একজন বৃদ্ধার জীবনের একটি দিন রচনা

একজন বৃদ্ধার জীবনের একটি দিন

ফজরের আজানের ধ্বনিতে ঘুম ভাঙল তার। আস্তে আস্তে তিনি উঠে বসলেন। প্রায় শেষ রাতের দিকে ঘুম এসেছিল। এখন চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই। আরাম করে ঘুমােনাের জন্যেও যেন বয়স একটা বাধা। সহজে তার ঘুম আসতে চায় না। আবারও গত রাতে তিনি বাতের ব্যথায় কষ্ট পেয়েছেন। ওষুধ খেতে ভুলে যাননি তাে! দুর্বল স্মৃতিশক্তি আগের রাতের কথা। মনে করার চেষ্টা করল । নাহ, বৌমা ওষুধ খাইয়ে দিয়ে গিয়েছিল। ওষুধে কি আর বুড়ােদের ব্যারাম সারে সাময়িকতারে। ব্যথা ভুলে থাকার ব্যর্থ প্রয়াস মাত্র। সেই ব্যথা ফিরে আসবেই।

বাথরুমে গিয়ে ওজু করলেন। বেসিনের আয়নায় যে মুখটা দেখা যাচ্ছে তা একজন বৃদ্ধার । বয়স পঁচাত্তর হবে। কপালে তাঁর অসংখ্য ভাজ । প্রত্যেকটিই যেন একেকটি কঠিন পরীক্ষার সাক্ষী। অবয়বজুড়ে বয়সের বলিরেখা যেন কঠোর বাস্তবতার চিহ্ন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি এখন জীবনযুদ্ধে জর্জরিত একজন ক্লান্ত সৈনিক। একজন বিজয়ীও বটে। তাঁর সন্তানদের তিনি মানুষ করতে পেরেছেন। তাঁর দুই ছেলে, তিন মেয়ের প্রত্যেকেই পেশাগত দিক দিয়ে সফল। কিন্তু তার মনে একটা গােপন কষ্ট আছে। ওদের বাবা সন্তানদের এই সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। তাঁর সন্তানরা আর্থিকভাবেও সচ্ছল । শােবার ঘরে তাঁর আরামআয়েশের ব্যবস্থা করা আছে। গত বছর একটা টি এসি লাগানাে হয়েছে। একটা ইলেকট্রিক বেলও আছে তাঁর খাটের পাশে, প্রয়ােজনে ঘরের কাজের লােকদের ডাকার জন্যে। তাঁর ছােট ছেলে একটা টিভি কিনে দিতে চেয়েছিল অনেক বুঝিয়ে ছেলেকে থামিয়েছেন তিনি। বলেছেন, ‘জোয়ান মানুষদের টিভি দেখে সময় কাটে, আমার ওসব লাগবে না বাবা’। আসলেই তাে, তাঁর বড় ছেলে আর বৌমা যখন অফিসে চলে যায়, বাসায় তখন মানুষ বলতে তিনি আর একটা কাজের মেয়ে। গুলশানের ছােটখাটো অ্যাপার্টমেন্টটা তখন খা খা করে। সময় কাটতে চায় না। হকার পত্রিকা দিয়ে যায়। উলটে পালটে দেখেন। ছােট হরফগুলাে এখন আর তেমন স্পষ্ট ধরা পড়ে না চোখে। গত বছর শীতে ছানি কাটানাে হয়েছে, তারপরও । শিরােনামগুলাে পড়তে আর কতক্ষণ লাগে। বারান্দায় রাখা ফুলের টব। যেখানে গেলে এক চিলতে আকাশ দেখা যায়। তখন খুব ভালাে লাগে। এই ভালাে লাগাটাও ক্ষণস্থায়ী। কেননা বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা একভাবে বসে থাকা তার জন্যে কষ্টকর, ডাক্তারের বারণও। মাঝে মাঝে ব্যথাটা কম থাকলে রান্নাঘরে উকি দেন। কাজের মেয়েটার সাথে টুকটাক গল্প, নিজের মতাে করে রান্না দেখিয়ে দেওয়া।

নামাজ শেষ করে আবার শুয়ে পড়লেন তিনি। তার এখন মনে হতে থাকল, কাল বৌমা ওষুধ দিয়ে যায়নি। গতকাল তাে তাদের বাইরে দাওয়াত ছিল। নাকি সেটা পরশুদিনের কথা? উফ! কিছুই মনে থাকে না আজকাল। কিছু না। একসময় হাল। ছেড়ে দিলেন তিনি। ওষুধ খেলেও কী, না খেলেই কী । বাতের ব্যথা থাকবেই।

চোখ বন্ধ করে তসবি জপতে জপতে অনেকটা সময় পার হয়ে গেল। রান্নাঘরে খুটখাট শব্দ শুনতে পাচ্ছেন। নাশতার টেবিলে যেতে হবে খাট থেকে ধীরে ধীরে নেমে খাবার ঘরে গেলেন তিনি। ওষুধ খাওয়ার জন্যে রােজই তাকে একটু আগেভাগেই নাশতা সেরে নিতে হয়। ব্যথার ওষুধ খেনেই তাে সাময়িক আরাম। ভাজি, রুটি আর মুরগির ঝােল দিয়ে নাশতা সারলেন। শুধু তার জন্যেই বাসায় আটার রুটি বানানাে হয়। বাকি সবার পাউরুটি হলেই চলে। এজন্যে তাঁর একটু একটু খারাপও লাগে। শরীরে কুলালে তিনি নিজেই রুটি বানিয়ে নিতেন। এক কালে কত রকম কাজই না তাকে করতে হতাে। আজ রুটি বানানাে তাে দূরের কথা, এক গ্লাস লেবুর শরবতও তিনি নিজ হাতে বানাতে পারেন না । লেবু চিপে রস বের করাটাই তার কাছে একটা কঠিন কাজ।

আবার নিজের ঘরে ফিরে এলেন। ঘরে আসবাব বলতে স্টিলের আলমারি, একটা কাঠের কেবিনেট, একটা খাট আর খাটের পাশে সাইড টেবিল । সাইড টেবিলে জগ আর গ্লাস। জগে পানি ভরতে হবে। তিনি ইলেকট্রিক বেলের বােতাম টিপলেন। বৌমাই এসে জগটা ভরে দিয়ে গেল, ওষুধ দিয়ে গেল । তার এই বৌটা বড় পয়মন্ত । একেবারে নিজের মেয়ের মতাে। কখনাে মুখ ভার করে কথা বলে না। মেয়েটার জন্যে প্রাণ ভরে দোয়া করেন তিনি।

বেলা দশটার মধ্যে বাসা সুনসান হয়ে গেল। দুপুর দুটো পর্যন্ত থাকবে এই নীরবতা। তাঁর নাতি আবির স্কুল থেকে ফিরবে দুটোয় । নাতির কথা মনে পড়তেই তার মনটা ভালাে হয়ে গেল । তিনি আবিরের ঘরে গেলেন। এই ঘরটা অন্য ঘরগুলাের তুলনায় ছােট। কিন্তু নানা জিনিসপত্রে ঠাসা। বই-খাতা, কম্পিউটার, গিটার, ক্রিকেট-ব্যাট আরও কত কী। ঘরময় ছড়িয়ে। ছিটিয়ে রয়েছে কাপড়চোপড়। কাল বৌমা আবিরকে বলেছিল ঘর গুছিয়ে রাখতে । তিনি কিছুক্ষণ ঘরটা গােছানাের চেষ্টা করলেন। আবির ঘরে ফিরলে তাকে মনে করিয়ে দিতে হবে।

দুটো বেজে গেল। বৌমা ফোনে জানাল, আবিরের ফিরতে দেরি হবে। নাতিটার সাথে দুপুরের খাবার খান তিনি। হাত নেড়ে, চেড়ে কতরকম গল্পই না করে খেতে খেতে। তিনি মুগ্ধ হয়ে দেখেন, শােনেন। তার স্বামীর সাথে আবিরের কত যে মিল। স্কুল কোচিংয়ের জন্যে আজকাল প্রায়ই আবিরের ফিরতে দেরি হয়। তিনি একাই খেয়ে নিলেন। খাওয়া শেষ হওয়ামাত্র টেলিফোনটা বেজে উঠল। মুহূর্তেই তাঁর চোখে মুখে খুশির ঝিলিক। তার দুই মেয়ে প্রতিদিনই কয়েকবার তাকে ফোন করে। তাদের সাথে কথা বললে স্বস্তি হয়, ব্যথার কথা কিছু সময়ের জন্যে হলেও ভুলে থাকা যায়। দুপুর বেলাটায় তিনি শুয়ে শুয়ে নানা কথা ভাবেন। মাঝে মাঝে একটু ঘুমও আসে।

কখনাে কখনাে তিনি মেয়েদের বাসায় বেড়াতে যান। দু-চার দিন থেকেও আসেন। নাতি-নাতনিগুলাে এমন নাছােড়বান্দা। কিছুতেই আসতে দিতে চায় না। এদিকে দাদি না থাকলে আবিরেরও মুখ ভার। মায়া আর ভালােবাসার এই বন্ধনের কথা ভেবে আনন্দে তাঁর চোখে জল এসে যায় কেবলই ওদের বাবার কথা মনে পড়ে।

মাগরিবের আজান হলো । ওজু সেরে তিনি নামাজ পড়লেন। এরপর তার ঘরে চা দিয়ে যাওয়া হবে। ছােট ছেলে খোঁজখবর নেওয়ার জন্যে ফোন করবে। ওর বাসায় যেতে বলবে। কিন্তু ছােট ছেলের বাসায় তিনি খুব একটা স্বস্তি পান না। তার কেন জানি মনে হয়, ছােট বৌমা তার বাসায় থাকাটা পছন্দ করে না। সন্ধ্যায় তিনি টেলিভিশনে খবর শুনলেন। এরপর সময় যেন থমকে থাকে। তিনি বিছানায় শুয়ে রইলেন। হাতে তসবি। পরম করুণাময়ের কাছে তার একটাই প্রার্থনা, তার সন্তান-সন্ততিরা যেন সুখে থাকে। চলাফেরার শক্তি থাকতে থাকতেই যেন তিনি পরপারে চলে যেতে পারেন। একটু তন্দ্রা এসে গিয়েছিল । হাত থেকে তসবি পড়ে গেলে ছুটে গেল ঘাের। বৌমা এসে খেতে ডেকে গেল এ সময়টার জন্যেই তিনি অপেক্ষায় থাকেন। এ সময়টাতেই ঘুমন্ত বাড়িটা যেন জেগে ওঠে। সবাই একসাথে বসা, হাসি, কাজের কথা— সবই হয়। তিনিও যেন প্রাণ ফিরে পান।

কিছুক্ষণ পর সবাই ঘুমিয়ে পড়বে। কাল আবার আধুনিক যুগের ব্যস্ততার ভিড়ে এদের হারিয়ে ফেলবেন তিনি। অপেক্ষা করবেন রাতের এ সময়টুকুর জন্যে।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.