Faria Hasan / March 12, 2021

কুটিরশিল্প রচনা (১০০০ শব্দ) | HSC |

Spread the love

কুটিরশিল্প রচনার সংকেত

  • ভূমিকা
  • বাংলাদেশের কুটিরশিল্পের বৈচিত্র্যময় আয়ােজন
  • কুটিরশিল্প সৃষ্টির প্রেক্ষাপট
  • কুটিরশিল্পের সমৃদ্ধ অতীত
  • কুটিরশিল্পের বর্তমান অবস্থা
  • কুটিরশিল্পের অবনতির কারণ
  • কুটিরশিল্পের পুনরুজ্জীবনের উপায়
  • কুটিরশিল্পের উন্নয়নে বর্তমান উদ্যোগ
  • উপসংহার

কুটিরশিল্প রচনা লিখন

ভূমিকা:

বাংলাদেশের ঐতিহ্যের স্বয়ংসম্পূর্ণ ইতিহাস রচনা করতে হলে কুটিরশিল্পের কথা সর্বাগ্রে বিবেচ্য। গ্রামীণ সাধারণ মানুষ নিজেদের প্রয়ােজনে পর্ণকুটিরে বসে দক্ষ হাতে তৈরি করত নানা সামগ্রী। এ সামগ্রীতে একাকার হয়ে মিশে যেত তাদের সরল মনের সহজ সৌন্দর্যবােধ । মাটিঘেঁষা মানুষের অকৃত্রিম আন্তরিকতাপূর্ণ শৈল্পিক ছোঁয়ায় তৈরি এসব নিত্যব্যবহার্য সামগ্রীকেই বলা হয় কুটিরশিল্প। এককালে কুটিরশিল্প বাংলাকে দিয়েছিল বৈশ্বিক মর্যাদা। অতীত ঐতিহ্য ধরে রাখতে না পারলেও কুটিরশিল্প এখনও দেশের অর্থনীতিতে রাখছে উল্লেখযােগ্য ভূমিকা।

বাংলাদেশের কুটিরশিল্পের বৈচিত্র্যময় আয়ােজন:

বাংলার কুটিরশিল্পের বিপুল আয়ােজনের কথা বলতে গেলে সর্বাগ্রে আসবে তাঁতশিল্পের কথা । এছাড়া রেশম ও পশমশিল্প, চামড়াশিল্প, মৃৎশিল্প, বেতশিল্প, অলংকারশিল্প, খেলনার জিনিস, ঝিনুকের তৈরি নানা দ্রব্য, সূচিশিল্প ইত্যাদি কুটিরশিল্পের উল্লেখযােগ্য আকর্ষণ । প্রাত্যহিক জীবনধারণের জন্য এসব শিল্পপণ্য তৈরি হলেও এগুলােতে গ্রামীণ মানুষের বিলাসী মনের পরিচয় বিধৃত।

কুটিরশিল্প সৃষ্টির প্রেক্ষাপট:

সেকালে বাংলাদেশের গ্রামগুলাে ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং গ্রামীণ মানুষগুলাে ছিল স্বনির্ভর । গ্রামীণ কাঠামাে ছিল কৃষিনির্ভর । খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়ােজনীয় সকল জিনিসই গ্রামের মানুষগুলাে নিজেরাই তৈরি ত। নিজেদের দৈনন্দিন প্রয়ােজন মেটানােই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। এভাবেই একেক পেশার মানুষ কুটিরশিল্পের একেক শাখায় নিয়ােজিত হতাে। কেউ বস্ত্রশিল্পে, কেউ মৃৎশিল্পে, কেউ কাঠশিল্পে, কেউ ধাতুশিল্পে— এভাবেই ব্যাপক প্রসার লাভ করেছিল কুটিরশিল্প । একসময় দেখা গেল, গ্রামের অর্থনীতি হয়ে পড়েছিল কুটিরশিল্পনির্ভর।

কুটিরশিল্পের সমৃদ্ধ অতীত:

একদা বাংলাদেশের কুটিরশিল্পীদের শৈল্পিক চাতুর্য বিস্ময়াভিভূত করেছিল সমগ্র বিশ্ববাসীকে। ঢাকাই মসলিনের বিশ্বজোড়া খ্যাতি বাংলাকে অধিষ্ঠিত করেছিল শিল্পবােধের উচ্চাসনে এ গৌরবময় ঐতিহ্যের কথা সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতায় ফুটে উঠেছে অসাধারণ অভিব্যক্তি নিয়ে:
বাংলার মসলিন বােগদাদ রােম চীন
কান তৌলেই কিনতেন একদিন।’

এছাড়া স্বর্ণশিল্প, রেশমশিল্প, রৌপ্যশিল্প, মৃৎশিল্প, সূচিশিল্প প্রভৃতিতেও কুটিরবাসী শিল্পীদের দক্ষতা ছিল ঈর্ষণীয়। একসময় এ কুটিরশিল্পের কিছু কিছু পণ্য বিশ্ববাসীর কাছেও লােভনীয় হয়ে উঠেছিল। ফলে কুটিরশিল্পের মাধ্যমে এদেশে প্রবাহিত হয়ে আসত বৈদেশিক মুদ্রা। উল্লেখ্য বাংলার সাধারণ মানুষের হাতে বিকশিত নকশিকাঁথা শিল্পের ঐতিহ্য এখনও বহমান। একদিকে কৃষি উৎপাদন, অন্যদিকে কুটিরশিল্পের সমৃদ্ধি বাংলাদেশের গ্রামগুলােকে করেছিল সমৃদ্ধ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু আজ কুটিরশিল্পের সেই বিশ্বখ্যাত মর্যাদার কথা ইতিহাসের পাতায় আশ্রয় নিয়েছে ।

কুটিরশিল্পের বর্তমান অবস্থা:

একদিন যে কুটিরশিল্প এদেশকে দিয়েছিল বিশ্ববিশ্রুত মর্যাদা আজ তার অবস্থা হতাশাব্যঞ্জক। যন্ত্রশিল্পের ব্যাপক প্রসারের ফলে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে কুটিরশিল্প । পৃথিবীর বিলাসী জাতিরা একসময় এদেশের তথা ভারতবর্ষের কুটিরশিল্প পণ্যের জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করত। কিন্তু যান্ত্রিকতার বিপরীতে সে শিল্প মুখথুবড়ে পড়ে আছে, হারিয়ে ফেলেছে তার সমৃদ্ধ গৌরবময় অতীত। তবে সাধারণ মানুষের হাতের ছোঁয়ায় এ শিল্পের গায়ে যে কারুকার্য খচিত হয় তা বৃহদায়তন শিল্পে অনেক সময় সম্ভব হয় না। বিশেষত কুটিরবাসী মানুষের তৈরি নকশিকাঁথা, শীতলপাটি, মাটির তৈরি নানা দৃষ্টিনন্দিত দ্রব্য, বেতের তৈরি পণ্য, হাতে তৈরি তাঁতবস্ত্র কিংবা জামদানি শাড়ি ইত্যাদির শৈল্পিক আবেদন নিঃশেষ হবে না কোনােদিনও তাই দেখা যায়, কুটিরশিল্প যন্ত্রসভ্যতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলেও নানা অসুবিধার মাঝেও তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। বর্তমান যান্ত্রিক যুগে এ শিল্প হারিয়ে ফেলেছে তার অনেক ঐতিহ্য, কিন্তু কিছু কুটিরশিল্প আজও অনেক সম্ভান্না নিয়ে এগিয়ে চলেছে ।

কুটিরশিল্পের অবনতির কারণ:

ইউরােপের শিল্পবিপ্লবের সূচনা যখন থেকে শুরু হলাে ভারতবর্ষের তথা এদেশের কুটিরশিল্পের পতনের আগাম বাণীও তখন থেকে বাতাসে ধ্বনিত হলাে । ইংরেজরা জাহাজ ভর্তি কলের কাপড়, লৌহজাত নানা দ্রব্যসামগ্রী এনে এদেশের বাজার ছেয়ে ফেলল, শুরু হলাে কুটিরশিল্পের পতন, ইংরেজ শাসকরা সুপরিকল্পিতভাবে এদেশের কুটিরশিল্পের ওপর চড়াও হয়। নিজেদের বাজার সৃষ্টির জন্য তারা এদেশের রপ্তানি শিল্পের ওপর চড়া শুল্ক নির্ধারণ করে, নিজেরা বিনা শুল্কে ব্যবসা শুরু করে। অন্যদিকে, তাঁতশিল্পকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য তাঁতিদের বুড়াে আঙুল কেটে দেয়। তারা এদেশের
কুটিরশিল্পের ওপর দানবীয় শক্তি নিয়েই যেন আবির্ভূত হয়। অন্যদিকে, যন্ত্রে তৈরি শিল্পের অধিক চাকচিক্য মানুষকে মােহান্ধ করে ফেলে এবং অল্পসময়ে অধিক জিনিস সরবরাহ করতে পারে বলে জনগণ যন্ত্রশিল্পের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে তাছাড়াকুটিরশিল্প পণ্য তৈরিতে দৈহিক শ্রম ও উৎপাদন খরচ বেশি পড়ছে। ফলে কারখানাজাত শিল্পপণ্যের চেয়ে এসব পণ্যের দামও একটু বেশিই পড়ছে। অন্যদিকে, বৃহদায়তন শিল্পপণ্যের মূল্য পড়ছে কম, কিন্তু চাকচিক্য থাকছে বেশি। ফলে ক্রেতারা কম। মূল্যের জিনিসের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়েছে। সর্বোপরি পাশ্চাত্য প্রভাবে আমাদের মানসিকতা এতটাই পরিবর্তিত যে, দেশীয় শিল্পের সৌন্দর্য দেখার দৃষ্টি আমরা হারিয়ে ফেলেছি, অর্জন করেছি বিদেশি চাকচিক্যভরা হালকা জিনিসের প্রতি আকণ্ঠ পিপাসা । ফলে জীবনের চাহিদা মেটানাের জন্য কুটিরশিল্পীদের অনেকেই তাদের শিল্প-পেশা ত্যাগ করে ক্ষেতমজুর এবং কারখানার শ্রমিক হয়েছে। এ পরিবর্তনে হারিয়ে গেছে অনেক দেশীয় শিল্প এবং যা কিছু টিকে আছে তাও অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। কুটিরশিল্পের অবনতির কারণগুলাে এভাবে চিহ্নিত করা যায়—
১. যন্ত্রশিল্পের সাথে কুটিরশিল্পের অসম প্রতিযােগিতা।
২. পাশ্চাত্য মােহাতা ও পরিবর্তিত রুচি।
৩. দেশীয় শিল্পপণ্যের প্রতি অবহেলা ও উদাসীনতা।
8.স্বদেশপ্রেমের অভাব।

কুটিরশিল্পের পুনরুজ্জীবনের উপায়:

নতুন যুগের সাথে মােকাবিলা করার জন্য কুটিরশিল্পীদের প্রয়ােজন উন্নত যন্ত্রপাতি, উৎকৃষ্ট। চাচামাল, মূলধন, শৈল্পিক দক্ষতা বৃদ্ধি, উৎপাদিত পণ্য বিপণন ব্যবস্থা এজন্য প্রয়ােজন সরকারি সহায়তা ও উৎসাহ, বর্তমানে আমাদের দেশে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প সংস্থা’ নামে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান থাকলেও এ শিল্পে নিয়ােজিত লােকদের পর্যাপ্ত সুবিধা প্রদানে আরও ব্যাপক ভূমিকা প্রয়ােজন। এক্ষেত্রে কুটিরশিল্পের পুনরুজ্জবীনে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়ােজন তার মধ্যে উল্লেখযােগ্য হলাে—
১. কুটিরশিল্পীদের জন্য উন্নত যন্ত্রপাতি ও সহজ ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।
২.উৎপাদন বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয় কমানাের জন্য শৈল্পিক দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে
হবে।
৩. ক্ষুদ্র শহর ও গ্রামাঞ্চলে কুটিরশিল্পের সমপ্রসারণ করতে হবে ।
৪. কুটিরশিল্পীদের মধ্যে সমবায় প্রথার ব্যাপক সম্প্রসারণ করতে হবে ।
৫. প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের নারীসমাজকে কুটিরশিল্পের নানা কাজে নিয়ােজিত করতে হবে
৬. উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণে উৎসহ সৃষ্টি করতে হবে। প্রয়ােজনে সংরক্ষিত বাজারের ব্যবস্থা করতে হবে।
৭. শিল্পনৈপুণ্য ও দক্ষতা বিবেচনা করে শিল্পীদেরকে সম্মাননা, সনদ, বৃত্তি ও পুরস্কার দিয়ে উৎসাহিত করতে হবে।
৮. সর্বোপরি দেশীয় পণ্যের প্রতি আমাদের যে বিমাতাসুলভ আচরণ তার পরিবর্তন সাধন করতে হবে।

কুটিরশিল্পের উন্নয়নে বর্তমান উদ্যোগ:

কুটিরশিল্পের উন্নয়ন ছাড়া আমাদের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ উপলব্বি বর্তমানে সরকার ও দেশের আপামর জনসাধারণকে কুটিরশিল্পের প্রতি নতুন করে দৃষ্টি ফেরাতে বাধ্য করেছে। দেশের এ ঐতিহ্যের নবজীবন প্রদানের জন্য আজ অনেকেই আগ্রহী। এ লক্ষ্যে প্রকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা অনেক বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারিভাবে এ শিল্পের উন্নয়ন প্রয়াসে কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান, মূলধন সরবরাহ, বিপণন ব্যবস্থা প্রভৃতি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা হচ্ছে। তাছাড়া বেকারদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের সাহায্যে কুটিরশিল্পের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানে উল্লেখযােগ্য ভূমিকা রাখছে যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও কুটিরশিল্পের উৎকর্ষ বৃদ্ধিতে রাখছে সহায়ক ভূমিকা সরকারের পাশাপাশি এসব সংস্থাও কুটিরশিল্পের বাজার সৃষ্টিতে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বিদেশের মাটিতে দেশীয় এসব শিল্পের হৃতগৌরব ফিরে পাবার প্রচেষ্টায় তারা নিয়ােজিত। ফলে কুটিরশিল্পে সঞ্চারিত হচ্ছে তীজ নতুন প্রাণ-উন্মাদনা।

উপসংহার:

যেকোনাে দেশের কুটিরশিল্প সে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে করতে পারে মজবুত। এর উল্লেখযােগ্য উদাহরণ জাপান, যেখানে শ্রমশক্তির ত্রিশভাগ কুটিরশিল্পে এবং শতকরা ৩ান্নভাগ ক্ষুদ্র যন্ত্রশিল্পে নিয়ােজিত । আমাদের দেশের আর্থ- সামাজিক প্রেক্ষাপটে কুটিরশিল্পের পুনরুজ্জীবন এবং উন্নতিসাধন একান্ত প্রয়ােজন। কেননা এ শিল্পের সাথে আমাদের অর্থনীতির উন্নতি-অবনতি জড়িত। গ্রামনির্ভর আমাদের এদেশে গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণ হলাে কুটিরশিল্প ফলে এ শিল্পের উন্নতির মাধ্যমে এদেশের উন্নতি সম্ভব। সুতরাং, কুটিরশিল্পের পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমেই এদেশের ভাগ্যে রচনা করতে হবে সমৃদ্ধির এক নতুন অধ্যায়।

FILED UNDER : রচনা

Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content

রচনা, ভাবসম্প্রসারণ,অনুচ্ছেদ,পত্র, আবেদন পত্র, সারাংশ-সারমর্ম , লিখন , বাংলা, ১০ম শ্রেণি, ২য় শ্রেণি, ৩য় শ্রেণি, ৪র্থ শ্রেণি, ৫ম শ্রেণি, ৬ষ্ঠ শ্রেণি, ৭ম শ্রেণি, ৮ম শ্রেণি, ৯ম শ্রেণি,  for class 10, for class 2, for class 3, for class 4, for class 5, for class 6, for class 7, for class 8, for class 9, for class hsc, for class jsc, for class ssc, একাদশ শ্রেণি, দ্বাদশ শ্রেণি