রচনা: অতিথি পাখি / পরিযায়ী পাখি

অতিথি পাখি রচনা

ইউরােপের এক যুবক। তার বাড়ির পাশের একটি গাছে বাস করত একজোড়া সারস। একদিন সেফ কৌতুহলী হয়ে সেই যুবক একটি সারসের পায়ে পরিয়ে দিল তার নাম ঠিকানা খােদাই করা সােনার আংটি। শীতের শেষে বসন্তের এক সকালে ফিরে এলাে সারস দম্পতি। পায়ে তার অন্য আরেকটি আংটি। তাতে ভারতের বেনারসের একটি ইংরেজ পরিবারের নাম। ঠিকানা খােদাই করা । এভাবে যোগাযােগের পর যুক্কটির সাথে ওই পরিবারের মেয়েটির বিয়ে হলাে সুন্দর এ যােগাযােগটি ঘটিয়ে দিয়েছিল সেই দেশান্তরী সারস।

মানুষের কাছে পাখি অত্যন্ত প্রিয় একটি প্রাণী। পাখির বৈচিত্র্যে রূপমুগ্ধ আদিম গুহাবাসী থেকে শুরু করে আজকের সভ্য মানুষ কোথায় নেই পাখি? উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু, উষর মরুভূমি কিংবা গহীন অরণ্য – সবখানেই পাখির বিচরণ। পাখির কারণে পরিবেশও হয়ে উঠছে আকর্ষণীয় । আর এসব পাখি যখন দেশান্তরী হয় তখন প্রকৃতির দৃশ্যপটই পালটে যায়। আকাশে উড়ে বেড়ানাে নতুন কোনাে পাখি দেখে চকিতে চমক ভাঙে – এতাে পরিযায়ী পাখি !

ঋতু বদলের সাথে সাথে কোনাে কোনাে পাখির আবাসস্থলে নানারকম সংকট দেখা দেয়। পাখা থাকার সুবাদে ডানা ঝাপটিয়ে পাখিরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় উড়ে যেতে পারে। প্রায় সবখানেই হয় পাখিদের আবাস। তাই আবাস। সংকটের সময় নিরাপদ স্থানে চলে যেতে নীড় ছেড়ে বেরি য়ে পড়ে দেশান্তরী পাখিরা। ঠিকানা অন্য কোনাে দেশ, মহাদেশ, দূর থেকে দূরান্ত। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এরা আবার ফিরে আসে আপন নীড়ে । সেই নীড় খুঁজে পেতে তাদের এতটুকু অসুবিধা হয় না। এ এক মহাবিস্ময়। মহাসাগর, মহাদেশ পাড়ি দিয়ে সুদীর্ঘ পথ ভ্রমণ করে কিছুদিন বেড়িয়ে এরা আবার নিজ ঠিকানা কী করে খুঁজে পায় ! সাধারণত শীতকালেই পাখিরা দেশান্তরী হয়। আদিযুগের মানুষ ভেবে ভেবে কোনাে কূল-কিনারা পেত না। এত পাখি একসঙ্গে এত দীর্ঘ সময় কোথায় হারিয়ে যায়? কেউ কেউ ভাবত পুরাে শীতকালটা এরা ঘুমিয়ে থাকে। অনেকে ভাবত চাদেই বুঝি বা কাটে এদের শীত ঋতু। একসময় সেই ভুল ভাঙল । বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষানিরীক্ষার পর অবসান ঘটল এসব কল্পকাহিনির।

পাখিদের এ দেশান্তরী হবার পেছনের অনেক কারণ অজ্ঞাত থাকলেও ধরে নেয়া হয় শীতকালে দিনের সময়সীমা কমে আসা, তাপমাত্রার অস্বাভাবিক কমে যাওয়া এবং খাবারের তীব্র সংকটের কারণেই পাখিরা দেশান্তরী হয়। এছাড়া ডিম পাড়ার সময় হলে ভিড় এড়াতে চায় অনেক পাখি, সাথী খুঁজে নিতেও দেশান্তরী হয় কেউ কেউ। দেশান্তরী এ পাখিরা সাধারণত উত্তর গােলার্ধ থেকে দক্ষিণ গােলার্ধে যায়। কেউ ওড়ে দিনে, কেউ বা রাতের অন্ধকারকেই বেছে নেয় পরিব্রাজনের জন্য। কেউ কেউ অতিক্রম করে কয়েক শ মাইল পথ, কেউ কেউ হাজার মাইল। আর্কটিক টার্ন’ নামের দেশান্তরী গাঙচিল সবচেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। কবুতরের মতাে ছােট্ট পাখি উডকক’ – হিমালয়ের আট হাজার মাইল ওপরে যার বাস, পরিব্রাজনের সময় ১৫০০ মাইল পথ অতিক্রম করতে পারে। স্নাইপ’ পাখি কোনােরকম বিশ্রাম ছাড়াই তিন হাজার মাইল পথ পার হতে পারে। জাপানের এ পাখিটি শীত এলেই চলে যায় তাসমানিয়া। চার হাজার মাইল পাড়ি দিতে ‘অ্যালবাট্র’ সময় লাগে মাত্র ছয় দিন । একটুখানি পাখি ‘হামিংবার্ড’ প্রতিবছর শরৎ এলেই উত্তর আমেরিকা থেকে উড়ে উড়ে চলে যায় প্রায় তিন হাজার মাইল দূরে পানামা খালে । ইউরােপ থেকে সােয়ালাে পাড়ি জমায় আমাজান অববাহিকায় ।

দেশান্তরী পাখিদের নিয়ে গবেষণা করেন বিশ্বখ্যাত জীববিজ্ঞানী ও পক্ষিতত্ত্ববিদ জুলিয়াস হাক্সলি, জীববিজ্ঞানী ডারউইন প্রমুখ। এঁদের গবেষণায় দেখা গেছে, একটি সময়ে দেশান্তরী পাখিরা দেশান্তরে বেরিয়ে পড়ার জন্য আকুল হয়ে ওঠে। দেশান্তরে যাবার সময় হলে ডারউইন একটি দেশন্তরী পাখিকে পরীক্ষা করার জন্য খাঁচায় আটকে রাখেন। নির্দিষ্ট সময় এলে দেখা গেল পাখিটি খাচা থেকে বেরিয়ে আসবার জন্য নিজেকে রক্তাক্ত করে ফেলছে অন্য একটি পরীক্ষায় রাজহাঁসের ডানা কেটে নিলে রাজহাঁসটি সাঁতরে তার যাত্রা শুরু করে । ওড়বার সময় দেশান্তরী পাখিদের ইন্দ্রিয় থাকে সজাগ। সাগর-নদী, পাহাড়, বনাঞল চিনে চিনেই এরা পথ চলে। সূর্য ও নক্ষত্রের আলােয় এরা পথ চিনে নেয়। তাই মেঘলা দিনে কিংবা রাতের মেঘলা আকাশে অনেক পাখি দিকভ্রান্ত হয়।

বাংলাদেশে পাখির প্রজাতি আছে ৫৮০টি। এর মধ্যে ২০০ প্রজাতিই দেশান্তরী । অধিকাংশ পাখিই এখানে আসে শীতের শুরুতে হিমালয়, উত্তর ইউরােপ ও সাইবেরিয়া থেকে। শীত ছাড়াও বর্ষায় কিংবা বসন্তেও আসে কোনাে কোনাে পাখি। এদের
মধ্যে রয়েছে বুনাে হাঁস, খঞ্জনা, ওয়ালার, ফ্লাইকেচার প্রভৃতি। জলচর ও উপকূলীয় পাখিদের মধ্যে আসে বক, কাদাখোচা, হাড়গিলা, স্নাইপ ইত্যাদি। বাংলাদেশে দেশান্তরী পাখিদের বিশাল অংশ জুড়ে রয়েহে হাঁস এবং গায়ক পাখি । হাঁসদের মধ্যে উল্লেখযােগ্য হলাে: ধূসর রাজহাঁস, চখাচখি, চিতি হাঁস, রাঙামুড়ি ইত্যাদি। আর গায়ক পাখিদের মধ্যে ভরত, ধূসর ফিঙে,খ্রীস, ফ্লাইকেচার এবং বুশওয়ালার প্রধান। এছাড়া আসে গাঙচিল, টিটিভ, হট-টি-টি, পিউ, জল কবুতর প্রভৃতি। শিকারি পাখিদের মধ্যে আসে কালাে ঈগল, ভুবন চিল, বাজার্ড ইত্যাদি।

দেশান্তরী পাখিদের সুদূর যাত্রা ভীষণ কষ্টের। উড়ে চলার সময় বারবার বিপদের মুখােমুখি হতে হয় তাদের। মেঘলা আকাশ কিংবা তুষারপাত এবং ঝড়-ঝঞায় এরা সঠিক পথ থেকে ছিটকে সরে যায়। তারপর একসময় পথ খুঁজে পেতে পেতে ক্লান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। মরুভূমি কিংবা সমুদ্রের ওপর দিয়েও হাজার হাজার মাইল পথ চলতে হয়। বিশ্রাম নেবার এতটুকু জায়গা নেই । ছােট পাখিদের আছে শিকারি বাজের ভয়। আছে শিকারির বন্দুকের ভয়। ১৯৭৭ সালে মিনেসােটায় সাত লক্ষ পঞ্চাশ হাজার পাখি মারা গিয়েছিল তুষারপাতে। চলাচলের পথে আকাশচুম্বী অট্টালিকায় ধাক্কা খেয়ে মারা পড়ে অনেক পাখি । প্রতিবছর লাইট হাউজের তীব্র আলােয় আকৃষ্ট হয়েও অনেক পাখি মারা যায়।

এভাবে প্রতিবছর দেশান্তরী পাখিরা দেশে দেশে যায় আবার ফিরে আসে। আমাদের দেশে আইনভাঙা নিষ্ঠুর শিকারিদের হাতে প্রাণ হারায় অনেক পাখি। আমরা আমাদের অতিথিদের হত্যা করি নির্মমভাবে। তাই একরকম সন্ত্রস্ত হয়েই এরা নির্ধারিত সময় কাটিয়ে যায় আমাদের সাথে, অপরূপ সৌন্দর্যে মােহিত করে আমাদের । যাবার সময় স্বজন হারানাের এক বুক ব্যথা নিয়ে ডানা মেলে।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *