জনসেবা রচনা (700 words) | JSC, SSC |

জনসেবা রচনার সংকেত

  • ভূমিকা
  • জনসেবার স্বরূপ
  • জনসেবার গুরুত্ব
  • ধর্মীয় দৃষ্টিতে জনসেবা
  • জনসেবার উপায়
  • জনসেবা ও সেবা প্রতিষ্ঠান
  • উপসংহার

জনসেবা রচনা

ভূমিকা:

আত্মচিন্তায় মগ্ন থাকা জীবনের আসল উদ্দেশ্য নয়। পরের কল্যাণে আত্মনিয়ােগের মাধ্যমে নিজের জীবনের বিকাশ সাধনই জীবনের মূলকথা। অর্থাৎ সে জীবনই সার্থক যে জীবন পরের তরে নিবেদিত । জীবন মানে মায়া, জীবন মানে মমতা আর জীবন দিয়েই জীবনকে চিনতে হয়। জীবনকে চিনলেই অর্জিত হয় মনুষ্যত্ব। জনসেবা মনুষ্যত্ব অর্জনের যথার্থ ভিত্তি, স্বার্থের আবিলতা বর্জিত সেবাই হলাে জনসেবা। কবির ভাষায় –

‘আপনা রাখিলে ব্যর্থ জীবন সাধনা।
জনম বিশ্বের তরে পরার্থে কামনা।

জনসেবার স্বরূপ:

‘এ জীবন ক্ষণভঙ্গুর, তারাই যথার্থ জীবিত যারা অপরের জন্য জীবন দান করে’

স্বামী বিবেকানন্দের এ কথায় নিহিত আছে জনসেবার মর্মার্থ । নিজের স্বার্থকে উপেক্ষা করে বৃহত্তর জনগােষ্ঠীর কল্যাণ সাধন করার নামই জনসেবা।
মানবজীবন ক্ষণস্থায়ী। এ স্বল্পসময়ে সে সমাজবদ্ধ হয়। সমাজে সে নিজেকে আত্মকেন্দ্রিক বলয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বরং সবার সঙ্গে বাঁচে। পরের কল্যাণে জীবনােৎসর্গ করে সে জীবনের সার্থকতা খোঁজে। কিন্তু সমাজের মানুষের কল্যাণ
সাধন করার মধ্যেই জনসেবার প্রকৃত স্বরূপ উদঘাটিত হয় না। জনসেবার ধারণা আরও ব্যাপক ও বিস্তৃত। যে সেবার দ্বারা দেশ ও জাতির সামগ্রিক কল্যাণ সাধিত হয় তাই জনসেবা, আরও ব্যাপক অর্থে বিশ্বের বিপন্ন মানবতার সেবা করাই জনসেবা। বিখ্যাত লেখক Ruskin-এর মতে,

There are three kinds of duties, duties towards god, duties
towards parents and duties towads mankind.’

মানবকল্যাণের কর্তব্যই মূলত জনসেবা। সহজ কথায়, আমার বিবেচনা না করে দেশ-জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণের সেবা বা কল্যাণ সাধনই জনসেবা। মানুষ তার মৌলিক গুণাবলি ও কর্মপ্রচেষ্টার মাধ্যমে বিশ্বশান্তি ও কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। এতেই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা, তাইতাে কবি বলেছেন-

‘স্বার্থমগ্ন যে জন বিমুখ বৃহৎ জগৎ হতে
সে কখনাে শেখেনি বাচিতে।

জনসেবার গুরুত্ব:

জীবনকে পরিপূর্ণ সার্থক ও সমৃদ্ধ করতে হলে জনসেবার বিকল্প নেই। প্রার্থে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করার মধ্যেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত। মনুষ্যত্ব মানবচরিত্রের অমূল্য সম্পদ। আর আত্মমগ্ন মানুষ কখনাে মনুষ্যত্ব অর্জন করতে পারে না। কেননা মনুষ্যত্ব অর্জনের কঠিন সাধনা একমাত্র জনগণের কল্যাণ সাধনে নিজেকে নিয়ােজিত করার মাধ্যমেই সম্ভব। সমাজ, দেশ, বৃহত্তর অর্থে বিশ্বের শান্তি ও উন্নতি মানুষের সেবাব্রতের মহৎ চিন্তার মাধ্যমেই সম্ভব। ইতিহাস পর্যালােচনায় আমরা দেখব, যে দেশে জনসেবার মহৎ ব্রতে আত্মসুখ বর্জনের দীক্ষা নিয়েছে যত বেশি লােক, সে দেশের উন্নয়ন তত বেশি ত্বরান্বিত হয়েছে। সমাজ, দেশ তথা বিশ্ব মানবতার প্রতি মানুষের অকৃত্রিম কর্মপ্রচেষ্টা এবং স্বার্থত্যাগই দিতে পারে স্বর্গীয় আনন্দোপলব্ধি। তাই ক্ষণস্থায়ী জীবন শুধু নিজের করে না রেখে সকলের জন্যে বিলিয়ে দেয়া উচিত। সর্বজনীন কল্যাণ সাধনের মাধ্যমেই নিজেকে শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে গড়া যায় এবং মানব ইতিহাসে অমরত্ব পাওয়া যায়। তাইতাে কবি বলেছেন-

‘যা রাখি আমার তরে মিছে তারে রাখি
আমিও রব না যবে সেও হবে ফাকি,
যা রাখি সবার তরে, সেই শুধু রবে
মাের সাথে ডােবে না সে, রাখে তারে যবে ।

ধর্মীয় দৃষ্টিতে জনসেবা:

সকল জাতির সকল ধর্মেই জনসেবার মহান ব্রতকেই শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় চেতনাই মানুষকে সেবাব্রতে অনুপ্রাণিত করেছে। প্রাচীনকালে ধর্মীয় চেতনার আশ্রয়ে সেবাব্রত ব্যাপক অভিব্যক্তি পেয়েছিল। কোরান, বাইবেল, গীতা, ত্রিপিটক—বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্রে ধর্মসাধনার প্রকৃত পথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে জনসেবাকেই। মহানবি হজরত মুহম্মদ (স.) বলেছেন, সব কাজের মধ্যে সমাজ কল্যাণের কাজই শ্রেষ্ঠ এবং মানুষের মধ্যে তিনিই শ্রেষ্ঠ যিনি মানুষের উপকার করেন। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন- ‘জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।’ মানবকল্যাণ সাধনার ব্রতে গৌতম বুদ্ধ ত্যাগ করেছিলেন রাজসিংহাসন। জগতের ধর্মপ্রবক্তারা মানুষের কল্যাণেই খুঁজেছেন ঈশ্বরের অস্তিত্ব।

জনসেবার উপায়:

মহৎ কর্মসাধনার মাধ্যমে মানুষের কল্যাণ সাধনই জনসেবার প্রাণকথা। নানা উপায়ে এ কল্যাণ সাধন সম্ভব। কবি রজনীকান্ত সেন তার কবিতার মাধ্যমেই জনসেবার মহৎ আদর্শ ও উপায় চিহ্নিত করেছেন।

অন্নহীনে অন্নদান, বস্ত্র বস্ত্রহীনে,
তৃষ্ণাতুরে জলদান, ধর্ম ধর্মহীনে,
মূখজনে বিদ্যাদান, বিপন্নে আশ্রয়,
রােগীরে ঔষধ দান, ভয়ার্তে অভয়,
গৃহহীনে গৃহদান, অন্ধেরে নয়ন,
পীড়াতে আরােগ্যদান, শােকার্তে সান্ত্বনা
স্বার্থশূন্য হয় যদি এ দ্বাদশ দান,
স্বর্গের দেবতা নহে দাতার সমান।

অর্থাৎ নিঃস্বার্থ মহৎ মনােভাব নিয়ে আর্ত মানবতার কল্যাণ সাধনের মাধ্যমে জনসেবার মহান ব্রত পালন করা যায়।

জনসেবা ও সেবা প্রতিষ্ঠান:

জনসেবার মহান ব্রত পালনের উদ্দেশ্য নিয়ে কালের ধারায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অনেক সেবামূলকপ্রতিষ্ঠান। নানামুখী কার্যক্রমের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান মানবজাতির উন্নয়ন ও কল্যাণে নিয়ােজিত। দৈশিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম প্রশংসার দাবিদার। এছাড়াও বিভিন্ন সংঘ, সমিতি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। জনসেবামূলক নানান কর্মসূচি পালন করে থাকে। অসহায় মানুষের মুখে হাসি এবং প্রাণে বাঁচার আগ্রহ সৃষ্টিতে এসব সেবামূলক প্রতিষ্ঠান রাখছে অনন্য ভূমিকা।

উপসংহার:

সেবাধর্ম মানুষের অন্তরের মহত্তম গুণ। যে গুণের মাধ্যমে মানুষ লাভ করে প্রকৃত সুখ এবং জীবনকে করে পরিপূর্ণ সার্থক। নিজের স্বার্থ বলি দিয়ে অন্যের দুঃখ লাঘবের মাধ্যমে মানুষ জীবনের সত্যিকার অর্থ খুঁজে পায়। মানবতার কল্যাণ ব্ৰতেই মানুষ পায় নির্মল আনন্দের সন্ধান। তাই জনসেবার মহৎ আদর্শে উদ্দীপ্ত হতে হবে সবাইকে। কেননা

‘আত্মসুখ অন্বেষণে আনন্দ নাহিরে, বারে বারে আসে অবসাদ, পরার্থে যে করে।
তিতি নীরে, সেই লভে স্বর্গের প্রসাদ।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *