একজন ভিক্ষুকের আত্মকাহিনি রচনা | JSC, SSC |

একজন ভিক্ষুকের আত্মকাহিনি

আমি একজন অতি সাধারণ ভিক্ষুক। অন্যদের থেকে আমাকে আলাদা করে চেনার উপায় নেই। আমার গায়ে একটা ছেড়া পাঞ্জাবি আর পরনে লুঙ্গি। হাতে অ্যালুমিনিয়ামের থালা, দুই বছর আগে রােজার ইদে কমলাপুর রেল স্টেশনের এক কনস্টেবল আমাকে পাঞ্জাবিটা দেয়। সাধারণত আমি বিজয় সরণি আর ধানমন্ডি ২৭ নম্বর রােডের সিগন্যালে ভিক্ষা করি। রেল স্টেশনে যাই রােজার ইদের সময়। তখন ফিতরার টাকা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই লাভও হয় বেশি।

ভিক্ষাবৃত্তি আমি নিজে থেকে বেছে নিইনি। বড়লােকরা বলে ভিক্ষা করা খারাপ, কাজ করেও রােজগার করা যায় । আমি একসময় কাজই করতাম, হতদরিদ্র সংসারে খাবারের অভাবে আর সৎ মায়ের অত্যাচারে সব ছেড়েছিলাম তেরাে বছর বয়সে। মালগাড়িতে করে একদিন চলে এলাম ঢাকায়। তখন ঢাকায় এত যানজট ছিল না। মানুষ কম ছিল। বাড়িঘর ছিল আরও কম। রেল স্টেশনে একজনের সাথে পরিচয় হয়, সে আমাকে একটা কারখানায় কাজ দেয়। বেতন ছিল অল্প, কাজটাও ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু তখন এত বাছাবাছির অবস্থায় নেই, কাজ হলেই চলে। সেই কারখানায় কাজ করলাম কয়েক বছর, ভেবেছিলাম টাকা-পয়সা জমিয়ে গ্রামে ফিরে যাব আর ব্যবসাপাতি করব। একদিন হঠাৎ কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। সেই সাথে রােজগারের পথও। জমানাে টাকাপয়সা শেষ হয়ে গেল কিছুদিনের মধ্যেই। রেল স্টেশনে কুলিগিরি করলাম কয়েক বছর। এরপর আবার ফিরে গেলাম গ্রামে। ন্তুি পরিবারের দেখা পেলাম না। তারা কোথায় গেছে কেউ জানে না। গ্রামের প্রভাবশালী এক লােক তার ধানের জমিতে আমাকে কাজ দিল চেনা পরিবেশ, চেনা লােকজন, বেশ ভালাে লাগছিল কাজ করতে। কয়েক বছর পর সেই ধানের জমি বিক্রি করে দেয়া হলাে। নতুন মালিক কলের লাঙল কিনলেন। একসাথে আমরা অনেকে বেকার হয়ে গেলাম আর আবার শহরের পথে রওনা দিলাম । এরপর গ্রাম দেখার সৌভাগ্য আর হয়নি।

আবার কারখানা হলাে আমার কাজের ঠিকানা। আর এ কারখানাই হলাে আমার কাল । একদিন অসাবধানতার বশে মেশিনের নিচে হাত পড়ে গেল । কনুইয়ের নিচ থেকে কাটা পড়ল ডান হাত। সস্তা কারখানা, ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নেই। উল্টো চাকরি হারাতে হলাে, বিপদের সময় পরিচিত লােকজন সব কেটে পড়ল। আমি আক্ষরিক অর্থেই পথে বসলাম। সেই থেকে আজ পাঁচ বছর হলাে ভিক্ষা করছি। রাতে ডিভাইডারের উপর ঘুমাই । মগবাজারের এক গলিতে দশ টাকায় দুপুর আর রাতের ভাত পাওয়া যায়, সেটা খাই । ঝড়-বাদলের দিন বড় কষ্ট হয়। একবার বৃষ্টিতে ভিজে পাঁচ দিন জ্বরে ভুগেছিলাম। তিন জন টোকাই তখন আমার সেবা করে । ধুলা-ময়লার সস্তা জীবনের এ মানুষগুলাের মহানুভবতা আমাকে সেদিন চমকে দিয়েছিল । তাদের জন্যে আমি কিছুই করতে পারিনি। এরপর থেকে আকাশে মেঘ দেখলেই রেল স্টেশনের দিকে হাঁটা দিই।

ধানমন্ডি ২৭ নম্বর রােডে আমার ভালােই রােজগার হয়। দিনে গড়পিছু চল্লিশ টাকা, কোনাে কোনাে দিন নব্বই টাকাও হয় কিছু মানুষ নিয়মিতই এক দু টাকা করে ভিক্ষা দেয়। আবার কয়েকজন নিয়মিত না দিলেও, যখন দেয় তখন বেশি করে দেয়। একদিন এভাবে আমাকে একজন দশ টাকা দিয়েছিল । মনে আছে সেদিন অনেকদিন পর মাংস খেয়েছিলাম। আবার এক ধরনের মানুষ আছে যারা দিতেই চায় না, আরও ভিক্ষুক এসে ভিড় করবে এ ভেবে । ঢাকা শহরের যানজট সমস্যা আমাদের জন্যে এক আশীর্বাদ। ট্রাফিক জ্যাম হলেই আমরা গাড়ির দরজায় ভিড় করি। কিছু গাড়ির গ্লাস তুলে দেয়া থাকে, সেখানে টোকা মারা ছাড়া কিছু করার থাকে না। আবার কিছু গাড়ি আছে সেগুলাের গ্লাসের ভেতর দিয়ে কিছু দেখা যায় না। সেগুলাে বড়লােকদের গাড়ি । সৌভাগ্যবানদের গাড়ি ।

আমি জানি, ভিক্ষাবৃত্তিটাকে অনেকে ব্যবসা মনে করে। অনেকে ভাবেন, ভিক্ষা করে অলস-অপদার্থ লােক, যারা কাজ করতে পারে কিন্তু করতে চায় না। অবশ্য অনেকেই ছলচাতুরির আশ্রয় নেয়। আমি নিজে দেখেছি, অন্ধ নয় কিন্তু অন্ধ সেজে ভিক্ষা করছে। অন্ধ ভিক্ষুকদের প্রতি সাধারণ মানুষের এক ধরনের দুর্বলতা আছে। সেই সুযােগটাই তারা নিতে চায়। অনেকে মনে করে ভিক্ষুকদেরও সংগঠন আছে। তারা ভিক্ষার জায়গা ঠিক করে দেয়, টাকা-পয়সাও ভাগ-বাটোয়ারা করে। নিজের চোখে অবশ্য এরকম কিছু দেখিনি। তবে সব ভিক্ষুক যে আমার মতাে অসহায় নয় তা বুঝতে পারি ।

এভাবেই চলে আমার মতাে ভিক্ষুকদের জীবন। যাদের ভবিষ্যৎ নেই, প্রত্যাশা নেই, শখ-আহ্লাদ নেই, শুধু কোনােমতে বাকি জীবন কাটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। আমার চেয়ে অসহায় মানুষদের যখন দেখি, তখন নিজেকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করি। তারপরও একটা চাপা ক্ষোভ সবসময় মনকে কষ্ট দেয়। এ কষ্টই বােধ হয় একজন ভিক্ষুককে আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *