রচনা: পানি সংকট এবং আমরা

পানি সংকট এবং আমরা: বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট রচনার সংকেত

  • ভূমিকা
  • পানি সংকট কী
  • পানি সংকটের কারণ
  • বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
  • পানি সংকটের প্রভাব
  • পানি সংকট ও বাংলাদেশ
  • উত্তরণের উপায়
  • আমাদের প্রস্তুতি
  • উপসংহার

পানি সংকট এবং আমরা: বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট রচনা

ভূমিকা:

পানির অপর নাম জীবন। তাই পানি ছাড়া জীবনের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। পানি জীবন ধারণের মৌলিক উপাদান। কৃষি, শিল্প, জ্বালানি এমনকি মানব সভ্যতার ভবিষ্যত অনেকাংশেই পানি ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল । অথচ অতি প্রয়ােজনীয় সুপেয় পানির পরিমাণই দিনকে দিন কমে আসছে, যা আমাদের জীবনযাত্রার জন্য হুমকিস্বরূপ।

পানি সংকট কী:

প্রকৃতপক্ষে পানি সংকট বলতে ব্যবহারযােগ্য তথা মিষ্টি পানির অভাবকে নির্দেশ করে। পৃথিবীর চার ভাগের তিন ভাগ পানি হলেও তার প্রায় ৯৭ শতাংশেরও বেশি সমুদ্রের লােনা পানি। সংগত কারণেই এই পানি ব্যবহারের অযােগ্য। মােট পানির মাত্র ০.৩ শতাংশ নদীনালা, খালবিল, পুকুর বা জলাশয়ে থাকে। ব্যবহারযােগ্য পানি বলতে এই নদনদী, জলাশয় এবং ভূগর্ভস্থ পানিকেই বােঝায়। আমাদের চাহিদা অনুপাতে এই পানি যথেষ্ঠ নয়। পানির এই অপ্রতুলতাই পানি সংকট।

পানি সংকটের কারণ:

পানি সংকট বর্তমান বিশ্বে এক ভয়াবহ সমস্যা। আগামী দিনগুলােতে এই সমস্যা আরও প্রকট হবে বলে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এর জন্য নির্দিষ্ট একটিমাত্র কারণ দায়ী নয়, বরং প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বহু কারণ রয়েছে। মানবসৃষ্ট কারণের মধ্যে পরিবেশ দূষণের বিষয়টি অগ্রগণ্য। সভ্যতার ক্রমােন্নতির সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দূষণের হার । শুধু তাই নয়, পৃথিবীজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে বনভূমি ধ্বংস করা হচ্ছে। ক্রমাগত নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। এই পরিবর্তনের সাথে পানি সংকটের বিষয়টি গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়ন, নদীতে যথেচ্ছ বাঁধ নির্মাণ, নদীর পানির সুষ্ঠু বণ্টন নিয়ে বিভিন্ন দেশের টানাপােড়েন পানি সংকটকে তীব্রতর করে তুলছে। এছাড়াও অনেক নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে, অনেক নদী মৃত অথবা মৃতপ্রায়, যা এসকল অঞলে পানি সংকটকে ত্বরান্বিত করছে। বিজ্ঞানীদের আশংকা— আর মাত্র এক ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে বিশ্বের প্রায় ১৪৫ কোটি মানুষ সুপেয় পানি সংকটের মুখে পতিত হবে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট:

জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে দ্রুত তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যেই বিশ্বে প্রায় ৪০ ভাগ পানি সংকট দেখা দেবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধিসহ নানা কারণে এ শতাব্দির মধ্যভাগেই পানির চাহিদা প্রায় ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।

পানি সংকটের প্রভাব:

ইতােমধ্যেই বিশ্বের ৮০টি দেশের প্রায় ১১০ কোটি মানুষ পানি সংকটে ভুগছে। এছাড়াও প্রতিবছর বিশ্বের প্রায় ১৮ লক্ষ শিশুর মৃত্যু হচ্ছে দূষিত পানি পান করার কারণে। ইতােমধ্যেই দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে পানি সংকট এমন অবস্থায় পৌছেছে যে, কর্তৃপক্ষ বলছে— সহসাই সেখানে পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে জরুরী অবস্থা এসে যেতে পারে। এছাড়াও সুপেয় পানি আমদানির বিষয়কে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে টানাপােড়েনের সৃষ্টি হয়েছে। শুধু তাই নয়, ফারাক্কা বাঁধ ও তিস্তার পানিবণ্টনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যেও একধরনের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব চলছে।

পানি সংকট ও বাংলাদেশ:

বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড়াে অংশ পানি সংকটে রয়েছে। তা সত্ত্বেও কৃষিকাজের জন্য অনিয়ন্ত্রিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হারে ভূ-গর্ভস্থ পানি তুলে ফেলা হচ্ছে। ন্তুি সেই পানি একই হারে সেখানে যুক্ত হচ্ছে না। ফলে দিন দিন পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। তাই ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের এখনই সচেতন হতে হবে। অন্যথা, অদূর ভবিষ্যতে আফসােস করা ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না

উত্তরণের উপায়:

পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদেরকে সচেতন হতে হবে। স্থলভাগের পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। গত কয়েক শতকে এদেশের নদী ও জলাশয়ের সংখ্যা আশংকাজনক হারে কমে এসেছে। যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ করে মৃত ও অর্ধমৃত নদনদী, খালবিল খননের ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বোপরি পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং জলবায়ুর স্থিতিশীলতা রক্ষায় বিশ্বনেতৃত্বকে সমন্বিত ও কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

আমাদের প্রস্তুতি:

পানি সংকট বিষয়ে অন্যান্য দেশের মতাে বাংলাদেশও চিন্তিত। কেননা, পানি সংকটের কারণে যে কয়টি দেশ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ তার মধ্যে একটি। আর তাই বাংলাদেশ সরকারও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে। এরই অংশ হিসেবে সরকার দখল হয়ে যাওয়া নদীগুলাে উদ্ধারের জন্য সচেষ্ট হয়েছে। শুধু তাই নয়, হারিয়ে যাওয়া নদীগুলাের নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে খননসহ নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।

উপসংহার:

পানি সংকট একটি বৈশ্বিক সমস্যা। আর তাই এককভাবে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয় এর জন্য প্রয়ােজন সমন্বিত উদ্যোগ। এ কারণে সমস্যাটির ভয়াবহতা বিবেচনায় এনে বিশ্বনেতৃত্বকে এর সমাধানের জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এছাড়া সমাজ ও ব্যক্তি পর্যায়েও পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের সচেতন হতে হবে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। এভাবে সকলের সম্মিলিত প্রয়াসেই পানি সংকটের মতাে ভয়াবহ বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব হবে।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *