বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রচনা (৮৫০ শব্দ)

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রচনা লিখন

দিগন্তজোড়া সবুজ আর নীলিমার অপূর্ব ভূমি বাংলাদেশ। এখানে আছে আকাশের বিস্তীর্ণ ছায়ায় নদী ও পাহাড়ের মিলন। ফসল ভরা সুবিশাল প্রান্তর, ধানের খেতে বাতাসের দোলা, গাছে গাছে পাখির কূজন, ফুল ঘিরে অলির গুঞ্জরণ এদেশকে পরিয়েছে রানির সাজ। মুগ্ধ কবির চোখে এদেশ তাই ‘রূপসী বাংলা। এ দেশের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মােহমুগ্ধ কবি আবেগভরা কণ্ঠে বলে ওঠেন–

‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর।’

বাংলাদেশ ভূবৈচিত্র্যের দেশ। অসংখ্য নদনদী এদেশকে করেছে উর্বর পলিমাটিতে সমৃদ্ধ। সেখানে কৃষক ফলায় সােনার ফসল । সমতল ব-দ্বীপ হিসেবে পরিচিত হলেও দক্ষিণের পার্বত্য জেলাগুলােতে এবং সিলেট আর ময়মনসিংহের সীমান্তে আছে পাহাড়ি এলাকা । উত্তরে ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও গাজীপুর জেলায় রয়েছে ভাওয়াল ও মধুপুর গড় এলাকা, যেখানে গেরুয়া। রঙের মাটিতে মাথা উঁচু করে আছে সারি সারি শাল ও গজারি গাছ। দক্ষিণে আছে বঙ্গোপসাগর আর সুবিশাল সুন্দরবন।

সুন্দরবনে রয়েছে বৈচিত্র্যপূর্ণ উদ্ভিদের সমাহার। এ বনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার আর চিত্রল হরিণ বিশ্বে অনন্য। তাছাড়া দক্ষিণের কক্সবাজার বিশ্বের সর্ববৃহৎ সমুদ্রসৈকত। এ সমুদ্রসৈকত এবং সুন্দরবন বাংলাদেশের সৌন্দর্যের প্রধান এবং অকৃত্রিম আধার। পূর্বে আসামের শ্রেণিবদ্ধ পাহাড়ের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পাহাড়ি নদী। এককথায় সাগরের গর্জন-মুখরতা, পাহাড় ও বনানীর সবুজ-শ্যামল স্নিগ্ধতা এদেশকে করেছে অসামান্য রূপসি । বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ কবি তাই বিস্ময়াভিভূত হয়ে বলে ওঠেন—

এমন স্নিগ্ধ নদী কাহার, কোথায় এমন ধুম পাহাড়
কোথায় এমন হরিৎক্ষেত্র আকাশ তলে মেশে।

বাংলার প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের অন্যতম প্রধান উৎস হলাে গ্রামবাংলার রূপবৈচিত্র্য। গ্রামের বিস্তৃত সবুজ প্রান্তর, পথ, গাছের শীতল ছায়া, গ্রাম ছুঁয়ে যাওয়া নদী, পুকুর-নদী-বিল কিংবা ঝিলের স্বচ্ছ জল, বিল কিংবা ঝিলের বুকে ফুটে থাকা শাপলার অনুপম রূপ গ্রামকে করেছে সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ। এমন সৌন্দর্যে বিমােহিত কবি তাই বলেছেন।

‘কাহার ঝিয়ারী কদম্ব শাখে নিঝঝুম-নিরালায়,
ছােট ছােট রেণু খুলিয়া দিয়াছে— অস্ফুট কলিকায়।
বাদলের জলে নাহিয়া সে মেয়ে হেসে কুটিকুটি হয়

সে হাসি তাহার অধর নিঙ্গাড়ি, লুটিয়াছে বনময়।’

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরও বৈচিত্র্যময় করেছে ঝতুপরিক্রমা। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত- এ ছয়টি ঋতু পালাবদলের চাকায় ভর করে প্রকৃতিকে সাজিয়ে তােলে নানা রূপ-রস-গন্ধে। প্রতিটি ঋতু আপন রূপস্বাতন্ত্র নিয়ে বাংলার বুকে আবির্ভূত হয়ে প্রকৃতিকে দেয় নতুন চেহারা। ঋতু পরিক্রমায় বাংলাদেশের প্রকৃতিক সৌন্দর্যে কখনাে যােগ হয় রুক্ষতা, কখনাে সজীবতা, কখনাে স্নিগ্ধতা, কখনাে ধূসরতা, কখনাে রিক্ততা, আবার কখনাে ফুল ও পত্রালির মােহমুগ্ধতা। আবর্তনের ধারায় প্রথমেই আগমন ঘটে গ্রীষ্মের । বাংলার প্রকৃতি হয়ে ওঠে রুদ্র, রুক্ষ ও প্রাণহীন তীব্র তাপদাহে প্রকৃতি হারায় সজীবতা, মাঠ ফেটে হয় চৌচির। জলাধারগুলাের পানি যায় শুকিয়ে। একসময় প্রবল রুদ্ররূপ নিয়ে হাজির হয় কালবৈশাখি । তছনছ করে দেয় সবকিছু। কবিগুরু রবীন্দ্রনথ গ্রীষ্মকে অভিহিত করেছেন ‘মৌনীতাপস’ বলে। তবে রুক্ষতার মধ্যেও প্রকৃতি এ সময় উপহার দেয় রসালাে ফলের সম্ভার।

গ্রীষ্মের পরেই আসে ঘনঘাের বরষা। পাল্টে যায় প্রকৃতির চেনা রুক্ষরূপ । প্রকৃতির তৃষ্ণা নিবারণের ভার নিয়েই যেন বর্ষার আগমন। অব্রিাম বৃষ্টিধারায় সর্বত্র লাগে শিহরণ, জাগে সজীবতা। বর্ষা নিয়ে আসে শ্যামল ছায়াঘন দিন। বর্ষার রূপ দেখে কবি গেয়ে ওঠেন।

‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাই আর নাহি রে
ওগাে, আজ তােরা যাস নে ঘরের বাহিরে।’

বর্ষার ছোঁয়ায় প্রকৃতি হয়ে ওঠে সবুজ, গাছে গাছে পাখিরা সুধাকণ্ঠে করে কূজন, মাটির বুক চিরে উকি দেয় নবীন শস্য, আরও দেখা যায় নানা সুগন্ধি ফুলের সমাহার। এককথায় বৃষ্টির ছোঁয়ায় প্রকৃতি যেন নবীন প্রাণের চাঞ্চল্যে আত্মহারা হয়। বর্ষার পরেই মেঘ আর আলাের লুকোচুরি নিয়ে আসে শরৎ। কালাে মেঘের বদলে শরতের আকাশে দেখা দেয় সাদা মেঘের বিস্তার। শরতের রাতের জ্যোত্সাবিধৌত প্রকৃতি মনে দেয় দোলা । চোখে পড়ে ঝকঝকে আকাশের সুনীল রূপ আর নদীতীরের কাশফুলের শুভ্রতা। কবির কণ্ঠে তাই শােনা যায়—

‘কী ভালাে আমার লাগলাে আজ এই সকালবেলায়।
কেমন করে বলি?কী নির্মল নীল এই আকাশ, কী অসহ্য সুন্দর, যেন গুণীর কণ্ঠের অবাধ উন্মত্ত তাণ
দিগন্ত থেকে দিগন্তে।’

হেমন্ত আসে ফসল তােলার ধুম নিয়ে পাকা ধানের গন্ধে বাতাস হয় মও। পাকা ধানের সােনা রঙে গ্রামবাংলা যেন সােনার অলংকারে সেজে ওঠে। কুয়াশার পাতলা চাদরে গা ঢেকে থাকে হেমন্তের ভাের। আবার শীতের ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে সে বিদায় নেয় প্রকৃতি থেকে।

উত্তরের হিমেল হাওয়ার পাখায় ভর করে আসে শীত। শীতের আগমনে প্রকৃতি হয়ে ওঠে রিক্ত বৈরাগী, যেন শূন্যতা ও রিতার প্রতিমূর্তি। গাছপালা হারায় সজীবতা,শাখা-প্রশাখা হয়ে পড়ে পাতাবিহীন। ফসলবিহীন মাঠে দেখা যায় সীমাহীনশূন্যতা। কবির কণ্ঠে তখন ধ্বনিত হয়-

‘ঘর-দুয়ার আজ বাউল যেন শীতের উদাস মাঠের মতো ঝরছে গাছে সবুজ-পাতা আমার মনের বনের মতাে।’

তবে শীতের সকাল বাঙালির শ্রেষ্ঠ সুন্দর সময়। ঘন কুয়াশায় ঢাকা সকালে নিস্তরঙ্গ প্রকৃতি মানুষকে কাছে টানে শীতের সময় হরেক রকমের ফুল ও শাকসবজির সম্ভারে প্রকৃতি সেজে ওঠে। শীতের রিক্ততাকে বিদায় দিতে দখিনা বাতাসে ভর করে আসে ঋতুরাজ বসন্ত। গাছে গাছে বিকশিত হয় নবীন কিশলয়, বনে বনে পাখিদের কলকাকলিতে আবার চঞ্চল হয় প্রকৃতি। অশােক, কৃষ্ণচূড়া, শিমুলের রক্তলাল রঙে প্রকৃতি হয় নববধূর মতে রঙিন । এছাড়াও জারুল, হিজলের রূপ প্রকৃতিকে করে অনন্য। কবির কণ্ঠে তাই শােনা যায়-

‘এলাে বনান্তে পাগল বসন্ত।
বনে বনে মনে মনে রং সে ছড়ায় রে
চল তরুণ দুরন্ত।
বাঁশীতে বাজায় সে বিধুর পরজ বসন্তের সুর
পান্ডু-কপােলে জাগে রং নব অনুরাগে
রাঙা হল ধূর দিগন্ত।’

এ আনন্দঘন স্নিগ্ধ প্রকৃতিতে কখনাে ওঠে চৈতালি ঝড়। শােনা যায় কালবৈশাখির পদধ্বনি, পুনরায় ফিরে আসে গ্রীষ্ম এভাবেই বাংলার প্রকৃতি সাজে বিচিত্র রূপ-ভিন্নতায়। নদী-সাগর, পাহাড়-পর্বত, বন-বনানী আর ঋতুবৈচিত্র্য সবকিছুর সমন্বয়ে বাংলার সৌন্দর্য হয়েছে অসাধারণ ঐশ্বর্যের অধিকারী । বিচিত্র আর অফুরন্ত সৌন্দর্যের ডালি সাজানাে এ বাংলাদেশ | তা মানুষের মনকে করে কল্পনাপিয়াসী । নিয়ে যায় অন্য এক বােধের জগতে। তাইতাে কবি বাংলাকে ভালােবেসে বার বার বাংলার বুকেই ফিরতে চেয়েছেন:

‘আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালােবেসে জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এ সবুজ করুণ ডাঙায়।’

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *