Faria Hasan / December 30, 2020

বাংলাদেশের ঋতুবৈচিত্র্য রচনা (950 words) | JSC, SSC |

Spread the love

বাংলাদেশের ঋতুবৈচিত্র্য রচনা

অপরূপ রূপ মাধুর্যে ভরা আমাদের এ বাংলাদেশ। নিত্য নতুন সাজে সে আপন অঙ্গা সাজিয়ে বিমােহিত করে সবাইকে। বর্ষপরিক্রমায় এদেশে ছয়টি ঋতুর আবর্তন হয়। আর এ ছয় ঋতুর গতিধারায় প্রকৃতি নিজেকে রাঙিয়ে তােলে বিচিত্র রূপে। প্রতিটি ঋতু আপন রূপ-স্বাতন্ত্র নিয়ে বাংলার বুকে আবির্ভূত হয়ে বাংলার প্রকৃতিকে করে অনুপম রূপ-ঐশ্বর্যে ভরপুর।প্রাকৃতিক পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে চলে ঋতু পরিবর্তনের বর্ণাঢ্য শােভাযাত্রা। প্রকৃতি এখানে কখনাে ধারণ করে রুক্ষ- রুদ্র রূপ, আবার কখনাে স্নিগ্ধ-সজীব; কখনাে হয়ে ওঠে শ্বেত-সুন্দরী, কখনাে ধারণ করে ধূসর রূপ, কখনাে নেয় রিক্ত বৈরাগীর রূপ, আবার কখনাে ফুলে আর নবকিশলয়ে পূর্ণতায় হয়ে ওঠে ঐশ্বর্যশালী । প্রকৃতির এ বিচিত্র রূপে আবেগমুগ্ধ কবি তাই বাংলার নাম দিয়েছেন ‘রূপসী বাংলা’।

রূপসি বাংলার রূপবৈচিত্র্য সম্পূর্ণই ঋতুভিত্তিক। ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এ ঋতুবৈচিত্র্যের আবির্ভাব ঘটে এবং বাংলার প্রকৃতিতে তার চমৎকার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। আবহাওয়াবিদদের মতে, পৃথিবীতে প্রধানত চারটি ঋতু পরিলক্ষিত হয়—গ্রীষ্ম, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। কিন্তু আমাদের দেশে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত— এ ছয় ঋতুর আবর্তন। বর্ষপঞ্জির হিসাবে প্রতি দু মাস নিয়ে একটি ঋতুর ব্যাপ্তিকাল ধরা হয়। এ হিসাবে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ হলাে গ্রীষ্মকাল, আষাঢ়-শ্রাবণ বর্ষাকাল, ভাদ্র-আশ্বিন শরৎকাল, কার্তিক-অগ্রহায়ণ হেমন্তকাল, পৌষ-মাঘ শীতকাল আর ফাল্গুন-চৈত্র বসন্তকাল । অবশ্য বাংলার ঋতু পরিক্রমা মাসের সীমারেখায় আবদ্ধ থাকে না। একটি ঋতুর রূপ প্রায়শ একাকার হয়ে যায় আরেকটির সাথে । তবুও প্রকৃতির পরিবর্তন প্রতিটি ঋতুর স্বাতন্ত্র্য সগৌরবে প্রকাশ করে।
বছরের শুরুতেই সূর্যের তীব্র তাপদাহ নিয়ে আবির্ভূত হয় গ্রীষ্ম । ঘরে-বাইরে শুরু হয় বর্ষবরণের ধুম । বাংলা ও বাঙালির জীবনে নতুনের শুভ সূচনা করতেই গ্রীষ্মের আগমন। যদিও বৈশাখ আসে নতুনের বার্তা নিয়ে, ন্তুি প্রকৃতিতে দেখা যায় তার রুদ্র রূপ । গ্রীষ্মের আগমনে প্রকৃতি হয়ে ওঠে প্রাণহীন, রসহীন, রুক্ষ ও বিবর্ণ। সূর্যের তীব্র ও প্রখর তাপদাহে প্রকৃতি হারায় তার অপরূপ সবুজ, শ্যামল শােভা। ধু ধু করে মাঠ, জলশূন্য হয়ে পড়ে জলাধার, কবির ভাষায়—

গ্রীষ্মের দুপুরে রােদুরে চারিদিক
গেল বুঝি গেল সব ঝলসে
বৃষ্টির জলধারা এনে দাও, এনে দাও
মন তাই বারেবারে বলছে।

এ তীব্র হাহাকারই গ্রীষ্মের নিত্যরূপ। একসময় ভয়াল রুদ্র রূপ নিয়ে প্রকৃতির বুকে আঘাত হানে কালবৈশাখি। তার লক্ষ্য যেন সব ভেঙেচুরে নতুনের প্রতিষ্ঠা করা। গ্রীষ্মে সূর্যের অগ্নিশিখায় দুঃসহ অতিষ্ঠ কৃষকের দৃষ্টি থাকে উর্ধ্ব আকাশে। একটু বৃষ্টির ছোঁয়ায়, ঠান্ডা বাতাসের স্পর্শে আর শীতল ছায়ার জন্য যেন তার প্রাণ কাঁদে। তবে গ্রীষ্ম প্রকৃতির ডালি সাজিয়ে দেয় বিচিত্র সব ফলে।

গ্রীষ্ম প্রকৃতির বুকে যে হাহাকার সৃষ্টি করে তাকে শান্ত করতেই যেন বর্ষার আবির্ভাব। প্রকৃতির তৃষ্ণা নিবারণের ভার নিয়ে ঘনগৌরবে বর্ষা আসে শ্রাবণের ধারা সজো করে। প্রাণহীন প্রকৃতিতে জাগে অপূর্ব প্রাণস্পন্দন। বাংলার প্রকৃতি ফিরে পায় চিরচেনা সবুজ-শ্যামল সাজ। অবিরাম বৃষ্টিধারায় প্রকৃতির সর্বত্র লাগে শিহরণ, জাগে সজীবতা । অপূর্ব মেঘের সমারােহে শ্যামল, সুন্দর, নয়নাভিরাম বর্ষা বাংলার প্রকৃতিতে নিয়ে আসে শ্যামছায়াঘন দিন। বৃষ্টির ছোঁয়ায় কদম, কেয়া, হাসনাহেনার মাতাল গন্ধে প্রকৃতি-হৃদয়ের দ্বার হয় উন্মুক্ত। প্রকৃতির বুকে আবার শােনা যায় পাখির কলকাকলি, শুষ্ক মাটির বুক চিরে জেগে ওঠে নবীন শস্যের দল । প্রকৃতির ভরসা যেন এ নবযৌবনা বর্ষা। কবির ভাষায়-

বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর
বৃষ্টি নামে মিষ্টি মধুর
উঁই চামেলি ফুলের বোঁটায়
বৃষ্টি নামে ফোটায় ফোঁটায়
বাদলা দিনে এক টানা সুর
বৃষ্টি নামে ঝুমুর ঝুমুর

প্রাণপ্রদায়ী বর্ষা আবার কখনাে কখনাে বন্যার রূপ নিয়ে জনজীবনে নিয়ে আসে চরম দুর্ভোগ। তবে অধিক বৃষ্টি দুর্ভোগের কারণ ঘটালেও বর্ষা ঋতুতেই বাংলার প্রকৃতি পায় সজীবতার স্নিগ্ধ ছোঁয়া।

এরপর ঋতুপরিক্রমায় বাংলার প্রকৃতিতে আগমন ঘটে স্নিগ্ধ ও প্রসন্ন শরৎ ঋতুর। তবে আষাঢ়-শ্রাবণের সময়সীমায় বর্ষা। পরিপূর্ণ বিদায় গ্রহণ করে না। ভাদ্র ছাড়িয়ে আশ্বিনের আঙিনাতেও কখনাে কখনাে চঞ্চলা হরিণীর মতাে বর্ষা উকি দিয়ে যায় ।
তাই শরতের প্রথমার্ধেও চলে মেঘ-বৃষ্টি আর আলাের লুকোচুরি । ধীরে ধীরে শরৎ তার আপন বৈশিষ্ট্যে হয় সমুজ্জ্বল। রাতের আকাশ জুড়ে থাকে পূর্ণ চাঁদের আলাে। নদীর তীরে দেখা যায় কাশফুলের অপূর্ব শুভ্র সমারােহ। বাতাস জুড়ে থাকে কদম, কেয়া, শিউলির মৃদুগন্ধ। বাংলার প্রকৃতি অনির্বচনীয় রূপ-মাধুরী নিয়ে যেন পূর্ণ হয়ে ওঠে কানায় কানায় । শরৎ কেবল তার সৌন্দর্যে শুভ্রতা দিয়েই মুগ্ধ করে না, বরং ফসলের আগমনী বার্তা শুনিয়ে জনজীবনে জাগায় আনন্দের সাড়া। কবির ভাষায়-

‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরির খেলা
নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা
আজ ভ্রমর ভােলে মধু খেতে, উড়ে বেড়ায় আলােয় মেতে আজ কীসের তরে নদীর চরে চখাচখির মেলা।

শরতের পর নীরবে নিভৃতে হিমের ঘােমটা উপস্থিত হয় হেমন্ত। হেমন্ত আসলে শরতেরই বিলম্বিত রূপ, ফসল ফলাবার নিঃসঙ্গ ও নিরলস সাধনায় মগ্ন থাকে হেমন্ত রানি । শরতের মতাে রূপৈশ্বর্য তার নেই। হেমন্তের বর্ণ ধূসর কিন্তু সে ধূসরতা রিক্ততার নয়, বরং পরিপূর্ণতার আমেজই তাতে বিদ্যমান
রূপ-সৌন্দর্যের আতিশয্য না থাকলেও হেমন্তের রয়েছে মমতাময়ী কল্যাণী মায়ের রূপশ্রী। মাঠে মাঠে পাকা ধানের গন্ধে ভরে ওঠে গ্রামবাংলা। ঘরে ঘরে চলে নবান্ন উৎসব। আপন। দানে সবাইকে পরিপূর্ণ করে কুয়াশার চাদরে গা ঢাকা দিয়ে নিঃশব্দে বিদায় নেয় হেমন্ত।

হেমন্তকে বিদায় জানাতে কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে আসে শীত। ঘন কুয়াশার অন্তরালে প্রকৃতি অলংকারবিহীন বৈরাগীর সাজ নেয়। সজীব প্রকৃতি হয়ে ওঠে বিবর্ণ। রিক্ততা আর দিগন্তব্যাপী সুদূর বিষাদের প্রতিমূর্তি এ শীত ঋতু। এ সময় একদিকে প্রকৃতিতে দেখা যায় পাতা ঝরার দৃশ্য, অন্যদিকে নানা সবজি আর রং-বেরঙের ফুলের সমাহারে প্রকৃতি হয়ে ওঠে পরিপূর্ণ। বাঙালি সমাজ পৌষ-পার্বণের উৎসবে হয় মুখর। তবে বাংলাদেশের দরিদ্র জনগােষ্ঠী এ সময় চরম কষ্টভােগ করে। বাংলার ষড়ঋতু পরিক্রমায় সর্বশেষ ঋতু বসন্ত। শীতের রিক্ততা আর জীর্ণতার অন্ধকারকে ঘুচিয়ে নবীন আলাের প্রভাত নিয়ে বসন্তের আগমন। শীতের বৈরাগী বসন্তের সাজে হয় চিরচল। বসন্ত জরাজীর্ণ পাতার বিদায়গাথা রচনা করে প্রাণের জয়তােরণ গড়ে আনন্দের তানে’। এ সময় অকারণ আন্দোলনে অশােকের বন হয় চল, নব কিশলয় ওঠে নেচে, বনে বনে জাগে পাখিদের গান। দখিনা বাতাসের কৌতুকে পুষ্পগন্ধে প্রকৃতি হয় আমােদিত। শিল্পিত মনে আনন্দের বাণী ধ্বনিত হয়—

‘পূর্ণিমা রাতে ঐ ছােটাছুটি করে কারা
দখিনা পবনে দোলে, বসন্ত এসে গেছে।
কেমনে গাঁথিব মালা, কেমনে বাজিব বেণু
আবেগে কাঁপিছে আঁখি, বসন্ত এসে গেছে।

ফালুনের এ আনন্দঘন স্নিগ্ধ প্রকৃতি চৈত্রের আগমনে হয় মলিন। শােনা যায়, কালবৈশাখির পদধ্বনি। চৈত্র বনে বনে গাছের শাখায় শাখায় আর ফসলের মাঠে মাঠে বেলা শেষের সংগীত বাজায়। বর্ষপরিক্রমায় আবার ফিরে আসে গ্রীষ্ম। শুরু হয় নতুন বছরকে বরণ করে নেবার প্রস্তুতি।

এভাবেই বাংলার প্রকৃতি মঞে ষড়ঋতুর রূপবৈচিত্র্যের মারােহ পরিলক্ষিত হয়। একেক ঋতুতে প্রকৃতি একেক সাজে নিজেকে মােহনীয় করে তােলে। এর প্রভাব পড়ে বাঙালির হৃদয়-মনে। বছরের বিভিন্ন সময়ে ঋতুবৈচিত্র্যে প্রকৃতির যে স্বতন্ত্র সাজ তাতে মুগ্ধ হয়েই কবি বাংলার বুকে বার বার ফিরে আসার আকুলতা প্রকাশ করেছেন। বলেছেন:

‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে-এ বাংলায়
হয়তাে মানুষ নয়, হয়তাে বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে।’

FILED UNDER : রচনা

Submit a Comment

Must be required * marked fields.

:*
:*

Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content

রচনা, ভাবসম্প্রসারণ,অনুচ্ছেদ,পত্র, আবেদন পত্র, সারাংশ-সারমর্ম , লিখন , বাংলা, ১০ম শ্রেণি, ২য় শ্রেণি, ৩য় শ্রেণি, ৪র্থ শ্রেণি, ৫ম শ্রেণি, ৬ষ্ঠ শ্রেণি, ৭ম শ্রেণি, ৮ম শ্রেণি, ৯ম শ্রেণি,  for class 10, for class 2, for class 3, for class 4, for class 5, for class 6, for class 7, for class 8, for class 9, for class hsc, for class jsc, for class ssc, একাদশ শ্রেণি, দ্বাদশ শ্রেণি