ঝড়ের রাত রচনা

একটি ঝড়ের রাত রচনা

মানবজীবন বিচিত্র ঘটনাবলির নিরন্তর পরিক্রমা। ক্ষণে ক্ষণে জীবনে আনন্দ আসে, আসে বেদনাও। রুপালি জ্যোৎস্নার রাত এসে মানুষকে আনন্দ বিলিয়ে যায় আবার অন্ধকারে বয়ে যাওয়া ঝড় মানুষকে দিয়ে যায় অন্তহীন বেদনা, দিয়ে যায় মৃত্যু।
কারাে কাছে কোনাে একটি দিন কিংবা রাত অজস্র সুখ বয়ে নিয়ে আসে আবার কারাে জন্যে বয়ে আনে গভীর বেদনা । আনন্দ-বেদনারই কাব্য মানবজীবন। অনেক আনন্দের পাশাপাশি আমার স্মৃতিতে আছে একটি কষ্টকর অভিজ্ঞতার রাত সে রাতটি একটি ঝড়ের রাত। যে রাতের স্মৃতি আজও আমাকে নাড়া দিয়ে যায় অতি সংগােপনে।

বৈশাখের শেষের দিকে কোনাে এক শুক্রবার। তারিখটা ঠিক মনে নেই। কাল থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। আর আমি চাইছিলাম বৃষ্টি যেন আর না বাড়ে। কারণ সেদিন বিকেলে পার্শ্ববর্তী গ্রাম নয়নপুরের সাথে আমাদের গ্রামের অনূর্ধ্ব ১৫
কিশাের ছেলেদের ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিল। আর আমি ছিলাম আমার গ্রামের কিশাের ফুটবল একাদশের অন্যতম খেলােয়াড়। আক্রমণ ভাগের ভালাে খেলােয়াড় হিসেবে আমার সুখ্যাতি ছিল বলে সে দিনের ম্যাচে আমাকে ঘিরে
দলের এবং গ্রামবাসীর প্রত্যাশাও ছিল বেশি। কিন্তু প্রকৃতি আমার কাছে কিছুই প্রত্যাশা করল না। বরং বিকেলের আবহাওয়া আর বৃষ্টি সে দিনের কাঙ্ক্ষিত ফুটবল ম্যাচকে পণ্ড করে দিয়ে তার শক্তির পরিচয়কেই প্রতিষ্ঠা করল । সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলাে। ব্যথাতুর মনে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে পড়ার টেবিলে বই নিয়ে বসেছিলাম। কিন্তু হা-হুতাশ ছাড়া আর কিছুই করতে পারছিলাম

গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আর গুড়গুড় শব্দে রাত্রির অন্ধকারও যেন ভয় পাচ্ছে। বাতাসের বেগ কখনাে স্বাভাবিক, কখনাে অস্বাভাবিকভাবে এসে জানালায় ধাক্কা দিয়ে যেন আতঙ্ক সৃষ্টির খেলায় মেতেছে। আমি একে বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে রাতের খাওয়া সেরে ঘুমানাের প্রস্তুতি নিলাম। টিনের চালে দমকা বাতাসের ঝাপটা এসে লাগছিল। মনে হচ্ছিল যেন প্রকৃতির টার্গেট আমি। আমাকে বিকেলে ফুটবল খেলতে দেয়নি, এখন ঘুমাতেও দেবে না। টিনের চালের অস্বাভাবিক ধাক্কাটা এসে বুকের মধ্যে লাগল । রাত যত গভীর হতে থাকল, প্রকৃতির শক্তিও যেন ক্রমশ তীব্র হতে লাগল । দমকা বাতাস এসে শিয়রে জ্বালানাে বাতিটা নিভিয়ে দিল। অস্বাভাবিক বিজলির চমকে মুহর্তেই বিকট শব্দে বজ্রপাত ঘটল। পাশের বাড়ি থেকে ভিতু রাবেয়ার গােঙ্গানির শব্দ শােনা গেল ।

না,ঘুমানাে সম্ভব নয়। আজ না ঘুমানাের রাত। মধ্য রাতে চতুর্দিকে মানুষের হাহাকার শােনা যাচ্ছে। ঘরের মধ্যে আমরা সকলেই অনিদ্র। মা ব্যস্ত হয়ে আল্লাহকে স্মরণ করতে লাগলেন। চিরায়ত কুসংস্কারে বিশ্বাসী মা হঠাৎ করেই দরজা খুলে বাইরে ছুড়ে দিলেন কাঠের পিঁড়িটা। কিন্তু না। ঝড়ের দেবতা অজ পিঁড়িতে বসে শান্ত হবার নয়। সৃষ্টি যেন আজ ধ্বংসের লীলায় মত্ত। প্রকৃতি ক্ষুব্ধ হয়েছে আজ। কোনাে এক প্রতিশােধের নেশায় যেন সে বেপরােয়া হয়ে উঠেছে। তাই অন্ধকারে তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে সে।

নিকষ কালাে অন্ধকারে বিচিত্র শব্দ কানে এলাে মড়মড় শব্দ কানে বাজলেই অনুমান করার চেস্টা করলাম কোনাে গাছ যেন ভেঙে গেল । ঝন ঝন শব্দে টিনের চাল কেঁপে উঠছে— এ বুঝি উড়িয়ে নিল সব। স্পষ্ট শােনা যাচ্ছে পাশের বাড়িতে সুতীব্র চিৎকার। বেরিয়ে পড়েছেন তারা। হায়! শােনা গেল লাল-সিঁদুরে আম গাছটা ভেঙে পড়ল তাদের ঘরের চালে । দরজা-জানালা বন্ধ । তবুও দমকা হাওয়া কোনাে অজানা পথ যেন চিনে নিয়েছে। হাওয়া ঢুকে হ্যারিকেনটাকে আবার নিভিয়ে দিল । আতঙ্ক ছেয়ে ফেলল আমাদের । অন্ধকারেই আমাদের আগলে ধরে প্রবােধ দেবার চেষ্টা করলেন আব্বা। কী করা যায়। কর্তব্য স্থির করতে পারছে না কেউ। ঘরের ভেতরে-বাইরে কোথাও নিরাপত্তার ভরসা নেই। দূরে, নিকটে সর্বত্রই আর্তনাদের ধ্বনি। বাইরে মানুষের আর্তনাদ আর ঘরে অন্ধকারে আতঙ্ক নিয়ে কোনােমতে বেঁচে আছি আমরা। আরও বারকয়েক আকাশে মেঘের গর্জন শােনা গেল । ক্রমশ প্রকৃতি শান্ত হয়ে আসছে বলে মনে হলাে। এভাবে চলে গেল আরও কিছুক্ষণ। অবশেষে যখন প্রকৃতি শান্ত হলাে তখন সকাল হতে বিশেষ বাকি নেই। অন্ধকারেই হ্যারিকেন, বাতি নিয়ে নারী, পুরুষ, শিশু, বুড়াে সকলেই বেরিয়ে পড়ল। চতুর্দিকে ভাঙা গাছ, ভেঙে যাওয়া বাড়িঘর এসব দেখে মনে হচ্ছিল না এ আমার চিরচেনা প্রকৃতি। সকাল হলাে। জানা গেল মর্মান্তিক খবর । কাছের বস্তিতে কয়েকজন মারা গেছে মাটির দেয়াল ধসে। এমনি। করে পার হলাে জীবনের এক ভয়াল ঝড়ের রাত ।

জীবনের কত ঘটনাই স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে আছে। তবে সেই ঝড়ের রাতের স্মৃতি ব্যতিক্রম । ভুলতে পারি না সেই রাতের কথা। বৈশাখি কোনাে মেঘলা আকাশ দেখলে আমার আজও মনে ভাসে সেই আর্তনাদের ছবি ।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *