নদীতীরে সূর্যাস্ত রচনা ( 570 words) | JSC, SSC |

নদীতীরে সূর্যাস্ত রচনা

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি জেলা নওগাঁ । এ জেলার বুক চিরে বয়ে চলেছে স্রোতস্বিনী নদী ছােট যমুনা। ছােট যমুনার তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা ছােট্ট গ্রাম কুজাইল । এ গ্রামেই আমার শেকড়। শহরে থাকি। কিন্তু সেই শেকড়ের টানে গ্রামে যাই প্রতি বছর। শহরের ব্যস্ততা আর কোলাহলকে পেছনে ফেলে নিজ গ্রামে কাটানাে কয়েকটি দিন যেন আমার বেঁচে থাকার রসদ জোগায় । তাই বাবা-মায়ের সাথে প্রতি বছর একবার হলেও আমি গ্রামে যাই।

এবার গিয়েছিলাম শরৎকালে । কেবল বর্ষা পার হয়েছে। ছােট যমুনার বুকে তীব্র স্রোত নেই। স্থির গতি টইটম্বুর নদীকে দিয়েছে এক শান্ত, কোমল রূপ । এ নদীটি আমার খুব প্রিয় । গাঁয়ে এলেই আমার অনেকটা সময় কাটে এ নদীর তীরে।

শরতের আকাশ নীল । সেখানে পেঁজা তুলাের মতাে ভেসে বেড়াচ্ছে খণ্ড খণ্ড মেঘ । আমি বসে আছি নদীতীরের উঁচু পাড়ে সবুজ ঘাসে ছেয়ে যাওয়া প্রান্তরে। ইতস্তত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফুটে রয়েছে কাশফুল । যেন নীলাকাশ থেকে খণ্ড খণ্ড মেঘ নেমে এসেছে সবুজের বুকে। মৃদু মৃদু দুলছে শরতের বাতাসে প্রকৃতিতে এখন শেষ বিকেলের আলাে । চারদিক শান্ত, নিবিড়। সারাদিন জ্বলে জ্বলে সূর্যও যেন ক্লান্ত। সূর্যের এ কোমল রূপের সাথে সারাদিনের তেজি, প্রবল দীপ্তি ছড়ানাে ঝলসানাে সূর্যের কোনাে মিল নেই। সূর্য এখন রক্তিম। অনেকখানি হেলে পড়েছে নদীর ওপরে। লালচে আভা পড়েছে নদীর শান্ত জলে, কাশফুলে, গাছের পাতায় পাতায়, সবুজ ঘাসে, এমনকি আমার চোখে-মুখে।

হালকা-স্নিগ্ধ বাতাস বইছে। আকাশে পাখিদের কলতান। এখন ওদের নীড়ে ফেরার সময় । নদীর বুকে ভেসে চলেছে দু-একটা পালতােলা নৌকা। কোনাে এক মাঝি গাইছেন ভাটিয়ালি গান। মৃদুমন্দ বাতাসে সে গানের সুর ছড়িয়ে পড়ছে দূর থেকে আরও দূরে । নৌকার পালে অস্তায়মান সূর্যের পরশ পাখিদের ডানায়ও ছড়িয়ে পড়েছে তা। যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা নিপুণ কোনাে ছবি। ধীরে ধীরে দূরে চলে গেল নৌকাগুলাে। যেন ভেসে ভেসে চলে গেল শরতের হাওয়ায়। মিলিয়ে গেল সেই ভাটিয়ালি গানের সুর । কিন্তু রেখে গেল এক হৃদয়-ছোঁয়া স্নিগ্ধতা। আমার মনে পড়ে গেল রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরের খেয়া’ কবিতার কয়েকটি চরণ-

‘আসন্ন এ আঁধার-মুখে নৌকাখানি বেয়ে।
যায় কারা ওই; শুধাই, “ওগাে নেয়ে,
চলেছ কোনখানে?”
যেতে যেতে জবাব দিল, ‘যাব গাঁয়ের পানে।’

আমি তন্ময় হয়ে গিয়েছিলাম। আমার ঘাের ভাঙাল ছােট্ট এক রাখাল বালক আর এক বালিকা, বুঝি-বা ভাইবােন। মাঠ থেকে গরু নিয়ে ফিরছিল। গরুকে গােসল করিয়ে এ সােনা ঝরানাে শেষ বিকেলে নিজেরাও নদীর জলে সাঁতরে নিল কিছুক্ষণ। ওরা চলে যেতেই আবার নীরবতা। পাখিদের কলকাকলিও থেমে গেছে। সবাই ফিরে গেল নীড়ে।

সূর্য অস্ত যেতে বসেছে। সূর্যের রং তাই কিছুটা ম্লান। একপাল গরু নিয়ে চলছে রাখাল । পেছনে এক ভ্যানচালক ভ্যান চালাচ্ছে তাড়াহীন গতিতে। ভ্যানের পেছনে পেছনে চলছে কয়েকটি শিশু। যে যার গন্তব্যে ফিরছে । ফিরছে অস্তমিত সূর্যের অদ্ভুত মায়াবী আলাের পরশ গায়ে মেখে। নদীর জলে তিরতির করে কাঁপছে সে আলাে। প্রকৃতি যেন সােনার অলংকার পরেছে । সূর্যাস্তের ক্ষণে নদীতীরে গ্রামীণ জীবনের এ অসাধারণ রূপ দেখে আমি বিমােহিত । আমি যেন এক নতুন পৃথিবীকে দেখছি।

খানিক পরেই সূর্যটা অস্তাচলে গেল। যেন নদীর বুকেই টুপ করে ডুবে গেল । আকাশজুড়ে এখন ধূসর লাল আভা। নদীর স্নিগ্ধ মন্থর জলের রঙও গেল পালটে হালকা হাওয়ায় মাঝে মাঝে কেঁপে কেঁপে উঠছে সে জল । হঠাৎ করেই দূর থেকে ভেসে এলাে সেই পরিচিত ভাটিয়ালি সুর মাঝি ফিরে চলেছেন তার আপন গন্তব্যে। নৌকার পাল এখন যেন এক বিশাল ধূসর চাদর।

মুহূর্তেই পালটে গেল প্রকৃতির রং । ধীরে ধীরে নেমে আসছে আঁধারের কালাে পর্দা । তারপর পুরােপুরি অন্ধকার। শরতের আকাশে জ্বলে উঠল সন্ধ্যা তারা । ঝি ঝি পােকার ডাক, বুনােলতার গন্ধ আর ধূসর অন্ধকার সন্ধ্যার অস্তিত্বকে জানান দিচ্ছে । ক্রমশ চারপাশ অস্পষ্ট হয়ে উঠল । অপূর্ব এক ভালােলাগা নিয়ে আমি উঠে দাঁড়ালাম। এবার আমারও ফেরার পালা।

আমি ফিরে চললাম নিজ ঘরে । ঠিক সেই মাঝির মতাে, কিংবা সেই রাখাল বালক-বালিকার মতাে, কিংবা সেই নীড়ে ফেরা পাখির দলের মতাে। অথবা হয়তাে ফিরে চললাম সৌন্দর্যমুগ্ধ এক কাঙালের মতাে, যে কিনা বারে বারে ফিরে আসতে চায় এ নদীর তীরে সূর্যাস্ত দেখার জন্যে।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *