকে বাঙালি নারীসমাজ ছিল অবহেলিত, লাঞ্ছিতও অধিকারহীন। সমাজ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে নারী ছিল খুবই পশ্চাৎপদ। পুরুষ শাসিত সমাজে নারীদের মানবিক আকাঙক্ষাগুলাে ছিল পদদলিত। “নারী শুধু স্বামীর সংসার দেখাশোনার জন্য”- এরূপ পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার শিকার হয়েতারা শিক্ষায়, দীক্ষায়, অভিজ্ঞতায় এবং মননের উৎকর্ষতায় বহু পিছিয়ে পড়ে। বর্তমানে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেনারীর অবস্থান ও মানসিকতার ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। নিজেদেরকে ঘরের চার দেয়ালের মাঝে আবদ্ধ না রেখেতারা আজ দেশ ও জাতির উন্নয়নে বদ্ধপরিকর। দেশের উন্নয়ন কাজের সকল স্তরে তাদের অবাধ বিচরণ লক্ষণীয়। এ জন্যনারী বন্দনা করে কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন-“এ বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে যত ফল,নারী দিল তাতে রূপ-রস-মধু-গন্ধ-সুনির্মল”।সম্ভাবনাময় নারী : যে কোনাে দেশ তথা জাতির উন্নয়নে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কেননা, একটিদেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। জনসংখ্যার এই বিরাট অংশ যদি পুরুষের পাশাপাশি দেশ তথা জাতি গড়ার কাজেঅংশগ্রহণ করে তাহলে যে কোনাে দেশের উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হবে। তাই বেগম রােকেয়ার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরাযদি নারীদের পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারি তাহলে নারী সমাজের মধ্যেই পেয়ে যাব সচেতন শিক্ষিত মা, কবি,সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী কিংবা সমাজ সেবিকা। তখনই দেশ পৌছে যাবে উন্নতি, সমৃদ্ধি ও প্রগতির পথে। আর আমরা শিক্ষিতও সচেতন জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হব।জাতি গঠনে নারীসমাজের ভূমিকা ; একটি দেশ শিক্ষায় যত এগিয়ে সে দেশ তত উন্নত ও সমৃদ্ধ। পৃথিবীর উন্নতদেশগুলাের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই তারা তাদের দেশের সকল ক্ষেত্রে নারী সমাজকে প্রাধান্য দিয়েছে। দেশেরউন্নয়নমূলক সকল কাজে নারীসমাজের স্বতঃস্ফূর্ত পদচারণার বলেই তারা আজ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ আসনে অধিষ্ঠিত। বেগমরােকেয়ার প্রচেষ্টায় আমাদের দেশে নারীসমাজের চিত্র কিছুটা পরিবর্তন হলেও এ পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা ত্বরান্বিত করেইআমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নারীসমাজকে উদ্বুদ্ধকরতে হবে।শিক্ষাক্ষেত্রে নারী সমাজ : আবহমানকাল ধরে নারীরা পুরুষশাসিত সমাজে অবহেলিত হয়ে শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়েপড়লেও বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের সম উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। জাতীয় উন্নয়নে তারা।নিজেদেরকে যােগ্য ও দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলছে। পুরুষের সমকক্ষতা লাভের আশায় এবং সর্বক্ষেত্রে তাদেরসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে তারা যেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সাহিত্য ও গবেষণা কর্মেও নারীদের অবদান প্রশংসনীয়। তাইসহযােগিতার মনােভাব নিয়ে নারীসমাজকে যদি প্রকৃত শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ ও কর্মনিষ্ঠ করে গড়ে তােলা যায়, তাহলে তারা* জাতি গঠনে উল্লেখযােগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।সন্তানের চরিত্র গঠনে নারীসমাজ: শিশুরা জাতির আগামী দিনের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। এ শিশুকে সঠিকভাবে গড়েতােলার ব্যাপারে পিতার চেয়ে মা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। একটি শিশু যখন জন্মায় তখন সে নিতান্তই একইন্দ্রিয়সৰ্বস্ব প্রাণী। ইন্দ্রিয় দ্বারা সে তাড়িত হয়। শিশুর এ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মা তার কোমল মনকে সঠিক পথে চালিত করতেসাহায্য করে। সামাজিক আচার-আচরণ শিখিয়ে মা তার সন্তানকে সমাজের একজন যােগ্য ও মর্যাদাবান মানুষ হিসেবে গড়েতােলে। অর্থাৎ, মা-ই সমৃদ্ধ জাতি গঠনের সুদক্ষ কারিগর। তাই নেপােলিয়ন বলেছেন, “আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও,আমি তােমাদেরকে একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।”অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীসমাজ : অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে শক্তিশালী করতে বর্তমানে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাওসকল অর্থনৈতিক কাজে অংশগ্রহণ করছে। জাতীয় জীবনের উন্নতি সাধনে সকল কর্মক্ষেত্রে নারীসমাজকে দায়িত্ব বহন।করতে দেখা যাচ্ছে। তাদের ভূমিকার ক্ষেত্রও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘরে ও বাইরে তারা আজ কর্মমুখর জীবনের স্বাদআস্বাদন করছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীর অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা স্মরণ করে কবি কাজী নজরুল ইসলাম।লিখেছেন-পপি এসএসসি রচনা শিক্ষা২৮ “বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর* }, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।”• সামরিক ক্ষেত্রে নারী : একটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও দেশের অভ্যন্তরের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যে ক্ষেত্রটিগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তা হচ্ছে সে দেশের সামরিক ক্ষেত্র। বর্তমানে আমাদের দেশের সামরিক ক্ষেত্রেও নারী সমাজ।সদর্পে পদচারণা করছে। দেশ রক্ষার মহান দায়িত্ব নিয়ে তারা আজ দেশের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে কাজ করছে। অভ্যন্তরীণশান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, দুর্যোগকবলিত অসহায় লােকদের মাঝে দুত ত্রাণসামগ্রী পৌছানাে, বিতরণ ও তাদের পুনর্বাসনেআইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হয়ে তারাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আমাদের দেশের সামরিক বাহিনীর নারী সদস্যরাজাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করে শান্তিরক্ষায় অনন্য পরিচয় দিচ্ছে।রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নারী : বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতাে আমাদের দেশেও নারীরা রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করছে।আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও বিরােধী দলের প্রধানও একজন নারী। তা ছাড়াও রাজনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রেবর্তমানে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের সহযােগিতায় দেশ, জাতি ও সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে। রাজনীতিতেঅংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এমনকি জনগণেরঅধিকার আদায়ে তারা রাজপথে নেমে আন্দোলন করছে।ইতিহাসে নারী অবদানের দৃষ্টান্ত : ইতিহাস পর্যালােচনা করলে দেখা যায়, একুশের ভাষা আন্দোলনের মিছিলে,যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে, ‘৬২, ‘৬৬, ৬৯-এর মিছিলে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও তাদের বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল। তাছাড়া ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। পুরুষের পাশাপাশি তাদের অংশগ্রহণেরজন্যই আমরা সহজে স্বাধীনতা লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। তা ছাড়া ‘৯০-এর গণআন্দোলনেও নারীরা স্মরণীয় অবদানরেখেছিল। দেশ তথা জাতির কল্যাণে নারীসমাজকে এগিয়ে আনতে আদর্শব্রতী বেগম রােকেয়া সাখাওয়াত হােসেন,শামসুন্নাহার, সুফিয়া কামালের মতাে মহীয়সী নারীরা চিরস্মরণীয় অবদান রেখে গেছেন। এ ছাড়া প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার,মাদার তেরেসা, ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল, মাদামকুরী প্রভৃতি মহীয়সী নারী দেশের সেবার মাধ্যমে দেশ তথা জাতি গঠনেঅবিস্মরণীয় নজির স্থাপন করে গেছেন।উপসংহার : একটি আদর্শ জাতি গঠনে নারী সমাজের ভূমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশ নারীদের সুযােগ্য ও দক্ষ করেগড়ে তুলতে বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তার মধ্যে সরকারি চাকরিতে নারী কোটা সংরক্ষণ, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন।প্রকল্প বাস্তবায়ন, শহরে ও গ্রামে আত্মকর্মসংস্থানের সুযােগ সৃষ্টি, কারিগরি শিক্ষায় নারীর সুযােগ সম্প্রসারণ ইত্যাদিউল্লেখযােগ্য। আশা করা যায়, সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ হলে জাতির উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় নারী সমাজ আরাে ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।

দেশ গঠনে ছাত্রসমাজের ভূমিকা* অথবা, জাতি গঠনে ছাত্রসমাজের ভূমিকাঅথবা, ছাত্রসমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য| [ঢা, বাে, ২০১১, ২০১৩; সি. বাে, ২০১১, ২০১৫; রা, বাে, ২০১৭, ২০১৬;ব, বাে, ২০১৬; রা, বাে, ২০০১৩; য, বাে, ২০১৩]সূচনা : এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বাংলাদেশ নামের যে দেশটি আজবিশ্বের মানচিত্রে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে, তার মূলে কাজ করেছে জাগ্রত ছাত্রসমাজের গৌরবদীপ্ত সংগ্রাম। দেশের সামগ্রিকউন্নয়নে রয়েছে ছাত্রসমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তারাই পারে বিশ্বের দরবারে জাতিকে সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিতকরতে।২৩৬পপি এসএসসি রচনা শিক্ষাছাত্রজীবনের মূল্য : ছাত্রজীবন মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সময়। ছাত্রজীবনই ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত রচনা করে।ইমারতের ভিত্তি সুগঠিত হলে যেমন ইমারত শক্ত হয় না, তেমনি বাল্যকালে উপযুক্ত শিক্ষা লাভ না করলে মানুষেরভবিষ্যৎ জীবনও সুগঠিত হয় না। সংস্কৃতে প্রবাদ আছে- “ছাত্ৰনং অধ্যয়নং তপঃ।” অর্থাৎ অধ্যয়নই ছাত্রজীবনের মূলতপস্যা। এ দিকটার প্রতি বিশেষভাবে খেয়াল রেখেই ছাত্রদের অগ্রসর হতে হবে। তবে লেখাপড়ার সাথে সাথে ছাত্রদের দেশগঠনেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করা বাঞ্ছনীয়। ছাত্ররা নানাভাবে এ দায়িত্ব পালন করতে পারে। পড়াশুনার পাশাপাশিছাত্রদেরকে দেশ ও জাতির মঙ্গলের কথা ভাবতে হবে। নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্যবােধ সম্পর্কে অবহিত হওয়ার এটাই প্রকৃতসময়। নিজেকে সৎপথে পরিচালিত করা এবং প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তােলার উৎকৃষ্ট সময় ছাত্রজীবন।ছাত্রসমাজের আত্মত্যাগ : ছাত্ররা তরুণ, দুর্বার ও সংগ্রামী। তারা উচ্ছল ও প্রাণবন্ত। দুর্গম পথের পথিক এতরুণ।ছাত্রদল সর্বাবস্থায় দেশ গঠনে প্রস্তুত থাকে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর এবং শােষণের নাগপাশ ছিন্ন করার মতােঅবিচলিত শক্তির উৎস তারা। তাই দেশের সামগ্রিক উন্নতির জন্য মৃত্যুঞ্জয়ী সৈনিক হিসেবে ছাত্রসমাজকে এগিয়ে আসতেহবে। তাদেরকে আত্মত্যাগের সুমহান দায়িত্ব নিয়ে প্রবল কর্মোদ্যমে কাজ করতে হবে। নৈতিকতার উন্নতি বিধান, যাবতীয়কুসংস্কার, কুপ্রথা, অত্যাচার, অবিচার প্রভৃতি নির্মূল করার দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে ছাত্রসমাজকে। সকল প্রকার দুর্নীতিদমনের বজ্রকঠিন শপথ তাদেরকেই নিতে হবে। দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে সুদৃঢ় করার সংগ্রামেও ছাত্রসমাজকেএগিয়ে আসতে হবে। দেশ ও জাতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করে উন্নয়নের শীর্ষে পৌছে দিতে ছাত্রসমাজই রাখতে পারেঅগ্রণী ভূমিকা। জনসেবার মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণের পথ ত্বরান্বিত করা, দেশ থেকে নিরক্ষরতার অভিশাপ দূর করা এবংআত্মমুক্তির পথ অর্জনে ছাত্রসমাজের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কোনাে বিকল্প নেই। দেশ ও জাতির তরে নিবেদিত প্রাণ এ ছাত্ররাইজাতি গঠনে সর্বাগ্রে সহায়তা করতে পারে। এ জন্য শিক্ষাঙ্গনের পবিত্রতা রক্ষা করতে এবং সামাজিক নানা সমস্যাগুলােকেপ্রতিহত করতে ছাত্রসমাজকে তৎপর হতে হবে।জনসেবামূলক কাজ : জনসেবার মতাে মহান ব্রত পালনে ছাত্রদের তৎপরতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ! সমাজে বিদ্যমানশ্রেণিবৈষম্য দূর করে সকলকে উন্নয়নের পথে চালিত করতে ছাত্রসমাজ হতে পারে পথপ্রদর্শক। তারা দাঁড়াতে পারে।দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের পাশে, সেবার হাত বাড়িয়ে দিতে পারে অনাহারক্লিষ্ট এবং বৃদ্ধদের প্রতি। ছাত্ররাই ক্ষুধার্তের মুখে।তুলে দিতে পারে অন্ন, অসহায় রােগীকে দিতে পারে সেবা, মৃতপ্রায়কে নিতে পারে হাসপাতালে, পরিত্যক্ত শিশুকে পৌছেদিতে পারে শিশু সদনে, গৃহহারাকে দিতে পারে গৃহ। জনসেবায় নিজেদেরকে নিয়ােজিত রেখে দেশ ও জাতির কাছে আপন।মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে পারে ছাত্রসমাজ। নানা সেবামূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে জাতির কাছে নিজেদেরকে প্রকৃতমানুষ হিসেবে প্রতিপন্ন করার এটাই উপযুক্ত সময়। তাই বলা যায়, ছাত্ররাই দুর্বলের বল, অসহায়ের সহায় এবং রােগীরসেবক।পল্লি উন্নয়ন : পলিই বাংলাদেশের প্রাণ। তাই পল্লি উন্নয়ন দেশেরই উন্নয়ন। পল্লি উন্নয়নে ছাত্রসমাজ এগিয়ে আসতেপারে। গ্রামে আর্থ-সামাজিক অবস্থা উন্নয়নে ছাত্রসমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কৃষি উন্নয়নে আধুনিক প্রযুক্তিরসুফল সম্পর্কে নানা উপদেশ দিয়ে ছাত্রসমাজ প্রভূত সাহায্য করতে পারে। অবসর সময়ে ছাত্রসমাজ গ্রামে গিয়ে রাস্তা-ঘাটনির্মাণ, খাল-পুকুর খনন ইত্যাদি স্বেচ্ছাশ্রমের কাজ করতে পারে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অভিযান চালিয়ে ম্যালেরিয়া এবংঅন্যান্য রােগ থেকে গ্রামবাসীকে রক্ষা করতে পারে। ছােটখাটো রােগের হাত থেকে রক্ষা এবং রােগের প্রতিকার সম্পর্কেগ্রামবাসীকে সচেতন করে তুলতে পারে।নিরক্ষরতা দূরীকরণ : নিরক্ষরতা আমাদের জাতীয় জীবনে বিরাট অভিশাপ। দেশের প্রায় ২৭ ভাগ লােক নিরক্ষর।নিরক্ষরকে অক্ষরজ্ঞান দান করার ক্ষেত্রে ছাত্রসমাজের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। দেশের মানুষ যদি অজ্ঞানতার অন্ধকারেনিমজ্জিত থাকে তাহলে দেশের উন্নতি সম্ভব নয়। তাই গ্রামে-গ্রামে, মহল্লায়-মহল্লায় নৈশ বিদ্যালয়, বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্রস্থাপন করে নিরক্ষর লােকদেরকে অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন করে তােলার অভিযানে ছাত্রসমাজ অংশ নিতে পারে। নিরক্ষরতা দূরহলে মানুষ শিক্ষার আলাে পাবে, সাধারণ মানুষ আধুনিক চেতনার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। সাধারণ মানুষকে এ বােধে।পপি এসএসসি রচনা শিক্ষা২৩৭উদ্দীপিত করার দায়িত্ব ছাত্র সমাজের। বিশ্বের উন্নত দেশগুলাের কাতারে এ দেশকে সামিল করতে ছাত্রসমাজকেই নিতে হবেএ গুরু দায়িত্ব।জনমত গঠন : দেশ ও জাতির উন্নয়নমূলক নানা কর্মকাণ্ডে ও জনমত গঠনে ছাত্রসমাজ বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।সভা সমিতি ও নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ছাত্রসমাজ দেশের শিল্প ও সংস্কৃতিকে জাগিয়ে তুলতে পারে। জনগণের মধ্যেপ্রীতি ও ঐক্য স্থাপন করে সমৃদ্ধ জাতি গঠনে দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে জাতিরমানস গঠনে সাহ করতে পারে তারা। বিদেশি দ্রব্য বর্জন এবং স্বদেশি দ্রব্য ব্যবহার সম্পর্কে জনমত গঠনেরপ্রচারাভিযানে ছাত্রজ অংশ নিতে পারে।দেশপ্রেমের শিক্ষা : ‘স্বদেশপ্রেম ইমানের অঙ্গ। এ পবিত্র দায়িত্বে অন্যকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে ছাত্রসমাজ। ছাত্ররাইদেশ ও জাতির মূল চালিকাশক্তি। দেশকে ভালােবেসে স্বদেশের প্রয়ােজনে এগিয়ে আসার শিক্ষায় তারা দীক্ষিত। ছাত্রজীবনেযে দেশপ্রেমের উদ্ভব ঘটে তা তাদের মনে আজন্ম লালিত হয়। তাদের উপরই দেশ ও জাতির সকল ভার অর্পিত থাকে। তাইতাদেরকে জীবনের মায়া ত্যাগ করে দেশের বিপদে-আপদে এগিয়ে আসতে হবে। কবির ভাষায়-“নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান,ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।”আমাদের দেশের ইতিহাসে ছাত্রসমাজের দেশপ্রেমের প্রকৃষ্ট প্রমাণ রয়েছে। দেশের সংকটময় অবস্থায় বীরদর্পে অগ্রসরহয়ে সকল শৃঙ্খল ছিন্ন করেছে দুর্বার ছাত্রসমাজ। তাই ছাত্রজীবনে দেশপ্রেমের শিক্ষা অর্জন দেশ ও জাতি গঠনে অত্যন্তসহায়ক ও অপরিহার্য।উপসংহার : দেশ ও জাতি গঠনে ছাত্রসমাজের ভূমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশকে গড়ে তােলার কাজে ছাত্রসমাজইরাখতে পারে সর্বোচ্চ অবদান। আমাদের মতাে উন্নয়নশীল দেশকে ছাত্রসমাজই শিক্ষার মাধ্যমে নবজীবনের চেতনার সঞ্চারকরে উন্নত রাষ্ট্রের পরিণত করতে পারে। তাই দেশের কল্যাণ সাধনে ছাত্রসমাজকে জাগ্রত করতে হবে। ক্ষুদ্রতা, স্বার্থপরতাএবং অজ্ঞতার বাধাকে অস্বীকার করে চিরন্তন কল্যাণবােধে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে।

আমার প্রিয় কবি।অথবা, কবি কাজী নজরুল ইসলামযি. বাে, ২০১৩; চট্ট. বাে, ২০১৪, ২০১৩।ভূমিকা : বাংলা কাব্যজগতে যিনি চিরযৌবনের জয়ধ্বনি তুলে হয়ে আছেন মৃত্যুঞ্জয়ী, অগ্নিবীণার সুরে যিনি জাগ্রতরেখেছেন তারুণ্যকে, সাহিত্যে যিনি এনেছেন কালবৈশাখীর ঝড়াে হাওয়া, তিনি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, আমারপ্রিয় কবি। নির্জীব, স্থবির সমাজের বুকে তিনি নবযৌবন সঞ্চারিত করে একটি উন্নত জাতি গঠনের স্বপ্ন দেখেছেন। আর এস্থান পূরণে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন দুর্বার তারুণ্যকে। বাঙালির সুপ্ত শক্তিকে জাগরিত করে বিশ্বে নিজেদেরকে উন্নতবীরের জাতি হিসেবে পরিচিত করার উদাত্ত আহ্বানই কবি কাজী নজরুলকে আমার প্রিয় করে তুলেছে।জনপরিচয় ও বাল্যজীবন : আমার প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ২৫ মে, ১৮৯৯ সালে (বাংলা ১৩০৬সনের ১১ জ্যৈষ্ঠ) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে। তার পিতার নাম ফকির আহমদ এবং মাতার নাম জাহেদাখাতুন। ছােটবেলা বাবা-মা কে ‘দুখু মিয়া বলে ডাকতেন।শিক্ষাজীবন : প্রথম জীবনে কবি গ্রামের মক্তবে পড়াশুনা শুরু করেন। এখানে তিনি বালা, আরবি ও ফারসি ভাষায়প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করেন। ১০ বছর বয়সে তিনি এখান থেকে নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষায় পাস করেন। এরপর কবিরাণীগঞ্জের নিকটবর্তী শিয়ারশােল রাজ হাইস্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু স্কুলের ধরাবাধা নিয়মকানুন নজরুলের পছন্দ হলাে না।২৩৮পপি এসএসসি রচনা শিক্ষাতাই তিনি সেখান থেকে আসানসােলে পালিয়ে গিয়ে এক রুটির দোকানে মাসিক পাঁচ টাকা বেতনে কাজ করতে থাকেন। এসময়ে আসানসােলের দারােগা কাজী রফিকউদ্দিন নজরুলের চোখেমুখে বুদ্ধির দীপ্তি দেখে তাকে তার গ্রাম ময়মনসিংহেরশিমলায় নিয়ে যান। সেখানে নজরুল ইসলাম স্কুলে ভর্তি হলেও নিয়মিত তার স্কুলে যাওয়া হতাে না। এতে ফলাফল ভালােহওয়ায় তিনি আবার বর্ধমানে ফিরে আসেন এবং মাথরুন উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। কিন্তু থাকা-খাওয়ারঅসুবিধার কারণে তাকে এ স্কুলও ত্যাগ করতে হয়। এরপর তিনি বর্ধমানের শিয়ারশােল রজি বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তিহন। সেখানে পরীক্ষায় বিশেষ কৃতিত্বের জন্য তিনি একেবারে সপ্তম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণিতে উঠেন। পরের বছর ম্যাট্রিকপরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য প্রাক-নির্বাচনি পরীক্ষাতে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু তারপরেই ১৯১৭ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা নাদিয়ে সেনাবাহিনীর বাঙালি পল্টনে যােগ দিয়ে করাচি যান এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।=”।কবি নজরুলকে ভালাে লাগার কারণ : কবি নজরুলকে আমার ভালাে লাগার অন্যতম কারণ, তার মধ্যে প্রেম এবংবিদ্রোহ একাকার হয়ে আছে। তার কাব্যে মৃত্যুঞ্জয়ী চিরযৌবনের জয়ধ্বনি শুনতে পাই, শুনতে পাই অগ্নিবীণার সুর ঝংকার।তিনি ধীর, স্থির, অচঞ্চল বাংলা কাব্যে বয়ে এনেছিলেন দুর্বার কালবৈশাখী ঝড়। পরাধীন জড়তাগ্রস্ত সমাজের বুকে তিনিইসঞ্চারিত করেছিলেন নব যৌবনের শােণিত ধারা। তাঁর কবিতার পরতে পরতে প্রবাহিত হয় সঞ্জীবনী মন্ত্র, তাঁর সংগীতেবাজে সর্বহারাদের কান্নার বাণী। আবার তাকে একজন প্রেমিক হিসেবেও পাই। তার কণ্ঠেই ধ্বনিত হয়েছে— “মম একহাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণতূর্য”। অর্থাৎ একইসাথে তিনি প্রেমিক এবং বিদ্রোহী। তাই তাে তাকে আমার এতভালাে লাগে। তাই }} বলিতে ২১টি১ নংবিদ্রোহী কবি নজরুল : কবি নজরুলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য তিনি বিদ্রোহী ভাবাপন্ন কবি। তাঁর এ বিদ্রোহ সকল অন্যায়,অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে। জীবনের সর্বক্ষেত্রেই তিনি এ অন্যায়, অসাম্য, অত্যাচার ও অবিচার লক্ষ করেছেন এবংবলিষ্ঠ কণ্ঠে প্রতিবাদ করেছেন। পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ বাঙালি জাতির মুক্তির আহ্বানে শিকল ভাঙার আহ্বান তিনিইজানিয়েছেন নির্ভীক চিত্তে। আর এ কারণে তিনি বাংলা সাহিত্যে ‘বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত। তার বিদ্রোহী কণ্ঠের দৃপ্তউচ্চারণ—“বল বীরবল চির উন্নত মম শিরশির নেহারি আমারি নত শিরওই শিখর হিমাদ্রির।”কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী চেতনা প্রকাশ পেয়েছে তার “অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘শিকল ভাঙ্গার গান’, ‘প্রলয় শিখা’প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থে। নজরুল দৃপ্তকণ্ঠে বলেছেন-“কারার ঐ লৌহ কপাটভেঙে ফেল কররে লােপাটলাথি মার ভাঙরে তালাযত সব বন্দীশালায়।আগুন জ্বালা।প্রেম ও সৌন্দর্যের পূজারি কবি নজরুল : কবি নজরুল ছিলেন প্রেম ও সৌন্দর্যের পূজারি। কবি নজরুল শুধু বিদ্রোহেরকথাই বলেননি, প্রেমের কথাও বলেছেন স্পষ্টভাবে। যাবতীয় অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হলেও তিনি ছিলেনপ্রেমের কাঙাল। এমনকি তার বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতায়ও প্রেমিক নজরুলকে খুঁজে পাওয়া যায় “আমি চপল মেয়েরভালােবাসা, তার কাকন চুড়ির কন্ক।” বস্তুত, প্রেম নজরুল-কবিতার এক বিশিষ্ট রূপ। এ প্রেমের কবিতাগুলােই তাকেসমসাময়িকতার উর্ধ্বে স্থান দিয়েছে। তাঁর কাব্যে প্রেম প্রতিমা রূপ ধরে এসেছে, অতীত হয়ে উঠেছে জীবন্ত-অশুদীপ্ত ।পপি এসএসসি রচনা শিক্ষাসাম্যবাদী কবি নজরুল : কবি নজরুল মানবতার কবি, সাম্যবাদী কবি। তার কাব্যের সর্বত্রই তিনি নিপীড়িত,শােষিত, লাঞ্ছিত জীবনের জয়গান গেয়েছেন। তার সর্বহারা কাব্যের প্রতিটি কবিতায় গণমানুষের দুঃখ-দুর্দশার ছবি পরিস্ফুটএবং তাদের প্রতি তার অপরিসীম দরদববাধের পরিচয় মেলে। ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় কবি জনগণের সঙ্গে মিশে গেছেন।তিনি বলেন-গাহি সাম্যের গান-যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান।’কবি কাজী নজরুলের অন্যান্য গ্রন্থ : কবি নজরুলের উপন্যাস বাঁধনহারা, ব্যথার দান, মৃত্যুক্ষুধা, রিক্তের বেদন, কুহেলিকা।অপরদিকে শিউলিমালা, জিনের বাদশা’র মতাে অনেক ছােটগল্প এবং ঝিলিমিলি, আলেয়া, পুতুলের বিয়ে প্রভৃতি নাটক তাকেঅমরত্ব দান করেছে। প্রাবন্ধিক নজরুলের বলিষ্ঠ লেখনী বােধ করি কখনাে কখনাে কবি নজরুণকেও ছাড়িয়ে গেছে।কবি নজরুলের গান : কবি নজরুল একাধারে ছিলেন গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী। বস্তুত, বাল্লা সঙ্গীত ভুবনে তিনিআবির্ভূত হয়েছিলেন ঝড়ের মতাে। বৈচিত্র্যপূর্ণ অসংখ্য গানের পাশাপাশি ত্বিনি রচনা করেছেন অনেক ইসলামি গজল এবংশ্যামাসঙ্গীত; যেখানে আমরা ইসলামি ঐতিহ্য ও হিন্দু পুরাণের বিচিত্র সমাহার লক্ষ করি। এমনটি বাংলার অন্য কোনােকবি, সাহিত্যিক বা গীতিকারের মধ্যে দেখা যায় না।পুরস্কার ও সম্মাননা : কাজী নজরুল ইসলাম তার প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। ১৯৪৫সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক, ১৯৬০ সালে ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মভূষণ’, ১৯৬৯ সালে।রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ডি-লিট’, ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ডি-লিট’ এবং বাংলাদেশ সরকারকর্তৃক ১৯৭৬ সালে একুশে পদক’ তার জীবনের অন্যতম প্রাপ্তি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নজরুলের গান ও কবিতামুক্তিযােদ্ধাদের বিপুল অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল। তাই ১৯৭২ সালে অসুস্থ কবিকে ঢাকায় এনে ‘জাতীয় কবি’র মর্যাদা দেওয়াহয়। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ১৯৭৬ সালের ২৯শে আগস্ট কবি ইন্তেকাল করেন। তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদপ্রাঙ্গণে জাতীয় মর্যাদায় সমাধিস্থ করা হয়।উপসংহার : বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কবি কাজী নজরুল ইসলাম সৃষ্টিকর্তার এক আশীর্বাদ। তিনি বাংলা সাহিত্যকেনতুন রসের ধারায় সঞ্জীবিত করে তুলেছেন। তিনি বিদ্রোহী কবি, মানবতার কবি, গণজাগরণের কবি, আমাদের জাতীয়কবি। এ সমস্ত বহুমুখী গুণের অপূর্ব সমাবেশের জন্যই তিনি আমার প্রিয় কবি।

সময়ের মূল্য[সি, বাে, ১১; ঢা, বাে, ২০১২]ভূমিকা : ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে-“Lost property can be gained by hard labour,Lost health can be gained by medicine,But time, once lost is lost forever.সময় নিরবধি, অনাদি, অনন্ত, নিরাকার। সৃষ্টির আদিকাল থেকে সময়ের যাত্রা শুরু হয়েছে এবং পৃথিবীর ধ্বংস পর্যন্তসে যাত্রা চলবে। সময়ের এ ছুটে চলার কোনাে শেষ নেই, এমনকি একে প্রতিহতও করা যাবে না। তাই বলা হয়, “Timeand tide wait for none.” সময়ের এ অনন্ত প্রবাহের মাঝে একটি সীমাবদ্ধ জীবন নিয়ে মানুষ পৃথিবীতে আসে। তাকে এসীমিত ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জগৎ ও সংসারের সমুদয় কাজকর্ম শেষ করে হতে হবে স্মরণীয় ও বরণীয়। তাই মানবজীবনকে সফল ও সার্থক করে তুলতে সময়ের সদ্ব্যবহার করা একান্ত প্রয়ােজন। সময়ের যথাযথ মূল্য না দিয়ে জীবনেপ্রতিষ্ঠা লাভের আদৌ কোনাে বিকল্প পথ নেই।২৪০পপি এসএসসি রচনা শিক্ষাসময়ের মূল্য সময় নিরন্তর প্রবহমান বলেই মানবজীবনে সময় অমূল্য সম্পদ। এর মূল্য কোনাে জিনিস দিয়ে ।পরিমাপ করা যায় না। মানুষের ধন-সম্পদ, মান-সম্মান, স্বাস্থ্য ইত্যাদি হারিয়ে গেলে স্বীয় চেষ্টায় হয়তাে তা ফিরে পাওয়াযায়, কিন্তু সময় একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। একজন বিত্তশালী লােক তার অর্থবিত্ত দিয়ে হয়তাে পৃথিবীরসবকিছু ক্রয় করার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু সময়কে ক্রয় করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, সময় সকল ক্রয় ক্ষমতার উর্ধ্বে।সময় নদীর স্রোতের মতােই বহমান। কারাের অনুরােধে এক মুহূর্তের জন্য থামবার অবকাশ তার নেই। সময়ের মূল্যবুঝাতে গিয়ে রবার্ট ব্রাউনিং বলেছেন- “একটা দিন চলে যাওয়ার মানে জীবন থেকে একটা দিন ঝরে যাওয়া।” আবারইংরেজ কবি Milton তাঁর সনেটে উল্লেখ করেছেন- “Time is the subtle thief.” তাই সময়ের মূল্য লিখে বা বলে শেষকরার সুযােগ নেই। জীবনে সময়কে কাজে লাগাতে পারলে সাফল্য অনিবার্য হয়ে উঠে। তাই মানবজীবনে সময়ের মূল্যঅপরিসীম।মানবজীবনে সময়ের সদ্ব্যবহার : মানব জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে উপযুক্তভাবে কাজে লাগিয়ে নশ্বর পৃথিবীতেঅবিনশ্বর কীর্তি স্থাপন করে যাওয়াই মানব জীবনের সার্থকতা। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান। সময়কে ঠিকমতাে কাজেলাগাতে না পারলে জীবনে উন্নতি করা যায় না। একজন কৃষক যদি নির্দিষ্ট ঋতুতে ফসলের বীজ বপন না করে, তাহলেফসলের ঋতু শেষ হয়ে যাবার পর কেঁদে বুক ভাসালেও কোনাে লাভ হবে না। কারণ সময় চলে গেছে, চলে গেছে ঋতু।তাই কর্তব্য কর্ম কখনাে ফেলে রাখতে নেই। আজ করব না কাল করব ভাবলে দিনই কেবল চলে যায়। তাছাড়া মানুষের।মনের পরিবর্তন হয় অতি সহজে। একবার একটি কাজে আগ্রহ থাকলে পরে সে আগ্রহ না-ও থাকতে পারে। শরীরে শক্তিসামর্থ্য মানুষের চিরদিন থাকে না। তাই যতদিন তা থাকে ততদিন মানুষের উচিত এর সঠিক প্রয়ােগের মাধ্যমে সময়েরসদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা।ছাত্রজীবনে সময়ের সদ্ব্যবহার : ছাত্রজীবনে সময়ের সঠিক ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, ছাত্রজীবনকে বলা হয়বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। এ সময় যে যেমন বীজ বপন করবে, জীবনে সে তেমন ফল পাবে। তাই কবি বলেছেন-“যে চাষা আলস্য ভরেবীজ না বপন করেপকৃ শস্য পাবে সে কোথায়!”কবির এ চরণগুলাে সময় অপচয়কারী ছাত্রের জন্য চিরন্তন সত্য। ছাত্রজীবন শিষ্টাচার, নিয়মানুবর্তিতা, চরিত্র গঠনেরউপযুক্ত সময়। কিন্তু এসময় যদি ছাত্র আলস্যে সময় অতিবাহিত করে, তাহলে তার জীবনে কোনাে সফলতা আসবে না।ছাত্রজীবনে প্রত্যেকের উচিত সময়ের মূল্য দিয়ে নিয়মিত লেখাপড়া করা, ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। তবেই সেজীবনে সাফল্য অর্জন করতে পারবে।সময় অপব্যবহারের কুফল : যারা সময়ের মূল্য বুঝে না বা সময়কে উপযুক্তভাবে কাজে লাগাতে পারে না তাদেরজীবনে নেমে আসে দুঃখের কালাে ছায়া। ওয়াটারলুর যুদ্ধে নেপােলিয়নের জনৈক সেনাপতি পূর্ব নির্ধারিত সময়ের কয়েকমিনিট পর সসৈন্যে হাজির হওয়ায় নেপােলিয়নকে শােচনীয় পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল। তাই সময়ের কাজ সময়ে না।করে অবহেলায় সময় নষ্ট করার অর্থ নিজের সর্বনাশ নিজেই ডেকে আনা। আর সর্বনাশ যখন হয়েই যায়, তখন আর কিছুইকরার থাকে না। কবি লালনের ভাষায়-“সময় গেলে সাধন হবে না।”সময়কে কাজে লাগানাের উপায় : মানবজীবনে অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। জীবনের নির্দিষ্ট সময়সীমার মতেএসব দায়-দায়িত্ব সম্পন্ন করতে হলে উপযুক্ত সময় নির্বাচন করে নিতে হবে। কাজের পরিমাণ বিবেচনা করে সময়কে ভালকরে নিলে ঠিক সময়ে কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব। কাজের সময়ের মতাে অবসর সময়ও চিহ্নিত করে রাখতে হবে। সময়েমূল্য অনুধাবন করতে পারলেই সময়কে কাজে লাগানাে তথা সময়ের সদ্ব্যবহার সম্ভব। মনে রাখতে হবে, সময়কে।সঠিকভাবে ব্যবহার করেই মানুষ ইতিহাসে কীর্তিমান হয়ে আছে।২৪১,পপি এসএসসি রচনা শিক্ষা।সময়ানুবর্তিতার দৃষ্টান্ত : যেসব মহাপুরুষ পৃথিবীর বুকে যুগে যুগে অমর কীর্তি রেখে গেছেন, তারা সবাই সময়েরমূল্য সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তাঁদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই ছিল ব্যস্ত ও কর্মবহুল। ফলে তারা পেয়েছেন সফলতা;হয়েছেন বিশ্বখ্যাত। বিশ্বনবি হযরত মুহম্মদ (স.), হযরত উমর ফারুক (রা.), হযরত আবু বকর (রা.), হযরত আব্দুল কাদিরজিলানী (রহ.) প্রত্যেকে সময়ের মূল্য দিয়েছেন। আমেরিকার সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকন সময়ের মূল্য দিয়ে সাধারণশ্রমিক থেকে দেশের প্রধান হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, এ. কে. ফজলুল হক, আইনস্টাইন,নিউটন, টমাস আলভা এডিসন প্রত্যেকেই সময়ের সদ্ব্যবহার করতেন। অন্যদিকে সময়নিষ্ঠ জাতি হিসেবে জাপানি,আমেরিকান, ইংরেজ, চাইনিজ, কোরিয়ানদের বিশ্বব্যাপী খ্যাতি রয়েছে। এসব জাতি সময়ের সদ্ব্যবহার করে বিশ্বে তাদেরদৃঢ় অবস্থান তৈরি করেছে।উপসংহার : ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে সময়ের মূল্য অত্যধিক। কেবল সময়ের মূল্য সম্পর্কে সচেতন থেকে জীবনেরপ্রতিটি মুহূর্তকে যথাযথভাবে কাজে লাগানাের মাধ্যমেই জীবনকে সুন্দর ও সার্থক করা যায়। তাই আমাদের উচিত সময়েরসার্থক ব্যবহারের মাধ্যমে জীবনের সাফল্য নিশ্চিত করা।

সংবাদপত্র/ জাতীয় জীবনে সংবাদপত্রের ভূমিকা

ভূমিকা :

আধুনিক সভ্যতার শ্রেষ্ঠ বাহন সংবাদপত্র। সংবাদপত্র সমস্ত বিশ্বের নতুন নতুন খবর নিয়ে প্রতিদিন সকালেআমাদের দ্বারপ্রান্তে এসে হাজির হয়। সংবাদপত্র গণতান্ত্রিক যে কোনাে দেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজের দর্পণ। জনমতেরপ্রতিফলনে ও জনমত গঠনে সংবাদপত্র পালন করে শক্তিশালী ভূমিকা। গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় বহু দল ও মতের ধারক ওবাহক হিসেবে সংবাদপত্র সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করে।

সংবাদপত্র আবির্ভাবের ইতিহাস :

সময়ের প্রয়ােজনে আবির্ভাব ঘটেছে সংবাদপত্রের। সংবাদপত্রের প্রচলন প্রথম কোনদেশে শুরু হয় তার সঠিক প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। তবে জানা যায়, কাগজ আবিষ্কারের পর একাদশ শতাব্দীতেচীনদেশে সর্বপ্রথম সংবাদপত্রের প্রচলন হয়। ভারতে মুঘল শাসনামলে হাতে লেখা সংবাদপত্রের প্রচলন ছিল। ইউরােপে প্রথমসংবাদপত্র প্রচলন হয় ভেনিসে। তারপর রানি এলিজাবেথের সময় ইংল্যান্ডে প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। ভারতউপমহাদেশে ‘বেঙ্গল গেজেট’ নামে প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় ১৭৪৪ সালে। ১৮১৮ সালে শ্রীরামপুর মিশনথেকে বাংলা ভাষায় প্রথম সংবাদপত্র ‘সাপ্তাহিক সমাচার দর্পণ’ প্রকাশিত হয়। তারপর ১৮২২ সালে সাপ্তাহিক ‘সমাচার চন্দ্রিকা’, ১৮২৯ সালে সাপ্তাহিক ‘বঙ্গদূত’ এবং ১৮৩৯ সালে সাপ্তাহিক ‘সংবাদ প্রভাকর’ প্রকাশিত হয়। সাপ্তাহিক ‘সংবাদপ্রভাকর’ পরে দৈনিক পত্রিকা হিসেবে রূপান্তরিত হয়। এভাবে ১৯২২ সালে ‘ধূমকেতু’, ১৯২৩ সালে কল্লোল’, ১৯৪১সালে ‘সবুজপত্র প্রকাশের মধ্য দিয়ে সংবাদপত্রের ইতিহাস সমৃদ্ধ হয়ে উঠে।

সংবাদপত্রের প্রকারভেদ :

মানুষের হােট-বড় নানা কৌতূহল মেটাতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সংবাদপত্রের নানারূপান্তর ঘটেছে। বের হয়েছে নানা প্রকার সংবাদপত্র। যেমন- দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক ইত্যাদি।

বাংলাদেশের সংবাদপত্র :

বালাদেশে ছােট-বড়, সরকারি-বেসরকারি অনেকগুলাে সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়।বাংলাদেশে দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক ইনকিলাব, দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক ভােরের কাগজ, দৈনিক সমকাল, দৈনিক আমারদেশ, দৈনিক জনকণ্ঠ, দৈনিক প্রথম আলাে, দৈনিক কালের কণ্ঠ, দৈনিক সংবাদ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, দ্য ডেইলি স্টার,বাংলাদেশ অবজারভার, নিউ এজ, ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, মর্নিং নিউজ ইত্যাদি দৈনিক পত্রিকা এবং বিচিত্রা, বেগম,রােববার ইত্যাদি সাপ্তাহিক পত্রিকা বিশেষ উল্লেখযােগ্য। এ ছাড়া অনলাইনেও এ সকল পত্রিকার খবর প্রকাশিত হয়, যাআমরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে পড়তে পারি।

সংবাদ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ :

সংবাদপত্রের খবর সংগ্রহ করার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কতগুলাে প্রতিষ্ঠানরয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়টার্স উল্লেখযােগ্য। এছাড়া রয়েছে পিটিআই, ইউ. এন. আই ইত্যাদি। সােভিয়েতেরসংবাদ সংস্থার নাম ‘তাস’। বাংলাদেশে ‘বাসস’, ‘এনা’, ‘ইউএনবি’ ইত্যাদি সংবাদ সরবরাহ প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

সংবাদপত্রের আদর্শ :

সংবাদপত্রকে অবশ্যই একটা আদর্শ মেনে চলা বাঞ্ছনীয়। আর এ আদর্শটা হচ্ছে গঠনমূলক ওবস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন। সংবাদপত্রকে হতে হবে জনসাধারণের স্বার্থ রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরী। জনগণের কল্যাণে সংবাদপত্র।একদিকে যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে, তেমনি ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠার জন্যও সগ্রাম অব্যাহত রাখবে।সংবাদপত্রকে অবশ্যই ক্ষুদ্র স্বার্থের কথা চিন্তা না করে দেশ ও জাতির বৃহত্তর কল্যাণে কাজ করতে হবে। তবেই সংবাদপত্রজনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম ও সার্থক হবে।

সংবাদপত্রের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভূমিকা :

বিশ্বের রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, বাণিজ্য, সাহিত্য,সংস্কৃতি, খেলাধুলা, আমােদ-প্রমােদ সকল ক্ষেত্রেই সংবাদপত্রের অবাধ পদচারণা। দৈনন্দিন জীবনের নানা অপরিহার্য তথ্যও প্রতিদিন আমাদের সামনে তুলে ধরে সংবাদপত্র। পৃথিবীর যেকোনাে প্রান্তে ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, বন্যার মতাে প্রাকৃতিক দুর্যোগও নানা রকম ভয়াবহ দুর্ঘটনার খবরাখবর সংবাদপত্র আমাদের জানিয়ে দেয়। এভাবে দেশ ও বিশ্ববাসীকে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে বিপন্ন মানবতার পাশে দাঁড়াতে সাহায্য করে। সংবাদপত্রে দুর্ঘটনার খবর পড়ে নিহত-আহতের সন্ধানে ছুটে যেতে পারে তাদের আত্মীয়-পরিজন। সাম্রাজ্যবাদী কিংবা আগ্রাসী তৎপরতা যখন সভ্যতাকে গ্রাস করে, তখন সংবাদপত্রতার বিরুদ্ধে মানবতার জাগরণ ঘটায়। পারমাণবিক যুদ্ধ কিংবা স্নায়ুযুদ্ধের ভয়াবহতায় পৃথিবী ধ্বংসের আশঙ্কা দেখা দিলেসংবাদপত্র শান্তির সপক্ষে নেয় সচেতন দায়বদ্ধ ভূমিকা। দেশে সামরিকতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র জনগণের টুটি চেপে ধরলে সংবাদপত্রতার বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভের পটভূমি রচনা করে। গণআন্দোলনের পক্ষে নেয় কার্যকর অবস্থান। যেখানেই মানবতার লাঞ্ছনা,মূল্যবােধের অবক্ষয়, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিবেকের কণ্ঠরােধ, সেখানেই সংবাদপত্রের কণ্ঠস্বর নেয় প্রতিবাদী ভূমিকা।

সংবাদপত্র ও জনমত গঠন :

সংবাদপত্রের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব গণসচেতনতা সৃষ্টি, যা অন্য কোনাে মাধ্যম এতপ্রবলভাবে তৈরি করতে পারে না। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় প্রকৃত ক্ষমতা থাকে জনগণের হাতে। ফলে সরকারের গৃহীতপদক্ষেপ ও ভূমিকা জাতীয় অগ্রগতির পক্ষে কতটা সহায়ক এবং কতটা জনস্বার্থের পরিপূরক তা নিয়ে জনগণের মধ্যে অনেকসময় দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ক্ষমতাসীনরা সবসময় তাদের পদক্ষেপকে জোর গলায় ইতিবাচক বলে প্রচার করে এবং বিরােধীরা তাকে একেবারেই প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু সংবাদপত্র উভয় পক্ষের মতামত, যুক্তি ও তথ্যনির্ভর আলােচনা প্রকাশকরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নিজেদের অভিমত গঠন করতে পারে। সংবাদপত্রের পাতায় জ্ঞানীগুণী ও বিশেষজ্ঞদের লেখাপ্রবন্ধ ও অভিমত, কলাম লেখকদের তর্ক বিতর্ক, যুক্তিপ্রদান ও যুক্তিখণ্ডন, পত্রিকার নিজস্ব সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয়মতামত জনমত গঠনে সাহায্য করে। আমাদের দেশে সাম্প্রতিককালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন, পার্বত্যচট্টগ্রামে শান্তি চুক্তি ইত্যাদি ইস্যুতে জনমত গঠনে সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

আধুনিক জীবনে সংবাদপত্রের প্রভাব :

আধুনিক জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের গভীর ও ব্যাপক প্রভাবপরিলক্ষিত হয়। সংবাদপত্র প্রতিদিন আমাদের সামনে কেবল জাতীয় বিষয়াবলিই নয়, আন্তর্জাতিক অজ্ঞানকেও উন্মুক্ত করে দেয়। সংবাদপত্রে প্রচারিত বিভিন্ন তথ্য, আলােচনা, সমালােচনা প্রভৃতি জনগণের সামনে দেশের প্রকৃত চিত্রকে উন্মােচনকরে জনমত সৃষ্টিতেও সংবাদপত্রের ভূমিকা অপরিসীম। জনশিক্ষা প্রচারেও সংবাদপত্র অগ্রগামী। সংবাদপত্রই সেই মাধ্যম,যা সমাজের নানা দুর্নীতি ও কুসংস্কার দূর করে মানুষের নৈতিক মান উন্নত করে তুলতে সহায়তা করে। আলােকিত জীবনগঠনে, জনগণ ও গণশিক্ষা প্রচার ও প্রসারে সংবাদপত্রই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

সংবাদপত্রের ক্ষতিকর প্রভাব :

সংবাদপত্র জনকল্যাণের একটি বস্তুনিষ্ঠ মাধ্যম। কিন্তু আজকাল কিছু সংবাদপত্রেরপরিচালক ও সাংবাদিকগণ জনকল্যাণের মহান উদ্দেশ্যকে ভুলে গিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ কিংবা দলগত স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবেসংবাদপত্রকে ব্যবহার করছেন, যার মারাত্মক প্রভাব পড়ছে জাতীয় জীবনে। কিছু দায়িত্বজ্ঞানহীন সংবাদপত্রের উস্কানিমূলকপ্রচারণার জন্য দেশের মধ্যে উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, মারামারি-হানাহানি, হিংসা-বিদ্বেষ, কুৎসা ও মিথ্যা রটনা ব্যাপক আকারধারণ করে। নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য এসব সাংবাদিকগণ জাতির বৃহত্তর কল্যাণের পথে বিরাট বাধা হয়েদাঁড়ায়, যা দেশ ও জাতিকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়।

উপসংহার : সংবাদপত্র দৈনন্দিন জীবনের সীমাবদ্ধ মানুষকে বিশ্বের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে উত্তীর্ণ করে দেয়। সংবাদপত্রহচ্ছে সভ্যতার অগ্রগতির প্রমাণপত্র এবং নির্যাতিতের প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর। বর্তমান সভ্য সমাজে সংবাদপত্রের অনুপস্থিতিকল্পনা করা যায় না। নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে জনগণের মঙ্গল সাধন এবং প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও রক্ষায়সংবাদপত্রই রাখতে পারে বলিষ্ঠ ভূমিকা। দলীয় স্বার্থ ও সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠতে পারলে সমাজ জীবনে আধুনিক ধ্যান-ধারণা ও বিজ্ঞানমুখী চেতনার বিকাশে সংবাদপত্রের ভূমিকা হবে আরাে কল্যাণমুখী।

FILED UNDER : রচনা

Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content

রচনা, ভাবসম্প্রসারণ,অনুচ্ছেদ,পত্র, আবেদন পত্র, সারাংশ-সারমর্ম , লিখন , বাংলা, ১০ম শ্রেণি, ২য় শ্রেণি, ৩য় শ্রেণি, ৪র্থ শ্রেণি, ৫ম শ্রেণি, ৬ষ্ঠ শ্রেণি, ৭ম শ্রেণি, ৮ম শ্রেণি, ৯ম শ্রেণি,  for class 10, for class 2, for class 3, for class 4, for class 5, for class 6, for class 7, for class 8, for class 9, for class hsc, for class jsc, for class ssc, একাদশ শ্রেণি, দ্বাদশ শ্রেণি